Sunday, November 13, 2011

শিশুপাল


রোববার সন্ধ্যেবেলা অচেনা নম্বর থেকে ফোন এলেই মেজাজ খিঁচড়ে ওঠে কোনও অফিসিও খবরের আশঙ্কায়। ফোন-কলটা ধরবো কী ধরবো না ভাবতে ভাবতে ধরেই ফেললাম।
-“হ্যালো, পচা?”, দুরুম ব্যারিটোনেই বুঝতে চিনতে পারলাম আনন্দ-স্যার, ছোটবেলার ইংরেজি গৃহ-শিক্ষক কাম কৈশোরের জীবন-গুরু। ব্যাচেলর, গিটার-বাজিয়ে, দাপুটে এই ইংরেজি শিক্ষকটি ছিলেন আমাদের স্কুল-জীবনের আরাধ্য। ক্লাস এইট-নাইনে যখন আনন্দ-বাবুর কাছে পড়তাম, তখন মনে হত ; আজন্ম ব্যাচেলর থাকা, গিটার বাজানো, চারমিনার খাওয়া আর গড়গড় করে ইট্স বা শক্তি আউড়ানো ছাড়া জীবন বৃথা। কিন্তু উচ্চ-মাধ্যমিকের পর যথারীতি আনন্দ-বাবুর সঙ্গে যোগাযোগ কমে এসেছে। এখন যোগাযোগ বলতে বিজয়ার সময় আমার প্রণাম-সহ ফোন। কিন্তু এতদিন পর এই রবিবার সন্ধ্যে বেলা হঠাত্‍ আনন্দবাবুর ফোন পেয়ে অবাক হলাম বটে।

-“হ্যাঁ স্যার , বলছি। কেমন আছেন আপনি?”
-“আমি ভাল আছি কিনা জানতে হলে, নিজে ফোন কর”
-“হ্যাঁ স্যার
-“তুমি কেমন আছ? বৌমা কেমন আছে?”
-“ভাল স্যার, আপনার শরীর ভালো?”
-“কে ফোন করেছে?”
-“আপনি স্যার”
-“আমার শরীরের স্টেটাসের ব্যাপারে যখন আগ্রহ হবে নিজে কল করবে”
-“হ্যাঁ স্যার
-“চাকরি-বাকরি কেমন চলছে? নিজের উড়ন-চন্ডি হ্যাবিটগুলো কে চেক করতে পেরেছ?”
-“ইয়ে, হ্যাঁ স্যার”
-“সিগারেট ছেড়েছো?”
-না স্যার, মানে ছেড়ে দেব স্যার, তবে ইয়ে, আপনিও তো..”
-“আমি সিগারেট খাই, তাই বলতে চাও তো? আচ্ছা? আমি মর্নিং ওয়াক করি। তুমি কর? আমি ব্যায়াম করি দিনে ঝাড়া আধ-ঘন্টা, তুমি কর? আমি নিয়মিত টপ্পা শুনি, তুমি শোনো?
-“না স্যার”
-“তবে সিগারেটের ব্যাপারে আমার সঙ্গে তুলনা করছো কেনো?, যাক গে, বাইরের আগডুম-বাগডুম খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করেছ?”
-“চেষ্টা করছি স্যার”
-“এখনো চেষ্টা? তোমার পেটে যে পরিমাণ তেলে-ভাজার লেয়ার আছে, এরপর তো ফিনাইল ছাড়া সাফ হবে না হে, হ্যাঁ? হে হে হে হে হে..”
-“হে হে হে স্যার...”
-“যাক গে, বেশ লাগল তোমার কণ্ঠস্বর শুনে, আর আমার শরীর এখনো একদম ফিট বুঝলে, যোগ ব্যায়ামের মত কোনও ম্যাজিক হয় না। বেশ, বেশ, ভালো থাকো,আজ তবে রাখি”
-“স্যার কি দরকারে ফোন করেছিলে বললেন না তো?”
-দরকার? কই! কোনো দরকার নেই তো, ওই এমনিই আর কি, হে হে হে। অবিশ্যি, আমি অমুক-ডে তমুক-ডে এইসবের কনসেপ্ট এককেবারেই মানি না, তবে এই যে শুনলাম কাল নাকি চিল্ড্রেনস ডে, শিশু-দিবস। তাই ভাবলাম আমার শিশুপাল-গুলোকে একটু চমকে দি.. বুঝলে কি না! হে হে হে, রাখি কেমন? ভালো থেকো”

Thursday, November 10, 2011

শাহরুখ যদি


শাহরুখবাবু বাংলা প্রমোট করবেনভালো কথা
ব-ব-ব-ব-বাংলাআ-আ-আআ!” বলে নাইট-রাইডার্স অধিপতি দুলে উঠবেন, পশ্চিম বাংলা ঢেকুর তুলে গলা মেলাবেশাহরুখ ভক্ত হিসেবে আহ্লাদ কোথায় রাখিতবে রা.ওয়ান বলেই নাচবো আর বাংলা তুলে আ মরি আ মরিকরবো না, তা তো হয় না।
অতএব শাহরুখ বাবু, কয়েকটি ব্যক্তিগত মারপ্যাঁচে আপনার অভ্যস্ত হতে হবে, যদি না আপনি হিন্দ-মোটর ঘটিত এমবাসেডারের মত বঙ্গ-মানসে বাংলা-এমবাসেডার হয়ে মুখ থুবড়ে পড়তে না চান। কি কি এডজাষ্টমেন্ট করতে হবে আপনাকে? টুকে নিন:
১. কোলকাতা উচ্চারণ শিখুন স্যার। তুরন্ত!

২. সৌরভ বিনা নাইট-রাইডার্স আর পশ্চিম বিনা বাংলা একই কথা। পশ্চিম বাংলা বলে নাচুনি চালাবেন আর সৌরভ পুষবেন না, এসব চলবে না। মনে রাখুন, দাদা-ছাড়া ইডেন আর ঠাকরে-ছাড়া মুম্বই, একই ব্যাপার।
. লেনিন পড়ুন। মা-মাটি-মানুষ আবৃত্তি প্র্যাকটিস করুনতোতলামি বাদ দিয়ে
৪. মিষ্টি দই বা রসগোল্লা ভালো খান, এরকম প্রেস-বিবৃতি এখনো পাইনি। চটপট দিয়ে ফেলুন
৫. প্লিজ দাদা, ওই করবো-লড়বো মাফিক হেরো-গানটা এবার বাদ দিন। জাতীয়-স্তরে তো আর ইজ্জত রইল না
৬. কথায় কথায় উড়ন্ত-চুমু ভাসিয়ে দেওয়াটা বন্ধ করুন। আমরা মশাই ইণ্টেলেকচুয়াল জাতি, নেকু নয়। প্লিজ টেক কেয়ার।
৭. বাংলা সিনেমায় টুকটাক ভেসে উঠুন। আমাদের গরীব-গুর্বো টালিগঞ্জে টু-পাইস আসুক
৮.আসছে বছর দুর্গা-পুজোয় ম্যাডক্স-স্কোয়ারে ধুনুচি নেচে নিজের সেমি-বাঙ্গালিত্ব উদ্বোধন করুন।
৯. দৈনিক একটি কিমন আছো কলকত্তাগোছের টুইট-ঠুইট করতে যাবেন না, এন্তার প্যাঁক খেতে হবে।
১০. অবশ্যই, অবশ্যই মনে রাখবেন: “বাংলা Pepsi নহে”

(ছবি: ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত, সত্ত্ব-আপত্তি জানালে চটপট সরিয়ে নেওয়া হবে)

মগজ পোশাক



-“পচা, ঘুমাইতাসিলি নাকি?”, ভোর পৌনে ছটার সময় বিনু-মামার ফোন
-“হুম, কি ব্যাপার?”
-“কইতাসি কি, তর কাসে একখান শান্তিনিকেতনী ঝোলা হইবো?”
-“শান্তিনিকেতনী ঝোলা? মার আছে মনে হয় একটা পুরনো, তবে ময়লা হয়ে আছে বোধ হয়, কেন?”
-“ময়লা হইলে তো আরো ভালো, আর হ্যাঁ,আরেক খান জিনিষের দরকার আছিলো”

-“আবার কি?”
-“চারমিনার
-“চারমিনার? মার্লবোরো ছেড়ে চারমিনার? তোমার হয়েছেটা কি?”
_ “ চোপ, চিতকার করস ক্যান! চারমিনার ভুইলা যা। ঝোলাখান রেডি রাখিসবিকেল চারটেতে আসুম
বিকেল চারটে বাজবার পাঁচ মিনিট আগেই বিনু-মামা হাজির। বিনু-মামা বাঙাল ভাষায় পাবলিক হড়কালেও কেতাদুরুস্ত মানুষইস্তিরি করা ছিম-ছাম শার্ট-ট্রাউসার এবং পালিশ মারা বুট-জুতো না পরে বাড়ি বাইরে ঘুরতে যায় নাবলে বেরান যে “আমার মন্তর হইল গিয়া বি ক্লীন শেভেন”সুগন্ধি আফটার-সেভ লোশনে আসক্তি আছে। মার্লবোরো ছাড়া সিগারেট মানেই বিনু-মামার ভাষায় বিড়ি। এহেন বিনু-মামার আজ এ কি চেহারা?
চুল উস্কো-খুস্কো!দু-তিন দিনের না কমানো দাড়িশার্টএর বদলে আজ গায়ে ছাপানো বেমানান রঙ ওঠা ফতুয়া, নীচে বিবর্ণ ঢোলা পায়জামা!পায়ে পালিশ করা জুতোর বদলে পুরনো শ্রী-লেদার্সএর আধ-ফাটা চটি। এবং সর্বোপরি আঙ্গুলের ফাঁকে জ্বলন্ত ফিল্টার-লেস সিগারেট!
-“কই? শান্তিনিকেতনী ঝোলা খান কই?”
ঝোলা-চোয়াল নিয়ে বিনু-মামা কে এগিয়ে দিলাম ঝোলা টা!
-“এ কি? ঝোলা খান পরিষ্কার ক্যান? তুই না কইছিলিস ঝোলা খান ময়লা?”
-“হ্যাঁ, ছিলোতুমি নেবে শুনে মা ধুয়ে দিয়েছে দুপুরবেলা”
-“ধুয়ে দিছে? ছ্যা! কে যে তগো পাঁকামি করতে কয়! পরিষ্কার ঝোলা কোন কামে লাগে?”
-“তোমার কি হয়েছে বলো তো বিনু-মামা? এই পাগলের মত চেহারা-পোশাকএই চারমিনারনোংরা-ঝোলা, এসব নিয়ে করছোটা কি? ছদ্মবেশ নাকি?”
-“ধুর! ছদ্মবেশ কেন হইবো রে পাগলা?এই হইল গিয়া ইউনিফর্ম”
-“ইউনিফর্ম? কিসের ইউনিফর্ম?”
-“কলকাতা ফিল্ম-ফেস্টিভ্যালের পাস জোগাড় করসি, নন্দন যাইতে হইবোএকে নন্দন, তাইতে ফিল্ম-ফেস্টিভ্যালগরু-ছাগল তো আর যাইতে পারে নাকাজেই এই হালার ইণ্টেলেকচুয়াল-ইউনিফর্ম ছাড়া ফেস্টিভ্যালের ক্লাসিক ফিল্ম-গুলান দ্যাখতে যাই ক্যামনে ক দেখি তুই”

Tuesday, November 1, 2011

সেক্সিস্বর


ভূত ১: ভাই, নতুন নাকি?
ভূত ২: ইয়ে, হ্যাঁ, তিন মাস। আপনি?
ভূত ১: ১২০ বছর।
ভূত ২:ওরে বাওয়া,আপনি তো এলেমদার মামদো মশায়। ১২০ বছর ধরে কলকাতায় কচলাচ্ছেন?এই তিন মাসেই নাভি-শ্বাস উঠে গ্যালো, ভাবছি শিমুলতলা বা সিলেটে শিফ্ট করব।
ভূত ১ :ভারী চটপটে ভূত তো হে তুমি!অল্পবয়সে বিদেয় নিতে হয়েছে নাকি?
ভূত ২ :আর বলবেন না স্যার, উনিশ বছরেই কেলো ঘটে গ্যালো। একটা সেক্সি অঙ্কর সলিউশন চিন্তা করতে করতে রাস্তা পার হচ্ছিলাম
, এমন সময় শালা মিনিবাস'টা..
ভূত ১ :কি বললে? সেক্সি অঙ্ক? অর্থাত্‍, যৌনতা-মূলক অঙ্ক?
ভূত ২ : হে হে, আচ্ছা মাল তো স্যার আপনি। সেক্সি মনে যৌ.. , ধুর: মাইরি। অবশ্য মান্ধাতা আমলের লোক বটে আপনি। ওই যৌনতা-ফৌনতা ন্যারো, মানে ইয়ে, সংকীর্ণ মানে। সেক্সি অনেক বেশি বৃহত্তর শব্দ স্যার।
ভূত ১ :ভাষা ভারী এগিয়ে গ্যাছে হে, বৃহত্তর কেমন?
ভূত ২ :উমম,আধুনিক ব্যবহারে সেক্সি মানে হলো গিয়ে মার-কাটারি জিনিস। একটা ব্যপকা চাবুক মার্কা ইয়ে, বুঝলেন? মানে ইয়ে, একটা সুপার-ডুপার তুবড়ি মার্কা কোনও কিছু। মানে ধরুন 'ছেলেটা আলটিমেট সেক্সি কথা বলে', তার মানে গিয়ে হল গিয়ে ছেলেটা দারুন কথা বলে। বা সচিন একটা সেক্সি শট খেললো’, মানে দারুন প্যাদানী দিল বোলারকে। অথবা ধরুন রাস্তাটা সেক্সি’, তার মানে রাস্তায় কোনও খান-খন্দ নেই, এক্কেবারে স্মূদ-ড্রাইভ।মানে সোজা ভাষায় কোনও কিছু সেক্সি মানে হলো এমন কিছু যা কোটি'তে এক! কি বুঝছেন তো? এই যে কাকা, মিচকি হাসছেন যে, আমার কথা শুনে মস্তি মারছেন নাকি?
ভূত ১ :আরে না ভায়া, এক ভূতে কি অন্য ভূতের ওপর হাসতে পারে? তবে ভেবে ভারী চমতকৃত হতে হচ্ছে যে বাংলা ভাষায় অভিব্যক্তি আজকাল কি প্রচন্ড হয়ে উঠেছে, ভাগ্যে সময় থাকতে সরে পড়েছি ভাই।
ভূত ২: অভি.. কি? হ্যাঁ?
ভূত ১: অভিব্যক্তি, মানে হল গিয়ে..সে বাদ দাও। আমি কি ভেবে হাসছিলাম জানো? ওই যে তুমি বললে না, যে বা যা, কোটিতে এক, তাই সেক্সি। তা আমি পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার পর, এক উটকো লিখিয়ে বলেছিল আমি নাকি চার কোটি'তে একজন। তাই ভাবছিলুম যে আমি বোধ হয় চার-গুণ সেক্সি!
ভূত ২ : হে হে হে হে, আপনি মজার মানুষ মালুম হচ্ছে কাকা। আপনি কে ছিলেন মাইরি?মাস্টার-মাস্টার কথা বলেন কিন্তু আপনি। আর এই লিখিয়ে মালটাই বা কে যে আপনাকে এতো বার খাইয়ে কথা বলেছিল? আপনার শিষ্য-টিষ্য নাকি?
ভূত ১ :ভাই, লিখিয়েটি আমার শিষ্য কিনা জানি না, তবে তোমাদের চোদ্দ-গুষ্টির গুরুদেব তো বটেই।আর আমি মাস্টারিই করতাম বটে। ভূত হয়ে এ শহরে ঘুর-ঘুর করছি অথচ মজার কথা হল আমার পিতৃদত্ত নাম হল ঈশ্বর, ঈশ্বরচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়!

পরিশিষ্ট:
Shortly after Iswar Chandra (Bandyopadhyay) Vidyasagar's death, Rabindranāth Tāgore reverently wrote about him: "One wonders how God, in the process of producing forty million Bengalis, produced a man!" (উত্‍স :উইকিপিডিয়া)