Thursday, January 2, 2014

যত্তসব

-   জমিদার মশাই...

-   তুমি বড় কথা বল নায়েব

-   আজ্ঞে গোস্তাখি মাফ কত্তা

-   ফের কথা বললে ?

-   ক্ষমা-ঘেন্না করেন কত্তা।

-   ফের কথা বলে! তুমি শালা শুয়োরের বাচ্চা একটা। তা চুপ করে সং সেজে দাঁড়িয়ে আছ কেন ? বল, অমন নেচে নেচে এলে কি বলতে ? উফ, দু দণ্ড দেশের কল্যাণের কথা ভাববো তার উপায় নেই।

-   আজ্ঞে বলবো জমিদারমশাই ?

-   কি মাকাল রে বাপ, এই তোমায় আমি পয়সা দিয়ে পুষি ? বলবে না তো কি নেত্য করবে ? তুরন্ত বল নয়তো লাটসাহেব কে বলে তোমায় জেলে দেব।

-   আজ্ঞে কত্তা, একটা ছেলে এসেছিল।

-   ব্যাস, অমনি তোমায় আমি রাজচক্কোত্তি উপাধি দিয়ে দিই আর কি।

-   না মানে...

-   ছেলেটা কে ? কি চায় ?

-   আজ্ঞে হরেন। আপনার প্রজা। বিশু কুমোরের ছেলে।

-   বিশু ? যে হারামজাদা গত বছর অক্কা পেলে ?

-   যে আজ্ঞে।

-   তার সাহস কি করে হয় সে জমিদারের কাজের সময় এসে ব্যাঘাত ঘটায় ? এ যে রাজকর্মে বাঁধা; কত দেশসেবার কথা ভাবছিলাম। এই বেশ্যার পো এসে দিলে সব ভেস্তে...

-   আজ্ঞে বিশেষ অভিযোগ নিয়ে এসেছে...

-   এই এদের রোগ। অভিযোগ। টাকা নেই, খাওয়ার নেই, পাছায় ফোঁড়ার ওষুধ নেই। হারামজাদাগুলোর পাল্লায় পড়ে আর দশের উপকার করা হয়ে ওঠেনা। এই সেদিন ভাবলাম পুকুরপাড় বাঁধিয়ে সেখানে দোলনা বসাবো, তা না! গাধাগুলো বলে কি না ‘ জমিদার মশায়, ক্ষেতে জল নাই, খাল খুঁড়ে দেন”। আহাম্মকের দল। যে ভাবে কোম্পানিকে ট্যাক্সো দিতে হচ্ছে, অমন সখের কাজ করলে আমার চলে ? তার ওপর আবার আমার ছোট মেয়ে বায়না ধরেছে চড়কে মেলা বসাতে হবে – সেও মেলা খরচার ব্যাপার। তা এ ছেলে চায় কি ?

-   আজ্ঞে, ভারি নিদারুণ অভিযোগ।

-   কে বলেছে নিদারুণ ?
-   আজ্ঞে না মানে...আমি বললাম মানে...

-   চোপড়াও, আমি তোমায় বলতে বলেছি দারুণ না নিদারুণ ?

-   গোস্তাখি মাফ হুজুর।

-   ছেলেটা চায় কি ?

-   বিচার!

-   বিচার চায় মানে ? আমি কি অবিচার করেছি যে বিচার চাইবে ? ওর এত সাহস হয় কি করে ?

-   আজ্ঞে, গতকাল ওর দিদিকে নাকি জমিদার বাড়ির দুই লেঠেল মিলে ধর্ষণ করে। ধর্ষণ করে তারা নাকি সে মেয়েকে খুন করেছে...

-   কি বলে সে বেশ্যার ছেলে ? আমার লেঠেল তার দিদিকে ধর্ষণ করেছে ? খুন করেছে ? আমার লেঠেলের নামে বলেছে মানে তো আমার নামেই খিস্তি করেছে। শালাদের জন্যে এত করি আর শালা আমাকেই হুড়কো দেবে ?

-   আজ্ঞে না হুজুর, আপনার কাছে তো সে বিচার চাইতে এসেছে।

-   কিসের বিচার হে ? ওসব ছোটলোকের মেয়ের ছোটলোকামির মধ্যে আমায় জড়ানো ? হারামজাদা! জমিদার কে নিচু করবে ? আমার লেঠেলে তার দিদিকে মেরেছে ? মিথ্যে কথা। বল নায়েব, ছেলেটা মিথ্যুক কি না ?

-   আজ্ঞে একবার যদি ওর কথাটা...

-   তুমি কি শালা বিদ্রোহ করছো নায়েবের বাচ্চা ? তোমার পেটে পেটে এই ? দুধ কলা দিয়ে কালসাপ পুষছি আমি ?

-   আজ্ঞে মাফ করুন কত্তা। ছোট মুখে বড় কথা বলে ফেলেছি।

-    তোমার এ মাসের মাইনে থেকে দেড় টাকা কাটা গেল। অকাজের লোক আমি সহ্য করতে পারিনা।

-   আপনার শাস্তি শিরোধার্য কত্তা।

-   শোন, এসব অভিযোগ জমিদারের কাছে আসা ভালো নয়। এসব জমিদারের নামে কলঙ্ক লেপার চেষ্টা। হারামজাদা প্রজাগুলোর অভ্যাসই এমন, যে পাতে খাবে সে পাতেই হাগবে। কোনও কিছুতে এরা খুশি নয়, খেতে দিলে বলবে, বিছানা দাও। বিছানা দিলে বলবে মেয়েদের সম্মান বাঁচাও। এদের হাজার বায়নাক্কা। আবার এই মুখ্যুগুলোর পিঠে দু ঘা চাবুক পড়লেই বাপধনরা বাপ বাপ বলে বলে স্বীকার করে নেবে যে আমার জমিদারীতে তারা কত সুখে আছে। কি নায়েব, তাই না ?

-   আজ্ঞে জমিদার মশাইয়ের জমিদারী যে রামরাজ্য। লোকে যে আপনাকে ধন্য ধন্য করে।

-   লাটসাহেব আমায় রায় চৌধুরী উপাধি দিলেন বলে। আরে বাবা রাজ্য পরিচালনা কি চাট্টিখানি কথা।

-   ঠিক বলেছেন কত্তা মশায়।

-   আর এই ছেলে বলে কি না আমার পেয়াদায় তার দিদিকে...ছিঃছিঃছিঃ। নোংরা মায়ের পো কোথাকার। জমিদারের নামে খেউর না করতে পারলে এদের পেটের ভাত হজম হয় না।

-   আজ্ঞে যথার্থ বলেছেন। তা ছেলেটাকে বিদেয় করি তবে ?

-   শোনো নায়েব। ছেলেটাকে দু টাকা দিয়ে বল ফুর্তি করতে। আর সেই টাকা লেঠেলদের মাইনে থেকে কেটে নাও। দু টাকাতেও যদি হারামজাদার দিদির শোক না ঘোচে, তো ওকে জমিদারবাড়িতে চুরি করতে ঢোকার অভিযোগে লাঠি পেটা কর।

-   আজ্ঞে ?

-   হাঁ করে দাঁড়িয়ে মুখ দেখছো কি ? যা বললাম তাড়াতাড়ি কর। আমায় একটু শান্তিতে দেশের উপকারের কথা ভাবতে দাও দেখি। দেশের অভাগাগুলোর চিন্তায় আমার রাতের ঘুম গোল্লায় গেছে আর এরা এলেন এদের যত খুচরো পাপ নিয়ে। যত্তসব! 

Monday, December 30, 2013

একটি চুরির ঘটনা



অনিন্দ্য নিজেকে গোয়েন্দা বলতে বেশ লজ্জাই পায়। মাসে যে কটা কেস তার কাছে আসে, তা প্রায় সবই বিয়ের আগে পাত্র-পাত্রী সম্বন্ধে গোপনে খোঁজখবর নেওয়ার জন্যে – পাত্রর মাইনে-কড়ি ঠিক কত, পাত্রীর কোনও গোপন প্রেম রয়েছে কি না ইত্যাদি। তার তোপসে নেই, আছে শুধু তার ঘরের ও অফিসের কাজের লোক কমল। তার কাছে যে এমন কেস কিভাবে এলো। ভাবতে ভালো যতটা না লাগছে, তার চেয়ে বেশি লাগছে ভয়। দশ বছর হল এ লাইনে কাজ করছে অনিন্দ্য। তার এই সুপার শার্প ডিটেকটিভ এজেন্সি পাত্রপাত্রী খবরাখবর জোগাড়ে বেশ নাম করেছে শহরে। কিন্তু তাই বলে এমন জটিল কেস ? ডাইরেক্ট মূল্যবান সম্পদ চুরি ? এমন মক্কেল তার অফিসে আসলে কি চায়ের সঙ্গে সামান্য টা’য়ের ব্যবস্থা রাখা উচিৎ ? কমলের সঙ্গে কনসাল্ট করতে হবে।

দীপক মিত্র’র চেহারা দেখে বয়স চল্লিশের বেশি মনে হয় না। চেহারা ভারি ডাক-সাইটে, হীরের ব্যবসায়ীর চেহারা এমনটাই হওয়া উচিৎ। গলার স্বর ঠিক বাজখাঁই নয়, তবে দম আছে। অনিন্দ্যর বেশ নার্ভাস লাগছিল। কিন্তু দীপকবাবু যখন জানালেন যে চুরি হচ্ছে ‘কলকাতার শীত’, তখন অনিন্দ্যর মালুম হল যে ভদ্রলোকের মাথায় ছিট রয়েছে। মানে মানে বিদেয় করতে হবে, এই ভেবে কমলকে সে ইশারা করলে যে চায়ের সাথে ফুলুরি ভাজার দরকার নেই।
   

অনিন্দ্য – চুরি যে হয়েছে, সেইটা আপনি কি করে বুঝলেন ?
দীপক – নিজের চোখে লোপাট হতে দেখছি তো।
অনিন্দ্য – আমি যদি আপনাকে পাগল বা বেয়াদব ভাবি তাহলে কি খুব অন্যায় হবে?
দীপক – না। লাল-বাজার বা অন্যান্য জায়গাতেও তাই বলেছে। তাই বাধ্য হয়ে আপনার কাছে এসেছি। আই উইল অফার ইউ টেন থাউজ্যান্ড যদি আপনি কেসটা নেন। যদি চোরকে কে বামাল ধরতে পারেন, আই উইল গিভ ইউ আ ল্যাক।
অনিন্দ্য – দশ হাজার টাকার আমার খুব দরকার। কেস নেব।
দীপক – এই খামে দশটা হাজার টাকার নোট আছে।
অনিন্দ্য – গুনে নিলাম বলে কিছু মনে করবেন না। হয়ত আপনার মাথার ছিটের সুযোগ নেওয়াটা অন্যায় হচ্ছে...
দীপক – ইট ইজ ওকে। বালিগঞ্জ প্লেসে, রাস্তার ধার ঘেঁষা একটা ঘুমটি চায়ের দোকানে ওরা এসে প্ল্যান করে রোজ। ওই দোকানটাই ওদের কন্ট্রোল রুম। কলকাতার শীত-চুরির ব্লু-প্রিন্ট ওখানেই তৈরি হয়েছে।
অনিন্দ্য – এইটে মনে হওয়ার কারণ ?
দীপক - আমার কানে এসেছে। হরিপদ আর কালু; ওদের প্ল্যান আমি শুনে নিয়েছি। লেরো খেতে গেছিলাম। আমার কান ভারি শার্প।
অনিন্দ্য – হরিপদ কে ? কালু কে ? ওরা কলকাতার শীতকে চুরি করতে চাইবে কেন ? আর ইয়ে, মানে আমি বুঝতে পারছি না আপনি এমন দড়কচা লেভেলের গুল কেন মারছেন ?
দীপক – আপনি টেন থাউজ্যান্ড রিফিউজ করছেন ?
অনিন্দ্য – না! সে ক্ষমতা আমার নেই।
দীপক – হরিপদ’র বয়স ষাটের বেশি। ওই চায়ের দোকানের মালিক। ওর ছেলে কালু। এই চিরকুটে ওদের দোকানের এগজ্যাক্ট ঠিকানা আছে। আপনি আমায় কবে রিপোর্ট করছেন ?
অনিন্দ্য – ঠিক দু দিন পরে।
হরিপদ আর কালুর জীবন-পঞ্জি বার করে পাগলটার হাতে তুলে দিলেই ল্যাঠা চুকে যায়। কেস জলবৎ অনিন্দ্যর কাছে।

গড়বড়। অনিন্দ্য বেনামি হুমকি চিঠি পেয়েছে যাতে সে এই কেস না নেয়। কেউ তার বসবার ঘরে চিঠিটা মুড়ে ছুঁড়ে ফেলেছিল। কিন্তু বড় কথা হচ্ছে, দীপকবাবু আচমকা নিখোঁজ। বাড়ির লোক ক্লু-লেস। পকেটে গরম দশ হাজার সত্ত্বেও অনিন্দ্য বেশ ফাঁপরে পরে গেল।

এই তিনদিনে হরিপদ’র যথেষ্ট খবর অনিন্দ্য জোগাড় করেছে। বা জোগাড় করার চেষ্টা করেছে। এবং তার মাথা ঘোরার যথেষ্ট কারণ আছে। কারণ অনিন্দ্য সান্যাল, যে কিনা বারুইপুরের পাত্রের সাত পুরুষের খবর মাত্র দেড় দিনে জোগাড় করে ফেলে, সে হরিপদ’র বাড়ির ঠিকানা মালুম করতে পারলে না। এই তিনদিনে রোজই হরিপদ দোকান বন্ধ করবার পর তার পিছু নিয়েছে অনিন্দ্য। কিন্তু কোথায় কখন যে হরিপদ মিলিয়ে যায়।

৬  
হরিপদ – আপনাকে কিডন্যাপ করতে ভীষণ খারাপ লেগেছে। 
অনিন্দ্য – কিন্তু করলেন কেন ?
হরিপদ – কারণ শহরের শীত চুরি হওয়ার মত এমন একটা ফালতু খবরের পিছনে আপনি দৌড় শুরু করেছিলেন।
অনিন্দ্য – দীপকবাবুকে...
হরিপদ – ইয়েস স্যার, আমিই কিডন্যাপ করেছি।
অনিন্দ্য- এমন পাগলামিকে কেন্দ্র করে আপনি দুজনকে কিডন্যাপ করলেন। এটা পাগলামি নয় ?
হরিপদ – শুধু কিডিন্যাপটাই দেখলেন ? আজ যে আপনাদের দুজনকেই খুন করব, সেটার ব্যাপারে কিছু বলবেন না?
অনিন্দ্য – আপনি উন্মাদ হরিপদবাবু।
হরিপদ – আমি উন্মাদ নেই। আর আপনার সন্দেহ ঠিক অনিন্দ্যবাবু। আমি হরিপদও নই। আমার নাম আপনি উচ্চারণও করতে পারবেন না। তবে আমায় ভালোবেসে প্রি-সু বলতে পারেন। আমি অবভিয়াসলি দেখতেও এমন নই। ছদ্মবেশ। গত ত্রিশ বছরের ধরে চা ওয়ালা হয়ে আপনাদের শহরে ঘুরঘুর করছি। আর প্রতি বছর নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি, আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রি-স্রে বা আপনাদের পরিচিত কালুর সাথে মিলে, আপনাদের কলকাতার শীতের আমেজ চুরি করি। চুরি করে সেই আমেজ কে ডিজিটাল এলগোরিদমে কনভার্ট করে আমাদের গ্রহ পেঞ্চুয়ারিতে পাঠিয়ে দিচ্ছি।
অনিন্দ্য – সাইবেরিয়া থাকতে আপনি কোলকাতা এলেন শীত চুরি করতে ?
হরিপদ – দেখুন অনিন্দ্যবাবু। আবহাওয়া ও আবহাওয়ার আমেজ চুরি এবং সেই চুরি করা আবহাওয়ায় নিজেদের গ্রহ সাজিয়ে তুলতে আমরা শিখি আজ থেকে শ খানেক বছর আগে । ইয়েস, আমাদের গ্রহের পরিবেশ আর প্ল্যানেটারি মোশনের কেনা গোলাম নয়। তারপর আমরা দু শো বাহাত্তরটা এমন গ্রহ জুড়ে জরীপ করেছি যাঁদের পরিবেশ মনোরম। এই সব গ্রহের পনের লক্ষ অঞ্চল আমরা ঘুরে বেরিয়েছি আদর্শ আবহাওয়ার খোঁজে। কিন্তু গড় বারো ডিগ্রী তাপমানের এমন মধুর মেজাজ, এমন নলেন গুড়, এমন ময়দানের শীতের বিকেলের মধু, এমন মাঙ্কি টুপির আদুরে-পনা, এমন লেপের মিঠে ওম, এমন ফুলকপির শিঙ্গাড়ার আবেশ; আমরা আর কোথাও পাইনি অনিন্দ্যবাবু। পেঞ্চুয়ারি ভীষণ ছোট গ্রহ। কোলকাতা থেকে শীত চুরি করেই আমাদের সম্পূর্ণ গ্রহের পরিবেশ গোটা বছরের জন্যে মনোরম করে রাখা যায়।
অনিন্দ্য – আমার কিস্যু বিশ্বাস হচ্ছে না...আপনি...আপনি...
হরিপদ – অত নার্ভাস হবেন না অনিন্দ্যবাবু। খুন করার কথাটা আমি ঠাট্টা করে বলেছি। আমাদের সামান্য অসতর্কতায় এই যে দীপকবাবু আর আপনি আমাদের প্ল্যান-প্রোগ্রামের ব্যাপারে সন্দিহান হয়েছেন, তাতে আমাদের ভারি অসুবিধে। আমরা শুধু আপনাদের দুজনের ব্রেন থেকে এই কদিনের স্মৃতি একদম মুছে ফেলবো। সেই টেকনোলজি আমাদের আছে। সামান্য তো শীত-চুরি, তাই নিয়ে এত মাথা ব্যথার কারণটাই বা কি অনিন্দ্যবাবু ?
       
   
আচমকা এই দশটা হাজার টাকার নোট সমেত এই খামটা তার দেরাজে কি করে এলো, তা কিছুতেই মনে করতে পারছিল না অনিন্দ্য। এদিকে কমলকে জিজ্ঞেস করাও সমীচীন মনে হচ্ছে না।তাই বলে দশটি হাজার টাকা আচমকা তার দেরাজে, দুশ্চিন্তায় পড়তে হল অনিন্দ্যকে। 

Friday, December 20, 2013

স্যান্টার সারপ্রাইজ



মন বিলকুল  ভালো নেই। ডিসেম্বর এসে গেল তবু ধোপার ব্যাটা পশমের ওভার কোট আর প্যান্টালুন ফেরত দিলে না। লাগসই টুপিখানা সেই যে গত ফেব্রুয়ারি থেকে হাওয়া, এখনও খুঁজে পাওয়া গেল না । নতুন এক খানা টুপি জোগাড় করে নেওয়া যায় বটে, তবে পুরনোটার মায়া ত্যাগ করা কি অতই মামুলি ? ওদিকে স্লেজ খানার মধ্যে রাজ্যের উচ্চিংড়ের বাস। সাফ করতে জান কয়লা হয়ে যাবে। রেইন-ডিয়ার গুলো রাম আলসে হয়ে উঠছে, দিনরাত শুধু গাণ্ডেপিণ্ডে গিলবে আর মেদ বাগাবে। কিন্তু সবচেয়ে বড় বিপদ অন্য জায়গায়। গিন্নী বেজায় জেদ ধরেছেন ডায়েট করে রোগা হতে হবে। এমন তাবড় ভুঁড়ি নিয়ে ঘুরে বেরালে নাকি গিন্নীর ইজ্জত ফ্র্যাকচার হয়ে যায়। গত দু মাস যাবত খাওয়া-দাওয়ায় জোর করে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। ব্যাটাচ্ছেলে ভুঁড়িও গিন্নীর সাথে তাল মিলিয়ে ইঞ্চি চারেক কমে গেছে ইতিমধ্যেই ।  লাও ঠ্যালা। রস ছাড়া যেমন রসগোল্লা হয় না, তেমনি ভুঁড়ি ছাড়া কি স্যন্টা ক্লজ্‌ হয় ? চিমসে চেহারার কাউকে দুনিয়ার কোন বাচ্চা কি স্যান্টা ক্লজ্‌ বলে কদর করবে ?

এই সব সাত পাঁচ ভেবে ভেবে স্যান্টার রাতের ঘুম হাওয়া। গতবারে ইকুয়েডোরের এক খুকির উপহার শ্যামনগরের এক মিচকে খোকার উপহারের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলার পর থেকেই মনটা খচ্‌খচ্‌ করছিল। ঠিক গড়বড় হল এইবার। আর হপ্তা খানেকের মধ্যে উপহারের ঝোলা নিয়ে বেরিয়ে পরার কথা, অথচ এদিকে না আছে ধড়াচুড়ো, না বাহন তৈয়ার। অন্য দিকে ভুঁড়ি বাবাজি বেজায় চুপসে রয়েছে। কোটপ্যান্ট পড়ে ফিটফাট বাবুটি সেজে যদি ট্রামে, বাসে করে মর্তলোকে ঘুরতে হয়ে তবে ইজ্জতের কোপ্তা হতে বাধ্য।

বিছানায় শুয়ে এমন সব বিদঘুটে সব চিন্তা করতে করতে সবে স্যান্টার চোখে একটু তন্দ্রা এসেছে- এমন সময় এক মিষ্টি কণ্ঠস্বরে স্যান্টার তন্দ্রা ভাঙল:
-   “ স্যান্টা, ও স্যান্টা, ঘুমিয়ে পড়লে ?”
স্যান্টা দেখলেন বছর ছয়েকের একটি ফুটফুটে মেয়ে। মিষ্টি সাদা ফ্রক পোশাকে। তার শিয়রে দাঁড়িয়ে। সম্ভবত জাপানী।
-   “ তুমি কে মামনি?” , স্যান্টা ব্যস্ত হয়ে পড়লে, “ এখানে এলে কি করে ?”
-   “ বাঃ রে, তুমি যখন আমার বাড়িতে আচমকা মাঝরাতে বাবা মা কে না জানিয়ে আমার কাছে এসেছিলে উপহার নিয়ে, আমি বুঝি তোমায় জিজ্ঞেস করেছিলাম যে তুমি কি ভাবে এলে ?”
-   “ লে হালুয়া”, স্যান্টা অবাক, “ তাই তো, তোমার নাম কি মা ?”
-   “ কিম, মনে পড়ে?”
-   “ মনে ? ইয়ে মানে, পড়ে বই কি”
-   “ কচু মনে পড়ে। ছোটরা ভগবানের মত হয় না? তাঁদের মিথ্যে বলতে নেই”
-   “ সরি মামনি। বয়স হচ্ছে তো। ভুলে যাই মাঝে মাঝে”
-   “ ওটা নদী থেকে অল্প দূরে আমাদের বাড়ি ছিল। লাল রঙের। মনে পড়ে ? “
-   “ ওটা নদী ? হি...হি...হিরোশিমায় ? লাল বাড়ি? উঠোনে সাদা রঙের দোলনা ? বাড়ির সামনে ছোট্ট একটু বাগান ? উফ, তুমিই সেই কিম যে বায়না করেছিলে যে সাইকেল না পেলে তুমি নতুন বছরে কোত্থাও না বেরিয়ে বাড়িতে গুম হয়ে বস থাকবে ? হেঃ হেঃ, তোমার বাবার মাথায় সাইকেল কিনে দেওয়ার বুদ্ধিটা আমি কেমন চমৎকার ভাবে ঢুকিয়ে দিয়েছিলাম বল। দারুণ সারপ্রাইজ ছিল না কিম ?”
-   “ বাহ, এই তো তোমার সমস্ত মনে আছে”
-   “ মাত্তর সত্তর বছর আগেকার কথা, স্যান্টার কি ভুলতে আছে?”
-   “ থ্যাঙ্ক ইউ স্যান্টা, তার পরের বছর আর আমাদের হিরোশিমায় এলে না কেন স্যান্টা ?”
-   “ পরের বছর, মানে পরের বছর ঠিক, পরের বছর...”
-   “ পরের বছর কি স্যান্টা ?”
-   “ পরের বছর ক্রিসমাসে তো তুমি ছিলেনা খুকি”
-   “জানি, অগস্টে বোমা পড়েছিল। আমাদের বাড়ির বেশ কাছেই। আমরা অবশ্য টের পাওয়ার আগেই ঝলসে গেছিলাম। কষ্ট পাওয়ার আগেই আমি বাবা, মা ও আমার ছোট্ট ভাই ছাই হয়ে গেছিলাম জান? আর শুধু কি আমরা, সত্তর হাজার মানুষ সেই রাত্রেই... ও কি, তুমি কাঁদছ?”
-   “তুমি সে বছর আমার কাছে একটা কলের পুতুলের জন্যে বায়না করেছিলে কিম। কিন্তু যে মানুষের কাছে বন্দুক-বোমা থাকে; তাঁরা যে আমার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী কিম। আমি পেরে উঠিনি ওদের সাথে। তোমার জন্যে কলের পুতুল আমি আনতে পারিনি মামনি। পারিনি”
-   “তুমি কি করবে বল স্যান্টা ? তুমি তো আমাদের কথা শুনতেই। কিন্তু তার আগেই তো...কিন্তু স্যান্টা একটা কথা বল, আরও যারা রয়ে গেছিল, তাঁদের জন্যে অন্তত তুমি সে বছর হিরোশিমাতে গেলে না কেন ?”
-   “ সাহসে কুলোয় নি। অত রক্ত, অত যন্ত্রণা। কার জন্যে উপহার নিয়ে যাব মামনি ? কেউ তো স্যান্টার কাছে আবদার করার মত অবস্থাতেই ছিলনা”
-   “ কেউ কিছু না চাইলে বুঝি যেতে নেই ? আচ্ছা স্যান্টা , যারা আমাদের বাড়ির ওপর বোমা ফেলেছিল, সে বছর তুমি তাঁদের বাড়িতে গেছিলে ?”

স্যান্টা’র দম বন্ধ আসছে মনে হচ্ছে। কিম তাঁকে আদর করে জড়িয়ে ধরছে কিন্তু স্যান্টা শান্ত থাকতে পারলেন না। হু হু করে কেঁদে উঠলেন। সে কি হাউ হাউ বুক ফাটা কান্না। সম্বিত ফিরল গিন্নীর ঝাঁকুনি তে।
_ “ অমন ফেউ ফেউ করে কান্না কেন মিনসে ?”
স্যান্টা ধড়ফড় করে উঠে বসে দেখলেন মাঝরাত। কিম কি তবে স্বপ্নে এলে ? সত্যি নয় কি ? আচমকা স্যান্টা অবাক হয়ে দেখলেন তার নাদুস নুদুস ভুঁড়িটি আবার ফুলে ফেঁপে আগের মত হয়ে গেছে। স্যান্টা বুঝলেন যে কিম সোনা তাঁকে তার ভুঁড়িটি উপহার দিয়ে গেছে। মনে প্রাণে চাইলে সবার জন্যেই স্যান্টার উপহার অজান্তেই এসে হাজির হয়। বাপেরও যেমন বাপ আছে, স্যান্টারও স্যান্টা রয়েছে।
“ মেরি ক্রিসমাস”, হাঁক ঝালাতে ঝালাতে সেই মাঝরাত্তিরেই স্যান্টা ছুটলেন স্লেজ সাফ করতে।