Showing posts with label Bengali Cuisine. Show all posts
Showing posts with label Bengali Cuisine. Show all posts

Monday, August 26, 2013

মাধুকরী


ঘুগনি। পাঁঠার কিমা ছড়ানো আবেদনময় ঘুগনি। এলুমিনিয়ামের ডেকচিতে টগবগ করে ফোটা পিকাসো মেজাজের ঘুগনি।

মোড়ের মাথার মাধবদা’র ঠেলা।  থরে থরে ষ্টীলের প্লেটে ঘেরা ঠেলার চারপাশ। কেরোসিনের পাম্প দেওয়া স্টোভের গনগনে আঁচ। তার ওপরে মোহময় সেই ডেকচি। যার ভেতরে ফুলে ফেঁপে উথলে উঠছে ঘুগনিয় ঈশ্বর। পাশে প্লাস্টিকের মাঝারি মাপের সবুজ গামলার তিন ভাগ জুড়ে কুচোনো পেঁয়াজের ঢিপি আর বাকিটা জুড়ে লংকা কুচি। ঠেলার অন্য প্রান্তে রয়েছে ষ্টীলের একটা বেয়াড়া সাইজের বাটি – ওতে আছে তেঁতুল গোলা জল। সঙ্গে এক এলুমিনিয়াম গামলা সেদ্ধ খোসা না ছাড়ানো ডিম এবং এক বড় থলি ভরা মোহন বেকারির লম্বা পাউরুটি।

মাধবদা ঠিক সন্ধ্যে ছটায় ঠেলা নিয়ে মোড়ের মাথায় আসেন। ঘুগনি গরম করে নিতে তার লাগে মিনিট কুড়ি। তারপর তার ঠেলা ঘিরে খরিদ্দার জমতে থাকে। তিন ধরনের খরিদ্দার;
এক দল যারা শুধু ঘুগনি খান।
একদল যারা এক প্লেট ঘুগনি খেয়ে একটা বা দুটো ডিম সেদ্ধ খান।
আর আর এক দল যারা ঘুগনিতে ভিজিয়ে পাউরুটি খান।
মাধব’দার ঘুগনি পরিবেশন দেখাবার মত ব্যাপার ছিল। খদ্দের নতুন হলে জিজ্ঞেস করে নিতেন নুন-ঝাল-টক কেমন পড়বে ? মাধবদা বলতেন;
“শুধু ঘুগনি কাঁচা মাটির মত ব্যাপার, তাতে তুমি কেমন ভাবে পেয়াজ-লংকা কুচি তেঁতুল জল, বিট নুন ছড়িয়ে চাস-আবাদ করবে সেটা তোমার ব্যাপার। কাজেই খদ্দেরের থেকে আগে জেনে নিতে হয় যে সে কেমন স্বাদ চাইছে।  নয়ত দেখব সে চাইলে ধান; আমি ফলিয়ে দিলাম ফুলকপি। বুঝলে ?”      

মাধবদা অতি যত্নে প্লেট চামচ ধুতেন। ঝকঝকে প্লেটে গরম ধোঁয়া ওঠা পাঁঠার ঘুগনি; তার ওপর পেঁয়াজ কুচি-লংকা ছড়ানো, তেঁতুল জল মিশিয়ে নেওয়া। আহা:, ভাবলেই জিভে-চোখে জল চলে আসে।

ঠিক সন্ধ্যে সাড়ে সাতটার মধ্যে মাধবদা’র ভাঁড়ার সম্পূর্ণ ভাবে খতম হয়ে যেত; গোটা বছর, প্রত্যেক দিন। দিনে এই সোয়া ঘণ্টার ব্যবসা চলত মাধবদার। সেই সোয়া ঘণ্টা পাশের অন্য ঘুগনির দোকানগুলো মাছি মারত, মাধবদা ঠেলা সরিয়ে চলে গেলে তবে তাঁদের ঘুগনি বিক্রি খোলতাই ভাবে শুরু হত। এমন ছিল মাধবদার ঘুগনির সুনাম।

একদিন মাধবদাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে সে আরও বেশি করে ঘুগনি-ডিম সেদ্ধ নিয়ে আসে না কেন। তাহলে সে আরও বেচতে পারতে; আরও মুনাফার সুযোগ থাকত। এক গাল হেসে মাধবদা বলেছিলেন;

“ আরে ধুর, এতেই যা দু পয়সা আসে তাতে আমার দিব্য চলে যায়। আরে বাবা, আমি কি ব্যবসা করি না কি গো ? আমি করি মাধুকরী। দরকারের বেশি পয়সাকড়ি নাড়াচাড়া করে তারপর চিন্তায় চিন্তায় গোল্লায় যাই আর কি। আমাকে বোকা ঠাউরেছ ?”      

Tuesday, August 20, 2013

বাঙালি ও বৃষ্টির ব্যাপার-স্যাপার



বৃষ্টির ব্যাপারে কবিতা লিখে আর গান বেঁধেই যেন সব্বার দায়িত্ব খালাস। বৃষ্টিতে ভেজার বেলায় শুধু রবিনা ট্যান্ডন।  বৃষ্টির ছাঁট সামান্য গায়ে এসে পড়েছে কি আঁতকে ওঠা শুরু। জামা কাপড় বিগড়ে যাওয়া, অসময়ে জ্বর; এমন হাজার চিন্তা মানুষের মনে।  
বৃষ্টির উৎপাত এড়াতে মানুষের কত ফন্দি ফিকির।
কেউ বানালেন ছাদ।
কেউ বুদ্ধি করে আবিষ্কার করে ফেললেন ছাতা।
তৈরি হল হাই-ড্রেন।
পথ চলতি মানুষের গায়ে উঠলো বর্ষাতি, পা ঢাকতে গাম বুট।

তবে বৃষ্টি আটকানোর এই দুর্বুদ্ধিগুলোর একটাও কিন্তু বাঙালির আবিষ্কার নয়। বৃষ্টিকে বাঙালি সামাল দিয়েছে গাঙ্গুলিও-কভার ড্রাইভের কেতায়।
বাঙালি বৃষ্টিকে আপন করে নিয়েছেন বহুবিধ মায়াবী অস্ত্রে;
-      খিচুড়িতে
-      ফুলুরিতে
-      ইলিশে
-       “কোমরের ব্যথাটা রিল্যাপ্স করেছে স্যার, আজ অফিস আসতে পারছি না” মূলক ছুটিতে।

যে বাঙালি দৈনিক সংসার ও অফিসের যৌথ রগড়ানিতে নিয়মিত চিমসে যাচ্ছেন, বৃষ্টির সন্ধ্যেয় তার মেজাজেও রয়েল বেঙ্গলি হালুমের ছাপ এসে যায় এবং আলেকজ্যান্ডারি কেতা নিয়ে তিনি পেঁয়াজি  ও রবীন্দ্রনাথে ঝাঁপিয়ে পড়েন।  

Thursday, August 1, 2013

অ-লংকা-র


শুকনো লংকার ঝালে রয়েছে বনেদী মেজাজের গন্ধ। জলসাঘরের ভাঙ্গা কাঁচের গেলাসের খনক্‌। চাবুকের সপাং’য়ের মেজাজ। মাছের কালিয়ার দাপটের উৎস। আলু সেদ্ধ মাখার জৌলুস। মুসুরি ডালের বাহারি ফোঁড়ন। আদরহীন সোহাগ, সাবেকী দাপট। ব্যবহার করতে জানলে মাঞ্জাবতী সুতো, না জানলে গলার দড়ি।

আষাঢ়ে আকাশের দুষমনির ছোঁয়া যেমন   প্রেমেও চাবকায়, বিরহেও কাতরায়; তেমনি শুকনো লংকা পাঁঠার ঝোলেও দীপ্তি আনে, চাটনিতেও চোরা-স্রোত টানে। আপসহীন সাম্রাজ্যবাদী।

কাঁচা লংকা অন্যদিকে শিউলি মেজাজের বিপ্লবী। হাফ-পাঞ্জাবির তরুণ প্রেমিক। গরম-ঘি-ভাতের তুলসী মঞ্চ, আলু ভাজার ফাঁকে স্নেহ-টুকরো। তরতাজা উচ্ছ্বাস। স্নেহের সুবাসে বুকভার করে দিতে পারে, আবার পারে ক্ষিপ্ত আচমকা-আগুনে উড়িয়ে নিতে। আলু চচ্চড়ির আটপৌরে মা-ডাক হোক, সর্ষে ইলিশের প্রেম – কাঁচা লংকাই উত্তম কুমারিয় হাসি। রণে, বনে, জঙ্গলে,, ফুটপাথে – কাঁচা-লংকায় উত্তরণ ঘটবেই।  
শুকনো লংকায় যদি বিশ্বজয় সম্ভব হয় তবে কাঁচা লংকা হল গীতবিতান।



Wednesday, July 17, 2013

রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনা



রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনা কাকে বলে ?

ব্যাসন মাখা পাতলা-লম্বাটে বেগুনের টুকরোকে; টগবগে গরম তেলে ছেঁকে, কড়াই থেকে তুলে নেওয়ায় যে প্রস্তুতি।তাকে।

চীনেবাদামের ঠোঙা থেকে শেষ বাদাম টুকরোটি তুলে; শূন্যে ছুঁড়ে দিয়ে নিজের জিভের ডগা দিয়ে লুফে নেওয়ার যে দেড় সেকন্ড। তাকে।

আতপের ধোঁয়া ওঠা সেদ্ধ ভাতে ঘি'য়ের ফোঁটা মিশে যাওয়ার যে সুবাস। তাকে।

দাস কেবিনের রঙ চটা টেবিলের এক কোনে বসে, প্লাস্টিকের নুন-দানি নিয়ে খেলতে খেলতে ফিশ-কবিরাজির জন্য যে অপেক্ষা। তাকে।

বেদম গরমের রোদ মাখা জুন-দুপুরে- রাস্তার মোরের লেবু-জলের প্রথম চুমুকের গলা বেয়ে নেমে আসা। তাকে।

তেল-লঙ্কা দিয়ে মাখা মুড়িতে ভরাট মুখের মধ্যে ফুলুরির আগমনের যে তপস্যা। তাকে।

এক মুঠো সরু চালের ভাতের মধ্যে গবগবিয়ে গরম মুসুরির ডাল ঢেলে দেওয়ার যে স্পর্ধা। তাকে।

বছরের প্রথম হিমসাগরে যে আদুরে কামড় নেমে আসে। তাকে।

প্লেটের ওপরে রসগোল্লার রসধারা বয়ে গিয়ে সিঙ্গারাকে ছুঁয়ে ফেলার যে রোম্যান্স। তাকে।

"ভাত বেড়েছি, খেতে আয়"- মা'র এমন ডাক। আদত রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনা তাকেই বলে।







Friday, January 18, 2013

হেসে-ভালোবেসে

মগ হবে তো এলুমিনিয়ামে
নাড়ু হবে তো মিল্কমেডি নারকোলে
মুড়ি মাখা হবে তো আম-তেলে।
ইলিশ হবে তো ডিমে টইটুম্বুর পেটীতে।
আড্ডা হবে তো গোল্ডফ্লেকে।
একলা হবে তো বৃষ্টিতে।
দোস্তি হবে তো খিস্তিতে।  
জানুয়ারীও ভাত-ঘুম হবে তো জেলুসিল আর লেপ-মুড়িতে।
প্রেম হবে তো হাত-চিঠিতে।
চুমু হবে তো জিভ-চকামে।

আর সুর হবে তো ব্যথায়
শিরশিরে চিনচিনে যন্ত্রনায়, অন্ধকারে। যখন দুমরে-মুচড়ে ঘাপটি মেরে থাকা যন্ত্রণাগুলো মাকে পায় না; তখন গুটিগুটি সলিল এসে জড়িয়ে ধরবেন ,

“কখন জানি না সে, তুমি আমার জীবনে এসে, যেন সঘন শ্রাবণে প্লাবনে দুকুলে ভেসে...শুধু হেসে; ভালোবেসে”

Thursday, April 19, 2012

লুচি-জলখাবার' কথা

প্রতিটি লুচির সঙ্গে আমি উর্বর থেকে উর্বরতর হয়ে চলি। বেগুনভাজার প্রতিটি কামড়ের ফলে আমার রন্ধ্রে জড়ো হয় স্নেহ-উল্লাস। আলু ভাজা যে মুহূর্তে জিভ ছুয়ে যায় সে মুহূর্তে আমি খুঁজে পাই দিন খাই-নির্ভরতার স্পর্শ। ধবধবে, ময়দায় প্রস্তুত, বর্তুল অতি-দৈবিক সৃষ্টি এই লুচি, কখনো গোল বেগুন ভাজার খোবলানো হৃদয়, কখনো মিহি আলু-ভাজার সাথে নিবিষ্ট হয়ে; মুখের ভিতরে লালা-মিশ্রিত হয়ে স্বর্গীয় মণ্ডে পরিণত হয়। সেই প্রাণাধিক লুচি-আলু-বেগুন মণ্ড গলা বেয়ে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় উদরে নামে বটে, কিন্তু রসিক মাত্রই জানেন যে লুচির জাগতিক অস্তিত্বটুকু উদর-মুখী হলেও; লুচির পরমাত্মা নেমে আসে মানব হৃদয়ে। স্নায়ু এরপর সড়গড় হয়ে ওঠে, মানসপটে ভেসে ওঠে জিহ্বা-প্রেরিত সূর্যদয়নোনতা-ঝালের তৈল স্পর্শ ঝেড়ে লুচি-খন্ড স্বল্প-মিষ্ট পায়েসে গা-ভাসিয়ে খোঁজে উন্মেষ। পবিত্রতা পায় এক অতি সাধারণ নাগরিক প্রাত:রাশ।

এরপর জিলিপির সহজ কামড়ে নির্মল ভালোবাসায় স্তিমিত হয়ে আসে সকালের ক্ষুধা। সুস্বাগতম দিন ও দৈনিক যুদ্ধগুলি। 

Saturday, March 24, 2012

রবিবারের জলখাবার

হিং'য়ের কচুরী: দক্ষিণেশ্বর

বাঙালি রকেট হলে রবিবারের জলখাবার হলো Launching-Pad”- ছোটোমামা

সপ্তাহ কেমন কাটবে? মেজাজ দুরুস্ত থাকেবে তো? শরীর ঝ্যামেলায় ফেলবে না তো? হপ্তা-ভর সব কিছু খাপে খাপ খেলে যাবে তো? এর জন্যে একটাই Pre-Conditionজম্পেস রবিবাসরীয় জলখাবার
বাজার-বিজয় সেরে, হাত-পা ধুয়ে, টেবিলের ওপর আনন্দবাজার মেলে বসে, জলখাবারে ফোকাস; এর অন্যথা হয়েছে কী সপ্তাহের জন্যে মেজাজটা ধাপার মাঠ হয়ে যাবে। আর জলখাবারে থাকবে কী? একটা Ready Reference তৈরি করে রাখলাম:

(বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই লিষ্টি-টি ক্রমশ পরিশীলিত ও পরিবর্ধিত হবে, এমন আশা রাখি)

১। খাস্তা কচুরী-ছোলার ডাল-জিলিপি-দরবেশ

হিঙ্গের কচুরী-ছোলার ডাল-জিলিপি-রসগোল্লা

কড়াইসুটির কচুরি-নতুন গা-মাখা আলুর দম-চমচম (শীতকালীন)

৪। রাধাবল্লভী, আলুর দম, মুগ-ডালের হালুয়া, চমচম

৫। লুচি (ময়দার-গাওয়া ঘিয়ে ভাজা), আলু ভাজা (কালো জীরে মাখানো), বেগুনভাজা, গরম-রসগোল্লা

৬। মুড়ি-ঘন স্বর-মিশ্রিত দুধ-আম একসাথে মিশয়েশেষে আমের সরবত

৭। টাটকা ইলিশ মাছের পেটি ভাজা, বাঁসি ভাত মাছ ভাজা তেল ও কাঁচালঙ্কা দিয়ে মেখে, আজ্ঞে হ্যাঁ

৮। দুধ-খই, মুড়কি, কদমা, মঠ। সঙ্গতে স্বাদ-বদলির জন্যে ঝুড়ি-ভাজা। (বছরের সেই বিশেষ সময়টির জন্যে)

লিষ্টিতে আরও কিছু খাদ্য-মহীরুহ ঢুকবে অবশ্য! কিন্তু কী ঢুকবে না তাও নিশ্চিত। এই নিচের ফচকে ও-জলখাবারিক ব্যাপার-স্যাপার গুলো বাঙালি যত নিজের রবিবার থেকে দূরে রাখে ততই দেশের মঙ্গল, দশের মঙ্গল:

-পাউরুটি বিষয়ক কোনও কিছু ( না ফ্রেঞ্চ-টোস্টের নষ্টামিও নয়)
-নুডল (ম্যাগী-চাউমিন? রবিবারে? রামো: )
-কর্ণফ্লেক্স (এটা রবিবার কেউ ভাবলে তার উঠবোস করে নেওয়া উচিত, ১২ বার)
-যা কিছু মাইক্রোওয়েভ থেকে বেরিয়ে এসেছে

পুনশ্চ:রবিবার।বউ বাপের-বাড়ি গ্যাছে, সকালে Micro-waved-লাপসি-ম্যাগী খেয়েছি। ছোটোমামা ফোন করেছিল ডাল-কচুরী চিবুতে চিবুতেশুরুর বাকতাল্লাতা তখনই শুনিয়েছিলো
  





Thursday, December 1, 2011

সীতাভোগ-মিহিদানা ও ছোটোমামা




মত্‍স মারিব খাইবো সুখে; এহেন স্লোগান বদলে বাঙালি যখন মত্‍স ধরিব পুষিবো সুখে বলে ছলকে ওঠে, তখন ব্যাপারটা অতি সিরিয়াস পচা, নিজেকে কন্ট্রোল কর, তুই বখে যাচ্ছিস” আমার নতুন কেনা দু জোড়া মাছ সহ ফিশ-বাওল পর্যবেক্ষণ করতে করতে বললো ছোটমামা
একটা ফিস-বাওলএর শখ বহুদিন ধরেই ছিলোসেদিন হঠাত্‍ নিয়ে এসেছিলামদু জোড়া গৌরামি (GOURAMI) মাছ-সহএক জোড়া হলুদ, অপর জোড়াটি সাদাঘটনাচক্রে সেদিন ছোটমামা বাড়িতে এসেছিলছোটমামা মাছ-প্রেমিক, তবে পুষ্যি মাছের নয়, যেসব মাছ উদরস্থ করা যায় তাদের। পাড়ার মাছ বাজারে ছোটমামা আনন্দবাজারি ভাষায় বীরেন্দ্র সহবাগ।
দিনে অন্তত দু রকম মাছ ছাড়া ছোটমামার চলে না। মামার মাছ-প্রীতি এতদূর যে মাছ-ওয়ালারা মামা কে এস-এম-এস করে আগাম খবর দেয় কী কী মাছ আসছে বাজারে। বাড়িতে আলাদা ফ্রিজার রেখেছে শুধু মাছ স্টক করতে। ছোটমামা রবিবার আবার নিজে মাছ রান্না করেন, এক পদ ছোটমাছ, এক পদ বড় কোনও মাছ। সেও এক উত্সব, তার গল্পও অন্যদিন। ছোটমামার কিছু খুচরো মত্‍স-দর্শন আছে, যথা:
-বাঙালি যত না রবীন্দ্রনাথে, তার চেয়েও বেশি ইলিশ মাছে।
-মাছ থাকবে সমুদ্রে, নদীতে, পুকুরে বা খাওয়ার প্লেটে
-মাছা ছাড়া খাদ্য, সুরহীন বাদ্য
-মাছ দেখলেই পাকরো, কাটো, ভাজো এবং গপাগোপ গেলো
এহেন ছোটমামার যে মাছ পোষবার বুদ্ধি বিশেষ ভাল লাগবে না সেটাই স্বাভাবিক। তবে আমার এই দু জোড়া মাছ বোধ হয় তাদের স্বাদে না হোক, রূপে ছোটমামকে ইমপ্রেস করেছিল। গোটাদিন দেখলাম ছোটমামা দেখলাম ফিস-বাওলের কাছেই বসে রইল। বিকেলবেলা যাওয়ার আগে বলে গ্যালো, “বুঝলি পচা, তোর পোষা মাছগুলোর একটা করে নাম দিয়ে গেলাম”
-“আমি বললাম মাছের আবার নাম কী?”
_ “বাহ, নাম হবে না?”, ছোটমামা বললে, “যে মাছ কড়াইতে ভাজা যায় না, তার তো নাম দিতেই হয়। নাউ লিসেন পচা, ওই যে হলুদ মাছ-জোড়া ওদের নাম হল মিহি আর দানা, আর ওই যে সাদা মাছ জোড়া; ওদের নাম হল সীতা আর ভোগ”
-“মিহিদানা আর সীতাভোগ? মাছের নাম? আর ফিস-বাওলটা তাহলে কী? বর্ধমান?”
_”হে হে , তোর ঘটেও আছে কয় ছটাক, চলি রে পচা, চলি রে মিহিদানা- সীতাভোগ, টেক কেয়ার”
এর ঠিক এক সপ্তাহের মাথায় ছোটমামির ফোনে আর্তনাদ
_ “ ওরে পচা রে, তোর মামা তোর বাড়ি থেকে সেদিন ঘুরে আসবার পর থেকেই কেমন গোলমেলে হয়ে গ্যাছে রে”
-“কেন? ছোটমামার আবার কী হলো?, আমি অবাক।
-“তোর ছোটমামা আর মাছ খাচ্ছে না!”
-“ ছোটমামা মাছ খাচ্ছে না? ধুর! ছোটমামাকে ফোন দাও তো”
ছোটমামার এমন উদ্ভট ব্যবহারের কারণ জানতে চাইতেই ছোটমামার মিচকি হাসি মাখা জবাব ভেসে এলো, “আসলে পাতে মাছ দেখলেই সীতাভোগ, মিহিদানার ইনোসেন্ট চাউনি মনে পড়ে যায় রে, ভারী মিষ্টি রে তোর ওই সীতাভোগ-মিহিদানা। ভাবছি বর্ধমান থেকে হপ্তাহে এক-এক কিলো সীতাভোগ-মিহিদানাই আনিয়ে রাখবো, মাছএর বদলে মিষ্টিতেই কনসেনট্রেট করতে হবে দেখছি
ছোটমামা এরপর আর সত্যিই মত্‍স-স্পর্শ করেনি।


Saturday, October 15, 2011

ওয়াক-থু: কালচার



বাঙালিকে অফিস-মুখি করে তোলা চাট্টি-খানি কোথা নয় স্যারওসব ওয়ার্ক-কালচার বলে ওয়াক তুলে বাঙালিকে ভূলিয়ে কাজ করবেন, এমন ন্যালা-ক্যাবলা বাঙালি নয়।রক্তে কমিউনিজ্ম আর তৃণমূলীজ্ম এককেবারে ককটেল মেরে আছে মশাই, বেমক্কা যদি কাজ কাজ করে বাঙালি লাফাতে শুরু করে, তাহলে আর রাইটার্সএর ইজ্জত কে বাঁচাবে
? চার্ণকের ভূত?
আর আমিও বলিহারি যাই, আরে মশাই মারওয়ারীর খুচরো গোনার মত সেকণ্ড গুণে কি আর বাঙালি অফিস পৌছতে পারে? দূর-ধুর। সকাল বেলা যদি যত্ন করে চা-থিন এরারুটের সাথে খবরের কাগজটা ঘন্টা দুই ধরে না চটকাতে পারি,তাহলে পোলিটিক্সের পটি বুঝবো কি করে? বাম হলে আজকাল, তৃণ হলে বর্তমান, কাঁঠালি কলা হলে আনন্দবাজার; যেটাই হোক, খবরের কাগজ দৈনিক নটা পর্যন্ত হজম না করলে, ইন্টেলেক্ট পুষ্ট হবে কি করে? আর ইন্টেলেক্টই যদি মাএর ভোগে মেরে দি, তাহলে আমি আর বাঙালি কোথায় মশাই।! এরপর ধরুন বড়-বাথরুমে ঢুকতেই যারা বেরোবার জন্যে তাড়া লাগায় তাদের ইয়েতে আমার হুড়কো দিতে ইচ্ছে করে। কত হাজার কিলো ইসবগুল যে বাঙালীকে মর্নিং-ষ্টেডি করতে কনজিউম হয়ে যে জানেবড় জাগায় বড় ধরনের মন-সংযোগ না রাখতে পারলে ডেফিনীট ক্রাইসিস
এরপর ধরুন জলখাবার। সাহেবী কেতায় কর্ণফ্লেক্স চর্বনে তৃপ্তি পাবো বা একটুকরো মাখনিতো পাউ-রুটি নিয়ে আদিখ্যেতা করে অফিস বেরোবো, এমন আহাম্মক নইজলখাবারে পরোটা অব্লিক লুচি অব্লিক রাধা-বল্লভী, সঙ্গে একটি ভাজা একটি তরকারী এবং পরিশেষে একটি সন্দেশ অব্লিক জিলিপি অব্লিক চমচম। জলখাবারের ব্যবস্থাপনাটি তো আর অবহেলে গিলে ফ্যাল যায় না,তরিজুত করে হজম করতে সময় লাগে, রবীন্দ্রসঙ্গীত লাগে; সবে মিলে শান্ত-সময় লাগে।
এরপর রয়েছে প্রাত্যহিক গৃহকর্ম, এসব মিলে কার ক্ষমতা বেলা দশটার আগে বাড়ি থেকে বেরোয়? তারপর কোলকাতার ট্র্যাফিক আপনাকে কচলাবে।আরে মশায়, ভদ্দরলোকে পারে বেলা এগারোটার আগে অফিস পৌছতে?
আমার আবার ট্রাম-বাস ঠেলে অফিস পৌছিয়েই কাজে ঝাপ দিলে মাথা ঘোরায়আধ-ঘন্টা গপ্প আড্ডা, একটু চা, দুটো সিগারেট তবে না মনে হবে যে হ্যাঁ অফিস পৌছেছিসাড়ে এগারটায় অবশেষে ধীর চিত্তে কাজ শুরু করতে গিয়ে ফাইল টেনে নেবোআসলে তাড়াহুড়ো করলেই বাঙালি গুলিয়ে ফ্যালে, তাই বলি বেশি তাড়াহুড়ো করা পাপঠিক যেমন দুটোয় টিফিন বলতে আপনি ঠীক কাঁটায়-কাঁটায় দুটো বাজলেই টিফিন খুলে গপা-গপ ভাত-ডাল গিলবেন, এ আবার কেমনতর সাস্থ্য বিরুদ্ধ কথাপৌনে একটা থেকে মন কে তৈয়ার করতে হয়ে দুপুরের খাওয়ার জন্যে; এই একটু হাঁটা-চলা করে পাকস্থলীটাকে একটু জারিয়ে নেওয়া আর কিআরে বাবা কাজ তো আর পালিয়ে যাচ্ছে না, কিন্তু এই বয়েসে যদি হুড়মুর করে খাওয়ার খাওয়া অভ্যেস হয়, তাহলে তো হজম-শক্তির বারোটা বেজে যাবে অকালে
ধীরে-সুস্থে ভাত-টিফিন গলধ:করণ করে, চেয়ারে একটু গা না এলিয়ে কি উপায় আছে? এই একটি ব্যপারেই বাঙালির একটু স্প্যানীশ শৌখিনতা রয়েছে, Siestaএকটু ভাত-ঘুম না দিলে, সন্ধ্যে হতে না হতেই মাথা ধরবে, ধরবেইকথায় বলে হেল্থ ইস ওয়েল্থঅবিশ্যি, সামান্য ভূড়ি থাকাটাও স্বাস্থেরই লক্ষণ
বেলা তিনটের পড়ে গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে, এক কাপ চা খেয়ে আবার না হয় কাজে লেগে পড়া যাবে। তবে হ্যাঁ, কাজ-টাজ না হয় হল, তাই বলে কি পাঁচটায় ছুটি বলে পাঁচটাতেই বেরবো নাই? বেলা ৪টে-সাড়ে ৪টের মধ্যে না বেরোতে পারলে তো মারা পড়তে হবে! কৃপাসিন্ধু পাড়ি দেওয়া সহজ, কিন্তু বড়বাজারের সন্ধ্যে বেলার ট্র্যাফিক পেরোতে খোদ হরিও পারবেন না
তাই বলি, অত ওয়ার্ক-কালচার-ফালচার বা কর্ম-সংস্কৃতি-মৃতি ফলাতে যাবেন না, বাঙালিকে শান্তিতে বাঙালি থাকতে দিন।

পরিশিষ্ট: