Thursday, October 24, 2013

ইভনিং শাওয়ার

বাথরুমে এত রকমের সাবান সাজানো থাকে যে নির্মল রোজই খেই হারিয়ে ফেলেন। নতুন কোম্পানি থেকে সাজানো ফ্ল্যাট দেবে তা বেশ জানা ছিল কিন্তু তার বাথরুমের চেকনাইও যে এমন হবে, সেটা আগে ভাবা যায়নি। বউ-ছেলেকে তাড়াতাড়ি অন্ডালের বাড়ি থেকে এখানে নিয়ে আসতে হবে। এখন কত তাড়াতাড়ি দীপা ও বুম্বা এখানকার সোসাইটির আদব কায়দা রপ্ত করতে পারে সেইটেই দেখবার।

বাথরুমের ক্যাবিনেট খুলে মনে ভরে প্রসাধন সম্ভার দেখতে থাকেন নির্মল। হাত ধোয়ার সাবান এক, মুখ ধোয়ার সাবান অন্য।  বাকি শরীরের ধোয়ার জন্যে অন্তত চার রকমের সাবান – লিকুইড আর বার মিলে। লেবেল পড়ে নির্মল বুঝতে পারেন একেক সাবানের মর্ম একেক রকম; একেক রকম স্কিনের জন্যে একেক চিজ্‌, নিজের চামড়ার রকমটা এতদিনেও জানা হয়ে ওঠেনি নির্মলের। স্ক্রাব বলে কিছু একটা ব্যাপার রয়েছে যা দিয়ে বোধ নিজেকে বেশ রগড়ে পরিষ্কার করা যায়।

চুলের জন্যেও হরেক আয়োজন; শ্যাম্পু, কন্ডিশনার, মাস্ক, সিরাম। আর তাছাড়া যে কতশত রকমের শিশি রয়েছে গুনে বা পড়ে শেষ করা যায় না।  শাওয়ারের ঠাণ্ডা জলের সাথে নির্মলের শিরদাঁড়ার ঘাম মিশে যায়।

ফেনায় ভেসে যেতে যেতে নির্মল গাঙ্গুলি তার এই অচানক বিশ্বজয়ের তড়িৎ সিঁড়িগুলো মনে করতে থাকেন। থ্রিল। নতুন সেক্রেটারির ব্লাউজের ঝিলিক খেলে যায় মনে। থ্রিল। বস যে শ্যাম্পেন খাওয়ালে তার এক গেলাসের দাম নাকি থ্রি অ্যান্ড হাফ্‌ থাউজ্যান্ড রুপিজ। থ্রিল।

মৃদু অস্বস্তিটা যায় না, সেটাও বেশ টের পান নির্মল। গোটা শরীরময় জল সাবানের ঝাঁপাটা সত্যেও একটা চ্যাটচ্যাটে ভাব। ছেলেবেলায় বাবা মার্গো সাবান আনতেন। সবজে সাবান, নিম তিতকুটে গন্ধ। তবু নির্মলের ভারি প্রিয় ছিল।

বাথরুমের দরজা খুলে গলা বাড়িয়ে নির্মল হাঁক দিলেন।

-      রাজু ? রাজু ?
-      জি সাহাব। আউর এক তাউলিয়া চাহিয়ে কেয়া সাহাব ?
-      না।  মার্গো সাবান এখনও বাজারে চলে ? জানিস তুই ?
-      জি নহি পতা হুজুর।
-      এক কাজ কর। চট করে নিচের মুদির দোকানে গিয়ে খোঁজ করে আয় দেখি। মার্গো সাবান। মনে থাকবে ? যা দেখে আয়।
-      শর্মার দুকানমে সাহাব ?
-      হ্যাঁ, হ্যাঁ, ওই ছোট মুদীর দোকানটায়।
-      উ দুকানমে আপকা লায়েক সামান নহি মিলেগা সাহাব।
-      আরে যা বলছি তাই কর গিয়ে। এটা থাকলে ওর দোকানেই থাকবে। চট করে যা। ভেজা গায়ে আমি দাঁড়িয়ে আছি। মার্গো সাবান থাকলে এক জোড়া নিয়ে আসিস। টেবিলের ওপর খুচরো টাকা রাখা আছে। জলদি, যা। 

Tuesday, October 15, 2013

ইভনিং পার্টি

সান্যাল – আই হোপ তুমি আজকের ইভনিং পার্টির ইম্পরট্যান্স বুঝতে পারছ গাঙ্গুলি।

গাঙ্গুলি  - অ্যাব্‌সলিউটলি স্যার। কন্ট্র্যাক্ট পাওয়ায় জন্যে ঢান্ডানিয়া কে যে আমরা স্পেশাল ফেভার অফার করতে পিছপা হব না, সেইটা কনভে করবার এর চেয়ে বেটার প্ল্যাটফর্ম আর পাওয়া যাবে না।

সান্যাল – প্রিসাইসলি। ইন ফ্যাক্ট,আগাম হাতে গুঁজে দেওয়ার জন্যে কিছু ক্যাশ আমি সঙ্গে রাখছি। দ্য সুনার উই টাই হিম ডাউন দ্য বেটার।

গাঙ্গুলি – কিন্তু ঢান্ডানিয়াকে হাতে রাখাই কি মূল শর্ত এই কন্ট্র্যাক্ট হাতে পাওয়ার ? ওর ওপরওয়ালা রয়েছে।

সান্যাল – যথেষ্ট খবর রয়েছে আমার কাছে। ওর ওপরওয়ালারা সবাই শুধু রাবার ষ্ট্যাম্প। তাছাড়া, এই ঢান্ডানিয়া ইজ আ ভেরি ধুরন্ধর মাল। দেবিকাপ্রসাদ বলে যে ওর অ্যানুয়াল ইনকাম’য়ের সেভেন্টি পারসেন্ট হল ব্ল্যাক। বুঝতেই পারছ।

গাঙ্গুলি – আই সি। আচ্ছা পার্টিতে তো ডেভিডসন অ্যান্ড কোম্পানির দাশগুপ্তও থাকবে। তাই না। ঢান্ডানিয়াকে এপ্রোচ করবার সময় ওকে দূরে রাখতে হবে।

সান্যাল – সেই কাজটা আমি করব।

গাঙ্গুলি – স্যার, আপনি মানে ? আপনি যদি দাশগুপ্তর সঙ্গে  নিজেকে ব্যস্ত রাখেন তাহলে ঢান্ডানিয়া কে টোপ গেলাবে কে ?

সান্যাল – তুমি। আই ওয়ান্ট ইউ টু ডু ইট।

গাঙ্গুলি  - মাফ করবেন স্যার। আপনি তো জানেন এই ধরনের শেডি ট্র্যান্স্যাকশনগুলো আমি হ্যান্ডল করতে পারি না। মানে, আজ পর্যন্ত কখনও...

সান্যাল – লুক হিয়ার গাঙ্গুলি। এই বিজনেসে থেকে তুমি তুলসী পাতার প্রিটেন্স নিয়ে জীবন কাটিয়ে দেবে সেটা তো হতে পারে না।

গাঙ্গুলি – দেখুন স্যার। আমার এই ব্যাপারটা আপনার কাছে অজানা নয়। কিছু ব্যাপারে আমি কম্প্রোমাইজ করতে পারব না।

সান্যাল – ইউ উইল হ্যাভ টু গাঙ্গুলি। এই সব ডার্টি প্ল্যান ফাঁদায় তোমার এক্সপ্লিসিট মদত থাকবে। মুনাফা কামাবে। বেন্‌জ চড়বে। আর এদিকে হাতে ছুঁচোর গন্ধ বরদাস্ত করবে না। সেইটে তো বেশি দিন হতে পারে না। ইউ উইল হ্যাভ টু। অর আই উইল মেক শিওর দ্যাট ইউ আর নট আ পার্ট অফ দিস ডিল।

গাঙ্গুলি – ইজ ইট আ থ্রেট ?

সান্যাল – এক্সপ্লিসিটলি সো।

গাঙ্গুলি – আমি ভাবতে পারছি না স্যার। আপনার গলার স্বর এই মুহূর্তে সম্পূর্ণ ভাবে অন্য।

সান্যাল – ন্যাকামোর সময় নেই গাঙ্গুলি। ইউ আর ডুয়িং ইট। আর এখন থেকে মনে রেখ, তেল মাখতে হলে তোমায় কড়িটি ফেলতে হবে।

গাঙ্গুলি – বাড়ির ফোন। এক্সকিউজ মি।

পিতা – হ্যালো। গুবলু ? শোন, সন্ধ্যে বেলা আমার একটা ইম্পরট্যান্ট মিট অ্যাটেন্ড করতে হবে । ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড বাবা।

আই নো। আই নো। প্রেপারেশন ভালো আছে তো ? গুড বয়।

হ্যাঁ তোমার সান্যাল কাকু সঙ্গেই আছে আমার। হি উইশেস ইউ অল দ্য বেস্ট ফর টুমরোজ ক্লাস টেস্ট।  

কাল কোন সাবজেক্টে টেস্ট যেন গুবলু সোনা ? মরাল সায়েন্স ? দ্যাট শুড বি আ ওয়াক ইন দ্য পার্ক ফর ইউ। টূ ইজি সাবজেক্ট, তাই না ?


Thursday, October 3, 2013

চিন্তার ব্যাপার


লাঞ্চ হয়ে গেছে দেড়টার মধ্যেই। এই সময়টা দেবুবাবু একটু জিরিয়ে নেন। অফিসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে একটা জর্দা-পান, একটু আনন্দবাজার, অ্যাকাউন্টস’য়ের সামন্তের সঙ্গে চাট্টি কথা, একটা গোল্ডফ্লেক। অতঃপর ফের টেবিলে ফিরে এসে  ফাইল মন্থন।

বারান্দাটা চওড়া। কিন্তু ভারি স্যাঁতস্যাঁতে। ব্রিটিশ আমলের বাড়ি কি না। সতের  বছর আগে জয়েন করেছেন দেবুবাবু; কিন্তু এর মাঝে অফিসে একবারও চুনকাম হয়েছে বলে মনে পড়ে না। পাঁচতলার এই বারান্দা থেকে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউর ব্যস্ততা দেখতে দেখতে দিব্যি সময় কেটে যায়। আনন্দবাজারের খেলার পাতায় পৌঁছে , পান চিবোনো শেষ করে এবং গোল্ড ফ্লেক ধরিয়ে; দেবুবাবু টের পেলেন যে সামন্ত ছোকরা এখনও আসেনি। আজ সামন্ত কামাই করেনি, কারণ গুপ্তা অ্যান্ড কোম্পানির ফাইলটা নিজের হাতে পৌঁছে দিয়েছিল সকাল বেলা।

হরিদেব সামন্ত বয়েসে দেবুবাবুর চেয়ে বছর দশেকের ছোট। বছর খানেক আগে জয়েন করে, আলাপ হয় অফিস ক্যান্টিনে। সেই থেকে দুজনের মধ্যে গুরুশিষ্য গোছের সম্পর্ক। অফিস পলিটিক্স থেকে বস ম্যানেজ করার উপায়; সমস্ত ব্যাপারেই সামন্তকে গাইড করে থাকেন দেবুবাবু। তাছাড়া প্রতিদিন দেড়টা থেকে দুটো; অফিসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দুজনের আড্ডাটা একটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

পৌনে দুটোতেও যখন সামন্ত এলে না; তখন দেবুবাবুর খটকা লাগলো। সিগারেট বারান্দার কোনায় ছুঁড়ে ফেলে এগোলেন অ্যাকাউন্টসয়ের দিকে। সামন্তর টেবিল নজরে আসতেই দেখলেন যে সামন্ত মুখ গুঁজে ডায়েরিতে কিছু লিখে চলেছে।

চিন্তায় পড়লেন দেবুবাবু। ছোকরা কি অসময়ে কাজ করা আরম্ভ করলে নাকি ? ম্যানেজমেন্ট লাই পেয়ে যাবে যে। পই পই করে দেবুবাবু ছোকরাকে বুঝিয়ে চলেন যে অফিসে আসার পরে আধ ঘণ্টা , লাঞ্চের পর আধ ঘণ্টা আর ছুটির আগের আধ ঘণ্টা; কাজ করতে নেই, কাজ করতে নেই, কাজ করতে নেই – করলে  কেরানী জাতের অমঙ্গল। বেশ কথা শুনে চলা ছেলেই তো মনে হত। সেই ব্যাটা এই অসময়ে মন দিয়ে কলম পিষছে দেখে গা পিত্তি জ্বলে গেল দেবুবাবুর।
দুড়দাড় করে এগিয়ে গেলেন সামন্তের টেবিলের দিকে।

-      কই হে সামন্ত, ভারি কাজ করছ দেখছি। বড়বাবু সুড়সুড়ি দিয়েছেন নাকি ?
-      না দেবুদা, অফিসের কাজ নয়।

-      আহ: , বেশ। নিশ্চিন্ত হলাম। তা এত মন দিয়ে কি লেখাপড়া হচ্ছে ভায়া ? সোশ্যালিস্ট পোয়েট্রি-টোয়েট্রি নাকি?

-      ইয়ে না, তা নয়।

-      তবে? দুপুরের আড্ডা ছেড়ে টেবিলে বসে কলম চালাচ্ছ, জরুরি কিছু তো বটেই। পরকীয়া প্রেম পত্র নাকি ?

-      না দেবুদা। আসলে বউ দু মাস পর বাপের বাড়ি থেকে ফিরছে আগামীকাল। বলে রেখেছে মাসকাবারি বাজার করে না রাখলে আমার কপালে দুঃখ আছে। তা, এর আগে বাজার যতবার করেছি বউই ফর্দ করে দিয়েছে। সে চলে যাওয়ার পর হারধনের মেসেই খাওয়া দাওয়া চালিয়েছি এ দুমাস। সেই সকাল থেকে বসে রয়েছি ডায়রি খুলে দেবুদা। চাল, মুগ ডাল আর বাতাসা ছাড়া কিস্যু মাথায় আসছে না। এদিকে ফি মাসে বউ ইয়া লম্বা লিস্ট ধরিয়ে দেয়। কি উপায় দেবুদা? যদি মাসকাবারি ম্যানেজ না করতে পারি তাহলে দু মাসের জন্যে এবার আমায় গা ঢাকা দিতে হবে।

-      হুম, মিনিবাসের ভিড় আর মাসকাবারি; এই করেই যৌবনের বাপের নাম খগেন হয়ে যায় হে। তাই তো বলি; আরথ্রাইটিস গেড়ে বসার আগে হিমালয়ে চলে যাও ভায়া। আজকের বাজারে; মাসকাবারির চেয়ে মাধুকরী ইজ আ ঢের বেটার অপশন।