Wednesday, July 31, 2013

মেজাজ ও স্নান



নিজের ওজন বুঝে নেওয়া উচিৎ সকলের। সরি স্যার। ওজন বলতে ভুঁড়ি বা মানিব্যাগের পরিধি মাপতে বলছি না। মেজাজের গভীরতা দিকে নজর দিচ্ছি।

গুরুজনেরা বলে গেছেন যে মেজাজটাই আসল রাজা। মেজাজ গড়বড়ে হলে, পকেটে টু পাইস্‌ থাকলেও আপনার ইচ্ছে করবে এইবেলা এলুমিনিয়ামের বাটি হাতে খানিক ভিক্ষে করে আসি। কাজেই মেজাজকে খোকার হাতের মোয়া করে রাখার বিশেষ প্রয়োজন।

মুস্কিল হচ্ছে, মেজাজ মাপার যন্ত্র বলতে কিছু নেই। নিজের মেজাজটা যে রাজকীয় না এলেবেলে;সেটা না বুঝলে চলবে কেন। তবে, ইয়ে...উপায় আছে। মেজাজকে আঁক মেপে চিনে নেওয়ার উপায় আছে। কি ভাবে ? তা বলতেই এ পোস্টের পাঁয়তারা।

মেজাজ মাপার একটা জলবৎ-তরলং উপায় হল  অতি সহজ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া –

“ আপনার এখন কি ভাবে স্নান করতে ইচ্ছে করছে ?

কউন বনেগা ক্রোরপতির ঢঙে এখানেও থাকবে অপশন্‌স।

প্রথম অপশন - স্নান করতে ইচ্ছে করছে না ? অসময় মনে হচ্ছে  ? স্নানে অভক্তি ? অর্থাৎ - গেঁজে আছেন। মেজাজ চটকে চ হয়ে রয়েছে। আপনার মনের সাথে তুলনা করে করলাকে রসগোল্লা বলা যেতে পারে।

দ্বিতীয় অপশন - কর্পোরেশনের নল থেকে তির্‌তিরিয়ে বেরিয়ে আসা জলে ভরা এলুমিনিয়ামের বালতি। প্লাস্টিকের মগের বার দুই ঝপঝপ। সাবান-টাবানের বাড়াবাড়ির মানে হয় না। গামছা দিয়ে কড়া ভাবে গা মুছে বেরিয়ে আসা।
অর্থাৎ - আপনার মেজাজ ভারি বাড়াবাড়ি রকমের ব্যস্ত। হয়ত সামান্য বেরসিক।

তৃতীয় অপশন - খোলা শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে গা মেলে দিতে ইচ্ছে করছে বুঝি ? মাথায় শ্যাম্পু, গায়ে লাক্স, কণ্ঠে শ্যামল মিত্র ?
অর্থাৎ -আপনি প্রেমময় মেজাজে ভাসছেন। আহা:। আহা:। আহা:। এ মেজাজের আপনিকে গোটা পৃথিবী চুমু খেতে চাইবে।

চতুর্থ অপশন - পুকুরে ডুব-স্নান।
অর্থাৎ -হয় কবিতা লিখবেন নয়ত এডভেঞ্চারে বেরবেন। সহজ ভাষায় বললে, আপনার মেজাজ চাইছে চমকিলা কিছু করতে। “ থাকবো না আর বদ্ধ ঘরে / ল্যাজ নাড়বো চিত্ত ভরে” গোছের ফুর্তিবাজ ভাব।  

পঞ্চম অপশন - সমুদ্রে লাফঝাঁপ
অর্থাৎ -ফুর্তি ভালো, বেআক্কেলে আহ্লাদ ভালো নয়। মেজাজে লাগাম দিন নয়ত কপালে দুঃখ আছে।

ষষ্ঠ অপশন - সর্ষের তেল গায়ে রগড়ে সামান্য দৈহিক কসরত। তারপর নারকোল তেলে চুপচুপে করে নেওয়া মাথা। এরপর গামছা আর মার্‌গো সাবান হাতে এসে দাঁড়ানো পাতকুয়ো তলায়। ঝপঝপ ঠাণ্ডা কুয়োর জল মাথায়, ফুরফুরে হাওয়া গায়ে, মুখে গুনগুন ভুল ভর্তি রবীন্দ্রনাথ।
অর্থাৎ - হে রাজন, আপনার মেজাজই শ্রেষ্ঠ। আপনার মন এখন আলেকজান্ডার আর সমুদ্রগুপ্তের মিলিত দীপ্তিতে পরিপূর্ণ।   জাগতিক সুখ দুঃখের অনেক উপরে ভাসছে আপনার হৃদয়-সাম্রাজ্য। আপনি শুধু ভোগ করবেন না, উপভোগ করবেন প্রতিটি কানাকড়ি। আপনিই সুন্দর।  

Tuesday, July 30, 2013

দুজন


কসবা থেকে গরিয়াহাট যাব। একটানা ঝিরঝিরে বৃষ্টি। নেচে-কুঁদে কোনোক্রমে একটা ট্যাক্সি দাঁড় করিয়ে উঠতে যাব অমনি দেখি এক বৃদ্ধ এসে হামলে পড়লেন আমার গায়ে। বৃদ্ধ বলছি কারন মাথার চুল ধবধবে সাদা। পোশাক ধোপ-দুরুস্ত, পরনের টিশার্ট’টি কেতাবাজ বললে ভুল হবে না।

-      “ ইয়ে মানে আমিই ট্যাক্সি দাঁড় করালাম কি না, আপনার কি বিশেষ প্রয়োজন ?” বৃদ্ধকে জিজ্ঞেস করতেই হল।

-      “ ঢাকুরিয়া যাব। আই হোপ দ্যাট ইউ ক্যান গিভ দিস্‌ ওল্ড ফুল আ লিফ্‌ট। “
সম্মতি সূচক হাসি দিতেই হল। দুজনেই উঠে বসলাম ট্যাক্সিতে।

গপ্পে শুনে যা বুঝলাম, ভদ্রলোকের নাম অনিমেষ সেন। এক কালের ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির সেরা ছাত্রদের মধ্যে একজন ছিলেন। পরে লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিক্সে পড়াশুনা চালিয়েছেন। ইউরোপ-আমেরিকার নামী খান চারেক ইউনিভার্সিটিতে দীর্ঘকাল ছাত্র পড়িয়েছেন। বর্তমানে রয়েছেন সিয়াটেলে। আমার পরিচয় জানবার পরে নিজের ব্যাপারে  গড়গড় করে এসব ইনফো শেয়ার করে গেলেন ভদ্রলোক। বললেন সিয়াটেলে এলে যেন ওনার বাড়িতে আমি মাছ-ভাত খেতে আসি একবার। বাধ্য হয়ে ওনাকে জানাতে হল যে সিয়াটেলে গিয়ে মাছ-ভাত খেতে হলে আমাদের গড়িয়ার বাড়িটা সম্ভবত বেচে দিতে হবে। দেখলাম ভদ্রলোক সাহেবি সুরে হাসিটি বেশ রপ্ত করেছেন। বললেন “ তোমার হাসির সঙ্গে নাকি রাজা সপ্তম এডওয়ার্ডের হাসির সাঙ্ঘাতিক মিল, মে বি আই শুড এড্রেস ইউ এজ মিস্টার কিং”

“ ইয়ে, আমার ডাকনাম অবিশ্যি পচা”, জমাট হেসে বলতে হল।

গরিয়াহাট কাছাকাছি আসতে যেই পকেটের দিকে হাত বাড়িয়েছি অমনি ভদ্রলোক খপ করে আমার হাত ধরে ফেললেন।   “ নো মিস্টার কিং,  তুমি যেদিন সিয়াটেলে আসবে সেদিন বরং আমার জন্যে এক হাঁড়ি নলেন গুড়ের রসগোল্লা নিয়ে এসো। বাট্‌ আই এম দ্য গুরুজন হিয়ার। খবরদার, তুমি  ওয়ালেটে হাত দিলেই দক্ষযজ্ঞ হয়ে যাবে কিন্তু”

ভারি অমায়িক ভাবে বললেন ভদ্রলোক। লজ্জা লাগলেও না মেনে উপায় ছিলনা। গরিয়াহাটের মোড়ে আমি নেমে গেলাম। ভদ্রলোক ট্যাক্সি নিয়ে চলে গেলেন ঢাকুরিয়ার দিকে। টাটা বলার আগে ট্যাক্সির জানালা থেকে হাত বাড়িয়ে নিজের বিজ্‌নেস কার্ড দিয়ে গেলেন।
বেশ একটা ভালো লাগা নিয়ে এগিয়ে গেলাম একটা পান দোকানের দিকে। একটা ফ্লেক্‌ দিতে বলে পকেটে হাত দিলাম। টের পেলাম মানিব্যাগটি নেই।  মাথায় তড়াং করে উঠলো একটা চিন্তা। কসবায় ট্যাক্সিতে ওঠার মুখে অনিমেষ সেনের ধাক্কাটা মনে পরে গেল। তখনও হাতের মুঠোতেই রয়ে গেছে মিঃ সেন’য়ের বিজ্‌নেস কার্ডটা।  
কার্ড দেখে কোনও সন্দেহ হয় না। দেখলাম দুটোই আমেরিকার নম্বর। তবু ডায়াল করলাম মোবাইল থেকে। হয়ত ট্যাক্সিতেই পড়ে গেছে মানিব্যাগটি।

-      “ হ্যালো”, ওপার থেকে যে গলাটি ভেসে এলো সেটা চেনা ঠেকল না।
-      “ আমি কি প্রফেসর অনিমেষ সেন’য়ের সাথে কথা বলতে পারি ?”
-      “ বলছি, তা এই মাঝ রাত্রে ফোন করার কি মানে ?”
-      “ মাঝ রাত্তির মানে ? এ তো ভরদুপুর, আমি আর আপনি এই মাত্তর ট্যাক্সি ধরে কসবা থেকে গরিয়াহাট এলাম...”
-      “ ধুর, আমি তো রয়েছি সিয়াটেলেই”
ঘাবড়ে গেলাম। ভদ্রলোককে খুলে বললাম সব কিছু।
হেসে উঠলেন অনিমেষ সেন। বললেন “ শোন ভায়া, দু হপ্তা আগে দেশে গেছিলাম। ময়দানের দিকে বিকেলে হাঁটবার সময় এক বৃদ্ধের সাথে আলাপ হয়। ভারি কেতাবাজ। চোস্ত ইংরেজি বলেন। মাইকেল মুখস্থ বলেন। ব্যাটা বলে নাকি আমার হাসির সাথে রাজা সপ্তম এডওয়ার্ডের হাসির সাঙ্ঘাতিক মিল। এসব গপ্পে ভজিয়ে আমার পকেট মেরে মানিব্যাগ নিয়ে হাওয়া হয়ে যায়। হাইলি স্কিল্‌ড। ওই মানিব্যাগে আমার কিছু বিজ্‌নেস কার্ড ছিল। আর কিছু জানতে চাও ?”

হেঁচকি তুলতে তুলতে আই-এস-ডি কল’টি ঝপ করে কেটে দিলাম।  


----


ঘটনা সুত্র শ্রী শ্রী দিব্যজ্যোতি মহাশয়ের একটি অভিজ্ঞতাঃ



Thursday, July 25, 2013

চিরঞ্জিত যদি


চিরঞ্জিত আমায় যদি একবার “ এই ভাই” বলে ডাকতেন
-

রাজা হলে রাজ্য ছেড়ে দিতাম।  অমলেটের অর্ধেক দিয়ে দিতাম। মানি-ব্যাগ থেকে শেষ মুচমুচে নোট খানা বিলিয়ে দিতাম। পুরনো বই কেনা ছেড়ে দিতাম। প্রেমিকাকে ফাঁকি দিতাম। বৃষ্টির সন্ধ্যেয় ফুলুরির বদলে পেঁপে-সেদ্ধ খেতাম।

চিরঞ্জিত যদি সিনেমেয় সুরে একটি বার আমায় “ এই ভাই” বলে ডাকতেন, “ দাদা” সুরে ঢেঁকুর তুলতে তুলতে মূর্ছা যেতাম।   

Monday, July 22, 2013

দিবাকর এবং হাওড়া ব্রিজ


হাওড়া ব্রিজের একটা ডাকনাম দিলেন দিবাকর। 

একটা চটের থলিতে  ছয় কিলো গেঞ্জি-কাপড় বয়ে দৈনিক বড়বাজার টু হাওড়া হেঁটে আসেন তিনি। একটা বাস ধরতেই পারেন কিন্তু অফিস টাইমের দম বন্ধ করা ভিড়কে ভীষণ ভয় পান দিবাকর। তবে তার চেয়েও বড় কারন হচ্ছে হাওড়া ব্রিজের মায়া। সেই সতের বছর বয়স থেকে বড়বাজার থেকে গেঞ্জি কাপড় কিনে রিষড়া’র একটা আধ-কানা কারখানায় সাপ্লাই করে চলেছেন দিবাকর। বয়স এখন চুয়াল্লিশ। দিবাকর ভেবে দেখেছেন যে সময়মত বিয়ে হলে তাঁর ছেলে নান্টূ এখন ক্লাস এইটে পড়তো আর মেয়ে নিপা ক্লাস ফাইভে। এটাও ভাবা আছে যে তাঁর একটা এলো-আই-সি আর দুটো ফিক্সড্‌ ডিপোজিট হতে পারত এ বয়েসে। বুদ্ধি করে চললে সান্যালদের এক কাঠা জমি কিনে একটা ছোট পুঁচকে বাড়ি হাঁকানো কি মহা-অসম্ভব কিছু কিস্‌সা হত ?

মুস্কিল হল, বিয়ে-থা আর করা হয়ে ওঠেনি দিবাকরের। গেঞ্জির কাপড় সাপ্লাই দিয়ে যে দু পয়সা আসে তাতে তাঁর আর পিসিমার সংসার প্রায় চলে না বললেই হয়। তাও ভাগ্যি পিসেমশাই আধ-ভাঙ্গা বাড়িটা রেখে গত হয়েছেন। নয়ত পিসিমা’র সাথে ষ্টেশনের বস্তিতে গিয়ে থাকতে হত। এলো-আই-সি’র গুড়ে বালি, দিবাকরের নিজের কোনও ব্যাঙ্ক একাউন্টই নেই।
 পিসিমা’র প্রেশারের ওষুধ কিনতে গিয়েই হিমশিম খেতে হয়। দিবাকর শেষ পাঁঠার মাংস খেয়েছিলেন চার মাস আগে, পাড়ার বাদলদা’র মেয়ের বিয়েতে। 

প্রত্যেক দিন সন্ধ্যে বেলা; এই হাওড়া ব্রিজ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে দিবাকরের যে কি ভালো লাগে। মিষ্টি হাওয়ার ঝাপটা মুখে আসে, হাতের ওজন যেন হাল্কা হয়ে আসে। হাজার লোকের ভিড়েও নাভিশ্বাস ওঠে না। গঙ্গার রিম্‌ঝিম্‌ কেউ না শুনতে পাক, দিবাকর শুনে নেন। ব্রিজের ঠিক মাঝখানে গিয়ে পাক্কা পাঁচ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকেন দিবাকর। পাশের ভিড়-বাস-চেল্লাচেল্লি-ফেরিওয়ালার দল ক্রমশ হারিয়ে যায়। কালো নদীর বুকে টিম্‌টিমে কিছু আলো ভেসে যায়; দু পাশে দিয়ে ঝিরঝিরি টুনি বাল্বের মত ছড়িয়ে রয়েছে শহর। কয়েক হাজার সন্ধ্যেয় ঠিক এই একই মুহূর্ত বারবার ফিরে আসে দিবাকরের জীবনে। মাঝে মাঝে ব্রিজের এই মাঝখানের অংশটাকে সান্যালদের জমির উত্তুরে কোনা বলে ভুল হয়। হুগলীর হাওয়ায় নান্টুর বাজে-গপ্প শুনতে পারেন দিবাকর। সন্ধ্যের ঠিক এই সময়টাতেই নিপার গানের মাষ্টার আসতেন হয়ত। দিবাকর নদী-শহর মেশানো হাওড়া ব্রিজের গন্ধ নিশ্চিত চেনেন। শুধু ঠাহর করতে পারেন না যে পন্ড্‌স পাউডার আর বউ-মেশানো গন্ধটা নাকে ঠিক কেমন লাগবে। 

বিড়বিড় করে নিজের কিছু গল্প নিয়মিত নদীতে ঢেলে দেন দিবাকর। 

কলকাতা হুড়মুড় করে বদলে চলে। কিন্তু দিবাকরের চোখে এই হাওড়া ব্রিজটা একই রকম রয়ে গেল। একবার ব্যান্ডেল লোকালে এক সহযাত্রীর মুখে শুনেছিলেন যে হাওড়া ব্রিজ নাকি ফি বছর একটু একটু করে নদীর নরম মাটিতে বসে যাচ্ছে। হাওড়া ব্রিজের রেলিং’য়ে দিবাকর মাঝে মাঝে হাত বুলিয়ে দেন। জুড়িয়ে আসে শরীর। এত বছর ধরে কত গপ্প ব্রিজ থেকে সোজা হুগলীতে ছুড়ে দিয়েছেন দিবাকর; এই ব্রিজ কখনো বিরক্ত হয়নি। দিবাকর নাকি বাজে বকেন; নিজের পিসিমা থেকে পাড়ার ছেলে-বুড়ো সক্কলে তাঁর যে কোনও কথা বলতে শুরু করলেই বিরক্তি প্রকাশ করে। ছিচ্‌কেরা বোধ হয় তাকে ছিট্‌গ্রস্তও ভেবে থাকে। কিন্তু এই ব্রিজ তাকে কখনও কিস্যু বলে নি। চেনাজানা অতি-নিরেট-গবেট ভালোমানুষ এই ব্রিজ। 
“ আজ থেকে তোমায় ব্রজমোহন বলে ডাকবো। ব্রজদা চলবে ?” ব্রিজের হাওয়ায় ফিস্‌ফিসিয়ে বললেন দিবাকর।     

Thursday, July 18, 2013

কেউ কেউ


এক দল লোক কবিতা লিখে লিখে ফতুর হয়ে গেলেন।

অনেকে বিপ্লব-বিপ্লব করে করে গেঁজে গেলেন।

কেউ হুট-হাট ক্যামেরায় খচ্‌খচ্‌ করে চলেন।

কেউ হারমোনিয়ামে মেজাজি তাজমহল।

কেউ আপিসে ছুট্টে যান, ফাইল ঘাটেন, বস পোষেন, ওয়াপস আসেন।

কয়েকজন বলেন ভুতের গল্প মোমবাতিতে আর তেলেভাজায়।

কেউ বা বইয়ের ভাঁজে ভাঁজে “গ্লব-ট্রট্‌” করেন।

কেউ যেন চুমু বিশারদ।

আর কেউ কেউ ছেলেবেলার ফেলে আসা এঁদো গলির গন্ধ মনে করে হাউ হাউ করে কেঁদে ওঠেন মাত্র।  

সরলীকরণ

রাজনীতির সরলীকরণ হতেই পারে। এবং এই সরলীকরণের ভারি প্রয়োজন রয়েছে। তাতে আখেরে আমাদের প্রচুর লাভ। আহঃ, এই আখের শব্দটিতে কি সুফিয়ানা মেজাজ রয়েছে; আখের রসের মত মিষ্টি বাহার রয়েছে। তবে আখেরের কথা অন্যদিন।

আজ কথা রাজনৈতিক সরলীকরণের। বর্তমানের হিসেব-কিতেব ভারি জটিল। এবং কুটিল।  ভোট দিয়ে নেতা ঠিক করা। তারপর সেই নেতাদের হাতে নিজেদের সঁপে দেওয়া। নিজেদের ভবিষ্যতকে তাদের দায়িত্বশীল হাতে অর্পণ করা। নিজেদের ছোট ছেলেমেয়েগুলোকে রাজনৈতিক মাঞ্জায় ধারালো করে নেওয়া। সরকার-বাহাদুর আমাদের আখের গুছিয়ে দেবেন এমন সব মেজাজি অঙ্কে সামিল হওয়া।  কি অব্যর্থ রোমান্টিসিজ্‌ম। অথচ কি জটিল।

তবে দেশের আম –জনতার পক্ষ থেকে আমি কবুল করে নিচ্ছি যে আমাদের রাজনৈতিক পিতাদের প্রতি আমাদের দাবিগুলি নেহাতই অনৈতিক এবং ক্ষেত্র বিশেষে বর্বরচিত। তাঁদের প্রতি আমরা বিন্দু মাত্র সাহায্যের হাত কখনও বাড়িয়ে দিই না অথচ ওনাদের থেকে আমাদের চাওয়ায় ফিরিস্তি অশেষ। অন্তত রাজনৈতিক ক্রিয়াকর্মের সরলীকরণে সাহায্য করে আমরা তাঁদের প্রতি স্নেহজ্ঞাপন করতেই পারতাম।

আমাদের দেশের রাজনীতি সামান্য ২৩টি শিশুর আহুতি চাইলে। আহুতি বিনে এত বড় দেশ চলবে কি করে ? এই আসুরিক সমাজ-ব্যাবস্থা দাঁড়িয়ে থাকবে কোন বলে যদি এখন-তখন খান কুড়ি কচি প্রানের বিনিময় মুল্যটুকুও সমাজ দিতে অস্বীকার করে ?

কিন্তু না।  এ দেশের মানুষজন এমনই আক্কেলহীন যে সন্তানকে দু মুঠো খেতে দিতে না পারলেও স্কুলে পাঠাবার শখ আছে। আহাম্মকের দল। সরকার বাহাদুরের চরনে ২৩টা লাশ ফেলে দেওয়া কি এতই কঠিন ছিল  ? বাপ-মা’দের এত ভনিতার কি প্রয়োজন ? তেইশটা কচি গলা টিপে দেওয়া কি এতই কঠিন ? তা না করে; তাঁদের সরকারি স্কুলে পাঠিয়ে, বিসাক্ত মিড-ডে মিল গিলিয়ে, সংবাদ-মাধ্যমে হল্লা-বাজি করে সন্তান আহুতি দিয়ে; সরকারকে উদ্ভ্রান্ত করে; কি লাভ হল ? বেওকুফ যত। 

Wednesday, July 17, 2013

রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনা



রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনা কাকে বলে ?

ব্যাসন মাখা পাতলা-লম্বাটে বেগুনের টুকরোকে; টগবগে গরম তেলে ছেঁকে, কড়াই থেকে তুলে নেওয়ায় যে প্রস্তুতি।তাকে।

চীনেবাদামের ঠোঙা থেকে শেষ বাদাম টুকরোটি তুলে; শূন্যে ছুঁড়ে দিয়ে নিজের জিভের ডগা দিয়ে লুফে নেওয়ার যে দেড় সেকন্ড। তাকে।

আতপের ধোঁয়া ওঠা সেদ্ধ ভাতে ঘি'য়ের ফোঁটা মিশে যাওয়ার যে সুবাস। তাকে।

দাস কেবিনের রঙ চটা টেবিলের এক কোনে বসে, প্লাস্টিকের নুন-দানি নিয়ে খেলতে খেলতে ফিশ-কবিরাজির জন্য যে অপেক্ষা। তাকে।

বেদম গরমের রোদ মাখা জুন-দুপুরে- রাস্তার মোরের লেবু-জলের প্রথম চুমুকের গলা বেয়ে নেমে আসা। তাকে।

তেল-লঙ্কা দিয়ে মাখা মুড়িতে ভরাট মুখের মধ্যে ফুলুরির আগমনের যে তপস্যা। তাকে।

এক মুঠো সরু চালের ভাতের মধ্যে গবগবিয়ে গরম মুসুরির ডাল ঢেলে দেওয়ার যে স্পর্ধা। তাকে।

বছরের প্রথম হিমসাগরে যে আদুরে কামড় নেমে আসে। তাকে।

প্লেটের ওপরে রসগোল্লার রসধারা বয়ে গিয়ে সিঙ্গারাকে ছুঁয়ে ফেলার যে রোম্যান্স। তাকে।

"ভাত বেড়েছি, খেতে আয়"- মা'র এমন ডাক। আদত রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনা তাকেই বলে।







Wednesday, July 10, 2013

এক রেল অন্য রেল


রেলগাড়ি শব্দটার মধ্যে কি গড়িমসি স্নেহ কাঠের হাতলের দুলুনি, বাদাম-ওয়ালার হাঁক, ঘটরঘটর ছন্দএকটু চেপে বসবেন দাদা জুলুম-হীন আবদার ভাঁড়ে চা শীতের দুপুরের রোদ; অসময়ে বৃষ্টির ছাঁট; ট্রেন জানলায় কলেজ-ফেরতা পথে রেলগাড়ির ফাঁকা সীটগুলোকে অবজ্ঞা করে দরজায় দাঁড়ানো; সদ্য আবিষ্কৃত প্রেমিকার আঙুলের ডগায় গোপন নিষ্পাপ ছোঁয়া   ভিড় মেখে বন্ধুদের সাথে অক্লান্ত সব গল্পগুলো  কাঠের সীটের কোনায় কোনক্রমে বসে আনন্দবাজারি শব্দছক্নিয়ে নাড়াচাড়া

ট্রেন শব্দটার মধ্যে বড় কঠোর ভাবে একটা কারখানা রয়েছে
যেন ঘাম, অফিস টাইম, জনৈক টিফিন-বাক্সের গুঁতো, দম বন্ধ ভিড় আচমকা ঝগড়া, ডেলি-প্যাসেঞ্জারি উগ্র-হুল্লোড় ঘড়ি দেখে আঁতকে ওঠাআজকেও এত লেট

ট্রেন যদি সওদাগরি আপিসের খ্যাঁকখ্যাঁকে ওপরওয়ালা হয় তবে রেলগাড়ি হলে স্কুল-প্রেমিকা     

Friday, July 5, 2013

তস্য তস্য ঈশ্বর

তেমন কিছু নয়। একটি পোকা। কালচে, পুচকে, বিশ্রী; যেমন তারা হয়। আঙুলের ডগায় কেতরে পরে আছে। চলৎশক্তি-হীন বলেই বোধ হয়। অকিঞ্চিৎকর হুল’টির ইতিউতি নড়াচড়ায় বোঝা যায় যে বেঁচে রয়েছে। আয়তনে একটি বাঁশকাঠি চালের দানার চেয়ে দেড়গুনের বেশি  বড় নয়। মুদির দোকান থেকে বয়ে আনা ডালের প্যাকেট থেকে বের হওয়া প্রাণী। দোকানিকে যে রগড়ানি দিতে হবে তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু এই পোকাটাকে টুসকি মেরে উড়িয়ে দিতে মন চাইলো না। অতি চমৎকার দেবতা দেবতা ভাব মনে। চটকে দিতে পারি, ক্যারমের স্ট্রাইকার চালানোর ভঙ্গিতে উড়িয়ে দিতে পারি, আলতো চাপে ভবলীলা সাঙ্গ  করে ঝাড় দিয়ে সটকে দিতে পারি। আমি এই পোকাটির ঈশ্বর; আমি রাখলে থাকবে-আমি মারলে মরবে। আমার মুখের সামনে এই মুহূর্তে কেউ আয়না ধরলে  নিজের স্মিত হাসিটুকু দেখতে পারতাম।

------------------------


আমি যে ঘরে বসে, সেই ঘরটা যে পাড়ায়, সেই পাড়াটা যে রাজ্যে, সে রাজ্যটা যে দেশে, সে দেশটা যে গ্রহে, সে গ্রহটা যে মহাবিশ্বে; সে মহাবিশ্বটা আসলে একটি দানার মধ্যে রয়েছে।

দানাটি রয়েছে একটি প্রকান্ড পোকার পেটের ভিতর একটি ক্ষুদ্রকায় জীবাণু হয়ে। সেই পোকাটি অন্য এক দানবের আঙ্গুলে অসহায় হয়ে লেটকে পড়ে আছে। দানবটি মুদি গোছের দোকান থেকে ডাল গোছের কিছু খাদ্য জাতীয় বস্তু নিয়ে এসেছিলো যার মধ্যে থেকে এই পোকাটি বেরিয়েছে। দানবটি বুঝতে পারছে যে সে এখন এই পোকাটির ঈশ্বর; সে চাইলে পোকাটি মরবে; সে রাখলে বাঁচবে।   

-------------------------

ভাবনাটা এই ভিডিও থেকে টুকে নেওয়া -