Monday, November 1, 2010

ক্ষতিপূরণ / দেবব্রত কর বিশ্বাস


( দেবব্রত কর বিশ্বাস: কবি, বন্ধু, বিরিয়ানী প্রেমী, প্রবল ভাবে কোলকাতা বাজ, আড্ডা-বিলাসী এবং ঘোর ইস্ট বেঙ্গলিস্ট! 'মেঘজন্ম' নামক লিটিল ম্যাগাজিনের ব্রেন-পিতা ও যুগ্ম-সম্পাদক। )


******

একটা শব্দ আমাকে অনেকদিন ধরে ভাবাচ্ছে- ক্ষতিপূরণ। যেকোনো বিপর্যয় হলে সাধারণত সরকার বা প্রশাসন, যাই বলি না কেন, তাঁরাই এই ক্ষতিপূরণের সিদ্ধান্ত নেন। ক্ষতিপূরণের হার এবং প্রাপকদের সম্বন্ধেও শেষ সিদ্ধান্তটুকু সম্ভবত তাঁরাই স্থির করেন। আর কিছু বেসরকারী উদ্যোগ, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে এসে দাঁড়ান। ক্ষতিপূরণ দেওয়ার মতো সামর্থ্য, অধিকার, কোনোটাই তাঁদের থাকে না। তাই তাঁরা শুধু পাশে এসে দাঁড়ান। অন্তত তাঁরা তেমনটাই বলে থাকেন। ক্ষতিপূরণ দেওয়ার অধিকারটুকু সবলে নিজেদের দখলে রেখেছে সরকার বা প্রশাসন বা মালিকপক্ষ। ক্ষতি করবার ক্ষমতা আছে যার, ক্ষতিপূরণ সেই দেবে।

এটাই নির্ধারিত। তাই আজ টিভিতে, খবরকাগজে, ইন্টারনেটের আনাচে কানাচে চোখ রাখলেই জানতে পারা যায়, কোনো বৃহত্তর বিপর্যের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়েও সরকার এবং বিরোধীপক্ষ বেশ কোমর বেঁধে প্রতিযোগীতায় নেমেছে- কে কত বেশী টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে পারে ! আচ্ছা, এই লড়াই-কে কি সুস্থ প্রতিযোগীতা বলা চলে ?অথচ আমরা, সাধারণ মানুষেরা, পপকর্ন হাতে দর্শকাসনে আয়েস করে বসে এই লড়াই উপভোগ করছি। অথচ যার জন্য এতকিছু, সেই বিপর্যয়টুকু কেন হলো, কে বা কারা দোষী, তারা শাস্তি পেলো কিনা, এইসব প্রশ্নের উত্তর অধরাই থেকে যায়। আমরা সবাই যেন কম বেশী মনোনিবেশ করে বসে আছি একটাই শব্দের দিকে- ক্ষতিপূরণ।

সেদিন ছুটির বিকেলে আমার বন্ধু সুমনের ছোট্ট স্টেশনারী দোকানে বসে আড্ডা মারছিলাম। দোকান লাগোয়া এসটিডি বুথ। সেটাও সুমনদের। কয়েক বছর আগেও এই বুথ রমরম করে চলতো। মানে আমাদের সবার হাতে মোবাইল ফোন চলে আসার আগে। এখন টিমটিম করে টিকে আছে। সুমনের সঙ্গে কথা হচ্ছিলো। পৌরসভা রাস্তা চওড়া করবে বলে সুমনদের জমির খানিকটা নিয়ে নিয়েছে। ফলে দোকানটাও আগের থেকে ছোট হয়ে গেছে। তার জন্য সুমনরা ক্ষতিপূরণ পাবে। কিন্তু কত টাকা পাবে সে সম্বন্ধে কোনো আইডিয়া নেই সুমনের। তবে সেই টাকা পেতে যে অনেক সময় লাগতে পারে সেই বিষয়ে সুমনকে নিশ্চিত দেখলাম। ওরা এখন বিরোধী দলের কাছে যাবে বলে ভাবছে। একটা প্রতিযোগীতার আবহ তৈরি করে যদি ক্ষতিপূরণের টাকা ঠিকঠাক সময়ে পেয়ে যায়, সেই চেষ্টা করবে। অথচ আমি কেমন চুপ করে যাচ্ছি আজকাল। ক্রমাগত বিপর্যয়, ক্ষয়ক্ষতি, খুন-জখম, এইসব শব্দ আর আমাদের সেভাবে ভাবাচ্ছে কি ? আমরা এড়িয়ে চলার সাহস এবং ভঙ্গিমা, দূটোই রপ্ত করে নিয়েছি।
নিজের খুব প্রিয় একটা রঙিন কাচের বল হারিয়ে গিয়েছিলো বলে একসময় একটি ছোট্ট ছেলে খুব কেঁদেছিলো, আর সেই ছেলেটি যখন বড় হলো, সাদা-কালো, একনম্বর-দুনম্বর বুঝতে শিখলো তখন সে নিজের মতো করে ক্ষতিপূরণ বুঝে নিতে শিখে গেছে। তাই আজ বড় কিছু হারিয়ে গেলেও তার সেভাবে কষ্ট হয় না আর। কষ্ট পাওয়ার মতো মনটাও বোধহয় সে হারিয়ে ফেলেছে। এখন সে শুধু জিততে চায়। জীবনের ছোট-বড়, রঙিন-সাদাকালো, সমস্ত যুদ্ধে জিততে চায়। সমুদ্র যার সমস্ত কেড়ে নিয়েছে, যাকে নিঃস্ব করে রেখে সেই সমুদ্র বহাল তবিয়তে শুয়ে আছে পৃথিবীর বুকে, সেই অনন্ত জলরাশি দেখে কি ভয় পাবে সর্বহারা নাবিক ? নাকি সমুদ্রকে জয় করে প্রতিশোধ নিতে চাইবে সে ?
সুমনদের দোকানে একটি সুন্দর দেখতে মেয়ে ফোন করতে এসেছিলো। আমরা আড়চোখে দেখছিলাম। সুমন বললো- মেয়েটি রোজ এখানে আসে বিদেশে চাকুরীরত বন্ধুকে ফোন করবে বলে। সেদিন ফোনে কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেললো মেয়েটি- তোমাকে ভুলে যাবো? সেও কি সম্ভব ? ব্যস। আর কোনো কথা না বলে ফোন রেখে দিয়ে বিল মিটিয়ে মেয়েটি চলে যায়। সুমন জানিয়েছে মেয়েটি আর কোনোদিন আসেনি। নিশ্চিত ভাবেই মেয়েটি একটি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে। ওকে কে ক্ষতিপূরণ দেবে ? এসব ভাবতে ভাবতে দেখি একটি অলৌকিক জলযানে চড়ে বসেছি আমি। সম্পূর্ন একা। আমার চারদিকে দিগন্ত বিস্তৃত সমুদ্র। মধ্যরাত্রির অন্ধকারে সেই সমুদ্রে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ফসফরাস জ্বলছে আর নিবছে !

ছবি: আরিত্র সান্যাল।

Wednesday, September 22, 2010

Amnesiac হিজিবিজি



একটি দুর্ঘটনা।
স্মৃতির এলোমেলো হয়ে যাওয়া এক মানুষের কিছু অসংলগ্নতা, পুরনো খাতার পাতায় কিছু হিজিবিজি।
হিজিবিজি সর্বস্ব কাগজটার হাতে চলে আসা একান্তই আকস্মিক।
********
তখন থেকে রুমালের এক কোন মন দিয়ে চিবিয়ে চলেছি নোনতা, বিস্বাদ। মিডিল টার্ম ফ্যাক্টরাইজেসনে তো এর আগে কখনো থমকে যেতে হয়নি এই অঙ্কের বইটা কার? অভিরূপের?
রুমালটা থেকে ভারী বিকট গন্ধ আসছে, কতদিন ধোয়া হয়নি বোধ হয়রুমাল কে ধুতো? মা? রুমাল মাই ধুতো, স্পষ্ট মনে পড়ছে এলুমিনিয়ামের বালতি, সাদা ফ্যানা,কল ঘর। মাএর মুখ টা আবছা ভাসছে।

বালতি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, অথচ মার মুখটা অস্পষ্ট, ধুর!মা কানে ঝোলা দুল পরতেন, তাই না? নিশ্চয় পরতেনআলবাত পরতেনআচ্ছা, মা কে আপনি করে ভাবছি কেন? মা কে তো তুমি করে ডাকতাম, এই অভিরূপ নামের যে ছেলেটা সারাদিন আমার পাশে ঘুর-ঘুর করে, সেও তো নিজের মাকে তুমি করেই ডাকে। না না, মাকে তুমি বলেই ডাকা ভাল।
রুমাল, মা, সব মিলে যাচ্ছে কেন? রুমাল বোধ হয় মায়েরাই ধুয়ে থাকে, তাই তো মা, তবেই তো রুমালকিন্তু মা না থাকলে? তখন রুমালের কী হয়?
অভিরূপ আমায় বাবা ডাকে, ভাল লাগেবিশ্বাস করতে এত কষ্ট হয় কেন? দারুন ঝক ঝকে একটা ছেলেদেবতার গ্রাস পুরোটা মনে আছে, পানপোসের লাল বাড়িটা মনে আছে, নয়ন তারার শাড়ির লাল পেড়ে হলদে আঁচল কি সুন্দর মনে পড়েশুধু অভিরূপ কেন মনে আসে না? অভিরূপের মা কি তবে আমার--? তবে শিউলির কি হল? অভিরূপের মাকে ভয় লাগছে কেন? কষ্ট খুব হচ্ছে, খুব। কষ্ট মানেই তো খারাপ নয়, কষ্টে কান্না আসেআমার কান্না ভাল লাগে
মিডিল টার্মটা হয়ে গেল, দোতলার এই ব্যালকনিটা খুব সুন্দরবিকেল বেলা এখানে বসে থাকতে কি ভালোই যে লাগেঠিক আমাদের পানপোসের বাড়িটার মত, অবিকল এরকম একটা বাড়ি আমি বানাতে চেয়েছিলাম হালিশহরে। এই জায়গাটা বোধ হয় বহরমপুরহালিশহর নামটা যে কেন মনে আসছে কে জানেশিউলি কি ওখানে থাকে?
আকাশ মেঘলা ছিলই, এই টুপটাপ বৃষ্টি শুরু হল, বৃষ্টির ফোঁটা ছিটকে এসে চাএর কাপে পড়ছেটপাত-চলাক-চল! দারুন, দারুন লাগছে, অভিরূপটা যে কোথায় গেল! আমি খুব খুশি এখন, কান্না পাচ্ছে! এই যে কান্না ভালোবাসা, এটাও তো একটা সিকনেস, তাই না? অভিরূপকে জিজ্ঞেস করব
তমাল আমাদের ফার্স্ট বয় ছিল, কেন এ কথা মনে এল জানি না, হয়তো শিউলির জন্যে, শেষ করে দিল মেয়েটাকে তমালঅভিরূপের মাকে দেখলে এত ভয় হয়, শুধু ভয় না, অপরাধ বোধ জুড়ে বসেযেদিন আমায় জড়িয়ে ধরলেন, কেন যে আমি ফস করে শিউলি বলে ডেকে ফেললাম, তারপর সেই ফটস-ফট চোখের জলসব কান্না তো আনন্দের নয়বুঝতে পারি। কেন যে অভিরূপের মা আমায় এত---, অস্বস্তি লাগেতমালের কথা ভেবে ঘেন্না লাগে, আমি তমাল নয়!
বৃষ্টি মেশানো ঠান্ডা চায়ে তুলসী পাতার গন্ধ আপনা থেকেই চলে আসে, এটা আগে জানতাম না! অভিরূপের মাএর একটা ভাল নাম দিয়েছি আজ, “শিউলি”! শিউলি কে আজ এই নোংরা রুমাল টা কেচে দিতে বলবো