Tuesday, August 27, 2013

ফিলিপ কোটলার ও মানব জীবন

এটা ভাঁওতার যুগ। মার্কেটিঙের যুগ। নেকু বাঙালি সেজে থাকলে কিস্যু হওয়ার নয়। এর কাঁঠাল অন্যের মাথায় ভেঙ্গে দিন গুজরান ; এই হল মন্ত্র। দুনিয়ার সামনে নিজেকে একটা প্রডাক্ট হিসেবে জাহির না করতে পারলেই চিত্তির। ফিলিপ কোটলার সাহেব পই পই করে বলে দিয়েছেন যে কোনও পণ্য কেতার সঙ্গে বেচতে হলে প্রয়োজন সঠিক বিপণন মিশেল অর্থাৎ চারটে P, যথা Product, Price, Place এবং Promotion।

এই চারটে P’কে নিজের জীবনেও যদি যুতসই ভাবে ব্যাবহার না করা যায় তবে বিষম কেস।

প্রথম পি ; প্রডাক্ট বা পণ্য আপনি নিজে স্যার – বউ’য়ের কাছে আপনি মাকাল ফল, ছেলেমেয়ের কাছে দুধেল গাই, বসের কাছে গাধা। অকাট্য।

দ্বিতীয় পি ; প্রাইস বা পণ্য-মূল্য। অর্থাৎ আপনি যে সক্কলকে নিজের রক্ত জল করে পরিষেবা দিচ্ছেন তাতে আপনার টু পাইস ইনকাম আছে কি না। শুনে রাখুন; আপনি সবার মন জুগিয়ে চলতে পারলে আপনার স্ত্রী আপনাকে বাপান্ত করবেন না, ছেলেমেয়েরা ছিঁচে কান্না জুড়বে না আর আপনার বস খিস্তি মেরে আপনার গুষ্টির তুষ্টি করবেন না – এবসেন্স অফ নেগেটিভ ইজ দ্য অনলি পজিটিভ স্যার। এই বাপান্ত, ছিঁচে কান্না আর খিস্তি থেকে রেহাই পাওয়াই আপনার খাটুনির একমাত্র মূল্য।

তৃতীয় পি ; প্লেস। অর্থাৎ সর্ষে কে পেষাই কোথায় করা হবে। ভেবে হয়রান হবেন না স্যার; সর্ষে আপনিই। আপনার পেষাই চলবে বাড়িতে, অফিসে, মিনিবাসে; সর্বত্র। আপনাকে রগড়ে যে ফোঁটা ঝাঁঝালো তেল বেরোবে; তা দিয়ে আপনারই কলজে ডিপ-ফ্রাই হবে।

চতুর্থ এবং সবচেয়ে মারাত্মক পি ;  প্রোমোশন। অর্থাৎ নিজেকে একটু ফেস্টুনের মত টাঙিয়ে ধরুন আপনার খদ্দেরদের কাছে।   বউকে বলুন “ আই লাভ ইউ সোনা”; তাকে বুঝিয়ে বলুন এই মাগ্যির বাজারে ‘সোনা’ ডাকটিও কি অমূল্য। ছেলেমেয়েদের সামনে নিজেকে একটা চলমান মানিব্যাগ বলে তুলে ধরুন, নয়ত ইজ্জতের আশা করবেন না। আর নিজের বসের সামনে নিজেকে পেশ করুন পনের শতকের মধ্য-ইউরোপের বাজারে বিক্রি হওয়া আফ্রিকান দাস’দের রেপ্লিকা বলে- তবেই সময়মত উন্নতি ঘটবে। প্রোমোশনে একটু কোথাও ঝুলিয়েছেন কি “ বেআক্কেলে, ন্যাকা ভুত, অকর্মণ্য” এমন যাবতীয় পোষ্ট-মডার্ন বাক্য-ক্যালানি সহ্য করতে হবে।  

 শুধু “ মা, মা গো” বলে আরাম মাখা দীর্ঘশ্বাস ভাসিয়ে দিতে কোনও কোটলারের হিসেব-কিতেব মাথায় রাখার দরকার নেই।

Monday, August 26, 2013

মাধুকরী


ঘুগনি। পাঁঠার কিমা ছড়ানো আবেদনময় ঘুগনি। এলুমিনিয়ামের ডেকচিতে টগবগ করে ফোটা পিকাসো মেজাজের ঘুগনি।

মোড়ের মাথার মাধবদা’র ঠেলা।  থরে থরে ষ্টীলের প্লেটে ঘেরা ঠেলার চারপাশ। কেরোসিনের পাম্প দেওয়া স্টোভের গনগনে আঁচ। তার ওপরে মোহময় সেই ডেকচি। যার ভেতরে ফুলে ফেঁপে উথলে উঠছে ঘুগনিয় ঈশ্বর। পাশে প্লাস্টিকের মাঝারি মাপের সবুজ গামলার তিন ভাগ জুড়ে কুচোনো পেঁয়াজের ঢিপি আর বাকিটা জুড়ে লংকা কুচি। ঠেলার অন্য প্রান্তে রয়েছে ষ্টীলের একটা বেয়াড়া সাইজের বাটি – ওতে আছে তেঁতুল গোলা জল। সঙ্গে এক এলুমিনিয়াম গামলা সেদ্ধ খোসা না ছাড়ানো ডিম এবং এক বড় থলি ভরা মোহন বেকারির লম্বা পাউরুটি।

মাধবদা ঠিক সন্ধ্যে ছটায় ঠেলা নিয়ে মোড়ের মাথায় আসেন। ঘুগনি গরম করে নিতে তার লাগে মিনিট কুড়ি। তারপর তার ঠেলা ঘিরে খরিদ্দার জমতে থাকে। তিন ধরনের খরিদ্দার;
এক দল যারা শুধু ঘুগনি খান।
একদল যারা এক প্লেট ঘুগনি খেয়ে একটা বা দুটো ডিম সেদ্ধ খান।
আর আর এক দল যারা ঘুগনিতে ভিজিয়ে পাউরুটি খান।
মাধব’দার ঘুগনি পরিবেশন দেখাবার মত ব্যাপার ছিল। খদ্দের নতুন হলে জিজ্ঞেস করে নিতেন নুন-ঝাল-টক কেমন পড়বে ? মাধবদা বলতেন;
“শুধু ঘুগনি কাঁচা মাটির মত ব্যাপার, তাতে তুমি কেমন ভাবে পেয়াজ-লংকা কুচি তেঁতুল জল, বিট নুন ছড়িয়ে চাস-আবাদ করবে সেটা তোমার ব্যাপার। কাজেই খদ্দেরের থেকে আগে জেনে নিতে হয় যে সে কেমন স্বাদ চাইছে।  নয়ত দেখব সে চাইলে ধান; আমি ফলিয়ে দিলাম ফুলকপি। বুঝলে ?”      

মাধবদা অতি যত্নে প্লেট চামচ ধুতেন। ঝকঝকে প্লেটে গরম ধোঁয়া ওঠা পাঁঠার ঘুগনি; তার ওপর পেঁয়াজ কুচি-লংকা ছড়ানো, তেঁতুল জল মিশিয়ে নেওয়া। আহা:, ভাবলেই জিভে-চোখে জল চলে আসে।

ঠিক সন্ধ্যে সাড়ে সাতটার মধ্যে মাধবদা’র ভাঁড়ার সম্পূর্ণ ভাবে খতম হয়ে যেত; গোটা বছর, প্রত্যেক দিন। দিনে এই সোয়া ঘণ্টার ব্যবসা চলত মাধবদার। সেই সোয়া ঘণ্টা পাশের অন্য ঘুগনির দোকানগুলো মাছি মারত, মাধবদা ঠেলা সরিয়ে চলে গেলে তবে তাঁদের ঘুগনি বিক্রি খোলতাই ভাবে শুরু হত। এমন ছিল মাধবদার ঘুগনির সুনাম।

একদিন মাধবদাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে সে আরও বেশি করে ঘুগনি-ডিম সেদ্ধ নিয়ে আসে না কেন। তাহলে সে আরও বেচতে পারতে; আরও মুনাফার সুযোগ থাকত। এক গাল হেসে মাধবদা বলেছিলেন;

“ আরে ধুর, এতেই যা দু পয়সা আসে তাতে আমার দিব্য চলে যায়। আরে বাবা, আমি কি ব্যবসা করি না কি গো ? আমি করি মাধুকরী। দরকারের বেশি পয়সাকড়ি নাড়াচাড়া করে তারপর চিন্তায় চিন্তায় গোল্লায় যাই আর কি। আমাকে বোকা ঠাউরেছ ?”      

Friday, August 23, 2013

মামা ভাগ্নে সংবাদ এবং পুজো পরিকল্পনা


ছোটমামা – “ কি বললি ? এবার পুজোয় তুই পাড়ায় থাকবি না?”

আমি-“ কতবার বলব ? নো। না। নেভার। হাওড়া টু কালকা টিকিট কেটে ফেলেছি। 
পুজোর পাঁচটা দিন শিমলা এবং মানালিতে কমপ্লিট রিল্যাক্সেশন”

ছোটমামা – “ টিকিট কাটার সময় আমার পারমিশন নিয়েছিলি ?”

আমি- “ বাবা’র পারমিশন নিয়েছি”

ছোটমামা – “ ভারি এক্কেবারে পিতৃভক্তি উথলে উঠেছে। টিকিট ক্যান্সেল কর। তোর যাওয়ার কোন প্রয়োজন আমি দেখছি না। এক কাড়ি টাকা নষ্ট। কলকাতার অক্টোবরে গায়ে কম্বল চাপা দিস, শিমলে গেলে বেঁচে ফিরবি ভেবেছিস ?”

আমি- “ সে আমি বুঝবো”

ছোটমামা – “ আমরা গুরুজনেরা থাকতে তুই কি বুঝবি রে আহাম্মক ? তুই চলে গেলে নবমীর থিয়েটারে শিশুপাল হবে কে ? আমি গলা কাটবো কার ?”

আমি – “ বাঃ রে, আমি শিশুপাল হতে যাব কোন দুঃখে ? প্রত্যেকবার যত ফালতু রোলে আমায় কাস্ট করা, আই ওন্ট টলারেট”

ছোটমামা – “ ফালতু কথা। তুই জানিস শিশুপালের ডায়লগ ডেলিভারি কি মর্মান্তিক ? বিশু শিশুপালের রোল পাওয়ার জন্যে আমায় ভজহরির ডিনার অফার করেছে সে খবর রাখিস ?”

আমি – “ ওসব ছাড়ো। বারোয়ারী মণ্ডপে লেবারের মত খাটাবে। ভোগ বিতরণে হাত লাগা রে, ধুনুচি প্রস্তুত কর রে, বৃষ্টি নামলে চেয়ার সরা রে, এটা আন রে, সেটা কেন রে, ভিড় সামলা রে, হ্যান কর রে, ত্যান কর রে। উফ পাঁচটা দিন জুড়ে; সকাল টু রাত ভলেন্টিয়ারগিরির নামে বেগার খাটুনি।  ওই থ্যাঙ্কলেস্‌ হয়রানির মধ্যে এ বান্দা নেই। তাছাড়া হিমাচল আমায় ডাকছে মামা, রিফিউজ করতে পারব না”

ছোটমামা – “ ন্যাকা! হিমাচল ডাকছে! তুই জানিস পুজোর সময় যে বাঙালি পাড়ার পুজো বাদ দিয়ে ব্যাংকক বা ঊটি গিয়ে নেত্য করে তাঁদের দশা কেমন ?
বিরিয়ানি বাদে আরসালানের মতন। ভুঁড়ি বাদে গণেশের মত। ময়দান বাদ কলকাতার মত। টুপি বাদে হিমেশ রেশমিয়ার মত। আপেল বাদে নিউটনের মত। লংকা কুচি বাদে এগ রোলের মত। কচুরি বাদে রবিবারের সকালের মত...”

আমি- “থামো থামো। মাথা চিনচিন করছে”

ছোটমামা – “ ঠিক হ্যায়। মর গিয়ে তুই শিমলায়। শুধু ইয়ে, এ বারে থিয়েটারে দোলন দ্রৌপদির পার্ট করছে। কাল থেকে রিহার্সাল শুরু। টানা দেড় মাস চলবে; সন্ধ্যে সাতটা থেকে রাত নটা পর্যন্ত। ভাবছিলাম তোকে বলব যে তোর বাড়ির কাছাকাছি থাকে যখন, তখন দোলন কে রোজ রিহার্সালের শেষে বাড়ি পর্যন্ত সঙ্গে নিয়ে যেতে। এখন ভাবছি তুই যখন শিমলা কাটছিস, তখন বিশুকেই শিশুপালের পার্টটা অফার করি”

আমি – মামা ইয়ে, আমি বলছিলাম কি...

ছোটমামা – কি ?

আমি – ভেবে দেখলাম তুমি মন্দ বলনি। টনসিলটা এমনিতেই এত ট্রাবল দিচ্ছে। অক্টোবরের শিমলার টেম্পারেচারে আবার কোল্যাপ্স না করে যাই। ভাবছি টিকিটটা ক্যান্সেল করে দি বল ? তাছাড়া শিশুপালের ক্যারেক্টারে একটা বেশ ইয়ে আছে...তাই না ?

ছোটমামা – “ ভারি ইয়ে হয়েছিস, মামা’র সামনেও অমন ইয়ে ভাবে ইয়ে রিভিল করতে আছে ? হা হা হা হা হা হা......” 

Tuesday, August 20, 2013

বাঙালি ও বৃষ্টির ব্যাপার-স্যাপার



বৃষ্টির ব্যাপারে কবিতা লিখে আর গান বেঁধেই যেন সব্বার দায়িত্ব খালাস। বৃষ্টিতে ভেজার বেলায় শুধু রবিনা ট্যান্ডন।  বৃষ্টির ছাঁট সামান্য গায়ে এসে পড়েছে কি আঁতকে ওঠা শুরু। জামা কাপড় বিগড়ে যাওয়া, অসময়ে জ্বর; এমন হাজার চিন্তা মানুষের মনে।  
বৃষ্টির উৎপাত এড়াতে মানুষের কত ফন্দি ফিকির।
কেউ বানালেন ছাদ।
কেউ বুদ্ধি করে আবিষ্কার করে ফেললেন ছাতা।
তৈরি হল হাই-ড্রেন।
পথ চলতি মানুষের গায়ে উঠলো বর্ষাতি, পা ঢাকতে গাম বুট।

তবে বৃষ্টি আটকানোর এই দুর্বুদ্ধিগুলোর একটাও কিন্তু বাঙালির আবিষ্কার নয়। বৃষ্টিকে বাঙালি সামাল দিয়েছে গাঙ্গুলিও-কভার ড্রাইভের কেতায়।
বাঙালি বৃষ্টিকে আপন করে নিয়েছেন বহুবিধ মায়াবী অস্ত্রে;
-      খিচুড়িতে
-      ফুলুরিতে
-      ইলিশে
-       “কোমরের ব্যথাটা রিল্যাপ্স করেছে স্যার, আজ অফিস আসতে পারছি না” মূলক ছুটিতে।

যে বাঙালি দৈনিক সংসার ও অফিসের যৌথ রগড়ানিতে নিয়মিত চিমসে যাচ্ছেন, বৃষ্টির সন্ধ্যেয় তার মেজাজেও রয়েল বেঙ্গলি হালুমের ছাপ এসে যায় এবং আলেকজ্যান্ডারি কেতা নিয়ে তিনি পেঁয়াজি  ও রবীন্দ্রনাথে ঝাঁপিয়ে পড়েন।  

Sunday, August 18, 2013

একটি মই কেনার আগ্রহ ও বাঁশ


ডাকনাম খোকন হলে কি হবে, খোকনবাবু রীতিমত কলপে এবং চ্যবনপ্রাশে জীবনযাপন করেন। সেদিনকেও চ্যবনপ্রাশের চামচ সবে মুখে চালান করেছেন, ঠিক তখন খবরের কাগজের একটি বিজ্ঞাপনে তার নজর আটকে গেল।

দেখলেন এক মাদ্রাজি কোম্পানি টেলিফোনে অর্ডার নিয়ে বাড়ি বাড়ি মই সাপ্লাই করে। বাঙালি বাঁশের মই নয়, ফাইবার ল্যাডার। সেই মই নাকি ইচ্ছে মত ছোট-বড় করে নেওয়া যায় । কোনাকুনি, লম্বালম্বি যে কোন ভাবে বাড়ির দেওয়ালে লাগানো যায়। মইয়ের মাথায় উঠে অনায়াসে হেলান দিয়ে বসে রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনা যেতে পারে; এতটা সুরক্ষিত ব্যবস্থা তার । খোকনবাবুর মনে হল যে সিলিং ফ্যানের ঝুল ঝাড়তে বা বুক শেল্ফের একদম উপরের তাকে গিয়ে কেরদানি করতে বা বাড়ির পুরনো ইলেকট্রিক মিটারের রিডিং পড়তে তাকে যে হিমশিম খেতে হয়, এই ফাইবার মই জুটলে সমস্ত সমস্যার সমাধান হয়ে যেতে পারে। এমনকি ঘরোয়া স্পাইডারম্যান বনে যেতেও কোনও অসুবিধে নেই। এমন মজবুত মই যে খোকনবাবুর মনে হল যে এবার থেকে সকাল বেলা চা আর আনন্দবাজার হাতে ফাইবার’র মই’ইয়ের  মাথায় গিয়ে কিছুক্ষনের জন্য বসে থাকলে বেশ হয়।

বিজ্ঞাপনে দেখলেন একটা ফোন নাম্বার দেওয়া রয়েছে, যেখানে মিস্‌ড কল দিলেই মই-কোম্পানি থেকে কল আসবে। হাত ঘড়িতে সময় দেখলেন খোকনবাবু, রাত সাড়ে দশটা। এত রাত্রে মিস্‌ড কল দেওয়া যায় ? সাহস করে একটা মিস্‌ড কল করেই ফেললেন; পয়সা তো যাচ্ছে না।

দু মিনিটের মধ্যে খোকনমামা এস-এম-এস পেলেন। মাদ্রাজি কোম্পানিটি তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছে টুয়েন্টি ফাস্ট সেঞ্চুরি ফাইবার ল্যাডারের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করার জন্যে। এবং তার পাঁচ মিনিটের মাথায় সোজা চেন্নাই থেকে একটা ফোন কল্‌।
খোকনবাবু ভাবলেন এই বেলা দাম জেনে নেওয়া যাক। কিন্তু তিনি কিছু জিজ্ঞেস করবার আগেই এক রোবট গোছের মাদ্রাজি ভদ্রলোক দমাদম প্রশ্ন শুরু করলেন।
হাজারো সওয়াল।

খোকন বাবুর ভালো নাম কি।
খোকন বাবুর বয়স কত।
তার বাড়ির ঠিকানা।
তার মোবাইল নাম্বার।
তার ল্যান্ডলাইন নাম্বার।
তার ব্লাড গ্রুপ।
চাকরি করেন না ব্যবসা।
অফিসের ঠিকানা।
অফিসের ফোন নাম্বার।
খোকনবাবু ক্রমশ অধৈর্য হয়ে পড়ছিলেন।

_ “ ইয়ে...এবাউট দ্য ল্যাডার...” , খোকনবাবু মিউ মিউ করে বললেন। গিন্নী ভাত বেড়েছে বোধ হয়।   

মাদ্রাজি সেলস্‌ম্যানটি খোকনবাবুকে তেমন পাত্তা দিলেন না। প্রশ্নমালায় চলে গেলেন নির্বিকারে।
একে একে জানতে চাইলেন তার বাড়ি না ফ্ল্যাট।
কয় তলা।  
তার বাড়ির দেওয়ালের উচ্চতা।
কত দিনের বাড়ি।
কত কাঠা জমির ওপর।
তার পরিবারে কয়জন আছে। 

“ কি মুস্কিল, প্লিজ টেল মি এবাউট দ্য প্রাইস অফ দ্য ফাইবার মই, আই মিন, ফাইবার ল্যাডার”, বেপরোয়া ভাবে পাল্টা প্রশ্ন করেন।
সেলস্‌ম্যানটি দমে যাওয়ার পাত্র নন।

“ ইন এ মিনিট সার” বলে টুসকি মেরে ফের সেই মাদ্রাজি-বাবু চলে গেলেন প্রশ্ন বৃষ্টিতে।
প্রশান্তবাবুকে বাধ্য হয়ে বলতে হল;
তার  চাকরি কত দিনের।
এর আগে অন্য কোথাও তিনি কোন চাকরি করেছেন কি না।
তার মাইনে কত।
তার কয়টি ব্যাঙ্ক একাউন্ট।
তার কাছে ক্রেডিট কার্ড আছে কি না।

অবশেষে সারেন্ডার করলেন প্রশান্তবাবু। করুন গলায় বললেন “ স্যার, মাই গুড স্যার। প্লিজ একটু লিস্‌ন টু মি স্যার। আই থিংক মাই ব্যাম্বু ল্যাডার ইজ বেটার দ্যান ইওর ফাইবার ল্যাডার। এনিথিং বিয়ন্ড মাই ডিয়ার ব্যাম্বু ল্যাডার ইজ গোয়িং টু বি এ বাঁশ। থ্যাঙ্ক ইউ”
বলে দুম করে ফোন কেটে দিয়ে নিজের মোবাইল সুইচ্‌ অফ করে হাঁফ ছাড়লেন খোকনবাবু।   

Monday, August 12, 2013

পলিটিক্স ইজ ইন আওয়ার ব্লাড


পলিটিক্স ইজ ইন আওয়ার ব্লাড। শুধু গোল্ডফ্লেক্‌ ফুঁকে আর লিট্‌ল ম্যাগ ঘেঁটে ইন্টেলেকচুয়াল বনে থাকা যায় না। পলিটিক্স বুঝতে হবে এবং টেবিল চাপড়ে বোঝাতে হবে। ব্রাজিলে যদি সবাই ফুটবল-বিদগ্ধ হন, তবে কলকাতাইয়া মাত্রই রাজনীতিজ্ঞ এবং রীতিমত থুঁতনি চুলকনো সেফলজিস্ট। অবিশ্যি আমাদের রাজনীতিতে ডান-বাম তেমন কিছু নেই। উইং বলতে দুটিই ; অতি-বাম এবং প্রবল-বাম। বুর্জোয়া রাজনীতি এবং পনীরের ঝোলের পরোয়া বাংলাই কোনোদিন করেনি এবং ভবিষ্যতেও করবে না।


কলেজে ভালো ছেলে-মেয়েরা পড়াশোনা করেন, গবেটরা গায়ে হাওয়া লাগিয়ে নবাবী করেন আর বুদ্ধিমানেরা রাজনীতি করেন। উপযুক্ত দাদা-দিদিদের চিনে নেওয়া, মিছিল-টিছিলে র্যাীম্প ওয়াক, ইউনিয়ন রুমে দেদার ফ্রি চা-বিস্কুট, ব্রিগেড মিটিং’য়ের দিনে পার্টি ব্যাজ আর বিরিয়ানির বাক্স এবং সর্বোপরি; এলেম থাকলে কচি নেতা’র উপাধি – এইসব মিলে ছাত্র রাজনীতি।

ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় হাতেখড়ি না হলেও ক্ষতি নেই। সক্রিয় বলে অবিশ্যি কিছুই হয় না; আদতে সবই ইন-ডাইরেক্ট ; অন্যের মাথায় কাঁঠাল ক্র্যাক করে দুনিয়া চলছে।
বাঙ্গালির কাছে রাজনীতির ডিস্ট্যান্স লার্নিং কোর্স হিসেবে রয়েছে জলখাবারের পাতে আলু ভাজার হলুদ মাখা খবরের কাগজ। অথবা পাড়ার অমুক-দা বা ছোটকাকার পলিটিকাল এনালিসিস ও টিপ্পনী। রাজনীতির যাবতীয় জ্ঞান কুলকুল করে অনবরত মগজে চালান হয়ে চলেছে।

যৌবনের রঙ দেহে সঠিক ভাবে লাগবার আগেই মনে লাগে পার্টির রঙ। পাড়ার নেতা তখন দেবতা, আখের তখন পার্টি ম্যানিফেস্টো। এর সাথে যোগ হয় গোঁয়ার্তুমি; এই ব্যাপারটি সমুচিত পরিমাণে না থাকলে চায়ের দোকান কি কফি হাউসের পলিটিকাল তর্কে জমি পাওয়া অসম্ভব। আস্তিনে যদি কিছু জাঁদরেল খিস্তি গুঁজে নেওয়া যায় তবে অতি জম্পেশ।

বাঙালি মননে রাজনীতির আলোচনা বলে কিছু হয় না, হয় শুধু তর্ক ও ঝগড়া। এট দি হাইয়েস্ট ফর্ম- হাতাহাতিও চলতে পারে। আমি যা বলছি; চমৎকার বলছি আর আমার বিরুদ্ধে কেউ কিছু বললেই সে ব্যাটা ক্যাপিটালিস্ট রাস্কেল। আমি চাই উন্নয়ন আর আমার বিরোধী মানেই পুকুর-ডাকাত। আমি হচ্ছি লিবারেল আর যে উল্টো কথা বলে সে হিটলারের চুমু খাওয়া বান্দা। আমার মতবাদ তুলসি পাতা আর অন্য মতবাদ চোলাই।

বেশির ভাগ বাঙ্গালির জন্যে রাজনীতির আড্ডা এক ধরনের সুস্বাদু ও অব্যর্থ ইসবগুল বিশেষ।

Friday, August 2, 2013

মধুময়ের ঘুম




ঘুম পাওয়ার প্রথম ধাপে মাথার তালুতে নরম শিরশিরানি টের পান মধুময়। রাত এগারোটা নাগাদ রাতের খাওয়া সেরে নিজের বিছানায় চলে আসেন তিনি। সঙ্গে থাকে কোন সরল বই কিংবা পত্রিকা। বাসে-ট্রেনের টানাহ্যাঁচড়া আর চাকরির চক্করে শরীরে ক্লান্তি জমে থাকেই। মধুময় তিন কি চার নম্বর পাতায় গিয়েই বুঝতে পারেন যে চোখের পাতার ওজন বেড়ে চলেছে। থুঁতনি ক্রমশ নেমে আসে পাশ বালিশের বুকে। ছয় নম্বর পাতায় পৌছনোর আগেই বইটা আলগা হয়ে খাটে লুটিয়ে পড়ে। ঘুমের দানা যত জমতে থাকে , মধুময়ের কানে সিলিং ফ্যানের এক ঘেয়ে আওয়াজ তত দাপুটে হয়ে ওঠে। রোজই তিনি টের পান যে তার ডান চোখ যখন আধবোজা , তার বাঁ চোখ সম্পূর্ণ ভাবে বুজে গেছে। বেশ দৃপ্ত ভঙ্গিতে ঘুমের পিছু পিছু বেশ কিছুক্ষন ছুটে চলেন মধুময়।
বাজিয়ে দেখে নেন যে ঘুম বাবাজির দম কতটা। রোজকার ঘুম চিনে রাখাটা মধুময়ের একটা অবসেস্‌ন। পরিচিত অভ্যাস।

রক্ত চলাচলে ঘটে চলা তারতম্যটুকুও বেশ বুঝে নেন মধুময়। মগজের ভেতর  তিমির পেটের মত অন্ধকার যে অংশটুকু, সেইখানে কয়েক মুহূর্তের জন্য ধুকপুক টের পান তিনি। অথচ পরিচিত মগজ টুকরোটি যে মাটির  নিকনো দাওয়ায় মাদুর পেতে জিরিয়ে নিচ্ছে; সেই অনুভুতিটা বেশ সরেস ভাবে বুক জুড়ে আসে।

ঘরের জিরো পাওয়ায়ের রাত-বাতিটির আলো যখন আবছা হয়ে আসতে শুরু করে, হাতের আর পা ঝিমঝিমে ভাবে আলগা হয়ে চলে, ওষ্ঠ অধরের থেকে অস্পষ্ট ভাবে দূরে সরতে থাকে...
ঠিক তখন মধুময় টের পান যে তার চোখ জুড়ে শুধু আবছা লালচে অন্ধকরা। নিজেকে ভাসমান মনে হয় তার। ঘুমে ভেসে যাওয়ার আগে মধুময়ের কানে ভেসে আসে বাবা’র মত একটা কণ্ঠস্বর “ শুনেছি মায়ের পেটে থাকতেই বাচ্চারা শব্দ শুনতে পারে বুঝলে বউ ? মন দিয়ে এবেলা ওবেলা রবি ঠাকুরের গান গাইবে। কেমন ? বাচ্চার কানে মিষ্টি শুরু গেলে তবেই না তার হৃদয়ে মধু জমা হবে ? আচ্ছা বউ, আমাদের মেয়ে হলে তার নাম রাখবো মধুরিমা আর ছেলে হলে নাম রাখবো মধুময়। কেমন ?”   

Thursday, August 1, 2013

অ-লংকা-র


শুকনো লংকার ঝালে রয়েছে বনেদী মেজাজের গন্ধ। জলসাঘরের ভাঙ্গা কাঁচের গেলাসের খনক্‌। চাবুকের সপাং’য়ের মেজাজ। মাছের কালিয়ার দাপটের উৎস। আলু সেদ্ধ মাখার জৌলুস। মুসুরি ডালের বাহারি ফোঁড়ন। আদরহীন সোহাগ, সাবেকী দাপট। ব্যবহার করতে জানলে মাঞ্জাবতী সুতো, না জানলে গলার দড়ি।

আষাঢ়ে আকাশের দুষমনির ছোঁয়া যেমন   প্রেমেও চাবকায়, বিরহেও কাতরায়; তেমনি শুকনো লংকা পাঁঠার ঝোলেও দীপ্তি আনে, চাটনিতেও চোরা-স্রোত টানে। আপসহীন সাম্রাজ্যবাদী।

কাঁচা লংকা অন্যদিকে শিউলি মেজাজের বিপ্লবী। হাফ-পাঞ্জাবির তরুণ প্রেমিক। গরম-ঘি-ভাতের তুলসী মঞ্চ, আলু ভাজার ফাঁকে স্নেহ-টুকরো। তরতাজা উচ্ছ্বাস। স্নেহের সুবাসে বুকভার করে দিতে পারে, আবার পারে ক্ষিপ্ত আচমকা-আগুনে উড়িয়ে নিতে। আলু চচ্চড়ির আটপৌরে মা-ডাক হোক, সর্ষে ইলিশের প্রেম – কাঁচা লংকাই উত্তম কুমারিয় হাসি। রণে, বনে, জঙ্গলে,, ফুটপাথে – কাঁচা-লংকায় উত্তরণ ঘটবেই।  
শুকনো লংকায় যদি বিশ্বজয় সম্ভব হয় তবে কাঁচা লংকা হল গীতবিতান।