Friday, March 15, 2013

হুজুগ-দেবী ও বাহানা-সম্রাট

ঘুরতে যাওয়ার জন্যে কত শত মজবুত হুজুগ মজুত রয়েছে। ছোট ঘুরতে যাওয়া, মেজ ঘুরতে যাওয়া বড় ঘুরতে যাওয়া। আহাঃ।  

কতদিন ঘুরতে যাওয়া হয় না, চলো ঘুরে আসি। পাহাড় ডাকছে গো, চলো তবে। জগন্নাথের মানত ওভার ডিউ, এবার না গেলেই নয়। মাইনে বেড়েছে গত মাসে, ঘুরে আসি। বোনাস আ গয়া, টিকিট কেটে ফেলা যাক। শরীর মন ভালো নেই, একটু বেড়িয়ে আসলে কেমন হয়? প্রবল স্ফূর্তি; দল বেঁধে বেড়িয়ে আসা যাক। মন কেমন বিকেলবেলা, চলো গঙ্গার ঘাটে। সময় কাটাবার  পার্কে হাঁটাহাঁটি। পায়ের তলায় আর ইলিশ ভাপায়; সর্ষে ম্যাজিকের জুড়ি নেই। ঘুরে বেড়াবার যুক্তি জোগাড় করে একদল মানুষ হিল্লে মনে ঘুরে বেড়ান; যেমন আমার সঙ্গিনীটি।

অন্যদিকে। যারা মুভ-টি-নট হয়ে ঘরের কোনে ক্যানিয়াকুম্যারি টু ক্যাস্মের এস্পার-ওস্পারে করে থাকেন, তাঁদেরও বাহানা-বাহিনী নিতান্ত নড়বড়ে নয়।
পাড়ার মণ্ডপে না বসলে পুজো গ্যাঁজলা মেরে যায়, এ সময় ঘুরতে বেরোবার মানে হয় না। উইকেণ্ড রেস্ত করে রেস্ট নেওয়ার সময়; বেফালতু বোলপুর গিয়ে হেজিয়ে মরার কি দরকার ? সমুদ্র বাদ কারন কুষ্ঠীতে আছে জলে ফাঁড়া বিটউইন আঠারো টু তেপান্ন। Acrophobia আর সর্দির ধাত, অতএব পাহাড় বাদ। কলকাতার ঘেমো ভিড়ে চটকে নিউমার্কেট ঘুরবার জন্যে রবিবারের সিয়েস্টা ত্যাগ করতে হবে, শেষটায় এমন দিন এলো ?  ঘরে বসে ল্যাদ খাওয়ার টাল-বাহানা মুলক যুক্তির লিস্টি অনেকে পকেটে রেখে চলা-ফেরা করেন। যেমন আমি।

দেবীর ভ্রমন-পিপাসায় ও নিজের গৃহ-আলস্যের যুদ্ধে দুজনেই অনবরত জিতে চলি।  তাই সিমলা বেড়াতে , হোটেলের বারান্দায় ফেলে আসা কলকাতার ব্যালকনির মেজাজ খুঁজে পেয়ে আমি বিভূতিভূষণ ও কফি-কাপে দিন উড়িয়ে দিই। আবার দেবী বাড়ির ছাদে উঠে বিকেলের পাতলা আলোয় পড়েন ভ্রমন কাহিনীর রগরগে সমস্ত প্রকৃতি প্রেম। এইটুকুতেই সংসারে থাকা।  

Thursday, March 7, 2013

শাহবাগের প্রতি



আমি মনে মনে শাহবাগ প্র্যাকটিস করি। সক্কাল সক্কাল বাথরুমে ঢুকে শাওয়ারের তালে চিৎকার করে উঠি “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি”। এরপর গায়ে ডিও স্প্রে করতে করতে আলতো গলা কাঁপুনিতে ফ্ল্যাট বাড়ির বাতাস হয়ে ওঠে বিপ্লব-ময় : “ আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী, আমি কি ভুলতে পারি ?” ।

তারপর মুখে সামান্য লুচি-আলুর দম মুখে পুরে ঝুঁকে পরি আনন্দবাজারে; এক দিকে শাহবাগ; অন্য দিকে শহবাগ। ওপারের নির্ভীক প্রতিবাদের খবরে গর্বে ফেঁপে উঠি, বাংলা বলে ঢেঁকুর তুলি,গর্জে উঠি ; “আর একটা লুচি প্লিজ”।

হুন্ডাই গাড়ির স্টীয়ারিং’য়ে দ্রুত অফিসের দিকে ভেসে যেতে যেতে অবাক হয়ে ভাবি ; “ আমরা কি ভাবে পাল্টে দিচ্ছি বাংলার জং ধরা যত খোল নলচে; কি ভাবে ঘুরিয়ে দিচ্ছি বাঙ্গালির ভাগ্য-পথ”। তিন বার জয় বাংলা বলে চালিয়ে দিই গাড়ির মিউজিক সিস্টেম-   “ যে তোমায় ছাড়ে ছাড়ুক আমি তোমায় ছাড়বো না মা...” । আহা; গায়ে কাঁটা আর মৌলবাদের মুখে ঝ্যাঁটা।

অফিসে ইংরেজিতে বার-ফাট্টাই চলে বটে কিন্তু মনে মনে বিপ্লবি বাঙালি হল্লা করে চলে “ জয় শাহবাগ, জয় বাংলা, স্ক্রিউ রাজাকার”। তবে অফিস তো, মন কে একটু মিউট করে চলতেই হয়।

ঘর ফেরতা টিভি’তে শাহবাগ, টুইটারে শাহবাগ, ফেসবুকে শাহবাগ - রক্ত গরম হয়ে যায় মাইরি; এত জোর বিপ্লব পায় যে কি বলবো। নিজেকে সামলাতে পারি না; সামান্য হুইস্কি আর এম-পি-থ্রি’তে প্রতুল মুখুজ্জের হাতে নিজেকে সঁপে দিয়ে গুনগুন করে চলিঃ “ আমি যা কিছু মহান বরন করেছি বিনম্র শ্রদ্ধায়, মেশে তেরো নদি সাত সাগরের জল গঙ্গায় পদ্মায় / বাংলা আমার তৃষ্ণার জল তৃপ্ত শেষ চুমুক / আমি একবার দেখি বার বার দেখি দেখি বাংলার মুখ”।