Monday, December 13, 2010

বড়া পাও বনাম আলুর চপ

আলোচনায়: ভেঙ্কট গুরু/সাম্য দত্ত

লেখক পরিচিতি:

ভেঙ্কট গুরু :
আপামর মুম্বাইকার এক তামিল বাংলা বিলাসীও বটে আদ্যোপান্ত ভারতীয় চাকুরে, ব্লগীয়ে ভালবাসেন রাস্কিন বন্ড, বিকেল বেলা ও আড্ডা

সাম্য দত্ত:
রাঁচী'র প্রবাসী বাঙালি কর্ম সূত্রে বর্তমানে চেন্নাইতে খাদ্য রসিক গাইয়ে, ব্লগীয়ে ভালবাসেন কথা বলতে এবং বন্ধুদের

অনুবাদ: বংপেন

(প্রথম পর্ব :ভেঙ্কট গুরু)

ভূমিকা


এমন এক শহরের মফস্বলি প্রান্তে বড় হয়েছি, যে শহর এক সময় 'বম্বে' ডাকে ঘুরে তাকাতো এই জন-মায়াবী বাস্তবতা খুব অল্প বয়স থেকেই আমায় সহজ ভাবে দুনিয়াদারি শিখিয়েছিলো রোজকার লোকাল ট্রেন সফরে কর্ম-ব্যস্ততা যখন যৌবনে ঠ্যালা দিল, তখন থেকেই এই শহর'এর ধমনী চিনতে শিখেছিলাম এই লোকাল ট্রেন সফর গুলো'তে, লক্ষ্য মানুষ'এর সন্নিধ্যে; যাদের সঙ্গে দিন শুরু হত এবং যাদের সাথে গৃহ-মুখি দৌড় দৌড়ে দিন শেষ করতাম ঠিক এই সময়ই এই শহরের নাগরিক হিসেবে নিজেকে আত্মস্থ করেছিলাম আপামর নাগরিক-খাদ্য বড়া-পাও'এর সাথে বড়া-পাও; যা কিনা এক সমগ্র শহুরে জাতির দৈনিক কর্ম-ব্যস্ততার মাঝে কখনো সকাল'এর জলখাবার, কখনো দুপুর রাত্রির গ্রাস, কখনো বা সন্ধ্যের ক্ষুধা তৃপ্তির সাজে; স্নেহ হয়ে নেমে আসে

এক পুরনো বন্ধুর সঙ্গে আলোচনার সূত্র ধরে মনে পড়ে যায় এম বি এ করবার সময় দিল্লীর চিত্তরঞ্জন পার্কে দুর্গা পুজোর সময় কিছু বাঙালি বন্ধুর সাথে ঘুরে বেড়ানোর এক সন্ধ্যে যাবতীয় বাঙালি খানার দোকানপাট'এর ভীড়ে একটা দোকানে যেন মনে হল বড়া-পাও বিক্রি হচ্ছে আর্কিমিডিও উত্তেজনা ইউরেকা বলতে যাব এমন সময় সহস্য নির্মমতায় আমার বাঙালি বন্ধুটি আমার ভুল ভাঙ্গীয়ে দিলো যে বস্তু'টি কে দেখে বড়া-পাও'এর বড়া ভেবে ভুল করেছিলাম তার কাছে গিয়ে নজর শ্যেণ করতেই বুঝতে পারলাম যে ব্যাপারটায় বাইরের কিছু মিল থাকলেও, সেটি আলাদা কতটা আলাদা বুঝতে এক টুকরো তুলে কামড় লাগালাম সেই হলো গিয়ে আমার এক-রাত্রিক আলু চপ'এর অভিজ্ঞতা আলু চপ, যা নাকি বঙ্গ জিহ্বা রস'এর অঙ্গ, কোলকাতার যে কোনও চৌমাথা থেকে বাংলার গ্রাম-গঞ্জ'এর যে কোনও বাজারে তেল-ভরা কড়াইয়ে যার গতায়াত সর্বত্র

মুন্নী-শীলার পেলবতায় তর্ক সুখ আটকে রেখে দেশ এবং মানবতার কি বিন্দু মাত্রও শ্রীবৃদ্ধি সম্ভব? আসুন সহ-নাগরিকেরা, জীবনের আরও নিবিড় স্পর্শ ও টানাপোড়েন গুলো নিয়ে আমরা মনসংযোগ করি, তর্ক জুড়ি জীবন'এর অতি-বাস্তবতাদের নিয়েআসুন, আমরা হিসেব কষে জেনে নিই,মানব জিহ্বাকে কে বেশি তড়িত্‍ স্পর্শ করেছে
এক নিরীহ ও একান্তই এক মধ্যবিত্ত্ব তুলনামূলক আলোচনায় ডুব দেওয়া যাক এইবারে, তুলনার পাত্ররা কারা? বড়া-পাও এবং আলুর চপদুই'ই বাহ্যিক রূপে প্রায় কাছাকাছি, দুটোই মেদ-মেদূর আলু দিয়ে তৈরি, ডুবো তেলে ডুব দিয়ে দুই'এরই আত্ম-প্রকাশ কিন্তু মননে এবং সত্ত্বায় এই দুটি খাদ্য ভিন্য মেরু'তে বিচরন করে মুম্বাইকর সূত্র ধরে বড়া-পাও'এর হয়ে পটভূমি রচনা করলাম আমি, নিরপেক্ষতার স্বার্থে আলুর চপ নিয়ে বিশ্লেষণে বসবেন আমার প্রিয় বন্ধু সাম্য দত্ত, যিনি নিজে প্রবাসী হয়েও, রসনার দিক থেকে এক প্রবল-বাঙালি


বড়া-পাও বনাম আলুর চপ

অথ বড়া-পাও কথা

বড়া-পাও মুম্বাইয়ের অলিতে-গলিতে-রাজপথের সবচেয়ে সহজলভ্য আম-জনতার খাদ্য গরম গরম পরিবেশিত হয়ে, দৈনিক ব্যস্ততার মাঝে, যা লক্ষ্য-কোটি পাকস্থলীদের শান্ত করে আসছে সেই কবে থেকে পকেটে কম তোলপাড় তুলে পেট'কে সুস্বাদু টোটকায় ভরিয়ে তোলে এই বড়া-পাও...এক নম্বর প্লাটফর্ম থেকে চার নম্বরের দিকে দৌড়ের মাঝে; হয়ত অফিস, হয়ত টিউশনি, হয়তো বা ক্রিকেট প্র্যাক্টিসের জন্যে...
বড়া পাও চিরে দেখুন:
সেদ্ধ আলু কাঁচা লঙ্কা-ধনে-হিং-হলুদ-শুকনো লঙ্কা গুড়ো সহ চটকে, নিটোল গোল্লা পাকিয়ে, বেসনে চুবিয়ে ডুব তেলে ভাজা এই ভাবে আত্ম-প্রকাশ বড়া' বড়া ব্যাপারটা নিজ গুণে খাওয়া যেতেই পারে, তবে এর পূর্ণ স্বাদ-সত্ত্বা এক মাত্র পাও'এর সাথেই প্রকাশ পায়পাও হল পাউ-রুটির পশ্চিমা অবতার, যার মধ্য ভাগ চেরা যাতে তার মধ্যে বড়া আশ্রয় নিতে পারেপাও কে মাখিয়ে নিন মিঠে চাটনি, ঝাল চাটনী এবং রসুনের শুকনো চাটনিতে এর পর এই রমণীয় চাটনি-রসাল পাও'এর মাঝে বড়া এসেই অমৃত-সৃষ্টি হুড়মুর ছুটতে-ছুটতে খান, বা ভীড়'এর মাঝে শ্বাস গুছিয়ে নিতে নিতে কড়া 'কাটিং' চা হাতে এর স্বাদে বুঁদ হয়ে যান আর এর সাথে যদি জুটে যায় বম্বের বৃষ্টি, তবে নিশ্চিত একটা আলপটকা রোমান্স আপনার বুক ছুয়ে পাকস্থলীতে মিশে যাবে
মুম্বাইয়ের সব চেয়ে নামী বড়া-পাও-স্থলগুলির মধ্যে অন্যতমগুলির ঠিকানা হলো ভিল্যে পারলে, ঠিক নারসী মঞ্জি আর মিথি ভাই কলেজের সামনে নারসী মঞ্জি'তে যে কয় বছর কাটিয়েছি, সেই কয় বছরে আর কাছে এসে পড়েছি এই বড়া-পাও'এর এখানকার বড়া-পাও'এর দোকানগুলির একটা অভিনবত্ব ছিল; এরা পাও'এর সাথে অন্যান্য চাটনিগুলোর সঙ্গে এক টুকরো আমূল মাখন ছড়িয়ে দিত এবং ফলত পাও ব্যাপারটা হয়ে উঠতো মাখন স্পর্শে অতি রমণীয় ভাবে সিক্ত চাটনি আর মাখনের আদর মাখা সেই বড়া-পাও যখন ধোঁয়া সহ মুখে যেত; আহ, জিহ্বে যেন রমন-বিস্ফোরণ ঘটে যেতো
মুম্বাইয়ের ব্যাবসা বাজারে বড়া-পাও'ও ব্র্যান্ড অর্জন করেছে এবং সেইসব ব্র্যান্ড সফলভাবে নিজেদের বানিজ্যিকরণ ঘটিয়েছে; "জাম্বো কিং", "গোলি বড়া পাও", "শিব বড়া-পাও"; কত অবতারেই বড়া-পাও আজ বম্বে আলো করে আছে
বড়া-পাও'এর নিবিড় সৌন্দর্য কোথায় জানেন? আশায়! এ শহরের শিরা-উপশিরায় কত মানুষ হিংস্র প্রতিকুলতা মাথায় নিয়ে প্রতিনিয়ত মাথা উঁচু করে টিকে আছে; শত অভাবেও একটা বড়া-পাও'এর দোকান দিয়ে কত মানুষ রোজ নিজেদের এলুমিনিয়ামের থালা ভরে নেন রুটি-তরকারী-আচারে বড়া পাও, যে সবার বড় প্রয়োজনের;যে কোনও প্রান্তে, যে কোনও জটলায়; এর বিক্রি তো হবেই, তাই না? আমি ব্যক্তিগত ভাবে চিনি এমন এক বন্ধুকে যিনি এক সময় ছোট্ট এক বড়া-পাও'এর দোকান শুরু করে আজ একটি পাঁচ-তারা হোটেলের শেফ
স্নেহের বড়া-পাও কে এই মুম্বাইকারের সেলাম
(দ্বিতীয় পর্ব: সাম্য দত্ত)

আলু চপ চরিত

এই তুলনাটা অনেকটা ডিস্কভারী চ্যানেলের ওই অনুষ্ঠান গুলোকে মনে করিয়ে দেয়, ওই যে যেখানে বিবিধ জানোয়ারদের গতি-প্রকৃতি নিয়ে চুল চেরা গবেষণা চালিয়ে যান বিশেষজ্ঞরা যাক, আলুর চপ নিয়ে আমায় বলতে হবে, এর চেয়ে ভালোবাসার আর কি হতে পারে আগেই যেমন আমার বন্ধু বলেছেন যে বড়া-পাও'এর বড়া আর আলুর চপের মধ্যে বাহ্যিক মিল আছে বটে, তবে সেটুকু নিতান্ত বাহ্যিকই বটে; ঠিক যেমন ধরুন অঞ্জন দত্ত ও নচিকেতা; দাঁড়ি-গীটারে-জীবনমুখিতে মিল আছে বটেই; তবে সেই মিলটুকু নিতান্তই আবরনের, আত্মার নয়
ভিতরের পুরের স্বাদে বড়া-পাও এবং আলুর চপ আদ্যোপান্ত আলাদা; সেদ্ধ আলু-পেঁয়াজ-নুন-লঙ্কা এবং আর কিছু ঘরোয়া মসলা মিলে মেখে, সাঁতলে এর পুর তৈরি হয়; মাখার গুনেই হোক বা বড়া'র তুলনায় কড়া ভাজার গুনেই হোক, এ দুয়ের স্বাদ বেশ আলাদা তাছাড়া কামড় দিলে বেশ টের পাবেন যে আলুর চপটি একটু বেশি মুচ-মুচে, গায়ের রংটিও সামান্য বেশি কড়া অনেক সময় আলুর চপ'এর দোকানে সিঙ্গারাও পাওয়া যায় কারণ আলুর চপের সঙ্গে পুরের রসদের কিছু মিল আছে, তবে আলুর চপের জনন্যে আলু কে একটু বেশি মাখতে হয়; আলুর চপ ভারী স্নেহময় কিনা বড়া যেমন পাও'এ পূর্ণ হয়, আলুর
চপের তেমনি কোনও বাঁধন নেই নিশ্চিন্তে একলা আলুর চপ'এর রসাস্বদন করতে পারা যায় তবে হ্যাঁ, অনন্য হরেক খাওয়ারের সঙ্গে মিলে অনাবিল হয়ে উঠতে পারে আলুর চপ সব চেয়ে বিস্ফোরক জুটি অবশ্যই আলুর চপ-মুড়ি (মুড়ি যদি সামান্য সর্ষের তেলে মাখা হয় তাহলে তো কথাই নেই) তবে কোনও সঙ্গত ছাড়াও, ভাজা-পড়ার জগতে আলুর-চপ'এর দৃপ্ত-আবেদন সর্বজনবিদিত এবং আস্বাদিত
আলুর চপ কিছুতেই হুড়মুরিয়ে গেলার বস্তু নয়আলুর চপের সাথে বাঙালির বহু যুগের আড্ডা-বিলাস, বহু সন্ধ্যের আলসেমো, বহু গল্প মাখা বৃষ্টি বিকেল আছে বাংলার গরিমসি আমেজের সাথে নির্মেঘ মিশে আছে আলুর চপ, আর কোনও খাদ্যই হয়তো বাঙালির এতটা স্বভাব-আয়ত্ব নয় সেই জন্যেই হয়তো আজ কলকাতায় এলেই প্রথম ঝাঁপ রোল-ফুচকায় নয়; আলুর চপেই দিয়ে থাকি

আলুর চপ যদি পূর্বের প্রতিনিধি হয়ে তবে বড়া-পাও একান্তই পশ্চিমা বড়া-পাও যদি ছুট-ছুট ব্যস্ততা হয়ে তবে আলুর চপ হয়তো গা-এলানো ভালোবাসা

Wednesday, December 8, 2010

কলেজ স্ট্রিট'য়ের খাওয়া-দাওয়া




কলেজ স্ট্রিট ঘেঁষে যে চার বছর'এর মেস-phase কেটেছে, সেই সময়কর ফুড-হ্যাবিট নিয়ে কিছু কথা ব্লগ রেকর্ডে ঢুকিয়ে রাখা উচিত। ফর ফিউচার রেফারেন্স। বিশেষ করে মমতা যদি সত্যিই কলকাতা'কে লন্ডনে কনভার্ট করতে পারেন (দিদি'র একটা প্রোগ্রেস থিম আছে না? কলকাতা কে লণ্ডন, দার্জিলিং কে সুইজারল্যান্ড এবং দীঘা কে গোয়া?), তাহলে এসব খাওয়ার-দাওয়ার'গুলো ফসিল-স্মৃতি হয়ে যাওয়ার হেভী চান্স আছে। তখন আমি গ্র্যাজুয়েসন করছি ক্যালকাটা উনিভার্সিটি থেকে। থাকছি আমহার্স্ট স্ট্রীট পোস্ট অফিসের উল্টো দিকের এক ছোট্ট গলি সীতারাম ঘোষ স্ট্রীট'এর এক মেস বাড়িতে। সেই সময় খাওয়া-দাওয়ার প্যাটার্ণ ছিল বেশ সোজা সাপটা। রাত তিন'টের আগে ঘুমতাম না, তাই বেলা এগারো'টার আগে ঘুম ভাঙ্গতো না, তাই জলখাবারের কোনও পাট কখনোই ছিল না। কখনো কখনো মেস'এর নিচের অমিত'এর চা'এর দোকান থেকে ডিম-পাউরুটি অবশ্য খাওয়া হত, তবে সাধারণত ব্রেকফাস্ট ব্যাপারটা উহ্যই থাকত। দুপুর'এর খাওয়া এবং রাত'এর খাওয়াটা মেস'য়েই হত।
অতএব কলেজ স্ট্রীট'এর ফুড-হাণ্ট চলতো শুধু সন্ধ্যে বেলার খাওয়াটুকুর জন্য। (সন্ধ্যে বেলার খাওয়া কে কি বলে? নাস্তা?টিফিন?জলখাবার?)। তখন অবশ্য পকেট মেপে চলতে হত, কাজেই বিকেলের টিফিন'এ জমিদারী করার স্কোপ থাকত না। তবে তার মধ্যেই উত্তর কলকাতার এই অঞ্চলে কম ভ্যারাইটি চেখে দেখিনি। সেইসময়কার প্রিয় দশ'টা সান্ধ্য-খাদ্য'এর লিষ্টি নীচে করলাম।


তবে নিচের কোনটাই প্রায় কলকাতা'র লিজেন্ড ঘেঁটে নেওয়া নয়, ব্যক্তিগত রুচি (এবং পকেট)'এর ওপর নির্ভর করে বানানো, একান্ত ব্যক্তিগত পছন্দের টিফিন লিস্ট এটা:
১। চিকেন কবিরাজি, দেলখোশ রেষ্টুরেন্ট, কলেজ স্ট্রিট মোর:
পুরনো কলকাতা'র কাঠামো এখনো জ্যান্ত আছে দেলখুশায়, টেবিল-চেয়ার যাবতীয় আসবাব, পর্দা থেকে ওয়েটার পর্যন্ত; সব কিছুতেই পুরনো গন্ধ। ভীষণ ইচ্ছে ছিল এদের সবুজ পর্দাটানা কেবিন ঘরে প্রেমিকা সহ এন্ট্রি নেওয়া, এমনি কপাল যে টাইমলি একটা প্রেমিকাও জটাতে পারলাম না। কবিরাজি ছাড়াও এদের যে কোনও চপ-কাটলেট নিশ্চিন্তে গেলা যেতে পারে।
২। মটন/চিকেন আফঘানি কাটলেট, ইন্ডিয়ান কফি হাউস, কলেজ স্ট্রীট মোর'এর কাছে:
কফি হাউস একটু ক্যালকুলেট করে ঢুকতাম, ওখানে বেশি ঘুর-ঘুরও করলে লোক'এ ইন্টেলেকচুয়াল বলে প্যাক দিতে পারে ভেবে। দোতলায় যেতাম না দুটো কারণে; দাম বেশি ছিল ওপরে আর প্রেম করতে পারিনি বলে; হামেশা নীচেই বসতাম। এখানের মোগলাইই'টাও মন্দ নয়, তব অদ্ভুত ব্যাপার; কফি হাউস'এর কফি; জানি না কেন আমার তেমন ভাল লাগতো না। আর হ্যাঁ, এখানের কোল্ড কফি বড্ড বাজে!
৩। পাউরুটি-চিকেন স্ট্যিউ, কলেজ স্কোয়ার ক্যান্টিন, কলেজ স্কোয়ার :
না স্যার, এতো রেষ্টুরেন্ট নয় তাই বসবার জায়গার সওয়াল নেই, ক্যান্টিনের ছোট্ট জানলা দিয়ে আপনার দিকে প্লেট বাড়িয়ে দেওয়া হবে, প্লেট হাতে কলেজ স্কোয়ার'এর বেঞ্চিতে বসে খাওয়া।গোল মরিচ ছড়ানো ফ্যাট-ফ্যাটে সাদা মুরগির স্ট্যিউ যাতে থাকত ছোট্ট এক পিস মুরগির অল্প মাংস মাখা হাড় প্লাস কিছু সব্জী এবং লম্বাটে পাউরুটি দু পিস। তখন ভীষণ ভাল লাগতো খেতে সেটা। দাম, যদ্দুর মনে পড়ে বারো টাকা। এখানে এই আইটেম বাদে কোনও কিছুই ট্রাই করিনি কখনো।
৪। মোগলাই পরোটা, কমলা রেষ্টুরেন্ট, সূর্য সেন স্ট্রীট'এর কাছে :
রেষ্টুরেন্টটা বিশাল কেতা-দুরুস্ত কিছু নয় কিন্তু এদের মোগলাই'টা ব্রিলিয়াণ্ট, ঝাল এবং ভারী : এত পুরু মোগলাইই পরটা খুব কম খেয়েছি, এ ছাড়া এদের সঙ্গে যে আলু'র তরকারীটা দিত সেটার মধ্যে কোনও মোগলাই কোয়ালিটি তেমন না থাকলেও; সুপার ফাইন বাঙালি-আলু চচ্চড়ি হত উইথ সুপার-ঝাল। আমার খাওয়া অন্যতম সেরা মোগলাইই পরোটা।
৫। মটন টিক্কা আর রুমালি রুটি, অন্নপূর্ণা রেষ্টুরেন্ট, টুওয়ার্ডস শেয়ালদা : মটন কিমা আর ছাতুর কম্বিনেশন যে এত সাংঘাতিক সুস্বাদু হতে পারে এদের মটন টিকিয়া না খেলে বোঝা যাবে না। এক পা এগিয়ে বলি, এদের মটন টিকিয়া এককেবারে কলকাতা বেস্ট। আর সঙ্গে সুপার ফাইন রুমালি রুটি। আজ ভাবতে গেলে জ্বিভে জল আসে। চার'টে রুমালি রুটি আর একটা মটন টিকিয়া তখন সতেরো টাকায় হয়ে যেত। এটা আমার ইসস্পেশাল টিফিন'এর লেভেলে পরতো।
৬। কচুরী-ছোলার ডাল, পুঁটিরাম, সূর্য সেন স্ট্রীট :
এমনিতেই এটা একটা ল্যান্ডমার্ক দোকান যাকে বলে, এদের ছোলার ডাল টা যাকে বলে তুরীয়, হাফ ডজন কচুরী কোথায় যে ভ্যানিস হয়ে যেত..
৭। রাধাবল্লভী-আলুর দম/ঢাকাই পরোটা, সুরভি মিষ্টান্ন ভান্ডার, আমহার্স্ট স্ট্রিট-হ্যারিসন রোড ক্রশিং'এর কাছে :
রাধাবল্লভী টা সত্যিই ক্লাস বানাতো, মিষ্টি-ঝাল আলুর দম'টাও চেখে দেখবার মত। ঢাকাই পরোটা'টা ছিল নোনতা খাজা আর কচুরীর মিক্সচার, সাইজে বিশাল, একটাতেই পেট ভরে যেত; ওপরে ছোলার ডাল ছড়িয়ে সার্ভ করা হত; বেশ টেষ্টি!
৮। এগ-চাউমিন প্লাস চিকেন পকোড়া, খোকন'দার চাউমীনের দোকান, সীতারাম ঘোষ স্ট্রীট :
একান্তই ব্যক্তিগত অভিরুচি এবং ভীষণ ভালোবাসা মেশানো খাওয়ার জায়গা ছিল এই খোকনদার চাউমীনের দোকান। আমাদের মেসের ঠিক নীচেই ছিল এই দোকান'টা। দোকান বলতে গলি'র ধারে ছোট্ট একটা আস্তানা, সামনের বেঞ্চিতে বসে খাওয়া। এখানের সেরা কম্বো একটাই; হাফ প্লেট এগ চাউমিন (সরু থ্রেডের চাউ, ওপরে ফ্রি চিলি চিকেনের গ্রেভী ছড়িয়ে নেওয়ার সুযোগ সহ) এবং এক পিস চিকেন পকোড়া। ভীষণ টেষ্টি অথচ অতি-মসলায় দুষ্ট নয়; ভরপেট মাত্র দশ টাকায় ছিল এ সব কিছু তখন। দারুন না?
৯। রোজ সিরাপ সরবত, প্যারামাউন্ট, কলেজ স্ট্রীট'এর কাছে :
এটা আর একটা ইতিহাস মার্কা 'বড়' দোকান। বহু রকমের সরবত রাখতো এরা, গরম কালে তো এদের সরবতের কোনও তুলনাই ছিল না । তবে এদের ম্যাঙ্গো, ব্যানানা যাবতীয় হিজিবিজি ফ্লেভার গুলোর মধ্যে সব চেয়ে বেশি প্রিয় ছিল আমার এই রোজ সিরাপ সরবতই; এটাই মনে হয়ে তখন সব চেয়ে সস্তাও ছিল; পাওয়া যেত দশ টাকায়।
১০। হাড়ি-গরম মিক্সচার, কলেজ স্কোয়ার :
বিকেলের ফুরফুরে হাওয়ায় এবং পেট'এর চনমনে খিদে'র সময় যদি টাকা কম থাকত, তখন সেরা সাপোর্ট সিস্টেম ছিল কলেজ স্কোয়ারের এই হাড়ি-গরম ফিরিওয়ালারা। হাড়ি'র আগুনে গরম করা চানাচুর'এর মধ্যে পেয়াজ, নূন, লংকার সলিড মিশেল, অপূর্ব সে স্বাদ। তবে আজব ব্যাপার সেই হাড়ি-গরম চানাচুর কলেজ স্কোয়ারে বসে খেলে যতটা জ্বিভে জল আনতো, তার সিকী ভাগ স্বাদও অন্য কোথাও হাড়ি-গরম খেলে পাই না।
সংযোজন:
কালিকার চপের দোকান, সূর্য সেন স্ট্রীট

ফুড স্টেশন, কলেজ স্ট্রীট (একটু পকেট-হেভী ব্যাপার, তুলনামূলক ভাবে)
বসন্ত কেবিন, কলেজ স্ট্রীট
(পুনশ্চ: কলেজ স্ট্রীট'এর যাবতীয় খাদ্য স্মৃতি ঘেঁটে দেখলাম, যে বহু খাওয়া-দাওয়ার হিসেব এখনো বাকি রয়ে গেল, এই পোস্ট ভবিষ্যতে সেই বাদ থাকা গুলো জুড়ে নিয়ে আরও পুষ্ট করে তুলতে হবে।