Monday, December 30, 2013

একটি চুরির ঘটনা



অনিন্দ্য নিজেকে গোয়েন্দা বলতে বেশ লজ্জাই পায়। মাসে যে কটা কেস তার কাছে আসে, তা প্রায় সবই বিয়ের আগে পাত্র-পাত্রী সম্বন্ধে গোপনে খোঁজখবর নেওয়ার জন্যে – পাত্রর মাইনে-কড়ি ঠিক কত, পাত্রীর কোনও গোপন প্রেম রয়েছে কি না ইত্যাদি। তার তোপসে নেই, আছে শুধু তার ঘরের ও অফিসের কাজের লোক কমল। তার কাছে যে এমন কেস কিভাবে এলো। ভাবতে ভালো যতটা না লাগছে, তার চেয়ে বেশি লাগছে ভয়। দশ বছর হল এ লাইনে কাজ করছে অনিন্দ্য। তার এই সুপার শার্প ডিটেকটিভ এজেন্সি পাত্রপাত্রী খবরাখবর জোগাড়ে বেশ নাম করেছে শহরে। কিন্তু তাই বলে এমন জটিল কেস ? ডাইরেক্ট মূল্যবান সম্পদ চুরি ? এমন মক্কেল তার অফিসে আসলে কি চায়ের সঙ্গে সামান্য টা’য়ের ব্যবস্থা রাখা উচিৎ ? কমলের সঙ্গে কনসাল্ট করতে হবে।

দীপক মিত্র’র চেহারা দেখে বয়স চল্লিশের বেশি মনে হয় না। চেহারা ভারি ডাক-সাইটে, হীরের ব্যবসায়ীর চেহারা এমনটাই হওয়া উচিৎ। গলার স্বর ঠিক বাজখাঁই নয়, তবে দম আছে। অনিন্দ্যর বেশ নার্ভাস লাগছিল। কিন্তু দীপকবাবু যখন জানালেন যে চুরি হচ্ছে ‘কলকাতার শীত’, তখন অনিন্দ্যর মালুম হল যে ভদ্রলোকের মাথায় ছিট রয়েছে। মানে মানে বিদেয় করতে হবে, এই ভেবে কমলকে সে ইশারা করলে যে চায়ের সাথে ফুলুরি ভাজার দরকার নেই।
   

অনিন্দ্য – চুরি যে হয়েছে, সেইটা আপনি কি করে বুঝলেন ?
দীপক – নিজের চোখে লোপাট হতে দেখছি তো।
অনিন্দ্য – আমি যদি আপনাকে পাগল বা বেয়াদব ভাবি তাহলে কি খুব অন্যায় হবে?
দীপক – না। লাল-বাজার বা অন্যান্য জায়গাতেও তাই বলেছে। তাই বাধ্য হয়ে আপনার কাছে এসেছি। আই উইল অফার ইউ টেন থাউজ্যান্ড যদি আপনি কেসটা নেন। যদি চোরকে কে বামাল ধরতে পারেন, আই উইল গিভ ইউ আ ল্যাক।
অনিন্দ্য – দশ হাজার টাকার আমার খুব দরকার। কেস নেব।
দীপক – এই খামে দশটা হাজার টাকার নোট আছে।
অনিন্দ্য – গুনে নিলাম বলে কিছু মনে করবেন না। হয়ত আপনার মাথার ছিটের সুযোগ নেওয়াটা অন্যায় হচ্ছে...
দীপক – ইট ইজ ওকে। বালিগঞ্জ প্লেসে, রাস্তার ধার ঘেঁষা একটা ঘুমটি চায়ের দোকানে ওরা এসে প্ল্যান করে রোজ। ওই দোকানটাই ওদের কন্ট্রোল রুম। কলকাতার শীত-চুরির ব্লু-প্রিন্ট ওখানেই তৈরি হয়েছে।
অনিন্দ্য – এইটে মনে হওয়ার কারণ ?
দীপক - আমার কানে এসেছে। হরিপদ আর কালু; ওদের প্ল্যান আমি শুনে নিয়েছি। লেরো খেতে গেছিলাম। আমার কান ভারি শার্প।
অনিন্দ্য – হরিপদ কে ? কালু কে ? ওরা কলকাতার শীতকে চুরি করতে চাইবে কেন ? আর ইয়ে, মানে আমি বুঝতে পারছি না আপনি এমন দড়কচা লেভেলের গুল কেন মারছেন ?
দীপক – আপনি টেন থাউজ্যান্ড রিফিউজ করছেন ?
অনিন্দ্য – না! সে ক্ষমতা আমার নেই।
দীপক – হরিপদ’র বয়স ষাটের বেশি। ওই চায়ের দোকানের মালিক। ওর ছেলে কালু। এই চিরকুটে ওদের দোকানের এগজ্যাক্ট ঠিকানা আছে। আপনি আমায় কবে রিপোর্ট করছেন ?
অনিন্দ্য – ঠিক দু দিন পরে।
হরিপদ আর কালুর জীবন-পঞ্জি বার করে পাগলটার হাতে তুলে দিলেই ল্যাঠা চুকে যায়। কেস জলবৎ অনিন্দ্যর কাছে।

গড়বড়। অনিন্দ্য বেনামি হুমকি চিঠি পেয়েছে যাতে সে এই কেস না নেয়। কেউ তার বসবার ঘরে চিঠিটা মুড়ে ছুঁড়ে ফেলেছিল। কিন্তু বড় কথা হচ্ছে, দীপকবাবু আচমকা নিখোঁজ। বাড়ির লোক ক্লু-লেস। পকেটে গরম দশ হাজার সত্ত্বেও অনিন্দ্য বেশ ফাঁপরে পরে গেল।

এই তিনদিনে হরিপদ’র যথেষ্ট খবর অনিন্দ্য জোগাড় করেছে। বা জোগাড় করার চেষ্টা করেছে। এবং তার মাথা ঘোরার যথেষ্ট কারণ আছে। কারণ অনিন্দ্য সান্যাল, যে কিনা বারুইপুরের পাত্রের সাত পুরুষের খবর মাত্র দেড় দিনে জোগাড় করে ফেলে, সে হরিপদ’র বাড়ির ঠিকানা মালুম করতে পারলে না। এই তিনদিনে রোজই হরিপদ দোকান বন্ধ করবার পর তার পিছু নিয়েছে অনিন্দ্য। কিন্তু কোথায় কখন যে হরিপদ মিলিয়ে যায়।

৬  
হরিপদ – আপনাকে কিডন্যাপ করতে ভীষণ খারাপ লেগেছে। 
অনিন্দ্য – কিন্তু করলেন কেন ?
হরিপদ – কারণ শহরের শীত চুরি হওয়ার মত এমন একটা ফালতু খবরের পিছনে আপনি দৌড় শুরু করেছিলেন।
অনিন্দ্য – দীপকবাবুকে...
হরিপদ – ইয়েস স্যার, আমিই কিডন্যাপ করেছি।
অনিন্দ্য- এমন পাগলামিকে কেন্দ্র করে আপনি দুজনকে কিডন্যাপ করলেন। এটা পাগলামি নয় ?
হরিপদ – শুধু কিডিন্যাপটাই দেখলেন ? আজ যে আপনাদের দুজনকেই খুন করব, সেটার ব্যাপারে কিছু বলবেন না?
অনিন্দ্য – আপনি উন্মাদ হরিপদবাবু।
হরিপদ – আমি উন্মাদ নেই। আর আপনার সন্দেহ ঠিক অনিন্দ্যবাবু। আমি হরিপদও নই। আমার নাম আপনি উচ্চারণও করতে পারবেন না। তবে আমায় ভালোবেসে প্রি-সু বলতে পারেন। আমি অবভিয়াসলি দেখতেও এমন নই। ছদ্মবেশ। গত ত্রিশ বছরের ধরে চা ওয়ালা হয়ে আপনাদের শহরে ঘুরঘুর করছি। আর প্রতি বছর নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি, আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রি-স্রে বা আপনাদের পরিচিত কালুর সাথে মিলে, আপনাদের কলকাতার শীতের আমেজ চুরি করি। চুরি করে সেই আমেজ কে ডিজিটাল এলগোরিদমে কনভার্ট করে আমাদের গ্রহ পেঞ্চুয়ারিতে পাঠিয়ে দিচ্ছি।
অনিন্দ্য – সাইবেরিয়া থাকতে আপনি কোলকাতা এলেন শীত চুরি করতে ?
হরিপদ – দেখুন অনিন্দ্যবাবু। আবহাওয়া ও আবহাওয়ার আমেজ চুরি এবং সেই চুরি করা আবহাওয়ায় নিজেদের গ্রহ সাজিয়ে তুলতে আমরা শিখি আজ থেকে শ খানেক বছর আগে । ইয়েস, আমাদের গ্রহের পরিবেশ আর প্ল্যানেটারি মোশনের কেনা গোলাম নয়। তারপর আমরা দু শো বাহাত্তরটা এমন গ্রহ জুড়ে জরীপ করেছি যাঁদের পরিবেশ মনোরম। এই সব গ্রহের পনের লক্ষ অঞ্চল আমরা ঘুরে বেরিয়েছি আদর্শ আবহাওয়ার খোঁজে। কিন্তু গড় বারো ডিগ্রী তাপমানের এমন মধুর মেজাজ, এমন নলেন গুড়, এমন ময়দানের শীতের বিকেলের মধু, এমন মাঙ্কি টুপির আদুরে-পনা, এমন লেপের মিঠে ওম, এমন ফুলকপির শিঙ্গাড়ার আবেশ; আমরা আর কোথাও পাইনি অনিন্দ্যবাবু। পেঞ্চুয়ারি ভীষণ ছোট গ্রহ। কোলকাতা থেকে শীত চুরি করেই আমাদের সম্পূর্ণ গ্রহের পরিবেশ গোটা বছরের জন্যে মনোরম করে রাখা যায়।
অনিন্দ্য – আমার কিস্যু বিশ্বাস হচ্ছে না...আপনি...আপনি...
হরিপদ – অত নার্ভাস হবেন না অনিন্দ্যবাবু। খুন করার কথাটা আমি ঠাট্টা করে বলেছি। আমাদের সামান্য অসতর্কতায় এই যে দীপকবাবু আর আপনি আমাদের প্ল্যান-প্রোগ্রামের ব্যাপারে সন্দিহান হয়েছেন, তাতে আমাদের ভারি অসুবিধে। আমরা শুধু আপনাদের দুজনের ব্রেন থেকে এই কদিনের স্মৃতি একদম মুছে ফেলবো। সেই টেকনোলজি আমাদের আছে। সামান্য তো শীত-চুরি, তাই নিয়ে এত মাথা ব্যথার কারণটাই বা কি অনিন্দ্যবাবু ?
       
   
আচমকা এই দশটা হাজার টাকার নোট সমেত এই খামটা তার দেরাজে কি করে এলো, তা কিছুতেই মনে করতে পারছিল না অনিন্দ্য। এদিকে কমলকে জিজ্ঞেস করাও সমীচীন মনে হচ্ছে না।তাই বলে দশটি হাজার টাকা আচমকা তার দেরাজে, দুশ্চিন্তায় পড়তে হল অনিন্দ্যকে। 

Friday, December 20, 2013

স্যান্টার সারপ্রাইজ



মন বিলকুল  ভালো নেই। ডিসেম্বর এসে গেল তবু ধোপার ব্যাটা পশমের ওভার কোট আর প্যান্টালুন ফেরত দিলে না। লাগসই টুপিখানা সেই যে গত ফেব্রুয়ারি থেকে হাওয়া, এখনও খুঁজে পাওয়া গেল না । নতুন এক খানা টুপি জোগাড় করে নেওয়া যায় বটে, তবে পুরনোটার মায়া ত্যাগ করা কি অতই মামুলি ? ওদিকে স্লেজ খানার মধ্যে রাজ্যের উচ্চিংড়ের বাস। সাফ করতে জান কয়লা হয়ে যাবে। রেইন-ডিয়ার গুলো রাম আলসে হয়ে উঠছে, দিনরাত শুধু গাণ্ডেপিণ্ডে গিলবে আর মেদ বাগাবে। কিন্তু সবচেয়ে বড় বিপদ অন্য জায়গায়। গিন্নী বেজায় জেদ ধরেছেন ডায়েট করে রোগা হতে হবে। এমন তাবড় ভুঁড়ি নিয়ে ঘুরে বেরালে নাকি গিন্নীর ইজ্জত ফ্র্যাকচার হয়ে যায়। গত দু মাস যাবত খাওয়া-দাওয়ায় জোর করে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। ব্যাটাচ্ছেলে ভুঁড়িও গিন্নীর সাথে তাল মিলিয়ে ইঞ্চি চারেক কমে গেছে ইতিমধ্যেই ।  লাও ঠ্যালা। রস ছাড়া যেমন রসগোল্লা হয় না, তেমনি ভুঁড়ি ছাড়া কি স্যন্টা ক্লজ্‌ হয় ? চিমসে চেহারার কাউকে দুনিয়ার কোন বাচ্চা কি স্যান্টা ক্লজ্‌ বলে কদর করবে ?

এই সব সাত পাঁচ ভেবে ভেবে স্যান্টার রাতের ঘুম হাওয়া। গতবারে ইকুয়েডোরের এক খুকির উপহার শ্যামনগরের এক মিচকে খোকার উপহারের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলার পর থেকেই মনটা খচ্‌খচ্‌ করছিল। ঠিক গড়বড় হল এইবার। আর হপ্তা খানেকের মধ্যে উপহারের ঝোলা নিয়ে বেরিয়ে পরার কথা, অথচ এদিকে না আছে ধড়াচুড়ো, না বাহন তৈয়ার। অন্য দিকে ভুঁড়ি বাবাজি বেজায় চুপসে রয়েছে। কোটপ্যান্ট পড়ে ফিটফাট বাবুটি সেজে যদি ট্রামে, বাসে করে মর্তলোকে ঘুরতে হয়ে তবে ইজ্জতের কোপ্তা হতে বাধ্য।

বিছানায় শুয়ে এমন সব বিদঘুটে সব চিন্তা করতে করতে সবে স্যান্টার চোখে একটু তন্দ্রা এসেছে- এমন সময় এক মিষ্টি কণ্ঠস্বরে স্যান্টার তন্দ্রা ভাঙল:
-   “ স্যান্টা, ও স্যান্টা, ঘুমিয়ে পড়লে ?”
স্যান্টা দেখলেন বছর ছয়েকের একটি ফুটফুটে মেয়ে। মিষ্টি সাদা ফ্রক পোশাকে। তার শিয়রে দাঁড়িয়ে। সম্ভবত জাপানী।
-   “ তুমি কে মামনি?” , স্যান্টা ব্যস্ত হয়ে পড়লে, “ এখানে এলে কি করে ?”
-   “ বাঃ রে, তুমি যখন আমার বাড়িতে আচমকা মাঝরাতে বাবা মা কে না জানিয়ে আমার কাছে এসেছিলে উপহার নিয়ে, আমি বুঝি তোমায় জিজ্ঞেস করেছিলাম যে তুমি কি ভাবে এলে ?”
-   “ লে হালুয়া”, স্যান্টা অবাক, “ তাই তো, তোমার নাম কি মা ?”
-   “ কিম, মনে পড়ে?”
-   “ মনে ? ইয়ে মানে, পড়ে বই কি”
-   “ কচু মনে পড়ে। ছোটরা ভগবানের মত হয় না? তাঁদের মিথ্যে বলতে নেই”
-   “ সরি মামনি। বয়স হচ্ছে তো। ভুলে যাই মাঝে মাঝে”
-   “ ওটা নদী থেকে অল্প দূরে আমাদের বাড়ি ছিল। লাল রঙের। মনে পড়ে ? “
-   “ ওটা নদী ? হি...হি...হিরোশিমায় ? লাল বাড়ি? উঠোনে সাদা রঙের দোলনা ? বাড়ির সামনে ছোট্ট একটু বাগান ? উফ, তুমিই সেই কিম যে বায়না করেছিলে যে সাইকেল না পেলে তুমি নতুন বছরে কোত্থাও না বেরিয়ে বাড়িতে গুম হয়ে বস থাকবে ? হেঃ হেঃ, তোমার বাবার মাথায় সাইকেল কিনে দেওয়ার বুদ্ধিটা আমি কেমন চমৎকার ভাবে ঢুকিয়ে দিয়েছিলাম বল। দারুণ সারপ্রাইজ ছিল না কিম ?”
-   “ বাহ, এই তো তোমার সমস্ত মনে আছে”
-   “ মাত্তর সত্তর বছর আগেকার কথা, স্যান্টার কি ভুলতে আছে?”
-   “ থ্যাঙ্ক ইউ স্যান্টা, তার পরের বছর আর আমাদের হিরোশিমায় এলে না কেন স্যান্টা ?”
-   “ পরের বছর, মানে পরের বছর ঠিক, পরের বছর...”
-   “ পরের বছর কি স্যান্টা ?”
-   “ পরের বছর ক্রিসমাসে তো তুমি ছিলেনা খুকি”
-   “জানি, অগস্টে বোমা পড়েছিল। আমাদের বাড়ির বেশ কাছেই। আমরা অবশ্য টের পাওয়ার আগেই ঝলসে গেছিলাম। কষ্ট পাওয়ার আগেই আমি বাবা, মা ও আমার ছোট্ট ভাই ছাই হয়ে গেছিলাম জান? আর শুধু কি আমরা, সত্তর হাজার মানুষ সেই রাত্রেই... ও কি, তুমি কাঁদছ?”
-   “তুমি সে বছর আমার কাছে একটা কলের পুতুলের জন্যে বায়না করেছিলে কিম। কিন্তু যে মানুষের কাছে বন্দুক-বোমা থাকে; তাঁরা যে আমার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী কিম। আমি পেরে উঠিনি ওদের সাথে। তোমার জন্যে কলের পুতুল আমি আনতে পারিনি মামনি। পারিনি”
-   “তুমি কি করবে বল স্যান্টা ? তুমি তো আমাদের কথা শুনতেই। কিন্তু তার আগেই তো...কিন্তু স্যান্টা একটা কথা বল, আরও যারা রয়ে গেছিল, তাঁদের জন্যে অন্তত তুমি সে বছর হিরোশিমাতে গেলে না কেন ?”
-   “ সাহসে কুলোয় নি। অত রক্ত, অত যন্ত্রণা। কার জন্যে উপহার নিয়ে যাব মামনি ? কেউ তো স্যান্টার কাছে আবদার করার মত অবস্থাতেই ছিলনা”
-   “ কেউ কিছু না চাইলে বুঝি যেতে নেই ? আচ্ছা স্যান্টা , যারা আমাদের বাড়ির ওপর বোমা ফেলেছিল, সে বছর তুমি তাঁদের বাড়িতে গেছিলে ?”

স্যান্টা’র দম বন্ধ আসছে মনে হচ্ছে। কিম তাঁকে আদর করে জড়িয়ে ধরছে কিন্তু স্যান্টা শান্ত থাকতে পারলেন না। হু হু করে কেঁদে উঠলেন। সে কি হাউ হাউ বুক ফাটা কান্না। সম্বিত ফিরল গিন্নীর ঝাঁকুনি তে।
_ “ অমন ফেউ ফেউ করে কান্না কেন মিনসে ?”
স্যান্টা ধড়ফড় করে উঠে বসে দেখলেন মাঝরাত। কিম কি তবে স্বপ্নে এলে ? সত্যি নয় কি ? আচমকা স্যান্টা অবাক হয়ে দেখলেন তার নাদুস নুদুস ভুঁড়িটি আবার ফুলে ফেঁপে আগের মত হয়ে গেছে। স্যান্টা বুঝলেন যে কিম সোনা তাঁকে তার ভুঁড়িটি উপহার দিয়ে গেছে। মনে প্রাণে চাইলে সবার জন্যেই স্যান্টার উপহার অজান্তেই এসে হাজির হয়। বাপেরও যেমন বাপ আছে, স্যান্টারও স্যান্টা রয়েছে।
“ মেরি ক্রিসমাস”, হাঁক ঝালাতে ঝালাতে সেই মাঝরাত্তিরেই স্যান্টা ছুটলেন স্লেজ সাফ করতে। 




Sunday, December 15, 2013

শীত Of কোলকাতা - The Essential Elements

ডিসেম্বর জুড়ে বসছে শহরে। সন্ধ্যের মুখে হাফ সোয়েটারটি আর বেমানান মনে হচ্ছে না। কলকাতাইয়া হাওয়াতেও চামড়ায় ছ্যাঁত হচ্ছে। সেন মহাশয় নলেন গুড়ের সন্দেশে বাজার মাতাচ্ছেন।
তা বাঙালির শীত পিকাসিও হয় কি প্রকারে ? বহুবিধ আবেদনময় পৌষ-মাঘি সৌখিনতার হাত ধরে। রবীন্দ্রনাথ বিনে বাঙালি হয়তো বা বাঙালি হলেও হতে পারতে; তবে পৌষ ম্যাজিক বিনে বাঙালিজ্‌ম বলে কিছু থাকতো কিনা সে বিষয়ে সবিশেষ সন্দেহ আছে।
বঙ্গ-শীতের সেরা মশলাগুলো কি কি ? অগোছালো ভাবে সাজিয়ে দেওয়া যাক Essential Elements of Kolkata Winter ----



চড়ুইভাতি। অর্থাৎ পিকনিক (ফ্যামিলির সাথে) বা ফিস্টী (পাড়ার বন্ধুদের সাথে)। 
The mandatory Picnic

   


সিঙ্গারায় ফুলকপি
Singara with traces of Cauliflower in It

(ছবিটি নেওয়া হয়েছে এখান থেকে- bloomsnpetals.blogspot.com)


চেজমি গ্লিসারিন সাবান
Glycerine Soap
 

ডাবর চ্যবনপ্রাশ
Warmth of Chawanprash



নতুন আলু
Fresh Potatoes




চিড়িয়াখানায় সকাল
Mornings spent at Alipore Zoo



ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে বিকেল বেলা
Late Afternoon Trips to Victoria Memorial



করাইশুটির কচুরি
Peas Kochuri

(ছবিটি নেওয়া হয়েছে এখান থেকে- saffronstreaks.com)

নলেন গুড়ের সন্দেশ
Nolen Gur Sondesh
 (ছবিটি নেওয়া হয়েছে এখান থেকে- banglasweets.wordpress.com)

জয়নগরের মোয়া
Joynogorer Moa
 
(ছবিটি নেওয়া হয়েছে এখান থেকে- bongcookbook.com)

লেপ
The Benglicized Quilt

কইমাছের ঝোলে ফুলকপি
Koi-Fish with Cauliflower
(ছবিটি নেওয়া হয়েছে এখান থেকে- lassiwithlavina.com)


পার্ক স্ট্রিটে বড়দিনের সন্ধ্যে
Christmas Evening at Park street

ইডেনে টেস্ট ম্যাচ
Test Match at Eden Gardens

পাঠিসাপটা
Pathisapta
(ছবিটি নেওয়া হয়েছে এখান থেকে- madhurrecipes.com) 

পাড়ার জলসায় রাতজাগা
Night Long Music Shows across the Paras


বছর শেষের রাত্রে আলতো হুইস্কির স্নেহ। সাহেবি নতুন বছরে সাহেবি মেজাজের কনসেপ্ট।
The New Year's Eve Whiskey. Sahib's Calendar should be celebrated in Sahib's fashion. 



ভোরের কুয়াশায় ময়দান ভ্রমন
Early morning walks across foggy Maidan
 (ছবিটি নেওয়া হয়েছে এখান থেকে- knowallsbox.com) 

শাল মুরি দিয়ে সন্ধ্যেবেলার চপ-মুড়ি
Wrapped up in a Shawl, Engaged in Chop-Muri
 (ছবিটি নেওয়া হয়েছে এখান থেকে- spicesandpisces.wordpress.com)

ডিনার শেষের সাহেবি কফি
The Post Dinner Coffee. Colonial Charisma speaking.


রাত্রে ভাতের বদলে রুটি
Roti replaces 'Bhaat' in the Dinner Menu 
(ছবিটি নেওয়া হয়েছে এখান থেকে- mansuraudraji.wordpress.com)

মাঙ্কি টুপি
Monkey Cap. The Crown. 

বোরোলিন
Boroline

চলো পুরী
Let's go to Puri

ফুচকায় বাড়তি ঝাল
Raising the Chili quotient of Fuchka to jack up the heat
 (ছবিটি নেওয়া হয়েছে এখান থেকে- viji-vijisworld.blogspot.com)

ছাদের রোদে বালতি রেখে জল গরম
Keeping the Bucket full of water under the roof top sun. For natural geyser effect. 


সর্ষের তেল মেখে স্নান
That classy mustard oil massage before bath. To amputate the remotest of Cough & Cold possibilities.  

সোয়েটারে ন্যাপথলিনের গন্ধ
The Napthalene flavored Sweaters


পেঁয়াজকলি দিয়ে মৌরলা মাছের ঝাল
Mourla Fish spicy curry with Spring Onions
PiyaajKoliMaach2
(ছবিটি নেওয়া হয়েছে এখান থেকে- bongcookbook.com)

নিউ মার্কেট চষে সেরা কমলা লেবুর খোঁজ
Exploring New Market for the finest Oranges

দ্য হাইয়েস্ট ফর্ম অফ ডিম- হাঁসের ডিম’য়ের বাড়তি ব্যবহার
The highest form of edible Eggs; The Ducks egg; assumes a far more significant role during this time.


বইমেলা; কালীঘাটের চেয়েও পবিত্র পীঠস্থান
Book Fair; Even the Kali Ghat is not as sacred.

পাড়ার মেলায় নাগরদোলার দোলন ও বেগুনী ভক্ষণ
Twisting on the Fancy Rides and Gorging on the Begunis at Para Fairs



বোলপুরে দু দিন গা এলিয়ে পৌষ মেলা
A leisurely trip to Bolpur's Poush Mela

মাফলার’য়ের আদর ঘোমটা
The Ghunghat of Muffler 




    এ লিস্ট অবশ্যই অসম্পূর্ণ; এ পোষ্ট দীর্ঘতর হবে এমনটাই আসা। ইংরেজিতে যাকে বলে “Suggestions are welcome”. 

Wednesday, December 11, 2013

অফিসার

জীবনে রয়েছে শুধু অফিস, মাছের বাজার আর মাস কাবারি। এর বাইরে সব ফাঁকি। যেদিন অফিস ফুরোবে; রেসিডিউ হিসেবে পড়ে রইবে শুধু ডায়াবেটিস আর ব্লাড প্রেশার। বউ, খোকা, বাবা, মা এ সবই ট্রান্সিটরি ব্যাপার। লাইফের নিউক্লিয়াস হচ্ছে অফিস। দিনে আট ঘণ্টা ঘুম, হাতে রইলে ১৬ ঘণ্টা। বাসে-ট্রেনে-বাথরুমে-বাজারে ৪ ঘণ্টা। হাতে রইলে বারো ঘণ্টা। এই ব্যবহারিক বারো ঘণ্টার মধ্যে বেবাক দশ ঘণ্টাই হজম করে নেয় অফিস। আর দু ঘণ্টা পরিবার- পরিজন – আত্মীয়স্বজন নিয়ে হাহাকার করে কি হবে ? অফিসই রামকৃষ্ণ।

বস’ও খেপচুরিয়াস, বউ’ও ডাইনোসরিও। বউ কে তোল্লাই দেব আর বস কে দেব পেল্লায় খিস্তি-সব, এ কেমন কথা ? ভেবে দেখলাম বউ কে যেমন ভাবে সামাল দিই, ঠিক একই ভাবে বস কে ম্যানেজ করতে পারলেই ল্যাঠা চুকে যায়।  

বস সেদিন বললে “ তোমার মার্কেট শেয়ার গোল্লায় যাচ্ছে হে, এমন গদাই –লস্করি করে চললে তোমার মুণ্ডুটি আস্ত থাকবে ভেবেছ ?” মনে মনে বস’কে বললাম- “ রেগে যেও না মাইরি, নেক্সট পুজোয় একটা বালুচরি। প্রমিস”।  ব্যাস অমনি রাগ গলে জল; বসের রাগ নয়,  আমার রাগ গলে জল। ঠাণ্ডা মেজাজে বসের সমস্ত রাগ অ্যাবসর্ব করে নিলাম।

আমি খাটলাম, আর প্রমোশন পেলে পাশের টেবিলের সামন্ত। সামন্তর অফার করা জলভরা উত্তমকুমারের হাসি ছুঁড়ে গ্রহণ করলাম। সন্ধ্যাবেলা নিজেকে একটা দামি হাত ঘড়ি উপহার দিলাম বছরভর অফিসে মার-কাটারি কাজ করবার জন্যে। আমিই আমার ম্যানেজমেন্ট। নিজের পিঠ আমি নিজেই চাপড়ায়েগা।

সেদিন পিওন হরিহর বললে যে মাঝে মাঝে বস আর সামন্ত আড়ালে-আবডালে আমায় নিয়ে “ গবেট” বলে হাসাহাসি  করে। হরিহর কে একটা গোল্ডফ্লেক অফার করে বোঝালাম , “ তুই জানিস, মানুষকে হাসাতে পারার ক্ষমতা ইজ দি হাইয়েস্ট ফর্ম অফ সুপার পাওয়ার ? আমার বাড়ির লোক তো সর্বক্ষণ  তেলে-বেগুনে হয়ে রয়েছে; হামেশাই ডিম্যান্ড পেশ হচ্ছে- বাবা’র নস্যি নেই, মা’য়ের কোমরের ব্যথার মলম নেই, বউয়ের হিল তোলা চটি নেই, ছেলের পোকেমন টিশার্ট নেই। বাড়িতে তো আমায় দেখে কেউ হাসে না, শুধু গুরু-গম্ভীর সব দাবী ঝেড়ে চলেছে- এই নেই, সেই নেই, ওটা কর, ওখানে যাও, অমুককে সামলাও, তমুককে ধর। আমার এই অফিস টেবিল আর এই চেয়ারখানি তো আমার ওয়েসিস রে। তুই যখন আমায় চা-বিস্কুট দিস, নিজের গা থেকে কেমন সাহেব-সুবোর মত গন্ধ পাই। এই আমার মত এমন দামড়ার কথা ভেবে বস আর সামন্ত যদি একটু হাসতে পারে, তবে সেটা তো আমার অ্যাচিভমেন্ট, কি বলিস ?”

যাওয়ার আগে হরিহর   বিড়বিড় করে যে কাকে “ক্যালানে” বললে সেটা ঠিক ধরতে পারলাম না।