Thursday, March 29, 2012

বালতীর ব্যাপার


আমার বালতী ভারী পছন্দেরলোহার বিদঘুটে মধ্যযুগীয় বালতী নয়, যারা শ্যাওলা মাখা নাইলনের দড়িতে ঝুলে কুয়োর ভিতর বাইরে আসা যাওয়া করতো। টুকটুকে কলেজমুখী মেয়েদের মত ঝকঝকে প্লাস্টিকের বালতীচমকিলা লাল, দাবিময় সবুজ, দুর্দান্ত নীল; বিভীন্ন সাইজের জল-পাত্র। মধ্যবিত্তের মার্গো-মার্কা বাথরুমের ধ্রুবতারা এই বালতীগুলি। কত রকমারি হাতল, স্টীলের পাতলা হাতলে প্লাস্টিকের গ্রীপ; এক ধাপ এগিয়ে প্লাস্টিকের হাতলে রাবারের গ্রীপ।

ছেলেবেলায় মাঝারি সাইজের বালতী বয়ে ছাদে নিয়ে যেতাম শীতকালে; বালতীর মুখ গামছায় ঢেকে রেখে দিতাম জল গরম করতে। তারপর সর্ষের তেল রগড়ে সেই প্রেম-মাখা জলে স্নান; বালতী-প্রীতি সে সময় থেকেই হয়তো

বালতীর আর নারী কোথায় মায়াবিনী? দুটি ব্যাপারেই উচ্চতা-গভীরতা দুইই আছে।আর দুজনেই চলনে ছলকে ওঠে। এ প্লাস্টিক-বালতী জলবিহীন অবস্থায় যতটা অনাবিল, পালক-ভার স্থিততায় মিষ্ট; জলবাহী অবস্থায় ততটাই  পর্বত-ভারী এবং অবুঝপনায় দুষ্ট। ঠিক যেমন নারী

Saturday, March 24, 2012

রবিবারের জলখাবার

হিং'য়ের কচুরী: দক্ষিণেশ্বর

বাঙালি রকেট হলে রবিবারের জলখাবার হলো Launching-Pad”- ছোটোমামা

সপ্তাহ কেমন কাটবে? মেজাজ দুরুস্ত থাকেবে তো? শরীর ঝ্যামেলায় ফেলবে না তো? হপ্তা-ভর সব কিছু খাপে খাপ খেলে যাবে তো? এর জন্যে একটাই Pre-Conditionজম্পেস রবিবাসরীয় জলখাবার
বাজার-বিজয় সেরে, হাত-পা ধুয়ে, টেবিলের ওপর আনন্দবাজার মেলে বসে, জলখাবারে ফোকাস; এর অন্যথা হয়েছে কী সপ্তাহের জন্যে মেজাজটা ধাপার মাঠ হয়ে যাবে। আর জলখাবারে থাকবে কী? একটা Ready Reference তৈরি করে রাখলাম:

(বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই লিষ্টি-টি ক্রমশ পরিশীলিত ও পরিবর্ধিত হবে, এমন আশা রাখি)

১। খাস্তা কচুরী-ছোলার ডাল-জিলিপি-দরবেশ

হিঙ্গের কচুরী-ছোলার ডাল-জিলিপি-রসগোল্লা

কড়াইসুটির কচুরি-নতুন গা-মাখা আলুর দম-চমচম (শীতকালীন)

৪। রাধাবল্লভী, আলুর দম, মুগ-ডালের হালুয়া, চমচম

৫। লুচি (ময়দার-গাওয়া ঘিয়ে ভাজা), আলু ভাজা (কালো জীরে মাখানো), বেগুনভাজা, গরম-রসগোল্লা

৬। মুড়ি-ঘন স্বর-মিশ্রিত দুধ-আম একসাথে মিশয়েশেষে আমের সরবত

৭। টাটকা ইলিশ মাছের পেটি ভাজা, বাঁসি ভাত মাছ ভাজা তেল ও কাঁচালঙ্কা দিয়ে মেখে, আজ্ঞে হ্যাঁ

৮। দুধ-খই, মুড়কি, কদমা, মঠ। সঙ্গতে স্বাদ-বদলির জন্যে ঝুড়ি-ভাজা। (বছরের সেই বিশেষ সময়টির জন্যে)

লিষ্টিতে আরও কিছু খাদ্য-মহীরুহ ঢুকবে অবশ্য! কিন্তু কী ঢুকবে না তাও নিশ্চিত। এই নিচের ফচকে ও-জলখাবারিক ব্যাপার-স্যাপার গুলো বাঙালি যত নিজের রবিবার থেকে দূরে রাখে ততই দেশের মঙ্গল, দশের মঙ্গল:

-পাউরুটি বিষয়ক কোনও কিছু ( না ফ্রেঞ্চ-টোস্টের নষ্টামিও নয়)
-নুডল (ম্যাগী-চাউমিন? রবিবারে? রামো: )
-কর্ণফ্লেক্স (এটা রবিবার কেউ ভাবলে তার উঠবোস করে নেওয়া উচিত, ১২ বার)
-যা কিছু মাইক্রোওয়েভ থেকে বেরিয়ে এসেছে

পুনশ্চ:রবিবার।বউ বাপের-বাড়ি গ্যাছে, সকালে Micro-waved-লাপসি-ম্যাগী খেয়েছি। ছোটোমামা ফোন করেছিল ডাল-কচুরী চিবুতে চিবুতেশুরুর বাকতাল্লাতা তখনই শুনিয়েছিলো
  





প্রথম সিগারেট

(সূত্র:"আমার প্রথম সুখটান; ৩ মার্চ, ২০০০। একটি সিগারেট খেয়ে, প্রচুর ক্লোরোমিণ্ট হজম করে, তিনটি ঘন্টা বাইরে কাটিয়ে, তবে ঘরে ঢুকেছিলাম। সুখ-স্মৃতি"- অর্জুন)


মাধ্যমিক খতম। আমি এখন রাজা, আমি এখন ডাইনোসোরআমি এখন পিরানহাযতদিন না রেজাল্ট বেরোচ্ছে, আমি প্রক্সীমা-সেঞ্চুয়ারী; ঝিলিক মারবো, কিন্তু কারুর হাতে আসবো নাপিতা, মেজদা, ছোটোমামার রেডিয়াসের বাইরে এখন আমার অস্তিত্বরেজাল্ট বেরোলে আড়ং-ধোলাই জুটবেইঅতএব তার আগে যতটুকু পারি মৌজ করে নিতে হবেনটায় ঘুম থেকে উঠছি, দেদার ফেলুদা-টিনটিন পড়ছি, দিনে দু ঘন্টা মাছ ধরছি কেল্টোদের পুকুরে, পাড়ার টিমে রাইট ব্যাকের জায়গাটা প্রায় কব্জা করে ফেলেছি, আর দিনে একটা করে সিনেমাএমন মাধ্যমিক বার বার আসুক

তুরীয় জীবন বয়ে যাচ্ছিলো। এক চড়া রোদের দুপুরে মাথায় ছাতা মেলে, কেল্টোদের পুকুরে ছিপ ফেলে বসে অছিফাতনার দিকে চেয়ে গুণ গুণ করে অঞ্জন দত্ত গাইছি আর মুড়ি চিবোচ্ছিচোখে অল্প অল্প ঘুম লেগে আসছে, এমন সময় গদাম শব্দে “পচা” শুনে মনোসংযোগ চটকে গ্যালোফিরে দেখি বাবলা, ক্লাসমেট এবং দোস্ত

-“হোয়াট টাইম ওয়েস্ট পচা, মাছ ধরছিস?”
-“চুপ শালা বাবলা, চিল্লাস না, মাছ ভেগে যাবে”
-“মাছ ভাগে তো ভাগুক, এসব ছেলে খেলা ছাড়, পুরুষ মানুষ হয়েছিস, কিছু কাজের কাজ কর...”
-“আবার চালিয়াতি?”
-“ওরে না রে, একটু ছিপ খানা সরা দেখি, একটা ম্যাজিক দ্যাখাবো!”
এই বলে বাবলা পকেট থেকে বের করে আনলো একটা বোমা, না বোমা নয়...তবে কমও নয় কিছু। একটা আস্ত সিগারেট।
-“বুঝলি পচা, এই হলো নেভি-কাট।কাকার পকেট থেকে সদ্য-হাত সাফাই করা। দেশলাই মেরেছি মার ঠাকুরের আসন থেকে। কবি বলে গ্যাছেন না? ‘থাকবো না আর বদ্ধ ঘরে, দেখবো এবার জগত্‍টাকে’? টাইম টু সি দ্য জগত্‍ বন্ধুপুরুষমানুষ হয়ে যদি সিগারেটই না খেলি তবে আর পুরুষ হয়েছিস কেন?”
-“কিন্তু তাই বলে সিগারেট? যদি...যদি ঘরে জেনে যায়?”
-“উহহ, ইউ আর এ নেকু। এত ভয় নিয়ে দেশ গড়বি পচা? আরে ভয় কী? তোর বয়সে বিবেকানন্দ হাজার হুঁকো ফূঁকে উড়িয়ে দিয়েছিলো, আর তুই এই সিগারেটের এক টানে ভয় পাচ্ছিস? শেম অন ইউ পচা। তুই আমার বন্ধু ভাবতে লজ্জা করছে আমার”
-“তুই খেয়েছিস আগে?”
-“না:, এই প্রথম,  আর প্রথম সুখ-টানের পুন্য আমি তোর সাথে ভাগ করে নেবো না, এমন নেমকহারাম বন্ধু আমি নই হে পচারাম”

কাঁপা হাতে বাবলা সিগারেট ধরালো, অনভ্যাসে প্রায় পুড়ে যাচ্ছিলো, কোনওক্রমে জ্বললো আমাদের তামাক-সাধনা। একটা ফুরুত করে টান মেরে সিগারেটটা আমার দিকে এগিয়ে দিল বাবলা। জয় মা বলে ঠোঁটের ফাঁকে সিগারেটটা চেপে প্রাণ ভরে একটা শ্বাস নিলাম। যে আমেজটা মুখে ঢুকলো,তা বিস্বাদ কিন্তু মন্দ নয়। একটা পোড়া আমেজ ছড়িয়ে গ্যালো মুখে। কিন্তু এরপর ঘটলো গড়বড়। বুকের মধ্যে নেমে গ্যালো এক রাশ ধোয়া। আর শুরু বেদম কাশি। কাশতে কাশতে কেতরে পড়েছি প্রায়, শেষে পুকুরের জল মুখে ছিটিয়ে সোয়াস্তি। কিন্তু ততক্ষণে আমরা ক্ষুদিরাম আর ওই সিগারেট আমাদের স্বাধীনতা। যাবতীয় কাশি সত্বেও নিকেশ করেছিলাম সে সিগারেট দুজনে মিলে। অনভ্যাসী ঠোঁটের ঠ্যালায় ভিজে যাওয়া ফিল্টার যখন পুকুরে নিক্ষিপ্ত হল, ততক্ষণে কেল্টোদের পুকুরঘাটটা চাঁদ আর আমরা এক জোড়া আর্মস্ট্র্ং।

কিন্তু এরপর এল অন্য চিন্তা। মুখের গন্ধ কী হবে? বাড়িতে কেউ টের পেলে স্ট্রেট তক্তা বনে যাবো
“চিন্তা নট বন্ধু”, বাবলার মুখের বুদ্ধের হাসি, “বাবলা সমাদ্দার থাকতে, পচা মুখুজ্যে বিপদে পড়বে, তা কী হয়?” বলেই বাবলা পকেট থেকে একগাদা পিপারমিণ্ট লজেন্স বের করলো। পর পর পাঁচটা লজেন্স খেয়ে একটু নিশ্চন্ত হলাম। বাবলাও আমার পিঠ চাপরে কেটে পড়লো ।

আমি তখনো বাড়ি ফেরার সাহস পেলাম না। এন্তার মশার কামড় হজম করে কেল্টোদের পুকুরের ধারেই বসে রইলাম ঝাড়া তিন ঘন্টা। অন্ধকার হলে তবে ফিরলাম বাড়ি।
মেজদা কৈফিয়ত-মুখী দাদা, জানতে চাইলে দেরি হলো কেনো? বললাম “কেল্টোদের পুকুরে একটা কাতলা খুব খেলুড়ে হয়েছে, তাই...”

মাধ্যমিকের পরেই বাবলার বাবার ট্রান্সফার হয়ে গেছিলো নাগপুরে। যোগাযোগ যথারীতি কমতে কমতে একরকম থেমেই গেছিলো। এই কিছুদিন আগে আচমকা বাবলার সাথে দ্যাখা দিল্লিতে। ব্যাটা এখন একটা বেসরকারী কোম্পানির হয়ে দিল্লী তে বেশ জাঁকিয়ে বসেছে। কিন্তু এখনো একইরকম দিল-দরিয়া আছে, চিত্‍কার করে কথা বলার অভ্যেসটাও যায়নি। আড্ডা জমেছিলো বাবলাদের ফ্ল্যাটেই। বাবলা-বৌদির হাতের রান্না অনবদ্য। একটা বিরাশী-সিক্কার ভুঁড়িভোজ সেরে আমি আর বাবলা ওদের ব্যালকনিতে বসেছি গ্যাঁজাতে। ইতিমধ্যে পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বার করে বাবলার দিকে এগিয়ে দিতেই ভূত দেখবার মত চমকে উঠলো বাবলা।

-“সিগারেট? তুই সিগারেট খাস পচা? সে কী?”
-সে কী মানে, ন্যাকামি করছিস, নে ধরা...”
-“হোয়াট নন-সেন্স, সিগারেট আমি বাপের জন্মে বরদাস্ত করতে পারিনা, নিজে কোনোদিন খাই নি, এমনকী প্যাসিভ স্মোকিংও অপছন্দ। দেশের হচ্ছেটা কী বলতো? এত ক্যান্সারয়ের ওয়ার্নিং সত্বেও লোকে মুর্খের মত সিগারেটকে আঁকড়ে ধরে আছে, আমরা তো আমাদের বাড়িতে অন্য কাউকেই স্মোক করতে দিই না, তাই না সোনা?”, বলে আদুরে চোখে বাবলা-বৌদির দিকে তাকালো বাবলা। স্মিত সম্মতি জানালো বৌদি। আমি সিগারেটের প্যাকেটটা মানে মানে পকেটে চালান করে দিলাম।

ফেরার সময় বাবলাই বললো যে আমার ও ওর গাড়িতে করে আমায় আমার গন্তব্যে ড্রপ করে দেবে। বৌদি কে টাটা বলে আমি আর বাবলা বেড়িয়ে পড়লাম। গাড়ি তে উঠেই বাবলা বলে, “এবার সিগারেটের প্যাকেটটা বার করো দেখি চাঁদু”
-“কেনো রে শালা? এই নাকি তুই স্মোকিং বরদাস্ত করতে পারিস না?”
-“ইয়ে মানে, বউ ব্যাপারটা ঠিক এলাউ করে না। এই গাড়িতে সিগারেট খাওয়ার কথাটাও যেন ফাঁস না হয়। সাধে কী আর আমার মাসে তিনটে গাড়ির-আতরের শিশি লাগে? আর হ্যাঁ, মনে করে কোনও পান-দোকানে দাঁড়াতে হবে, খান কয়েক পিপারমিণ্ট লজেন্স কিনতে, সমঝা?” 
  

Wednesday, March 21, 2012

তেল দ্য সর্ষে



শুনেছি যে দুই মাস বয়েস থেকেই আমার দিদা আমায় সর্ষের তেলে দলাই-মলাই করে রোদে ফেলে রাখতেন ঘন্টার পর ঘন্টা। তখন এমন প্যাকেট সর্ষের তেলের সময় আসেনি। পাড়ার ঘানীতে গিয়ে দাদু নাকি নিজে নিয়ে আসতেন আলট্রা-খাঁটি সে সর্ষের তেল। তার ঝাঁঝ নাকি এয়সা ক্ষতরনাক ছিল যে শিশির ছিপি খুলতেই চোখে জল চলে আসতো। সেই চাবুক সর্ষের তেলে দৈনিক প্রায় চুবিয়ে রোদ পোহানো হতো আমায়।শুনেছি বেদম চিত্‍কার করতাম সেই তেলের জ্বালায়। দাদু ভাবতেন নাতির গলায় সুর আসবে, ক্ল্যাসিকাল গাইয়ে হবে (সেই নাতি অবশেষে তেল বেচছে)। কিন্তু একটানা ওই তেল-রগরানিতেই নাকি আমার সর্দি-কাশির ধাত বিলকুল নেই। সে যাই হোক, ওই তৈল-মর্দন সেশনগুলো থেকেই আমার সর্ষের তেল প্রীতি শুরু।

শীতকালে ছাদে গিয়ে সর্ষের তেল মেখে স্নান তো অমোঘ-উত্‍সব ছিলো একসময়ে। মালকোচা মেরে পরা গামছা, পেতলের ছোট বাটির কানায় কানায় ভর্তি সর্ষের তেল
। সর্বশরীর তেল রগড়ে, আইসিং অন দ্য কেকের মতো আঙ্গুলের ডগায় তেল নিয়ে, আঙ্গুলের মাথা সটান নাকের মধ্যে চালান করে দেওয়া। অত:পর  চুপচুপে শরীরে ছাতময় পায়চারি আর হেঁড়ে গলায় প্রতুল মুখুজ্জে। সে সব ডিসেম্বর আর কে ফিরিয়ে দেবে! তবে শুধু শরীর-যতনে নয়, সর্ষের তেলের মূল কেতা মালুম চলতো রান্নায়ডুবো তেলের বেগুন ভাজাই হোক কী মাছ ভাজা, মুরগির-মাংস-তরকারী; সমস্ত কিছুই সর্ষের তেলেই খোলতাই হয় এমনটাই চিরকালীন বলে জানতাম।



 
বিয়ে করলাম, বউ এলো, এবং বাড়তি যৌতুকের মতো সাথে নিয়ে এলো কোলেস্টেরল কনসেপ্ট। ব্যাস! রান্না থেকে সর্ষের তেল ৮০ শতাংশ উধাওএবং, সুস্বাদু খাদ্য-গ্রহণ গ্যালো গুলিয়েহেঁসেল হয়ে উঠলো হাসপাতালের ক্যাণ্টীনরিফাইনড অয়েল ঢুকে বাঙালির জ্বীহা-রসের কাছা দিলো খুলে

এবং, জীবনে এলো আরও বড় ঝড়! বডি অয়েল! পুরুষ-দেহ মর্দনের জন্যে সর্ষের তেল ছাড়া যে অন্য কোনও ব্যাপার হতে পারে তা তো ভাবতেই পারতাম না? তাছাড়া আরও মুস্কিল, আধুনিক বাক্স-ফ্ল্যাটে ছাত কই? চুপচুপ সর্ষের তেল মেখে রোদ পোহাবো কোথায়? ব্যালকনিতে আধমরা রোদ আসে বছরে সাড়ে-সাত দিন, সঙ্গে ধুলো-পোড়া কার্বন।

অতএব?

এখন সকালে উঠে ট্যাঙ্কের জমানো ঠান্ডা জল; গীজারে গরম করে, দু মগ জলে দেহ ভিজিয়ে,  বউএর ড্রেসিং টেবিল হাতড়ে ময়শ্চারাইজিং ক্রীম দু ফোঁটা নিয়ে বুক পিঠ রগড়ে নেওয়া। এরপর দু ফোঁটা সাদা তেল মাখানো ব্রয়লার স্টু-ভাত গিলে অফিস মুখ হওয়া
সর্ষের তেল বিনে জীবন এখন বাঁসি পাউরুটি।ঝাঁঝ চলে গ্যাছে, বাঙালিয়ানা এখন আলট্রা-রিফাইনড আলুনি। ধুত্তর!



পাঁচ সেকেন্ডের কোলকাতা

রাত দেড়টায় শেষ ট্রাম চলে যায় হ্যারিসন রোডের ওপর দিয়ে ঘর-ঘর করে। লাগোয়া গলির এই দোতলায় ছোট্ট ঘরটা প্রায় কেঁপে ওঠে শব্দে। বহু জীর্ণ মেস বাড়িটার তস্য-জীর্ণ কাঠের জানলা গুলো মুচরে ওঠে কচর কচর করে। ট্রামটা যেতেই পাশের বাড়ির মেনিটা ম্যাও করে উঠবেই। নীচে মূল-দরজার নিচে ঠ্যালা লাগিয়ে শুয়ে থাকে রামলোচনট্রাম যেতেই লহমার জন্যে তার ঘুম ভাঙ্গে, সে “সিয়ারাম” বলে পাড়াময় এক দ্বীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। চিলেকোঠার পায়রা গুলো খলবল করে ওঠে কয়েক মুহুর্তের জন্যে। চৌকিতে অল্প কাঁপুনি বুঝতে পারি
, ট্রামের গুঞ্জনের তালে, সঙ্গে পাশে দাঁড়ানো টেবিলের নড়বড়ে পায়ার কনকন।  

এই কয়েক মুহুর্তের শব্দ-মেশালিতে আমার কলকাতা-যোগ। এই শব্দগুলো কে ঘিরেই আমার কলকাতাকে ভালোবাসা, স্নেহজেগে থাক কলকাতার আর অন্য কোনও ডাক আজও চিনতে পারি না। বুঝতেও পারি না। দৃশ্যতও আমি কোনও কলকাতা চিনি না।

তবে, আমি কবিতা বুঝি না, পড়িও না। শুধু ওই ট্রামের ডাকে আমি নিয়মিত ভূতের ভয় পাই। জীবনানন্দ কে আমি ভূত বলে চিনি।   

Tuesday, March 20, 2012

বটেই তো

বস: ভারী গুমোট!
আমি: বটেই তো!
বস: ফেব্রুয়ারী তেই এই?
আমি: বটেই তো।
বস: ভাব তাহলে মার্চে কী হবে?
আমি: আগুন জ্বলবে।
বস: না না অত গরম পড়বে না চট করে।
আমি:সেটাও অবিশ্যি ঠিক। অত চট করে অত গরম পড়বে না
বস:তবে বলা তো যায় না..
আমি: ঠিক, বলা তো যায় না..
বস: ভাবছি আরও একটা এসি কিনবো এবার।
আমি: তবে আমিও একটা কুলার কিনবো ভাবছি।
বস:কেন ভাবছো?
আমি: সত্যি তো, কেন ভাবছি..
বস: ভেবো না বেশি
আমি: বটেই তো
বস: আজ কী বার যেনো?
আমি: বিষ্যুদ
বস: শনি হলে জমে যেত
আমি: ক্ষীর হয়ে যেত
বস: কেনো? ক্ষীর কেনো বলছো?
আমি: জমে যেত বললেন যে?
বস: আইস-ক্রিম কী জমে না?
আমি: বটেই তো, আইস-ক্রিম।
বস: ওই তোমার এক দোষ, খালি মুখে মুখে তক্ক
আমি: বটেই তো
বস: শুধরে ফেলো, চটপট
আমি:আলবাত, immediately!
বস: আজ কী তারিখ যেনো?
আমি: উনিশে মার্চ
বস: হুম, দ্যাখো, মার্চ শেষ হতে চললো, অথচ এখনো সন্ধ্যের হাওয়ায় বেশ ঠান্ডা আমেজ আছে..
আমি: বটেই তো


ইত্যাদি, ইত্যাদি 

Monday, March 19, 2012

লুইস ক্যারোলের নন-সেন্স

অফিসের ERP গুবলেট হয়ে যাওয়ায় জমাট এক ঘন্টা গুলতানির সুযোগ ছিল। সেই সুযোগে লুইস ক্যারোলের দুটি নন-সেন্স রাইমের এক জঘন্য অনুবাদের চেষ্টা।অবশ্যই ব্যাপারটি দাঁড়ায়নি; কী ছন্দে, কী নন-সেন্সামিতে। তবু ব্লগে টুকে রেখে দিলাম। 
ছড়া দুটি হলো How Doth The Little Crocodile এবং The Mad Gardener's Song। আসল লেখা দুটি লিংক করে দিলাম। 


পাগলা মালির গান 

ভাবলুম বুঝি ওই নেচে চলে হাতি;
বাঁশির তালেতে তার দেহে লাগে দোল।
ভাল করে চেয়ে দেখি কেলো ঘোর অতি-
বউয়ের চিঠি ওটা, বলো হরি বোল !
বহু ভেবে অবশেষে, বুঝলুম শেষে-
এ জীবন নিম পাতা-করোলার ঝোল

ভাবলুম বুঝি ওই মোষ ভাগে জোশে
ছাদের ওপরে বসে চাটে আলপিন
ভালো করে চেয়ে দেখি কাকিমার পিশে
আলসেতে গুলতানী মারে সারাদিন
আমি কই “ওলো সই,পালাও তুরন্ত
নতুবা ঘানিটি টানা, বিফলে জামিন”

ভাবলুম বুঝি ওই লাউ-ডগা সাপ
তামিল ভাষায় তারে করিনু সওয়াল
ভাল করে চেয়ে দেখে ধরে গ্যালো হাঁপ
কই সাপ?  এ তো দেখি বুধবার কাল
আমি কিছু কইবো না,ভোটিবো না কিছু
রা-খানি কাটলেই আমি নিখুঁত বাচাল

ভাবলুম চিরুনি খোঁজ, খোঁজ কেরানী
বাস থেকে নেমে আসা ঘাম-ঘামা জামা
ভালো করে চেয়ে দেখি এ বা কী কাহানী
জলহস্তী-ভারী মস্তি, দিয়ে চলে হামা?
এই ব্যাটা যদি খায় ডাল-শাক-দোরমা
খালি পেটে রয়ে যাবে আমি,ছেলে তার মা

ভাবলুম উড়ে চলে ক্যাঙ্গারূরা সবে
কফি-হাতে বাবু সাজে  চন্ডি-উড়ন
ভাল করে চেয়ে দেখি বেওকুফি হবে
ইসবগুলের হাতে জীবন মরণ
যদি গিলি এই ফল অতি-ইসবে
মিসিং স্কোয়াড ও তার ভবানী-ভবন

ভাবলুম বুঝি বাঁধা আরাম-কেদারা
খাট ঘেঁসে ঘুম মারে আদরে
ভালো করে চেয়ে দেখি স্কন্ধ-কাটারা
মাথা ব্যথা বলে কাঁদে গুমোরে
তাই বলি খেতো যদি রদ্দাটি চড়া
ব্যথা-ট্যাথা টেসে যেতো পূর্ণ-বেঘোরে

ভাবলাম ওই বুঝি ব্যাটা পানকৌড়ি
ল্যাম্প-পোস্ট থেকে ঝোলে চপলে
ভালো করে চেয়ে দেখি স্ট্যাম্পের টুকি
খাম চেপে ঘুরে আসে ভূগোলে
বললুম ওরে ব্যাটা লাল ঘরে ডুবি
চুপচাপ ভিজে থাক রাত্তির ভুলে


ভাবলুম ওই বুঝি বাগীচার দোর
ভাঙ্গা তালা চাবি খোয়া স্পষ্ট
ভালো করে চেয়ে দেখি ধুত্তোর
দোহারা-তেহারা সে কী কষ্ট
অবশেষে জল-ভাত রহস্য ঘোর
ভেবে তবু সারাদিন ঘুম দুটো নষ্ট

ভাবলুম ওই বুঝি কথা-কাটা যুদ্ধ
ওই বুঝি কেষ্টটি, ঠাকুরের রাম
ভালো করে চেয়ে দেখি যা:চ্চলে
বুদ্বুদ খোসা বেছে খাচ্ছে বাদাম!
দ্বীর্ঘশ্বাস নামে ফুসফুস ছুয়ে
মরা আশা,আশা মোর চাষারে হারাম 


কচি কুমীর কেমনে

কচি কুমিরের বুকে তুলো-তুলো সাধ
চমকাবে ল্যাজখানি ঝকমক
নীল-নদ চষে জল ঢেলেছে অবাধ
প্রতিটি আঁশেতে সোনা চকমক

মুচকি হাসিতে তার গাল খানি ভরা
পরিপাটি মেলে ধরা স্নেহ-মাখা নখ
আলগোছে ডাকে “কই কচি মাছ তোরা?-
প্রেম-ময় দাঁত-ফাঁকে মিটিয়ে যা শখ!”