Monday, November 18, 2013

প্যান্ডোরার বাক্স

প্যান্ডোরা অস্থির হয়ে পায়চারি করচিলেন। ঘেইমে-নেয়ে সে এক একাকার কাণ্ড। ঢাউস বাক্সখানা রাখা আছে চিলেকোঠার ঘরে। কত্তা বার বার কয়ে গিয়েচেন যেন বাক্সখানের ধারে কাছে প্যান্ডোরা না ঘেঁষে। কিন্তু মনের মধ্যে তার কেমন যেন এতাল-বেতাল হচ্ছে গো।

মিনসে ভর দুপুরে অমন বাক্স নিয়ে এলেন কেন গো। আনলেনই যখন তখন চিলেকোঠার কোনায় লুইকে রাখলেন কেন গো। লুইকে রাখলেনই যখন, তখন প্যান্ডোরাকে সে বাক্সের ধারে কাছে যেতে বারণ করলেন কেন গো। মিনসে বারণ করে আবার নিজে বাড়ি থেকে বেইরে গেলেন কেন গো। এখন প্যান্ডোরা কি করবে গো।

চিন্তেয় চিন্তেয় হাঁপ ধরে যায় প্যান্ডোরার। বাক্সে কি এমন যেমন তেমন ব্যাপার আছে গো ? বাক্সে কি এমন বাঘ-ভল্লুক রইচে গো ? কি এমন বাক্স যা প্যান্ডোরা ধইরলে তার মিনসের মান-ইজ্জৎ লটকে যাবে গো ? মিনসে কি নতুন পিরীতির খপ্পরে পড়েচে গো? বাক্সে করে সতীনের গয়না এনেচে নাকি অ্যাঁ ? এনে নুকিয়ে রেখেচে ? প্যান্ডোরার কি এমন সব্বনাশ হতে চলেচে গো ? প্যান্ডোরা কি করবে গো ?
ও হরি, প্যান্ডোরা কি করবে গো ? প্যান্ডোরার কি সব্বনাশ হল গো ?

নাঃ, এমন হতে দেওয়া যাচ্চে না। প্যান্ডোরা ঠিক করলে সে ঝ্যাঁটা মারবে মিনসের নিষেধের মুখে। দুদ্দাড় করে সিঁড়ি বেয়ে চিলেকোঠায় উঠে গেলেন প্যান্ডোরা বউঠান। ঘরের কোনে মেঝেতে রাখা আধ-হাত লম্বা সাদা কাগজের বাক্স। বিকেলের আবছায়াতে দেখতে পষ্ট নয় গো। প্যান্ডোরা উবু হয়ে বসলেন বাক্স খানার পাশে। মন শক্ত করলেন। সাদা কাগজের বাক্স রঙিন ফিতে দিয়ে বাঁধা। প্যান্ডোরার তর সইল না গো। তর সইল না।

প্যান্ডোরা রঙিন ফিতে ছিঁড়ে বাক্সর ঢাকা খুললেন। ভেতরে থরে থরে সাজানো;  কৃষ্ণনগরের রসিক, ঢলঢলে সরভাজা’দের দল।          

Saturday, November 16, 2013

এক্সপেরিমেন্ট

দিবাকর দু আঙুলের ফাঁকে সাবধানে টেস্ট টিউবটাকে ধরে নাড়ছিলেন। আড়চোখে খেয়াল রাখতে হচ্ছিল স্টপওয়াচের প্রতি। পাক্কা বাহাত্তর সেকেন্ড।

তারপর একটা চিমটে দিয়ে টেস্ট টিউবটার টুঁটি টিপে বার্নারের ওপর ধরলেন। দিবাকরের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, গরমের নয়, উত্তেজনার। এই ছোট্ট ল্যাবরেটরিতে এর আগেও বহু চমৎকার ঘটনা ঘটেছে; কখনও তাঁর হাতে, কখনও বা তার সহকর্মী ইন্দ্রে’দার তত্ত্বাবধানে। তবে এই প্রথম দুজনে এক সঙ্গে মাঠে নেমেছেন কারণ কাজটা তেমনই দুর্দান্ত। এই কম্পাউন্ড আবিষ্কার হলে দুনিয়ার ভোল পাল্টে যাবে। এক সময় মনে হচ্ছিল কাজটা অসম্ভব। কিন্তু ভাগ্যিস দুজনের কেউই হাল ছেড়ে দেননি। ব্রেক-থ্রুটা আসে গত পরশু সন্ধ্যে বেলা। কি ভাবে সেটা বলাই বাহুল্য কিন্তু দুজনেই লাফিয়ে উঠেছিলেন। একটানা ত্রিশ ঘণ্টা না ঘুমিয়ে তারপর থেকে দুজনে কাজ করে গেছেন। এই সামান্য কিছুক্ষণ আগে ইন্দ্রদা গেছেন একটু ফ্রেশ হয়ে নিতে।

বার্নারের ওপর মিনিট তিনেক রাখতেই টেস্ট টিউবের ভেতরের মিশ্রণটি কালো ড্যালা থেকে পালটে দুটো স্পষ্ট ভাগে দেখা দিল; একটা সবজেটে, অন্যটা গাড় লাল। চিমটে সহ টেস্ট টিউব হাতে না থাকলে দিবাকর লাফিয়ে উঠতেন ইউরেকা বলে। একবার ভাবলেন ইন্দ্রদাকে হাঁক দেবেন। তারপর ভাবলেন যে এক্সপেরিমেন্টের শেষ অংশটুকু সেরেই ফেলা যাক। তারপর ইন্দ্রদাকে ডেকে ফাইনাল স্যাম্পেল দেখিয়ে হুল্লোড় করা যাবে।

টেস্ট টিউবের সবুজ-লাল মাল-মশলা একটা কাঁচের পাত্রে ঢাললেন দিবাকর। তারপর দেরাজ খুলে নিয়ে এলেন ড্রপার ও কাঁচের তিনটে শিশি। প্রত্যেক শিশি থেকে দুই ফোঁটা নিয়ে এই লাল-সবুজ কম্পাউন্ডে মিশিয়ে দিলেই সেই মহার্ঘ বস্তুটি তৈয়ার হবে। দিবাকর দেরি করলেন না। দু ফোঁটা করে কেওকার্পিন,  তরল বোরোলিন ও নলেন গুড় মিশিয়ে দিলেন সবুজ-লাল কম্পাউন্ডে।

সঙ্গে সঙ্গেই দিবাকর হাঁক দিলেন “ হুররে ইন্দ্রদা, উই হ্যাভ ডান ইট! বাঙালির ডী-এন-এ তৈরি”। 

Thursday, November 14, 2013

নামকরণ

লালু রেগে কাই । রাগবে নাই বা কেন ? পল্টু ব্যাটা একেবারে ইস্টুপিড। টিফিনের পরের প্রথম ক্লাসে বাংলার স্যার অমন দরাজ গলায় “ কন্যাকুমারীর রকমারি মনিহারী” কবিতাটি পাঠ করছিলেন; ক্লাসময় স্যারের আওয়াজ গমগম করে খেলা করছিল, গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল লালুর। অমনি পল্টে ব্যাটা এমন একটা বিরাশি সিক্কার হাঁচি ঝাড়লে যে সব মাটি। ছন্দপতন ঘটায় স্যার ফের ফিরে গেলেন সমাসে। রাগে মাথার চুল ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে করছিল লালুর। এই বাংলার স্যার নতুন এসেছেন, মাঝে মাঝেই স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করেন। ক্লাসের বাকি ছেলেরা ফচকেমি করে যে এই নতুন স্যারকে দাঁড়িলেস-রবীন্দ্রনাথ বলে ডাকে, তাতে লালু ভারি মর্মাহত হয়। ইয়ে, এই মর্মাহত শব্দটা লালু নিয়মিত ব্যাবহার করছে আজকাল, সেনটেন্সে বেশ জোর আসে তাতে।

লালু্র ভারি অপূর্ব লাগে নতুন বাংলা স্যারের কবিতা। স্যারের দেশ  বেড়ানোর নেশা আছে, আজ হিমালয় তো কাল কেরল। আর ঘুরে এসেই রোমাঞ্চকর সব কবিতা লেখেন। সে সব লেখায় যেমনি আবেগ, তেমনি তার ভাষা, তেমনি ছন্দ- ভারি হাইক্লাস। কবিতাগুলো লালুর মনের মধ্যে বায়স্কোপ চালিয়ে দেয়; এমন রিয়েল লেখা সেই সব।

লালুর ছোটকা বাড়ি থেকে অল্প বয়েসে পালিয়ে যান, লালুর অবশ্য বয়েস তখন অনেক ছোট। তাঁর তোরঙ্গ ঘেঁটে একটা চমৎকার কবিতার ডায়েরি পাওয়া যায় বহু বছর পরে। অতএব সাহিত্য’র প্রতি ন্যাক লালুর ব্লাডেই আছে। বাপ-মা যতই তাকে ইঞ্জিনিয়ার করতে চান না কেন, লালু বেশ জানে সে সব তার দ্বারা হওয়ার নয়। ক্লাস নাইনের জ্যামিতির চোটে এ বয়েসেই মাথায় কেমন টাক টাক ভাব আসছে। আর দাঁড়িলেস-রবীন্দ্রনাথ-স্যারের ইনফ্লুয়েন্স গাড় হওয়ার পর থেকে লালু ঠিক করেই নিয়েছে,হয় লিটারেচারে যাবে নয়তো মেজপিসের মত বড়বাজারে আচারের ব্যবসা ধরবে।

পল্টুর উৎপাতে বাংলা স্যার কবিতা থামিয়ে ফের পড়ানোতে মন দিয়েছিলেন। লালু ঠিক করলে আজ ক্লাসের শেষে স্যারের কাছে হত্যে দিতেই হবে। আসলে এই নতুন কবি-স্যারকে এতই ভক্তি করে লালু যে আজ পর্যন্ত ঠিক কাছে ঘেঁষবার সাহস হয় নি। কিন্তু স্যার যে তাকে অনবরত ইন্সপ্যায়ার করে চলেছেন, সেটা বেশ টের পায় লালু। স্যারের মত পকেটে ছোট ডায়েরি রাখতে আরম্ভ করেছে সে। অবিশ্যি সেই ডায়েরিতে যে কি লেখা যায়, তা নিয়ে লালুর ধারনা এখনই স্পষ্ট নয়।

ক্লাস শেষ হতেই লালু ছুটলে স্যারের পিছন পিছন। বারান্দার শেষ প্রান্তে এসে হাঁক দিলে
-      “ স্যার, এক মিনিট”
-      “ আরে লালমোহন যে, কিছু বলবে ?”
-      “ স্যার, ইয়ে মানে। আমি মানে...আমার আপনার কবিতা খুব ভালো লাগে স্যার”
-      “ হেঃ, ঠ্যাং পুল করছ না তো ?”
-      “ না...নো...মানে নেভার টি নট স্যার। কি বলছেন স্যার। আপনার ওই কাঞ্চনজঙ্ঘাকে নিয়ে লেখাটা, চোখে জল এসে গেস্‌ল স্যার। ওই যে স্টার্টটা। ‘অয়ি কাঞ্চনজঙ্ঘে’ বলে যে স্টার্টটা ছিল স্যার। ভারি মুভিং। আজকের যে চাঁদনী রাত নিয়ে কবিতা বলছিলেন স্যার, শুনে গায়ে কাঁটা দিয়েছে স্যার। নেহাত পল্টুটা এমন বেরসিক ভাবে হেঁচে দিলে...”
-      “ তোমার এতটাই ভালো লেগেছে লালমোহন ? এথিনিয়াম ইন্সটিটিউশনে এই প্রথম কেউ আমার কবিতাকে অ্যাক্‌নোলেজ করলে। মাঝে মাঝে মনে হয়, আমার কাব্যরস যেন সীতা, যুগের রাবণ তাঁকে টেনে-হিঁচড়ে কিডন্যাপ করে নিয়ে যাচ্ছে। বুঝতে পারছ ? আর এই একা তুমি আছ লালমোহন, যে জটায়ুর মত আমার কবিতার সীতা মাইয়াকে আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করেছ। আই অ্যাম গ্রেটফুল টু ইউ”
-      “ স্যার আশীর্বাদ করুন যেন গোটা জীবন জটায়ু হয়ে থাকতে পারি”

লালমোহন গাঙ্গুলি কে বুকে টেনে নিলেন শ্রী শ্রী বৈকুণ্ঠ মল্লিক।