Monday, December 31, 2012

কসম নববর্ষের


নিউ ইয়ার ইজ হিয়ার। সামগ্রিক ভাবে উত্তেজিতনা, রাতে অফিস পার্টিতে মাগনা-মদের ফোয়ারা ছুটবে বলে নয়, রিসলিউশণের সময় চলে এসেছে বলেনতুন বছরে অমুক-পণ, তমুক-পণ করে নিজের কলজেটাকে চাঙ্গা রাখাটা বিশেষ জরুরীতাছাড়া আজকাল নিউ ইয়ার রিজলিউশন ব্যাপারটা বেশ চলতি, এক-দুটো বাজারে না ছাড়তে পারলে লোকে ভাববে উলুবেড়িয়া থেকে লুঙ্গি পড়ে এসেছে বোধ হয়

তবে ব্যাপারটা আমি বেশ সিরিয়াসলি নিচ্ছিস্পষ্ট একট লিষ্টি-সৃষ্টি করেছি; ২০১৩ জুড়ে কী করিবো; কী করিবো না :

কি করবো :

১। মাসে দুটো করে বিদেশী লেখকের বই কিনবোএকা রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে আর  আর স্টেটাস স্টেবেল করা যাচ্ছে না।শুধু সুনীল-শীর্ষেন্দুর বইতে, ড্রয়িঙ রুমের শো-কেসটা কেমন একটা কেমন ম্যান্তা-মারা ভেতো ইমেজ প্রোজেক্ট করে চলেছে। ডিসগাস্টিং
২। এ বছর অন্তত তিনটে মোমবাতি-মিছিলে নামবোইসোশ্যাল ইমেজে ফোকাস বাড়াতেই হচ্ছে আগামী বছর। অফিসের পরমা, নন্দিতাদের কাছে ব্যাপারটা মোস্ট এপিলিং হবে।
৩। কমলালেবু ফ্লেভারের ইসবগুল চেখে দেখবো । ব্যক্তিগত জীবনে একটা নতুন কিছু করা চাই তো

কি করবো না:

১। জিমে বা যোগাসন ক্লাসে ভর্তি হওয়া চলবে না। টাকাটা খালাসীটোলা উন্নয়ন ট্রাস্টে দান করবো, তাও সইকিন্তু ওসব শরীর চর্চা-মূলক ভাঁওতা আর নয়
২। বউয়ের সঙ্গে তর্ক। নেভারকাভি নহীকিছুতেই নাযুক্তি দিলে ঝাড়, গলা উঁচু করলে কান্না, রিপার্টি দিলে ফেমিনিষ্ট হুমকি! ধুর ধুরফালতু চেষ্টা; এমন নাকালও হওয়া ২০১৩ থেকে বন্ধমতান্তরে ঘাপটি মেরে মনমোহন সেজে থাকাই শ্রেষ্ঠ বুদ্ধি
৩। বড় হাওয়াটা শুধু সেভিং-ব্লেড আঁকড়েই রয়ে গ্যালো।পাল্টাতে হবে ;অতএব - আচমকা অন্ধকার হলেই মনে মনে মা কই, মা কই” বলে রিফ্লেক্সে হাহাকার করে উঠবো না। না।না।  

Sunday, December 30, 2012

মুলাকাত

সমুদ্দুরের ধারে বসেরাত সোয়া এগারোটাশেষ ডিসেম্বরছ্যাত করে ছুয়ে যাওয়া হাওয়াপুরোনো দীঘার সৈকত-চত্তর প্রায় সম্পুর্ন ফাঁকাশেষ চা-ওয়ালা এলুমিনিয়ামের বালতি বয়ে ওয়াপস চলে গেছে আধ ঘণ্টা আগে। এই ঠান্ডায় একটু চা পেলে মন্দ হতো না কিন্তু উপায় নেই; তার জন্যে হোটেলে ফিরতে হবে। কিন্তু বসে থাকতে থাকতে নেশা ধরে গেছিলো। উঠতে গভীর অনিচ্ছা। অগত্যা গায়ের শালটাকে আরও আঁকড়ে বসলাম।

অফিসের সঙ্গী-সাথীরা হোটেলে আড্ডায় মশগুল। ফেরত গেলে সেই গতানুগতিক আধো-অফিস-আড্ডা। ধুর সমুদ্রের ধারে এমন নিরবিলি খুঁজে পেলেই বাপ্টুদার সেই অমোঘ বাতেলাতা মনে পড়ে যায় ; “ সমুদ্রের বালি-জল-হাওয়া মেলানো পরিবেশের মত এমন ল্যাদানুকূল পরিবেশ আর হয় না। হুল্লোড় বিহিন সমুদ্রের দিকে চেয়ে থাকার চেয়ে স্বাস্থকর মেডিটেশন আর হয় না।

ছোটমামা বলেন;পুরীর সমুদ্র হচ্ছে সত্যজিত আর দীঘার সমুদ্র হচ্ছে সন্দীপ। অনস্বীকার্যতবে পুরোনো দীঘার সৈকতের এই বিশেষ নিরবিলি অঞ্চলটি আমার ভীষণ প্রিয়, খোঁজ দিয়েছিলো ছোটমামা'ই

আলু-থালু ভাবতে ভাবতে চোখে একটু ঝিম লেগে এসেছিলো এমন সময় অনুভব করলাম পিঠে কেউ হাত রেখেছে।
ঘুরে দেখি এক বৃদ্ধ; অতি-শীর্ণ চেহারা, এই শীতেও পরনে শুধু একটা ফতুয়া যা দিয়ে বড় জোর টেবিল মোছার কাজ চলতে পারে আর হাফ-লুঙ্গি। স্বল্প চেহারা। ফিরিওয়ালাও নিশ্চয় নয়, ভিখিরি হবে বলে মনে হলো

-‘কী চাই ?’ – জিজ্ঞেস করতেই হলো।
-‘কিছু না – পাতলা কণ্ঠস্বর কিন্তু স্পষ্ট উচ্চারণ বৃদ্ধের।
-‘কিছু না মানে ? ডাকলেন কেনো ?’
-ডেকেছি কোথায় ? পিঠে হাত রেখেছি তাজ্জব করে দিয়ে বললেন।
-মানে ? কেনো ?’
-অবাক হলে কেনো ? একজন মানুষ তার সহ-মানুষের পিঠে হাত রেখেছে, সেটা একটা মানুষ কে অবাক করবে কেনো?’
-ধুর মশাই, কে আপনি’, বৃদ্ধর ভাষা শুনে সচেতন না হয়ে উপায় নেই।
-একটা ভুল বলে ফেলেছি। মানুষ এক মানুষের পিঠে হাত রাখেনি। আমি ভূত। একটা ভূত একটা মানুষের পিঠে হাত রেখেছে, এটা অবশ্যই নরমাল নয়, তবে মানবিকতায় আমি কোনো মানুষের থেকে কম যাই না
-কী আবোল-তাবোল হচ্ছে এটা দাদু ? বাংলা মেরেছেন নাকি ? আর আপনার কথা আর পোশাক তো মিলছে না?’
-চমত্কার পোশাক পরে যারা বন্দুক চালায়,তাদের কাজ আর পোশাক মেলে ? মিলতে হবে এমন কে দিব্যি দিয়েছে, তোমার পাশে একটু বসবো ?’
-বসুন, কে বারণ করেছে?’ বুড়ো কে ইন্টারেস্টিং ঠেকছিলো।
-নিজেকে ভূত বললেন কেনো?’ আমার হাতে বিস্তর সময়, আড্ডা মারতে আপত্তি নেই। নিজেই জিজ্ঞেস করলাম
-কারণ আমি মৃত, তাই
-ধুর
-তুমি শুধু ধুর বলতে চাওনি, তাই না? ধুরয়ের পর একটা খিস্তি চাপ ছিলো, তাই না ?’
-দাদু আপনার বাক্যি-এলেম আছে কিন্তু হাইলি-শাসপিশাস কেস আপনি। আমাকে পাকড়াও করলেন কেনো ?’
-‘এ গ্রহের একজন সহ-বাসিন্দা একলা বসে ছিলো; আমি তাকে সঙ্গ দিতে এলাম তুমি বিরক্ত হলে বা একা থাকার নিতান্ত দরকার থাকলে সরে যাবো
-আপনি এমন পোশাকে ঘুরছেন কেনো ?’
-ধর যদি বলি আমি ছদ্মবেশে আছি ?’
-‘ছদ্মবেশে কেনো আছেন? আর আমার কাছে ধরাই বা কেনো দিচ্ছেন?’
-বলবো। বলো তো বাবা, তুমি এখানে একা বসে কী করছিলে?’
- ল্যাদ খাচ্ছিলাম
-তুমি কোথায় থাকো?’
-কলকাতায়, জেনে আপনার লাভ
-কোলকাতা? বা:, সঠিক আন্দাজ করেছিলাম তোমার মত ছেলেকেই আমার বিশেষ দরকার
-ইয়ারকি পেয়েছেন নাকি ?’
-সত্যি দরকার, সাহায্য করবে?’
-আগে শুনি, আপনি কে
-আমি শ্রীযুক্ত সৌমিত্র হালদারআমার আদি-নিবাস; পুণ্য-তীর্থ কলকাতায় কলকাতা শহরের একটি সরকারী স্কুলে সম্মানীয় হেডমাষ্টার ছিলাম। এখন বাংলা-উড়িষ্যার সীমানা সংলগ্ন একটা গ্রামে থাকি। দিনমজুরি করতে মাঝে সাঝে দীঘায় আসি। আর মাঝে মাঝে আমার কলকাতার আমার একটা বিশেষ কাজের জন্যে লোক খুঁজি, এই যেমন তোমায় দেখে মনে হচ্ছে তুমি আমার ছোট্ট কাজটা করে দেবে?করে দেবে তো?’
-হেডমাস্টার থেকে দিন-মজুর? মানে ?’

-আরবনাইজেনশন আমায় নি:স্ব করে দিয়েছিলো ভাই। আমার এক মাত্র পুত্রটিকে ড্রাগ কেড়ে নিযেছিলোকন্যাটি চাকরির জন্যে হন্যে হয়ে বদ হাতে পড়ে অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছিলোআমার স্ত্রী গুমরে গুমরে কাটাচ্ছিলো। দুপুর বেলা সে ফ্ল্যাট-বাড়িতে এক ছিলো, কার্ডিয়াক এরেস্ট। প্রতিবেশীদের সামান্য সাহায্য পেলো না, আমি সন্ধ্যে বেলা এসে দেখি সব শেষ। ঘেন্না ধরে গ্যালো শহরের ওপর; শহুরে সমস্ত মানুষের ওপর; গোটা আরবান সিষ্টেমের ওপর’, বলতে বলতে বৃদ্ধ থর থর করে কাঁপছিলেন, আমার বিশ্বাস বা অবিশ্বাসের কোনও প্রশ্নই ওঠে না।
- তা আপনার কাজটা কী ?’, জিজ্ঞেস করতেই হলো।
-করবে তো?’, সমুদ্রের ফেনার মত চিকচিক করে উঠলো বৃদ্ধের দুই চোখ।
-‘শুনি কী কাজ?’
- খুব সহজ, কলকাতায় পৌছে; শহরের যে কোনও বড় রাস্তায় দাঁড়িয়ে, ঘেন্না নিয়ে এক মুখ থুতু ফেলতে হবে আর একবার চিত্‍কার করে বলতে হবে সৌমিত্র হালদার কলকাতাকে, দুনিয়ার সব শহরদের এবং শহুরে যা কিছু আছে; সমস্তটাকে ঘেন্না করে, শহুরে সভ্যতাকে লাথি মরে সৌমিত্র হালদার”।

অস্বস্তিতে উঠে পড়লাম। বৃদ্ধ পাঞ্জাবীর আস্তিন টেনে ধরলেন। জোর করে ছাড়িয়ে দ্রুত পায়ে হাঁটা লাগালাম হোটেলের দিকে। পিছণ থেকে বৃদ্ধ প্রায় প্রলাপের ভঙ্গিতে আউড়ে চলছিলেন:  “কলকাতার বুকে  আমার হয়ে থুতু ফেলবে তো ভাই ? বলবে তো আমি শহুরে সমস্ত কিছুকে কে লাথ্থি মারি ? বলবে তো ? বলবে তো?”
  


Saturday, December 29, 2012

খালাসীটোলা কী ভাবে মুছে যাবে

এদিকে
অনলাইন-সোস্যাল-বাজারি পরিবেশে, জনৈকার সাথে জনৈকয়ের অচানক আলাপআপনি-সম্বোধন ঝনাত করে সম-বয়স্কতা ও সম-মনস্কতা আবিষ্কার করে এবং  তুইতে নেমে আসা। ঈষত স্নেহ ও ডাকনাম বিনিময়। বন্ধু-সুলভ গদ্য কথা।

এমন সময় প্রশ্ন আসে পান-প্রীতির। বেবাক সাড়া দুজনেরই। দুটো সপাট খালাসিটোলা ভ্রমণের ইচ্ছে মুখোমুখি মিলিত হয়একে অপরের মন চাপড়ে নেয়। বাংলায় গান মেলে, চোলাই তালে।  

মন-ছন্দ মিলে দুজনে স্বীকার করে যে নেশা মদে নয়; সেবন-পরিবেশে লুকিয়ে রয়েছে। অতএব একে অপরকে আর একটু বুঝতে; চিনে নিতে হবে একে অপরের প্রিয় কোলকাতাইয়া-মাদক পরিবেশটিকে।
শুরু করলেন জনৈকা। নিজের প্রিয় মদ্য-ঠেকের লিস্টি;
সবেকিয়ানা-সিক্ত-ব্রডওয়ে হোটেল থেকে রুফ-টপ-রোম্যান্স-মাখা-ব্লু এন্ড বিয়ণ্ড থেকে সাহেবি-স্মার্ট-রুচি-রঞ্জিত-অলিপাব হয়ে অন্য মেজাজের সঙ্গীত-সহ নেশা ছড়ানো ট্রিন্কাস পর্যন্ত
; ছিমছাম ঝকঝকে পরিশীলিত সুর, প্রত্যয়ের রিমঝিম। 

মিষ্টি হাসিতে সাজানো জনৈকার লিষ্টিতে অভিভূত জনৈক স্মিত স্বরে জানালেন যে তিনি এ মদিরা-মন্দিরগুলির স্তুতি শুনেছেন, কিন্ত একটিতেও তার আজ পর্যন্ত পদার্পণ ঘটেনি।  
এ কেমন মদ্য-প্রীতি যুক্ত কলকাতার ভদ্র-বাবু, যিনি শহরের  এমন পান-তীর্থগুলিই ভ্রমণ করেন নি ? শিউরে উঠলেন জনৈকা।

বিবেকানন্দ-সুলভ আশ্বাস নিয়ে নিজের প্রিয় মদিরালয়ের আখ্যান মেলে ধরলেন জনৈক। নিজের অপত্য-মদ্য স্নেহ কে কেউ আড় চোখে দেখে চুকচুক করবে, এমনটা তো মেনে নেয়া যায় না। জনৈক মেলে ধরলেন মদ্য-অভিজ্ঞতা ডালি :
উত্তর কলকাতার সাবেকী বাড়ির চিলেকোঠায় মাঘের শীতে-রাত্রে; মাটির ভাঁড়ে রাম-চুমুক।
ছাতের ওপরের জলের ট্যাংকে মই বেয়ে বন্ধু সহ উঠে বিয়ার-অজ্ঞানতা-বরণ।
ফুটপাথিও-ল্যাম্পপোস্টের নিচে ইঁট পেতে বসে, কলকাতার মধ্য-রাত্রি ও এক অপরিচিত মুখ কে ভদকার প্লাস্টিক গেলাস হাতে চিনে নেওয়া; রাত জুড়ে।
 জনৈকা অপ্রতিভ হয়ে জানান দিলেন যে এই পান-অভিজ্ঞতা-সুখগুলি থেকে তিনিও বঞ্চিত।

জনৈক ও জনৈকা তখন অনলাইন যুক্তি-গুছোতে ব্যস্ত; কী ভাবে একে অপরের মদ্য-পরিবেশজনিত  অভিজ্ঞতার অভাবগুলি যৌথ-কার্যক্রমের মধ্যমে মিটিয়ে নেওয়া যায়। ঠিক হলো যে তার দুজনে সুনীল-শক্তি সুড়সুড়ি সম্বলিত খালাসীটোলায় দেখা করবেন এবং একে অপরের অভিজ্ঞতা বিকাশের স্বার্থে যথাযত প্ল্যান হাঁকবেন।

ওদিকে
ব্রহ্মা দেখিলেন ইহা এক মহাফাঁপর। দুই মাতাল যৌথ ভাবে জ্ঞান-অন্বেষণে বাহির হইলে মর্ত্তলোক নিশ্চিত ধ্বংস পাইবেদুই মাতালের মিলিত ও সুব্যবহারে শাণিত জ্ঞান-শক্তি;  নারায়ণ ও মহাদেবের যৌথ শক্তি হইতেও তীব্র- এমন সত্যটি ব্রহ্মা বিলক্ষণ জানিতেন কিন্তু এই মর্মান্তিক সত্যটি তিনি বেদ বা অন্য কোনও শ্লোক মাধ্যমে উহার উল্লেখ করেন নাই; পাছে মাতালরা তাহা জানিয়া প্রতি নিয়ত উত্‍পাত করিয়া বেড়ায়। যখনই কোনও দুইটি মাতাল জ্ঞান-অন্বেষণের স্বার্থে জোট বাঁধিতেন, ব্রহ্মা আগ বাড়াইয়া কোনওভাবে তাহাদের জোটে ব্যাঘাত ঘটাইতেন।

জনৈক-জনৈকার জ্ঞান-বিনিময় অভিসারে বিঘ্ন ঘটাইতে তথা মর্ত্তলোককে এ যাত্রা বাঁচাইয়া দিতে ব্রহ্মা ব্রহ্মাস্ত্র নিক্ষেপ করিয়া খালাসীতোলার বাংলা মদের আসরটি জ্বালাইয়া খাক করিয়া দিলেন। কিছু মানুষে ভাবিলো আপদ চুকিলো কেউ বা এই ভাবিয়া অস্থির হইলো যে; দ্যাখো সরকারের তরফ হইতে যথেষ্ট দেখভালের অভাবে এমন পবিত্র পিঠস্থানটি শর্ট-সার্কিটের আগুনে বিনষ্ট হইলো ; তাহারা মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করিয়া রাজ্য মাথায় করিলো 

খালাসি-বিযোগে জনৈক ও জনৈকা এমন ভাঙ্গিয়া পড়িলেন যে তাহারা প্রতিজ্ঞা করিলেন যে কখনোই আর একে অপরের সহিত দেখা করিবেন না

ব্রহ্মা হাঁপ ছাড়িয়া, ঘাম মুছিয়া;  মিচকি হাসিলেন।     

Friday, December 28, 2012

বিদায় পরিচিতা

এই ছিলুমএই হাপিস

বাবার চাকরি, বাবার ভোট, মার হাতের পরোটা, মার ভোট, দাদার ক্রিকেট, দাদার ভোট
আমার কলেজ, আমার সদ্য একুশ, আমার হরিণ মাংস, আমার ভোট
আমার বন্ধুরা, আমার বন্ধুটিআড্ডা-গপ্প-শয়তানীআমাদের এক রাশ ভোট

আমার বিদেশ ঘুরতে যাওয়ার স্বপ্ন,সুইজারল্যান্ড বা সিংগাপুরআহ, আর আমার ভোটটি।

বাবা বলতেন, আমি পড়াশোনা শেষ করে নিজে চাকরি করে বিদেশ ঘুরে আসবো। বাবা-মাকেও ঘুরিয়ে আনবোতিনটি ভোট, সেজে-গুজে বিদেশ ঘুরে আসবে
মা বলতেন;আমার বর আমায় বিদেশ নিয়ে যাবে। অন্য একটি পরিবারঅন্য একগুচ্ছ ভোট
বন্ধুটি বলতো আমি তোমায় বিদেশ দেখাবো, দুর্দান্ত সব ল্যান্ডস্কেপ্স, মন মাতানো শহর; প্রযুক্তির বিস্ফোরণ। সমস্ত”। একটি অসহায় সহ-পড়ুয়া ভোটনাদান ভোট
সবাই জেনে গেছিলো যে এই বুদ্ধু লড়কী বিদেশ ঘুরতে যেতে চায়।

ঠিক সে নহি পড়েগি, তো ফরেন যায়েগি ক্যায়সে বেওকুফ?”- অঙ্কর স্যার বলতেন। এই সেইবার অংকে দুম করে ছিয়ানব্বই পেয়ে বসলাম। স্যার কে বললাম, আর পাঁচটি বছর যেতে দিন; আমার সঙ্গে দ্যাখা করতে হলে বিদেশে আসতে হবে আপনাকে।
কেউ কেউ বিরক্ত হতেন আমার বিদেশ যাওয়ার নেশায়; কেন? কী নেই আমাদের দেশে ?”

ব্যাপারটা সত্যি, কী নেই আমাদের দেশে?প্রযুক্তি, বাড়ন্ত জি-ডি-পি, ক্রিকেট ওয়ার্ল্ড কাপ জয়; কী নেই ? সবই আছে। শুধু ভয় পাওয়াটা যে কেনো এমন অভ্যেস হয়ে গেছিলো। কিসের ভয় ?
ট্রেনে,বাসে, মেট্রোতে উঠতে,
বাজারের ভিড়ে,
ধর্মীয় স্থানগুলোর জটলায়,
যে কোনও মানুষের ভীড় কে ভয়।

কে বা কারা এই প্রত্যেকটি ভীড়ে লুকিয়ে থেকে আমার ওপর হামলে পড়তো ?
গা ঘিনঘিনে কথা কানে ভেসে আসতো, কখনো লোলুপ দৃষ্টির ময়লা বুকে-পিঠে ছড়িয়ে পড়তো, এবং কখনো নোংরা কিছু হাত খামচে ধরতো আমার শরীর।
মা বলতেন আমার নিজের ইজ্জত নিজের হাতে; আর কারুর দায় নয়। ট্রেনে-বাসে তো এমনটি হবেই;লোক-জানাজানি হোক; এমন ভাবে রাস্তায় যেনো কোনও চিত্কার না করে ফেলি; তাতে নাকি আরও অসম্মান; এমনটা তো হয়েই থাকে – মা বলতেন।

নিজেকে ঘেন্না লাগতো, কারা করে এমনটা রাস্তায় ? কারুর ভাই ? বাবা ? তবে কী আমারও ভাই-বাবা....! ছি: , আমি ক্রমশ অবিশ্বাস শিখেছিলামতাই ভাবতাম সব ছেড়েছুড়ে বিদেশ ফসকে যাবো

আজিব বাত দ্যাখো, যাদের প্রতি ঘেন্না এ দেশ ছাড়বো ভেবেছিলাম, তারাই আমায় বিদেশ পাঠাবার ব্যবস্থা করে দিলো। সেই অন্ধকার লোক-গুলোর মধ্যে থেকে কজন আমায় এমন ছিন্ন-ভিন্ন করে ফেললে, যে গোটা দেশ এবং মাননীয় ভারত সরকার হাত তুলে নিলে : বলে দিলেন তার যে আমায় সুস্থ করা তাদের কম্ম নয়স্নেহশীল ভারত সরকার আমার সমস্ত চিকিত্‍সার খরচ বহন করলেন, এমনকি আমায় নিয়ে গেলেন সিংগাপুর; এবং এরই ফাঁকে কাদের ওপর যেনো লাঠি-চালালেন, জল কামান হাঁকলেন; হারামজাদা লুম্পেন গুলো নাকি সরকারকে পথ দ্যাখাতে গেছিলো। রাসকেলগুলো কী দেখতে পায় না যে আমাদের পিতাসুলভ সরকার বাহাদুর কী প্রবল “ঠিক হ্যায়” সম্রাজ্য-স্থাপন করেছেন এ মহান দেশে ?

এবং আমাদের সংবেদনশীল শ্রী শ্রী মিডিয়া প্রভুগন আমায় নতুন নতুন নাম দিলেন, আরোপিত সেই নামে ভরিয়ে দিলেন খবরের ভাঁড়ার, টি-আর-পি আকাশ কে ফালাফালা করে দিলো

আমার পরিবার নাকি আমার চিকিত্‍সায় ভিষন খুশি ছিলেন, মিডিয়া এবং মাননীয় সরকার এমনটি জানালেন। সেলাম
আমি নাকি সিংহীর হৃদয় নিয়ে লড়াই করে গেছি, আমি ভিষন সাহসী, নির্ভীক ও অদম্য; মিডিয়া এবং মাননীয় সরকার এমনটি জানালেন। সেলামবিশ্বাস করুন আমি এমন অদম্য হতে চাইনি। 
বিশ্বাস করুন আমি ভিষন ভয় পাই সেই লোকগুলো কে, আর ওই অবিচলিত সরকার-বাহাদুরকে

আমি তো শুধু বাঁচতে চাইছিলাম। প্রতিশোধ নয়, সমাজ সংস্কার নয়ওই ভেণ্টিলেটরে শুয়ে যেটুকু সময় আমি ভাবতে পেরেছি; আমি শুধু বাঁচতে চেয়েছিলামনা, কোনও অফিসিয়াল স্টেটমেন্টবার বার করে দিতে আমার মন চায়নিবাঁচতে হবে, বাঁচতে হবেইমা আমি বাঁচবো, বাবা আমি বাঁচবো, দাদা প্লিজ...আমি একটু বাঁচবো

না: , আমি বাঁচতে পারলাম না। ইন্ডিয়া কী বেটি বলে আপনার কেউ পার পেতে পারলেন না। আমার মৃত্যুর দায় আপনাদের সব্বাইকে নিতেই হলো
আপনাদের তবু বোনটি, মেয়েটি প্রতিবাদ করার জন্যে রইলো, সরকারের ভোট রইলো; আমার মা-বাবাটা বড় এক হয়ে গ্যালো। যাক
একটাই ভালো ব্যাপার ঘটে গ্যালো জানেন; ওই অন্ধকার মানুষগুলোর অত্যাচারে এবং মহানুভব সরকারের স্নেহে আমার বিদেশ-ভ্রমণটা অন্তত হয়ে গ্যালো।

সিংগাপুর। আহ: কী চমত্কার শহর; ছবির মতনা, আমি দেখতে পারলাম না
বাসের ভীড়ে যখন কেউ আমায় খামচে ধরতো, কান্না আসতো। ভাবতাম; “এই পোড়া দেশে যেন মরতে না হয়”

ধন্যবাদ ঈশ্বর কে। অন্তত ভারতবর্ষের মাটির স্নেহ বহন করে আমায় চলে যেতে হলো না।