Saturday, November 20, 2010

দ্য গ্রেট কালচারাল দাদাগিরি

লিওপোল্ডএর লালচে আলো মাখা সন্ধ্যের আঁচ, আধ ঘন্টার মধ্যে যেকোনো মগজে ঝিম নামিয়ে দিতে পারে, মাতাল সহকর্মীগুলোর সঙ্গে মুম্বাইএর এই পান-তীর্থে এসে বুঝলাম যে কলকাতার দিবাকর সান্যালের জাজমেন্টটা নেহাত ফালতু নয়। টেবিলে সহকর্মীদের এক ঘেয়ে এলকহোলিক আড্ডাবাজি থেকে উঠে এসে, বার ঘেঁষে একটা আরাম-টুলে বসলুমগেলাসে মন দেব, এমন সময় কাটোয়া লোকাল ছাপ চাহিদা ভেসে এলো; “দাদা দেশলাই আছে?”

পকেট থেকে দেশলাই বের করে দিতে গিয়ে দেখলাম রঙ চঙে বুশ শার্ট পর এক মধ্য বয়স্ক ভদ্রলোক

-“বুঝলেন কি করে যে আমি বাঙালি?”, জানতে চাইলাম।
-“জনি ওয়াকারে যে ভাবে হাড়-হাভাতের মত চুমুক লাগলেন তাতেই সন্দেহ হয়েছিল, আর এই মাত্র যে রজনীকান্ত গুনগুণ করছিলেন সেটা ট্র্যাক করে ফেলেছি”, ভদ্রলোক দেশলাই ফেরত দিতে গিয়ে জানালেন, “কানটা আমার বেশ শার্প বুঝলেন”
-“শার্প শুধু না, সুপার শার্প”
-“তবে এই যে আপনার গুনগুণ টা শুনতে পেলাম সেটা কিন্তু শুধু কানএর জন্যে নয়, শুনতে পাওয়ার মূল কারণটা হলো আমাদের ইটারনাল সেন্স অফ দাদাগিরি”
-“দাদাগিরি? এক্সকিউজ মি?”
-“ বুঝলেন না তো! লেট মি এক্সপ্লেইন। এই ধরুন বন্ধু-বন্ধবের সঙ্গে আপনি বারে এসেছেন বিলিতি মাল খেতে, ফুর্তি করতে! বেশ করছিলেন সেই সবঅথচ একটু আগে দেখলাম আপনি ওখান থেকে উঠে এসে এই বারএর পাশে এসে একা বসে গুণগুণ করছেন তুমি নির্মল কর, মঙ্গল করহোয়াই? মাল খান, ফুর্তি করুন,কিন্তু লিওপোল্ডে রজনীকান্ত গুণগুণাবার কি হয়েছে? আপনি গুণগুণ করে উঠেছেন কারণ তখন আপনার মধ্যে বাঙালির ইণ্টেলেকচুয়াল দাদাগিরি চুইয়ে বেরোতে শুরু করেছে। ছোট-বাথরুম বড়-বাথরুমের মত এটাও বাঙালির একটা প্রাকৃতিক আর্জ, বুঝলেনযেকোনো জাগায় নিজের কালচার পুশ করা। এটা একটা খতরনাক সেন্স অফ দাদাগিরি, দি গ্রেট বাঙালি কালচারাল দাদাগিরি। আর এই যে আমি, এত ভিড়, হই-চই ফিল্টার আউট করে আপনার গুণ গুণ করা বাংলা গান ট্রেস করে ফেললাম, এটাও সেই আঁতেল দাদাগিরির রেজাল্ট। বাঙালি নর্থ পোলে গেলেও ক্যালেন্ডার দেখে বসন্ত উত্‍সব করবে মশাইআরে, সৌরভের সেঞ্চুরির থেকেও ঢাক বাজাতে পারা আমাদের কাছে বেশি স্পেশাল, বুদ্ধর নন্দন ভিজিট আর মমতার হিজিবিজি স্কেচ আমাদের কাছে বেশি মাইন্ড স্পেস পায়, ওদের পলিসি-টলিসি নিয়ে আমাদের কোনও মাথা ব্যথা নেই। সংস্কৃতি নিয়ে আমাদের এত মাতব্বরি, যে এই করে করেই জাতিটা বখে গেলরবীন্দ্রনাথ আর সত্যজিতের লিমিটেশন আর বাঙালি জন্মে ওভারকাম করতে পারবে নাশুধু এই কালচারাল দাদাগিরি ফলিয়ে বাঙালি খতম হয়ে গেল”
হাঁ করে গিলে গেলাম ভদ্রলোকের কথা গুলো। হুইস্কির জন্যে নাকি ভদ্রলোকের লেকচারের জন্যে জানি না, মাথাটা বেশ ঝিম ঝিম করতে শুরু করেছিলএমন সময় আমার সহকর্মীনী অনিতা আমায় ডাকতে এলোবাঙালি ভদ্রলোকের থেকে বিদায় নিয়ে নিজের টেবিলে এসে বসলাম। আর ঘন্টা খানেক গল্প আড্ডার পর আমরা টেবিল ছেড়ে উঠলাম। বেরোতে যাব এমন সময় দেখলাম যে সেই বাঙালি ভদ্রলোক তখনও বসে আছেন। ওনার দিকে হেঁটে গেলাম। পাশে দাঁড়িয়ে গুড নাইট বলে হাত বাড়িয়ে দিলাম। হ্যান্ড শেক করে ভদ্রলোক বললেন, “টেক কেয়ার”
উত্তরে বললাম “আপনি তাইলে বাঙাল?”
-“বরিশাল”, ভদ্রলোক অবাক হয়ে বললেন।
-“যশোর হিয়ার”, আমি জনালুম।
-“আপনি বুঝলেন কি করে যে আমি বাঙাল?” ভদ্রলোক এবার একটু ভেবড়ে গেছেন।
_ “ওই যে কালচারাল দাদাগিরি, ওই দাদাগিরি বেস করেই বুঝেছি”, হেসে বললাম।
-“মানে?” ভদ্রলোক উত্‍সুক এবার।
- “মানে ওই যে আমার সহকর্মীনী তখন আমাকে ডাকতে এসেছিলেন, তাকে দেখে যে আপনি অস্ফুটে বলে উঠলেন হালা, মাগী খান কি ডবকা’, সেটা আমি পাঁচ ফুট দূর থেকেও, এত হইচই, লাউড মিউজিক সত্ত্বেও ট্রেস করে ফেলেছি, এই হলো গিয়ে বাঙালদের প্রবলেম বুঝলেন, কালচারাল দাদাগিরি; বম্বে কি লণ্ডন, বাঙাল শুনলে বা ইলিশ শুঁকলে, সব ছেড়ে ছুড়ে ট্রেস করে নেবে। গুড নাইট, টেক কেয়ার”!

Monday, November 15, 2010

রোগ-সুন্দর



ভাইরাল, জ্বর-গলা ব্যথা-চোখ লাল-জ্বিভ বিস্বাদ! তবে এসব যন্ত্রণা সহ্য করেও যখন দেখি সোমবার দুপুরে; অফিসের থবড়ানি ভোগ না করে, মেডিকাল লিভের দৌলতে ঘরে বসে মন দিয়ে ভি সি ডিতে আইস এজ দেখছি, তখন দিল সুপার খুশ হয়ে যায়। সাবাস ভাইরাল, উইকেন্ডটাকে পাস কাটিয়ে ঠিক রবিবার রাত থেকে গায়ে টেম্পরেচার। কি টাইমিং মাইরি। নাহ, শুধু সেলস টার্গেটি নয়, জীবনে ভগবানও আছেন। বিকেলে বউ সলিড ঝাল ফুচকা নিয়ে আসবে, তাতে নাকি জ্বিভের টেস্ট-বাডরা জেগে উঠবে। এই বডি টেম্পরেচার আর দু দিন টানতে পারলেই হল, বিষ্যুদ-শুক্কুর অফিসে টুকি মেরেই ফের উইকেণ্ড, ক্লাস সিচুয়েশন!
অতএব কনক্লুশান?, রোগ-ভোগ মানে যে হামেশাই টেনশন-দুশ্চিন্তা-কষ্ট তা নয়। প্রাসঙ্গিক দুটি কেস:


1জনডিস
ক্লাস ইলেভেনে তখনমাস খানেক ক্লাস করার পরেই জনডিস ধরা পড়ল। কিলো কিলো রোল, ফুচকা, চপ-বেগুনীর ফসল। বিলিরুবিন সাড়ে আটসর্বক্ষণ গা-বমি ভাব, ভীষণ উইকনেস; সাপটা ডাক্তারী আদেশ: ১ মাস বেড রেস্ট। শুয়ে থাকার তিন দিনের মাথায় দুপুর বেলা ফোনে এল;
-“এই যে হলুদ পাখি, কি খবর? কদ্দিনের ছুটি?”
-“১ মাস, কে বলছিস?”, বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম।
-“মিকি
-“কে মিকি?”, প্রথমটায় মনে করতে পারিনি এই মিকিটা কে। তারপর মনে পড়ল যে এই মিকি আমাদের স্কুলে নতুন এসেছে। পাশের শহর থেকে প্রতিদিন আসে আমাদের স্কুলে।
চিনতে পেরেছি বলাতে বিজ্ঞের মত বলে গেল – “ এক মাস স্কুল মিস বেশ লম্বা বুঝলি, বাম্পার ছুটি এনজয় করবি বটে, তবে চাপ টা হল এই যে ক্লাসের ব্যাপারে আপডেট না থাকলে চলবেনা। তুই এক কাজ কর আজ থেকে একটা জনডিস ডায়েরী মেনটেন কররোজ দুপুরে আমি তোকে রোজকার স্কুলের আপডেট দেব ফোনে করেচিন্তা নেই, শুধু ক্লাসের পড়াশোনার কথা নয়, বিসাইড দ্য সিলেবাস আমি তোকে স্কুলের বাকি খবর-টবরও স্ট্রাক্চার্ড ওয়েতে সাপলাই করে যাব, হুইচ ইনক্লুডস ইন্টার হাউস ফুটবলএর হাল হকিকত এবং সায়নির সমস্ত খবর, কি ভাই, নামটা ঠিক বলেছি তো
প্রায় জোর করেই আমায় জনডিস জার্নাল মেনটেন করিয়েছিল মিকি। রোজ স্কুল থেকে ফিরে আমায় ফোনে করে স্কুলের ফিরিস্তি শোনাতো মিকি। ক্লাসে কি পড়ানো হচ্ছে, কে টেস্টে ফেল করেছে, কে প্যাদানি খেয়েছে বা দিয়েছে থেকে সায়নির দিকে কে তাকিয়েছে, বুলেট পয়ণ্টে সাজিয়ে বলে যেত রোজ। শুধু আমার জনডিস-ছুটির শেষ দুই দিন মিকির কোনও কল আসেনি। আমার আর ফিরতি কলও করা হয়নি
স্কুলে ফিরে গিয়ে মিকির খবর নিতেই জানলাম মিকি মাস খানেক স্কুলে আসতে পারবে না। জনডিস! বিলিরুবিন নয়ে গিয়ে ঠেকেছে। কি ভালোই যে লেগেছিল খবরটা পেয়ে।
স্কুল থেকে ফিরে গিয়েই ফোনে লাগলাম মিকিকে; - “ এই যে হলুদ পাখি, জনডিস ডায়েরী শুরু করে ফেল, এবার রেগুলার আপডেট দেব আমিপড়াশোনা থেকে ফুটবল, বুলেট বাই বুলেট”!
“আর শর্মিষ্ঠার খবর কে দেবে? প্রিন্সিপাল?”, গম্ভীর গলায় বলেছিল মিকি
দৈনিক খবর গুলো রোজ সাজিয়ে দিতাম মিকিকেসেই দ্বিপাক্ষিক জনডিস-বাজির জেরে এক পেল্লায় দোস্তি গজীয়েছিল। মিকির ভাষায় “এ হৃদয়ের যোগ নয় পচা, লিভার কনেকসন”!
২। চিকেন পক্স
সেই স্কুল থেকে আমি, পাপাই আর চিন্টু এক জান-এক প্রাণ। স্কুলকামাই থেকে মেয়েদের দিকে এংগুলার দৃষ্টি নিক্ষেপ, সমস্তই এক সাথে, গলায় গলায় জেনেছি-শিখেছি-করেছি। বেনিমাধব শীল যাই বলুক, আমাদের দিনগত ফল পৃথক কিছুতেই হতে পারে না, এটা একটা সোজাসাপটা হাইপোথেসিস। হাইপোথেসিসটাকে এক দিন বেমক্কা চ্যালেঞ্জ করে বসল পাপাই।
গরমের ছুটিতে আমি আর চিন্টু প্রবল ভাবে প্ল্যান করে চলেছি কি ভাবে টিউশনীর টাকা শটকে বিকেলগুলোকে চাউমিন-রোল-মোগলাইই সহযোগে আরও মনোরঞ্জক করে তোলা যায়, এমন সময় পাপাই এসে মেজাজের সঙ্গে জানালে যে এই গরমে সে মেজমামার সাথে উটি ঘুরতে যাবে।
টু দি ল্যান্ড অফ ব্লু মাউন্টেনস- আমি চললুম বন্ধুরা”, পাপাইএর কথা শুনে গা জ্বলে গেছিল।
চিন্টু সাবধান করেছিল পাপাইকে, “ওরে ট্রেটর, ওরে ইতর, বাবার পকেট কেটে তোকে চাউমিন গিলিয়েছি নিমাইদার দোকানে, সে কি আজ এই দিন দেখবো বলে? গরমের ছুটিতে আমরা বাড়িতে পচবো আর তুমি ল্যাল ল্যাল করে মেজমামার পিছণ ধরে উটি দেখবে?তুই জাহান্নামে যা, শুয়ার”
আমিও পাপাইকে একটু নিরস্ত করতে চাইলাম, “পাপাই, উটি তে কি এমন হাতি ঘোড়া আছে রে ভাই, তার এর চেয়ে চ শ্রীরামপুরে পিসির বাড়ি থেকে দু দিন কাটিয়ে আসি, পিসেমশাইদের ওখানে হিমসাগরের বাগান আছে, এক একটা মিষ্টি বম্ব এক্কেবারে”!
“গ্রেপ্স আর সাওয়ার মেট, গ্রেপ্স আর সাওয়ার”, এই বলে নিষ্ঠুর পাপাই কেটে পড়েছিল। সেদিন বিকেলেই পাপাই রওনা দিয়েছিল মেজমামার সাথে ২ সপ্তাহের জনন্যে উটি।
পইতে ছুয়ে চিন্টু বলেছিল “ভস্ম হয়ে যাক ব্যাটাচ্ছেলে পাপাই”!
পাপাই ভস্ম হয়নি।
এর ঠিক দুদিনের মাথায় ভোর পাঁচটায় চিন্টুর ফোন, “ পচা, ট্যাক্সি নিয়ে ১০ মিনিটে তোর বাড়ি আসছি, স্টেশন যেতে হবে”
-“কেন?” আমি ঘাবরে গেছি।
-“পাপাই ফিরে আসছে, উটি যাওয়ার পথেই ওর চিকেন পক্স বেরিয়ে গ্যাছে। মেজমামা ওকে পার্সেল করে ফেরত নিয়ে আসছেনওয়েলকাম ব্যাক সেরিমনিটা স্টেশন থেকেই আরম্ভ করতে হবে বুঝলি”
আহহ, এত তৃপ্তির খবর ক্যালকুলাসে পাস করেও পাইনি।

Monday, November 1, 2010

ক্ষতিপূরণ / দেবব্রত কর বিশ্বাস


( দেবব্রত কর বিশ্বাস: কবি, বন্ধু, বিরিয়ানী প্রেমী, প্রবল ভাবে কোলকাতা বাজ, আড্ডা-বিলাসী এবং ঘোর ইস্ট বেঙ্গলিস্ট! 'মেঘজন্ম' নামক লিটিল ম্যাগাজিনের ব্রেন-পিতা ও যুগ্ম-সম্পাদক। )


******

একটা শব্দ আমাকে অনেকদিন ধরে ভাবাচ্ছে- ক্ষতিপূরণ। যেকোনো বিপর্যয় হলে সাধারণত সরকার বা প্রশাসন, যাই বলি না কেন, তাঁরাই এই ক্ষতিপূরণের সিদ্ধান্ত নেন। ক্ষতিপূরণের হার এবং প্রাপকদের সম্বন্ধেও শেষ সিদ্ধান্তটুকু সম্ভবত তাঁরাই স্থির করেন। আর কিছু বেসরকারী উদ্যোগ, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে এসে দাঁড়ান। ক্ষতিপূরণ দেওয়ার মতো সামর্থ্য, অধিকার, কোনোটাই তাঁদের থাকে না। তাই তাঁরা শুধু পাশে এসে দাঁড়ান। অন্তত তাঁরা তেমনটাই বলে থাকেন। ক্ষতিপূরণ দেওয়ার অধিকারটুকু সবলে নিজেদের দখলে রেখেছে সরকার বা প্রশাসন বা মালিকপক্ষ। ক্ষতি করবার ক্ষমতা আছে যার, ক্ষতিপূরণ সেই দেবে।

এটাই নির্ধারিত। তাই আজ টিভিতে, খবরকাগজে, ইন্টারনেটের আনাচে কানাচে চোখ রাখলেই জানতে পারা যায়, কোনো বৃহত্তর বিপর্যের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়েও সরকার এবং বিরোধীপক্ষ বেশ কোমর বেঁধে প্রতিযোগীতায় নেমেছে- কে কত বেশী টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে পারে ! আচ্ছা, এই লড়াই-কে কি সুস্থ প্রতিযোগীতা বলা চলে ?অথচ আমরা, সাধারণ মানুষেরা, পপকর্ন হাতে দর্শকাসনে আয়েস করে বসে এই লড়াই উপভোগ করছি। অথচ যার জন্য এতকিছু, সেই বিপর্যয়টুকু কেন হলো, কে বা কারা দোষী, তারা শাস্তি পেলো কিনা, এইসব প্রশ্নের উত্তর অধরাই থেকে যায়। আমরা সবাই যেন কম বেশী মনোনিবেশ করে বসে আছি একটাই শব্দের দিকে- ক্ষতিপূরণ।

সেদিন ছুটির বিকেলে আমার বন্ধু সুমনের ছোট্ট স্টেশনারী দোকানে বসে আড্ডা মারছিলাম। দোকান লাগোয়া এসটিডি বুথ। সেটাও সুমনদের। কয়েক বছর আগেও এই বুথ রমরম করে চলতো। মানে আমাদের সবার হাতে মোবাইল ফোন চলে আসার আগে। এখন টিমটিম করে টিকে আছে। সুমনের সঙ্গে কথা হচ্ছিলো। পৌরসভা রাস্তা চওড়া করবে বলে সুমনদের জমির খানিকটা নিয়ে নিয়েছে। ফলে দোকানটাও আগের থেকে ছোট হয়ে গেছে। তার জন্য সুমনরা ক্ষতিপূরণ পাবে। কিন্তু কত টাকা পাবে সে সম্বন্ধে কোনো আইডিয়া নেই সুমনের। তবে সেই টাকা পেতে যে অনেক সময় লাগতে পারে সেই বিষয়ে সুমনকে নিশ্চিত দেখলাম। ওরা এখন বিরোধী দলের কাছে যাবে বলে ভাবছে। একটা প্রতিযোগীতার আবহ তৈরি করে যদি ক্ষতিপূরণের টাকা ঠিকঠাক সময়ে পেয়ে যায়, সেই চেষ্টা করবে। অথচ আমি কেমন চুপ করে যাচ্ছি আজকাল। ক্রমাগত বিপর্যয়, ক্ষয়ক্ষতি, খুন-জখম, এইসব শব্দ আর আমাদের সেভাবে ভাবাচ্ছে কি ? আমরা এড়িয়ে চলার সাহস এবং ভঙ্গিমা, দূটোই রপ্ত করে নিয়েছি।
নিজের খুব প্রিয় একটা রঙিন কাচের বল হারিয়ে গিয়েছিলো বলে একসময় একটি ছোট্ট ছেলে খুব কেঁদেছিলো, আর সেই ছেলেটি যখন বড় হলো, সাদা-কালো, একনম্বর-দুনম্বর বুঝতে শিখলো তখন সে নিজের মতো করে ক্ষতিপূরণ বুঝে নিতে শিখে গেছে। তাই আজ বড় কিছু হারিয়ে গেলেও তার সেভাবে কষ্ট হয় না আর। কষ্ট পাওয়ার মতো মনটাও বোধহয় সে হারিয়ে ফেলেছে। এখন সে শুধু জিততে চায়। জীবনের ছোট-বড়, রঙিন-সাদাকালো, সমস্ত যুদ্ধে জিততে চায়। সমুদ্র যার সমস্ত কেড়ে নিয়েছে, যাকে নিঃস্ব করে রেখে সেই সমুদ্র বহাল তবিয়তে শুয়ে আছে পৃথিবীর বুকে, সেই অনন্ত জলরাশি দেখে কি ভয় পাবে সর্বহারা নাবিক ? নাকি সমুদ্রকে জয় করে প্রতিশোধ নিতে চাইবে সে ?
সুমনদের দোকানে একটি সুন্দর দেখতে মেয়ে ফোন করতে এসেছিলো। আমরা আড়চোখে দেখছিলাম। সুমন বললো- মেয়েটি রোজ এখানে আসে বিদেশে চাকুরীরত বন্ধুকে ফোন করবে বলে। সেদিন ফোনে কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেললো মেয়েটি- তোমাকে ভুলে যাবো? সেও কি সম্ভব ? ব্যস। আর কোনো কথা না বলে ফোন রেখে দিয়ে বিল মিটিয়ে মেয়েটি চলে যায়। সুমন জানিয়েছে মেয়েটি আর কোনোদিন আসেনি। নিশ্চিত ভাবেই মেয়েটি একটি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে। ওকে কে ক্ষতিপূরণ দেবে ? এসব ভাবতে ভাবতে দেখি একটি অলৌকিক জলযানে চড়ে বসেছি আমি। সম্পূর্ন একা। আমার চারদিকে দিগন্ত বিস্তৃত সমুদ্র। মধ্যরাত্রির অন্ধকারে সেই সমুদ্রে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ফসফরাস জ্বলছে আর নিবছে !

ছবি: আরিত্র সান্যাল।