Monday, August 6, 2012

সফলের সাফল্য - বিফলের ফলিডল


ঢাকুরিয়া মোরে একটি মধ্য বয়স্ক পাগলকে প্রায়ই দ্যাখা যায় ব্যস্ত হয়ে ট্র্যাফিক পুলিশ সেজে হাত পা নেড়ে আমোদ করছেকেউ তাকে পাত্তাও দেয় না, বাঁধাও দেয় না অফিস ওইখানেই হওয়ায় ওই মধ্য বয়স্ক আহ্লাদি-উন্মাদটিকে আমি অন্তত বেশ চিনিআজ দুপুরে রোল খাওয়ার জন্যে ঢাকুরিয়া বেদুইনে হাজির হয়েছিলামএমন সময় দেখি সেই ক্ষ্যাপা লোকটি পাশে এসে দাঁড়িয়ে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়েওর দিকে চাইতেই ফিক করে হেসে বললে, “এক পিস রোল খাওয়াবেন নাকি স্যার? ঘুগনি পাউরুটি খেয়ে অরুচি ধরে গ্যালো”
মজা লাগলো ওর স্মার্ট আব্দার শুনেদুটো রোলের অর্ডার দিয়ে দাঁড়ালাম দোকান লাগোয়া ফুটপাথে।
জানতে চাইলাম “রোজ সকালে মোরে দাঁড়িয়ে যে মুজরো করো, কোনোদিন পুলিশ চাবকে দিলে কী করবে?”
-“কী করবো বলুন স্যার, কোলকাতা পুলিশ যদি ট্র্যাফিক ঠিক ঠাক সামাল দিতেই পারতো তবে আর চিণ্ময় সমাদ্দারের দালালি করবার দরকারটা কী ছিলো
? আমি না থাকলে যে শহর জুড়ে সিটু-আই এন টি ইউ সি বিনেই চাক্কা জাম হয়ে যাবে! সেই বেলা? একজন সফল মানুষ হিসেবে এ শহরকে এইটুকু ফ্রি-সার্ভিস যদি না দিতে পারি, তবে আমার আর  ক্যানিংয়ের পকেট মার মন্টু বিশ্বাসের মধ্যে কী ফারাক?

-“সফল মানুষ হ্যাঁ? তোমার বুকনি-রুচি তো বেশ জম্পেস হে?”
-“হে হে হে, ঠাট্টা করছেন স্যার? সফল কী আর এমনি এমনি হয়েছি স্যার, এই কলকেতার রাস্তা চষে, তবে না সাফল্যের মন্তর কব্জা করেছি”
-“সাফল্যের মন্ত্র? হুই!”
-“ আঁজ্ঞে হ্যাঁ স্যার। সফল জীবন-যাপনের সহজ, কোলকাতার রাস্তা  থেকে তুলে আনা মন্ত্র, শুনবেন?”
-“শোনাও”, ফুটপাথের রেলিঙে হেলান দিলাম, এখনও রোল আসতে কয়েক মিনিট বাকি।
এমন শ্রোতা এ বান্দা কখনো হয়তো পায়নি। কাছে এগিয়ে এসে হটাত্‍ ফিস ফিস করে কথা বলতে শুরু করলো পাগলটা:

“মন দিয়ে শুনে রাখুন স্যার জীবনে যদি সাফল্য চান, তাহলে মনে মনে টুকে রাখুন;
প্রতিশ্রুতি পালনে হয়ে উঠুন ট্যাক্সি ড্রাইভার। সে আপনাকে গন্তব্যে পৌছে দেবে কিন্তু আধ-কোলকাতা ঘুরিয়ে, মিটার দ্বিগুন করে। তেমনি অপর কে দেওয়া প্রতিশ্রুতি চট করে পালন না করে তাকে ল্যাজে খেলান। তাতে আপনার দর বাড়বে, লোকে মান্যি করবে
অটো-চালকের মত ম্যানেজ করতে শিখুন। দুজন সওয়ারীর জায়গায় তিনজন,তিন জনের জায়গার চার জনকোয়ালিটির জাঁতা কলে পিষেছেন কী আপনি ক্ষতম জীবনে মুনাফাটাই সব স্যারতাতে দু চার জনের কষ্ট হলে হোক, দুর্ঘটনা ঘটলে ঘটুক; মুনাফা করতে হলে ম্যানেজ করাই হলো মূল-মন্ত্র
ভীড়,ট্র্যাফিককে লাথি মেরে মিনি-বাসের চালকের ওভার-টেক করার ক্ষমতা কে রপ্ত করুন। ওভারটেক করুন সহকর্মী, সহ-ছাত্র, বন্ধু; পারলে নিজের ভাই-বোন বা যাবতীয় আপনজন কে। আলপটকা সিগন্যাল ভাঙ্গতে হতেই পারে তার জন্যে।  
ট্রাক চালকের মত প্রয়োজনে দু চারটে চুনো-পুটিকে ক্ষমতার টায়ারের নীচে পিষে দিতে কসুর করবেন না
নিজের প্রয়োজনে বাস-কন্ডাক্টারের মত তাগাদা মারতে শিখুন।

আর মনে রাখবেন, মাথার ঘাম পায়ে ফেলায় যদি আপনি বিশ্বাস করেন,তবে হাত-টানা রিক্সার মতই চওড়া সড়ক ছেড়ে,  অলি-গলিতে আপনাকে নষ্ট হয়ে থাকতে হবে। ওই এগ রোল এসে গ্যাছে, ধন্যবাদ স্যার।  দশ মিনিটের মধ্যেই আবার আমায় ডিউটিতে যেতে হবে”

Thursday, August 2, 2012

অথ কোলকাতা কড়চা-ক্যাওড়া

কোলকাতা সম্বন্ধিও যত আলপটকা ট্যুইটের ব্লগীও সংকলন। ক্রমশ আপডেটিতো হতে থাকবে, এমনটিই আশা  



"ধর্মতলায় ধর্ম ও রবীন্দ্রসদনে দাঁড়ি: খুঁজবেন না"

"কফি হাউসের কফি খারাপ এবং হাউস পুরনো। এছাড়া সব কিছু ঠিকঠাক"

"জামা-ভেজা ঘাম ও হ্যান্ডেলে ঝুলন্ত আধ-ঘুম : মিনিবাস বেমালুম"

"বিনে শ্যামবাজারের পাঁচ মাথা , কল্কে পাবেনি কোলকেতা"

"ট্রামের গতি আর গড়িয়ায় ট্র্যাফিকের মতি: কখনো ভরসা যোগ্য নয়"

"ভিক্টোরিয়ার ছাদে মশারি টাঙ্গানো চলে না"

"আলতো চুমু নন্দন, ফষ্টি-খেলা নলবন"

"ট্র্যাফিকে-পুকুরে, ক্লাবেতে-দুপুরে: রবীন্দ্রনাথই হলেন আদত 'চলমান অশরীরী' ”

Wednesday, August 1, 2012

অন্য পারের রাখী

(ও পারের বোনটির প্রতি)

জ্যেঠু হামেশাই বলতেন স্নেহ সহজেই পাল্সচিনে নেয়। এক সহজিয়া বন্ধু-স্বর ট্যুইটারের কচ-কচানি চিরে মাঝে মাঝেই সাড়া দিতো।সাড়া দিতো বাংলার ওপার থেকে, অন্য বাংলা হতে।  আচমকা ভেসে এলো আদর মাখা স্নেহ-ডাক : দাদাভাই। মুখায়ব অচেনা, অপরিচিতা, তবু কল্পনা করে নিতে অসুবিধে হয় না বোনটির চোখের কোণে চিকচিকে ভালোবাসা।

আন্তর্জালিক সুতোয় জড়িয়ে থাকা রাখী ভেসে এলো। সীমান্তে যুদ্ধটার মত; এমণটাও তো হয়েই থাকে।

নিপাট ভাই-বহেন।

* * * 

দমদম এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়ে রয়েছি। বস ঢাকা থেকে ফিরছেন কিছু বেফালতু অফিসিও কাজ সেরে। ঢাকার ফ্লাইটে নেমে বস ফোন হাতে ব্যস্ত। আমি সংটি সেজে নন্দি সেজে দাঁড়িয়ে রয়েছি।রাখীর দিন। শ্যামবাজারে পিসতুতো দিদির বাড়িতে মোগলাই খানার নিমন্ত্রণ। বসের চক্করে এয়ারপোর্টে আটকা রয়েছি। মেজাজ প্রবল ভাবে চটকে।  এমন সময় ঝকঝকে একটি মেয়ে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কী তন্ময়
?”

অচেনা। সম্পূর্ণ। ভেবড়ে গিয়ে বললাম, “ইয়ে, হ্যাঁ, কিন্তু কেনো?

মেয়েটি মিষ্টি হেসে আমার পকেটে একটা ভাঁজ করা কাগজ ঠুসে দিলো। বললে, “এই কাগজটি আপনাকে একজন দিতে বললো”

চিরকুট? আমায়? এয়ারপোর্টে কে চিনলো? কেনই বা দিলো? স্মগলার বা টেররিষ্ট নয় তো? কে দিলো, কেন দিলো জিজ্ঞেস করবার আগেই বসএর হাঁক। বসের দিকে ফিরে ফরমাশ সামাল দিতেই সেই মেয়েটি হাওয়া। বসকে কোনও মতে বিদেয় করেই চিরকুটটা বার করলাম। ভাঁজ দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে ভীষণ তড়ি-ঘড়ি করে লেখা। চিরকুটটা খুলতেই বৃষ্টি এলো প্রায়। ওতে লেখা:


“দাদাভাই,  

আমায় চিনতে পারলে না? আমি কিন্তু দূর থেকে দেখেই চিনতে পেরেছি। কয়েক ঘন্টার জন্যে ইন্ডিয়া এসেছি। একটু পরেই ঢাকায় ফিরে যাব। দ্যাখা হয়ে গ্যালো, তোমায় চমকে দিতেই এই চিরকুট। আজ রাখী না? তোমার জন্যে নিচের এই স্কেচ-টি। আর পরের বার দেখা হলে চিনে নিও কিন্তু”



ইতি, 

তোমার বোন

সোনা

পৃথিবী স্বর্ণ-ময়। গয়নার সোনা, ভল্টের সোনা, ছিনতাইয়ের সোনা, মাধ্যমিকের লেটার পাওয়া ছেলেটি সোনা, টুকটুকে মেয়েটির গায়ের রংটি সোনা, প্রেমিকার তুলতুলে আদুরে সোনা, বিস্কুটের সোনা, মহাপাত্র সোনা, আমার বাংলা সোনা, ডিসেম্বরের রোদ্দুরের সোনা, আদরের পোষ্য বেড়াল-সোনা, ওল্ড ইজ গোল্ডের সোনা, অল দ্যাট গ্লীটার্সয়ের সোনা, বাপী লাহিড়ীও সোনা, অলিম্পিকীও সোনা

শুধু যদি চলে যাওয়া মা এসে “সোনা” বলে বুকে টেনে নেয়, বাকি সব সোনা ছুড়ে ফেলে দেওয়া যায় 

Sunday, July 29, 2012

চাকরির চক্করে

গৌতমবাবুর সঙ্গে দেখা বহুদিন পরবাজারেগৌতমবাবু ছিলেন আমাদের কেমিষ্ট্রীর শিক্ষক।ভীষণ ভালো ফুটবল খেলতেন, পাড়ার ক্লাবের কোচও ছিলেন। ঢিপ করে প্রণাম করে নিজের পরিচয় দিলাম। চিনতে পারলেনআমি জানালাম কোথায় আছি এখন, কীই বা চাকরি করছি।গৌতমবাবু নরম হেসে বললেন:  

“চাকরি? চাকরির একটি মাথাদুটি কান, একটি নাক, একটা মুখ দুটো হাত, দুটো পাএকটি হৃদয়চাকরি স্তন-বানও বটে।চাকরির প্রতি এমন স্নেহ নিয়ে কৈশোর থেকে যৌবনের দিকে ট্র্যাভেল করেছোপড়াশোনার কসরত্‍ করেছো, কেতা-অভ্যেস করেছো, বিবেকানন্দ পড়ে ডন-বৈঠক দিয়েছো, কথা বলার চাকুরিও-মায়াবী ভঙ্গিমা রপ্ত করেছো, নারী-প্রেম নিশ্চই তোমার ট্র্যাভেল-ট্র্যাকে বোম মেরেছে তবু  তুমি লাইন-চ্যুত হওনি।এখন তুমি একজন পরিপূর্ণ যুবক! পকেট নিকোনো চাকরি। যার একটি মাথা, দুটি কান, একটি নাক, একটা মুখ, দুটো হাত, দুটো পা একটি কোলেস্টেরল-মাখা হৃদয় জানি না তোমার সাথে আবার কবে দেখা হবে, তাই বলিবিয়ে করেছো দারুন ব্যাপার। ইউ উইল বি আ ফাদার সাম ডে। সন্তান কে এমন শিক্ষা দিও যাতে সে  শৈশবকে কফিনে সার্ভ করার আগে শৈশবের কপালে আলতো চুমুটুকু খেতে পারে।চলি। কেমন?”

মনে রাখার ব্যাপার-স্যাপার

ন্যাবা-জ্যেঠুর বাড়িতে রাত সাড়ে এগারোটায় ঢুঁ মারতে হলো দাদুর হাঁটুর ব্যাথার হোমিওপ্যাথিক টোটকার জন্যে। ন্যাবা-জ্যেঠুর হোমিও-চিকিত্‍সাতেই দাদুর হাঁটু নাকি পুর্ণিমা-অমাবস্যাতে ম্যাক্সীমাম রিলিফ পায়। আজ আচমকা ব্যথাটা চাড় দেওয়াতে এই রাত-দুপুরে দাদু দেরাজ খুলে দেখলেন ওষুধের স্টক নীল। ন্যাবা-জ্যেঠু দাদুর মর্নিং ওয়াক সঙ্গী হওয়ায় রাত্রিবেলা প্রয়োজনে বিরক্ত করতে বিশেষ অসুবিধে নেই। ভদ্রলোকের হোমিওপ্যাথিতে এ অঞ্চলে বেশ পসার রয়েছে।সদ্য বিপত্নীক। এক মাত্র ছেলে বউ-বাচ্চা নিয়ে দিল্লিতে থাকে। পেল্লায় বাড়িতে একাই থাকেন।  

কলিং বেল টিপতেই ন্যাবা জ্যেঠু নিজেই দরজা খুললেন।দাদুর প্রয়োজনের কথা বললাম। ঘুম যে ভাঙ্গাইনি সেটা ন্যাবা জ্যেঠু নিজেই জানালেন; “যদিও আর্লি ট্যু বেডয়ের ফিলসফিতেই বিশ্বাস, তবে আজ জেগে রয়েছি অন্য কারণে, ছেলের তরফ থেকে বিশেষ ফোন আসবে”বিশেষ ফোন কেন জিজ্ঞেস করাতেই ন্যাবা-জ্যেঠু খোলসা করলেন : “গত বছর এই দিনে তোমাদের জ্যেঠিমা মারা গেছিলেন, তাই নিমুর (ন্যাবা জ্যেঠুর ছেলে)ফোন একটা এক্সপেক্ট করছিবেচারী ভারী মা ন্যাওটা ছিলোআজকের দিনটা নিশ্চই আমার সাথে ফোন করে একটু মন হালকা করে চাইবে। গোটা দিনের ব্যস্ততায় হয়তো ফোন করতে পারেনি, নিশ্চয় একবার ফোন করবে...” বলতে বলতেই ন্যাবা জ্যেঠুর ফোন বেজে উঠলো, “নিমু উইল লিভ ফর হান্ড্রেড ইয়ারস...কল এসেছে...মিনিট-পনেরো দাও আমায়, কথা বলেই ওষুধ টা এনে দিচ্ছি”। সঙ্গে একটা সাহেবী “এক্সকিউজ মী” জুড়ে ন্যাবা জেঠু পাশের ঘরে গেলেন কথা বলতেঠিক ৪৫ সেকন্ডের মাথায় ফেরত এলেন

-“কী ব্যাপার জ্যেঠু, লাইন কেটে গ্যালো নাকি?”, জিজ্ঞেস করলাম,
“না:”, জ্যেঠু হাসলেন, “কাল ইনকাম ট্যাক্স রিটার্ণ ফাইল করার শেষ দিন, আমার ভারী ভূলো মন তো, তাই আমার চার্টার্ড-পুত্র আমায় মনে করিয়ে দিলে যাতে আমি এই বেসিক ব্যাপারটা ভুলে গিয়ে একটা গোলমাল না করে দিই, তুমি পাঁচ মিনিট বসো; আমি ওষুধ নিয়ে আসছি”