Friday, July 22, 2011

সার-কথা


অতিথি লেখক: কেলো

পরিচয়: কোলকাতা-বাসী



ভয়ানক কান্ডএই যে আমি বেঁচে অছি, শিয়ার গডস গ্রেস যাকে বলেট্যাক্সিটা মিনিমাম সত্তরে ছিল, হাফ-ইঞ্চির তফাতে হুশ করে বেরিয়ে গেল।মাইনর এদিক ওদিক হলেই অক্কা, ভাবতেই কেঁপে উঠছি। ঘটনাটার মিনিট পনেরো পরেও, গাএর সমস্ত লোম এককেবারে পারপেণ্ডীকুলার হয়ে আছেবোকা পাঁঠা ভাববেননা আমাকে, রীতিমত জেব্রা ধরে পার হচ্ছিলুমআফটার অল, জন্ম থেকে তো প্রায় কলকাতার রাস্তাতেই মানুষকলকাতা চিরদিনই একটু কেয়ারলেস, কিন্তু সিভিক-সেন্সএর এত অধঃপতনটা কিন্তু হালফিল বেশি দেখছি

ছেলেবেলা কেটেছে উত্তর কলকাতার অলি-গলি চষে, সেসব জাগায় হাত-টানা রিক্সাদের মুভমেন্ট যে ভারী প্রেডিক্টেবল ছিল তা নয়, তবে মোটর-চালিয়ে সায়েব বা ট্যাক্সিচালকরা ছিলেন অনেক বেশি সাবধানী

, ট্র্যাফিকের লাল-বাতি না হোক, অন্তত রাস্তার খান-খন্দদের রেস্পেক্ট দিয়ে স্টীয়ারিং ঘোরাতেন। আজ কাল যে পাবলিকের মাথায় স্পীড-ড্রাইভিংএর কী তুমুল হুলো চেপেছে।


আজকাল অফিস পাড়ায় যাতায়াত করতে হয় নেহাত পেটএর দায়ে, নয়তো কে আসে এই ভীড়ে পাবলিকের জুতোয় নিজের লেজ ইস্তিরি করতে? ( ও হ্যাঁ, ইয়ে, আমি কুকুর, সায়েবি লোম-ব্যাগ নয়, দেশী নেড়ি)। এখন যেখানেই যাওয়া হোক, ভীড়-ভার-ঘাম-দুর্গন্ধ, ধুর! এ জাগায় কুকুর থাকে? আরে এঁটো খাওয়ার খাব ঠিক আছে, কিন্তু তার তো একটা সিস্টেম আছেসিস্টেমটা কি? সোজা ডাস্টবিনে যাবো, অখাদ্য ফিলটার আউট করে, খাওয়ার-দাওয়ার খুঁজে, উদর ভরে চলে আসবো, এই তো? কিন্তু আজকাল মানুষএর সেন্স দেখুন, সমস্ত ডাস্টবিন আজকাল ফাঁকা অথচ যত নোংরা রাস্তায়।সমস্ত সিস্টেমটাই গুবলেট হয়ে যাচ্ছে। পরিবর্তন যথেষ্ট নয়, নিউক্লিয়ার ফিসন ছাড়া এ শহরের খোল-নলচে পাল্টে দেওয়া অসম্ভব।

ওভার-অল যদি আমাকে ওয়ান টু টেন স্কেলে কলকাতাকে রেট করতে বলেন বাস-যোগ্যতার হিসেবে, আমি দেড় নম্বরের বেশি দিতে পারব না। এই দেড় নম্বর কেন দিলাম বলুনতো ? সিভিক-সেন্স কোসেন্ট তো এ শহরের গোল্লা।দেড় দিলাম এ শহরে সাম্য-বাদ ব্যাপারটা ক্রমশ জোরালো হচ্ছে বলেওই একটাই পসিটিভ আমি দেখি এই সুপার-নেগেটিভ জগতে

কিরকম সাম্যবাদ? না ইকুয়ালীটি বিটুইন মানুষ এণ্ড পশু। এ জিনিসটা আগে তেমনটা ছিল না বুঝলেন, আগে দেখতাম এ শহরে রাস্তা-ঘাটে কোনও মানুষের সামান্য চোট লাগেল হাজার লোক এসে জুটে যেতে তার শুশ্রূষায়, অথচ আমার মত একটা কুকুর যদি মোটর-ঠোক্কর খেয়ে আধ-মরা হয়েও রাস্তায় পড়ে থাকত, কোনও মানুষই এগিয়ে আসতো না তার প্রাণ বাঁচাতেএটা ছিল আগের ব্যাপার, এবং আজকাল এই ব্যাপারটাতেই কলকাতা এগিয়ে এসেছে সাম্যের পথে। এখন রাস্তার ধারে কোনও মানুষ ভেঙ্গে-চুড়ে পড়ে থাকলেও; তাকে সাহায্য করতে অন্য কোনও মানুষই আর এগিয়ে আসে না উটকো ঝামেলার ভয়ে। ঠিক যেমন করে মানুষ রাস্তায় পড়ে থাকা কোনও আহত কুকুরকে আলতো করে পাশ কাটিয়ে কেটে পড়ে, তেমনি ভাবেই রাস্তায় কোনও বিপদগ্রস্ত সহ-মানবের আর্তনাদকে কুকুরের ঘেউ-ঘেউএর মতই ডিসমিস করে কাঠি রোল-চিলি চিকেনভাবতে ভাবতে আধুনিক কলকাতিয়ে বীরদর্পে এগিয়ে যানএখানেই কলকাতায় এসেছে টোটাল সাম্য, মানুষ ও জন্তুর মধ্যেএইটুকু পাওনা বুকে করেই, আমি কলকাতা ছেড়ে উত্তরপাড়া চলে যাওয়ার রিস্ক নেব না


পুনশ্চ:

কলকাতাকে কালো কুত্তাবলে গাল দেওয়ার নোংরা অভ্যেসটা যদি কারুর থাকে, তবে তা এই ক্ষণ হইতেত্যাগ করলে ভারী খুশি হই। গালাগালটা অন্তত আমার চামড়ায় ভারী লাগে

ভেউ ভুক; অর্থাত্‍ ভালো থাকুন



Thursday, July 14, 2011

শফিকের সাইকেল

-'এই দ্যাখ ব্যাটা, ওই পুরনো সাইকেল আর চড়তে হবে না, বাইক চালাবে এবার তর আব্বু.."


-'বেশ আব্বু, এবার তবে এই বাইকটা তোমার আর সাইকেলটা আমি চালাব, কেমন আব্বু ?"


-'আর সাইকেল কেউ চালায় নাকি রে, তুই আর একটু বড় হয়ে যা, তারপর তোকে আমি এক্কেবারে বাইক চালানো শিখিয়ে দেব, তখন দেখবি বাইক চালাবার কি আনন্দ'



-'কিন্তু আব্বু আমার সাইকেলটাই বেশি ভালো লাগে যে, কেমন সুন্দর তুমি ওতে করে রোজ আমায় বড়-বাজারে ঘুরতে নিয়ে যাও, কেমন সুন্দর বেল'টায় ক্রিং-ক্রিং শব্দ হয়, কেমন সুন্দর সবুজ রঙের বাক্স লাগানো সামনেটায়, মটর-সাইকেলে ভারী বাজে আওয়াজ আব্বু, আমি একটু বড় হলে তুমি আমায় ওই সাইকেল টা চালাতে শিখিয়ে দিও কেমন? কিন্তু কি, ওই সাইকেল টা কই? দেখছি না তো?'


-'ইয়ে..দ্যাখো দেখি বোকা ছেলের কথা, হিরো-হোন্ডা থাকতে কেউ আবার সাইকেলের খোঁজ করে নাকি ?


-'না না না, আমার ওই সবুজ বাক্স-ওয়ালা সাইকেলটাই বেশ, কোথায় বল আব্বু আমার সাইকেল'


-'ওই সাইকেল তো আমি বেচে দিয়েছি বাপ, তুই একটু বড় হলে আমি তোকে নতুন সাইকেল কিনে দেব, ওরকম পুরনো খ্যাংরা-কাঠি সাইকেলের কি দরকার'


-'না না না, আমার ওই পুরনো সাইকেল'টাই চাই, চাই, চাই,চাই, তুমি কাকে দিয়ে এসেছ আমার সবুজ বাক্সের সাইকেল, এখুনি নিয়ে এস আব্বু, নয়তো আমি কখুনো তোমার সাথে কথা বলব না', এই বলে , গোটা দুপুর জুড়ে ৬ বছরের শফিকের কি দুরন্ত কান্না..


********


সন্ধ্যেবেলা, খেলনা পিস্তল নিয়ে যখন শফিক তার বাবার পুরনো সবুজ-বাক্স সাইকেল চলে যাওয়ার শোক ভুলতে বসেছে, ঠিক তক্ষুনি তাদের ঘরের ছোট টিভিটার তাকিয়ে চমকে উঠলো শফিক !


-'হুই যে আমার সবুজ বাক্স সাইকেল'


টিভির স্ক্রিন জুড়ে তখন এক দোমড়ানো সাইকেলের ছবি ভাসছে, সাইকেলের সামনে দুরমুশ হয়ে যাওয়া একটি সবুজ বাক্স


'বড় বাজারে আজ যে সন্ত্রাসবাদী বোমা -বিস্ফোরণে একজন শিশু সহ ৬ জন সাধারণ মানুষ মারা গ্যাছেন, সেই বোমাটি রাখা ছিল একটু পুরনো সাইকেলের সামনে লাগানো একটু সবুজ বাক্সতে, আরও জানা গ্যাছে..'



টিভিতে সিরিয়াল-সিনেমা ছাড়া অনন্য কিছু দেখার শখ কোনদিনই ছিল না আশফাকের, আজি শুধু খবর'এর চ্যানেল চালিয়েছিলেন খবরটার জন্যে;


ছেলে শফিক'এর আকুল চিত্কারে কোনো সাড়া না দিয়ে, আশফাক উঠে গিয়ে টিভিটা বন্ধ করে দিলেন