Showing posts with label Modern Bengali. Show all posts
Showing posts with label Modern Bengali. Show all posts

Tuesday, August 27, 2013

ফিলিপ কোটলার ও মানব জীবন

এটা ভাঁওতার যুগ। মার্কেটিঙের যুগ। নেকু বাঙালি সেজে থাকলে কিস্যু হওয়ার নয়। এর কাঁঠাল অন্যের মাথায় ভেঙ্গে দিন গুজরান ; এই হল মন্ত্র। দুনিয়ার সামনে নিজেকে একটা প্রডাক্ট হিসেবে জাহির না করতে পারলেই চিত্তির। ফিলিপ কোটলার সাহেব পই পই করে বলে দিয়েছেন যে কোনও পণ্য কেতার সঙ্গে বেচতে হলে প্রয়োজন সঠিক বিপণন মিশেল অর্থাৎ চারটে P, যথা Product, Price, Place এবং Promotion।

এই চারটে P’কে নিজের জীবনেও যদি যুতসই ভাবে ব্যাবহার না করা যায় তবে বিষম কেস।

প্রথম পি ; প্রডাক্ট বা পণ্য আপনি নিজে স্যার – বউ’য়ের কাছে আপনি মাকাল ফল, ছেলেমেয়ের কাছে দুধেল গাই, বসের কাছে গাধা। অকাট্য।

দ্বিতীয় পি ; প্রাইস বা পণ্য-মূল্য। অর্থাৎ আপনি যে সক্কলকে নিজের রক্ত জল করে পরিষেবা দিচ্ছেন তাতে আপনার টু পাইস ইনকাম আছে কি না। শুনে রাখুন; আপনি সবার মন জুগিয়ে চলতে পারলে আপনার স্ত্রী আপনাকে বাপান্ত করবেন না, ছেলেমেয়েরা ছিঁচে কান্না জুড়বে না আর আপনার বস খিস্তি মেরে আপনার গুষ্টির তুষ্টি করবেন না – এবসেন্স অফ নেগেটিভ ইজ দ্য অনলি পজিটিভ স্যার। এই বাপান্ত, ছিঁচে কান্না আর খিস্তি থেকে রেহাই পাওয়াই আপনার খাটুনির একমাত্র মূল্য।

তৃতীয় পি ; প্লেস। অর্থাৎ সর্ষে কে পেষাই কোথায় করা হবে। ভেবে হয়রান হবেন না স্যার; সর্ষে আপনিই। আপনার পেষাই চলবে বাড়িতে, অফিসে, মিনিবাসে; সর্বত্র। আপনাকে রগড়ে যে ফোঁটা ঝাঁঝালো তেল বেরোবে; তা দিয়ে আপনারই কলজে ডিপ-ফ্রাই হবে।

চতুর্থ এবং সবচেয়ে মারাত্মক পি ;  প্রোমোশন। অর্থাৎ নিজেকে একটু ফেস্টুনের মত টাঙিয়ে ধরুন আপনার খদ্দেরদের কাছে।   বউকে বলুন “ আই লাভ ইউ সোনা”; তাকে বুঝিয়ে বলুন এই মাগ্যির বাজারে ‘সোনা’ ডাকটিও কি অমূল্য। ছেলেমেয়েদের সামনে নিজেকে একটা চলমান মানিব্যাগ বলে তুলে ধরুন, নয়ত ইজ্জতের আশা করবেন না। আর নিজের বসের সামনে নিজেকে পেশ করুন পনের শতকের মধ্য-ইউরোপের বাজারে বিক্রি হওয়া আফ্রিকান দাস’দের রেপ্লিকা বলে- তবেই সময়মত উন্নতি ঘটবে। প্রোমোশনে একটু কোথাও ঝুলিয়েছেন কি “ বেআক্কেলে, ন্যাকা ভুত, অকর্মণ্য” এমন যাবতীয় পোষ্ট-মডার্ন বাক্য-ক্যালানি সহ্য করতে হবে।  

 শুধু “ মা, মা গো” বলে আরাম মাখা দীর্ঘশ্বাস ভাসিয়ে দিতে কোনও কোটলারের হিসেব-কিতেব মাথায় রাখার দরকার নেই।

Sunday, August 18, 2013

একটি মই কেনার আগ্রহ ও বাঁশ


ডাকনাম খোকন হলে কি হবে, খোকনবাবু রীতিমত কলপে এবং চ্যবনপ্রাশে জীবনযাপন করেন। সেদিনকেও চ্যবনপ্রাশের চামচ সবে মুখে চালান করেছেন, ঠিক তখন খবরের কাগজের একটি বিজ্ঞাপনে তার নজর আটকে গেল।

দেখলেন এক মাদ্রাজি কোম্পানি টেলিফোনে অর্ডার নিয়ে বাড়ি বাড়ি মই সাপ্লাই করে। বাঙালি বাঁশের মই নয়, ফাইবার ল্যাডার। সেই মই নাকি ইচ্ছে মত ছোট-বড় করে নেওয়া যায় । কোনাকুনি, লম্বালম্বি যে কোন ভাবে বাড়ির দেওয়ালে লাগানো যায়। মইয়ের মাথায় উঠে অনায়াসে হেলান দিয়ে বসে রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনা যেতে পারে; এতটা সুরক্ষিত ব্যবস্থা তার । খোকনবাবুর মনে হল যে সিলিং ফ্যানের ঝুল ঝাড়তে বা বুক শেল্ফের একদম উপরের তাকে গিয়ে কেরদানি করতে বা বাড়ির পুরনো ইলেকট্রিক মিটারের রিডিং পড়তে তাকে যে হিমশিম খেতে হয়, এই ফাইবার মই জুটলে সমস্ত সমস্যার সমাধান হয়ে যেতে পারে। এমনকি ঘরোয়া স্পাইডারম্যান বনে যেতেও কোনও অসুবিধে নেই। এমন মজবুত মই যে খোকনবাবুর মনে হল যে এবার থেকে সকাল বেলা চা আর আনন্দবাজার হাতে ফাইবার’র মই’ইয়ের  মাথায় গিয়ে কিছুক্ষনের জন্য বসে থাকলে বেশ হয়।

বিজ্ঞাপনে দেখলেন একটা ফোন নাম্বার দেওয়া রয়েছে, যেখানে মিস্‌ড কল দিলেই মই-কোম্পানি থেকে কল আসবে। হাত ঘড়িতে সময় দেখলেন খোকনবাবু, রাত সাড়ে দশটা। এত রাত্রে মিস্‌ড কল দেওয়া যায় ? সাহস করে একটা মিস্‌ড কল করেই ফেললেন; পয়সা তো যাচ্ছে না।

দু মিনিটের মধ্যে খোকনমামা এস-এম-এস পেলেন। মাদ্রাজি কোম্পানিটি তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছে টুয়েন্টি ফাস্ট সেঞ্চুরি ফাইবার ল্যাডারের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করার জন্যে। এবং তার পাঁচ মিনিটের মাথায় সোজা চেন্নাই থেকে একটা ফোন কল্‌।
খোকনবাবু ভাবলেন এই বেলা দাম জেনে নেওয়া যাক। কিন্তু তিনি কিছু জিজ্ঞেস করবার আগেই এক রোবট গোছের মাদ্রাজি ভদ্রলোক দমাদম প্রশ্ন শুরু করলেন।
হাজারো সওয়াল।

খোকন বাবুর ভালো নাম কি।
খোকন বাবুর বয়স কত।
তার বাড়ির ঠিকানা।
তার মোবাইল নাম্বার।
তার ল্যান্ডলাইন নাম্বার।
তার ব্লাড গ্রুপ।
চাকরি করেন না ব্যবসা।
অফিসের ঠিকানা।
অফিসের ফোন নাম্বার।
খোকনবাবু ক্রমশ অধৈর্য হয়ে পড়ছিলেন।

_ “ ইয়ে...এবাউট দ্য ল্যাডার...” , খোকনবাবু মিউ মিউ করে বললেন। গিন্নী ভাত বেড়েছে বোধ হয়।   

মাদ্রাজি সেলস্‌ম্যানটি খোকনবাবুকে তেমন পাত্তা দিলেন না। প্রশ্নমালায় চলে গেলেন নির্বিকারে।
একে একে জানতে চাইলেন তার বাড়ি না ফ্ল্যাট।
কয় তলা।  
তার বাড়ির দেওয়ালের উচ্চতা।
কত দিনের বাড়ি।
কত কাঠা জমির ওপর।
তার পরিবারে কয়জন আছে। 

“ কি মুস্কিল, প্লিজ টেল মি এবাউট দ্য প্রাইস অফ দ্য ফাইবার মই, আই মিন, ফাইবার ল্যাডার”, বেপরোয়া ভাবে পাল্টা প্রশ্ন করেন।
সেলস্‌ম্যানটি দমে যাওয়ার পাত্র নন।

“ ইন এ মিনিট সার” বলে টুসকি মেরে ফের সেই মাদ্রাজি-বাবু চলে গেলেন প্রশ্ন বৃষ্টিতে।
প্রশান্তবাবুকে বাধ্য হয়ে বলতে হল;
তার  চাকরি কত দিনের।
এর আগে অন্য কোথাও তিনি কোন চাকরি করেছেন কি না।
তার মাইনে কত।
তার কয়টি ব্যাঙ্ক একাউন্ট।
তার কাছে ক্রেডিট কার্ড আছে কি না।

অবশেষে সারেন্ডার করলেন প্রশান্তবাবু। করুন গলায় বললেন “ স্যার, মাই গুড স্যার। প্লিজ একটু লিস্‌ন টু মি স্যার। আই থিংক মাই ব্যাম্বু ল্যাডার ইজ বেটার দ্যান ইওর ফাইবার ল্যাডার। এনিথিং বিয়ন্ড মাই ডিয়ার ব্যাম্বু ল্যাডার ইজ গোয়িং টু বি এ বাঁশ। থ্যাঙ্ক ইউ”
বলে দুম করে ফোন কেটে দিয়ে নিজের মোবাইল সুইচ্‌ অফ করে হাঁফ ছাড়লেন খোকনবাবু।   

Thursday, April 25, 2013

চিট-ফান্ড

বস বলছে ছয় মাসের কাজ ছয় দিনে সারতে। 

বউ বলছে পুজোয় দীঘা-টিঘা চলবে না, ম্যালেইসিয়ার টিকিট কাটতে হবে। 

মন্ত্রীরা ভাবছেন এক কোপেই হাজার কোটি হাপিস মারতে, ইনস্টলমেন্টে ঝাড়ার  গড়িমসি অসহ্য।

প্রেমিকার মনের চিড়ে সওদাগরী আপিসের চাকরির জলে আর ভিজছেনি, দরকার "ফরেন পোস্টিং"।

ভিক্টোরিয়া প্রেম প্রেমিকের মনে যথেষ্ট সুধা-সঞ্চার করতে পারছে না আজকাল, কথায়  কথায় শুধু বকখালি-উইকেন্ডের বাই। 

বাংলা সিনেমা-দেখিয়ে পাবলিক এখন আর বাইক-চড়া রোম্যান্সে গলে পড়ছেন না, "বেড-সিন" চাই'ই চাই।

ভগবানও মাগনায় ক্রিকেট ছাড়তে চাননা, চল্লিশে চালসে ভগবান মানবেন কেন ? 

জগত্টাই এখন চিট-ফান্ড, তামাম পাবলিক চাইছেন কানা কড়ি ছড়িয়ে গ্যালন গ্যালন সর্ষের তেল গায়ে মাখবেন। লে রগড়। 
খামোখা সুদীপ্ত সেন'য়ের পেছনে হুমড়ি খেয়ে গড়াগড়ি যাওয়ার কি দরকার ?  

Monday, February 4, 2013

আব্বেয়ার

আব্বেয়ার!

কুল হও, ইংরেজিতে খিস্তি মেরে ভুত ভাগিয়ে দাও উও ভি সহি কিন্তু শালা-শূয়রের বাচ্চা হেঁকে ইজ্জতের শাকালু করে ফেলো না।

হিপ হও, প্রেমিকার কানে  “ উফ, সেক্সি বাটস”  বলে মূর্ছা যাও সেলাম পাবে, কিন্তু “তুমুল নিতম্ব” বলেছো কি সোজা হিল-জুতো-পেটা।

জ্যাজি হও। পাগলু নাচো আর শ্যামল মিত্তির ট্যাঁ-ফো করলেই জিজ্ঞেস করো স্যাঙস্ক্রিট শ্লোক নাকি ?
ইয়ো হও। ক্রঁসা’র ঢেঁকুর তুলে পুটী মাছের চচ্চড়ীতে ওয়াক তোলো।

ড্যাসিং হও। মনে রেখো -  পিতা ইজ ওল্ড ফুল আর গার্লফ্রেন্ড ইজ নির্ভুল; থাম্ব রুল অফ লাইফ।

রকিং হও । মনে রেখো বাংলা মিডিয়ামের মাল গুলো বেঢপ আনস্মার্ট আর ইংলিশ মিডিয়ামের প্রোডাক্ট হলো গিয়ের দেশের আর দশের ফিউচার।  

এবং সর্বপরি- মাইন্ড-ব্লোইয়িং হও। গ্রোথ রয়েছে পশ্চিম প্রদেশে-সায়েব দেশে, বাংলাতে শুধু সি-পি-এম,তৃনমূল ও ক্যাঁকড়া’র দল। 

Friday, January 18, 2013

মহাকাশে বাঙালি


বাক্স-প্যাঁটরা গুছিয়ে তৈয়ার হওয়া চাট্টিখানি ব্যাপার নয়। পাক্কা তিন মাসের মহাকাশ-Cruise। অনন্তবাবুর কাছে এ এক হিল্লে ব্যাপার। দেড়-খানা গ্যালাক্সি জুড়ে প্রমোদ ট্যুর। নন্দী-ট্র্যাভেলস চমত্‍কার ডিসকাউণ্ট অফার করেছে। এই মাগ্গির বাজারে এত সস্তার এই মহাকাশট্যুর টা মিস করার মানে হয় না।তাছাড়া বেশ কিছুদিনের ছুটি জমে ছিলো। বে-থা নেই, ঝাড়া হাত-পা। দেড় বছরের মধ্যে রিটায়ারমেন্ট, এই তো ঘুরে নেওয়ার সময়। মিল্কি-ওয়ে ছাড়া অন্য কোনও গ্যালাক্সি  আজ পর্যন্ত দেখা হয়নি অনন্তবাবুর; শেমফুল। দু খানা বেঢপ সুইট-কেস আর একটা ঝোলা ব্যাগে সমস্ত জিনিষ-পত্তর ধরে গ্যাছে। দুগ্গা বলে হাউই-ট্যাক্সি ধরে সিধে গিয়ে হাজির হলেন টলিগঞ্জ এয়ার-বোর্ন সিটির নতুন এই ভাসমান টারমাকে। 

***

কাঁচের ১৭ তলা নন্দী-ট্র্যাভেল স্পেশ্যাল মহাকাশ-ক্রুজ-ক্র্যাফ্টয়ে মৌজ করে বসে আছেন অনন্তবাবু। কিউবিকেলের দ্বিতীয় বেডের সঙ্গীটি এখনো আসেন নি। কী মুস্কিল। আর পাঁচ মিনিটের মধ্যে ক্রুজ যাত্রা শুরু করবে যে। লোকে এত দেরি যে কেন করে। একবার মনে হলো যে আর হয়তো কেউ আসবেন না। একা পুরো কিউবিকেল জুড়ে থাকতে পারবেন ভেবে মন্দ লাগছিলো না অনন্তবাবুর, তবে তিন মাসের ভ্রমণে একজন রুম-মেট পেলে সুবিধে হয়; এটাও একটা ফ্যাক্টর।

ক্রুজ-ক্র্যাফ্ট ছাড়তে যখন ঠিক আধ-মিনিট বাকি, তখন কিউবিকেলে হুড়মুড় করে ঢুকলেন অনন্তবাবুর কিউবিকেল সঙ্গী। তাড়াহুড়োর চোটে ভদ্রলোকের বেদম হাঁপাচ্ছেন।
-“ আমি মৃদুল খাসনবিস”, কোনও ক্রমে বলে হাত মেলালেন ভদ্রলোক।
-“ আমি অনন্ত মুখুজ্জে। তেষ্টা পেয়েছে ?”
-“ হ্যাঁ, এক-দুটো জলের বড়ি পেলে ভাল হতো”
অনন্তবাবু টেবিল থেকে জলের বড়ির শিশি বাড়িয়ে দিলেন মৃদুলবাবুর দিকেশিশি থেকে দুটো বড়ি মুখে চালান করে তৃপ্তিতে রুমাল দিয়ে মুখ মুছলেন মৃদুল বাবুতারপর অনন্তবাবুর দিকে চেয়ে শুধোলেন;
-   “ বিয়ণ্ড গ্যালাক্সি কি আপনার ফার্স্ট টাইম ?”
-   “ হ্যাঁ, আপনারও?”, অনন্তবাবু প্রশ্ন করলেন
-   “না, বেশ কয়েকবার হয়ে গ্যালো, শেষ গেছি টুয়েন্টি ট্যু হান্ড্রেড নাইন্টি সেভেনে”
-   “আপনার ক্রুজ-ক্র্যাফ্টে আসতে এত দেরি হলো? আর একটু হলেই তো বেরিয়ে যাচ্ছিলো আর কি ?”
-   “আর বলবেন না মশায়, আকাশে গিজগিজে জ্যাম, তার মধ্যেও শ্যামবাজার থেকে রাসবিহারী পর্যন্ত ফ্লাই করে ফেলেছি,  এমন সময় খেয়াল পড়লো ইসবগুলের কৌটো আর কাসুন্দির বোতল দুটোই ফেলে এসেছি। আমার ইসবগুল আবার স্পেশ্যাল, ছোট-শালা বাগনান থেকে মাসে মাসে পাঠিয়ে দেয়; ওইটে ছাড়া আমার মুভমেন্ট কিছুতেই খেলতে চায় না বুঝলেন। আর এই তিন মাস জুড়ে বাইরে থাকবো; ভাজাভুজির সাথে মিসেসের নিজের হাতের কাসুন্দি থাকবে না; এমনটা তো ভাবতেই রক্ত হিম হয়ে যাচ্ছিলো। অগত্যা! গ্যালাক্সি-ক্রুজ মিস হয় হোক, টাকা গচ্ছা যায় যাক; ইউ-টার্ণ নিয়ে সোজা শ্যামবাজার। কাসুন্দির বোতল আর ইসবগুলের কৌটো হাতে দে ছুট; কপাল জোরে পেয়ে গেলাম ক্রুজ-ক্র্যাফ্টটা”   
  

Sunday, January 13, 2013

আমি শুধু রইনু

ঠিক সন্ধ্যের মুখে। আজকাল লোডশেডিং এমনিতে হয় না, আজ হটাত্‍। অন্ধকার রাস্তা ঘেঁষা চুপড়ি আঁধারে ব্যালকনি। টুপটাপ ঝড়ে চলেছে শীত। গায়ের শাল, শরীরে লাক্স ও ঠোঁটে বোরোলীন মিলে মধ্য-বয়স্ক জানুয়ারীর মায়া-বসন্ত। বউটি হাওয়া; কোনও এক পার্লারে দেহ-লালনেআমার হাতে রয়েছে ফাঁকা কফির কাপ ও কোলে রয়েছেন ঘুপচি অন্ধকারে অসহায় ভাঁজ হওয়া মুজতাবাবেশবেশ

পকেটে রয়েছে মোবাইল। এখনই চুপুক করে কাউকে ফোনে ডাকতে পারি, ঝুপুক করে একটু ফেসবুকে উঁকি মারতে পারিচালিয়ে দিতে পারি এফ-এম; ,মিহি হিন্দী সুর বা কোন রেডিও জকির কোদাল-ধার মস্করায় নিজেকে বলতে পারি; লোডশেডিং আর আমাদের একা করতে পারে না

এও ভারি নাজুক হিসেব। আজকাল একা হওয়া যায় নাবাথরুমেও খবরের কাগজের ধর্ষণ নিমকি হাসে, মহা মুস্কিলহাল-ফ্যাশন আনন্দবাজারকে কমড-পণ্য বানিয়ে ছেড়েছে। একা আর থাকতে দেয় না দুনিয়া।

ছেলেবেলায় লোড-শেডিং হলে ঠাকুমাকে জাপটে বসে থাকতাম; একা থাকতে তখন ভরপুর ত্রাস। ঠাকুমা জড়িয়ে ধরে গুণগুণে-গান গাইতেন “বাপরে নিমাই আমার, যাইয়ো না যাইয়ো না”আর নিমাই! হাল জমানায় ওসব নিমাই-তস্য নিমাই সব লটকে যেতেন জয়েন্ট-এণ্ট্র্যান্স/আই-আই-টির খেলেশালা হিউমানিটি যাক মেট্রোর নীচে; কেরিয়ার বাঁচলে বাপের নাম

এখন একা থাকা অসম্ভব। অফিসে একা ঘুর-ঘুর করলে বস ভাবেন টিমম্যান নয়, বাড়িতে একা থাকলে বউ ভাবে অন্য প্রেম করছে, পার্কে গিয়ে একা বসলে পাড়া-পাবলিক ভাবে বউ-খেদানো মাল; লে হালুয়ানিজের নিজেকে নিয়ে থাকাটাই পাপ।

দিল্লাগী মওকা। বউ পার্লারে। লোডশেডিং, টিভি নেই-ইন্টারনেট-ফোন-কেতাব তামাম বাদ। আমি একা। এই ব্যালকনি আমার হিমালয়; আমি শ্রীশ্রী পচা বাবা। আমি ছেলে বেলার রথের মেলা ভাববো, আনমনা-খেউড় করবো, ভূপেন স্যারের কানমলার রেওয়াজি-স্বাদ মনে আনবো, গায়ের শালের কোনা দাঁটে কাটবো। এবং সর্বোপরি, ইচ্ছে মাফিক কিচ্ছু ভাববো না।

আমিও বেড়াল নয়, এ মুহূর্তও শিকে ছেড়া লোডশেডিংয়ের নয়। ঘরের টিউব-বাতি আর বউয়ের কলিং বেল, এক সাথে বুকে ছ্যাত করে উঠলো।    

Saturday, December 29, 2012

খালাসীটোলা কী ভাবে মুছে যাবে

এদিকে
অনলাইন-সোস্যাল-বাজারি পরিবেশে, জনৈকার সাথে জনৈকয়ের অচানক আলাপআপনি-সম্বোধন ঝনাত করে সম-বয়স্কতা ও সম-মনস্কতা আবিষ্কার করে এবং  তুইতে নেমে আসা। ঈষত স্নেহ ও ডাকনাম বিনিময়। বন্ধু-সুলভ গদ্য কথা।

এমন সময় প্রশ্ন আসে পান-প্রীতির। বেবাক সাড়া দুজনেরই। দুটো সপাট খালাসিটোলা ভ্রমণের ইচ্ছে মুখোমুখি মিলিত হয়একে অপরের মন চাপড়ে নেয়। বাংলায় গান মেলে, চোলাই তালে।  

মন-ছন্দ মিলে দুজনে স্বীকার করে যে নেশা মদে নয়; সেবন-পরিবেশে লুকিয়ে রয়েছে। অতএব একে অপরকে আর একটু বুঝতে; চিনে নিতে হবে একে অপরের প্রিয় কোলকাতাইয়া-মাদক পরিবেশটিকে।
শুরু করলেন জনৈকা। নিজের প্রিয় মদ্য-ঠেকের লিস্টি;
সবেকিয়ানা-সিক্ত-ব্রডওয়ে হোটেল থেকে রুফ-টপ-রোম্যান্স-মাখা-ব্লু এন্ড বিয়ণ্ড থেকে সাহেবি-স্মার্ট-রুচি-রঞ্জিত-অলিপাব হয়ে অন্য মেজাজের সঙ্গীত-সহ নেশা ছড়ানো ট্রিন্কাস পর্যন্ত
; ছিমছাম ঝকঝকে পরিশীলিত সুর, প্রত্যয়ের রিমঝিম। 

মিষ্টি হাসিতে সাজানো জনৈকার লিষ্টিতে অভিভূত জনৈক স্মিত স্বরে জানালেন যে তিনি এ মদিরা-মন্দিরগুলির স্তুতি শুনেছেন, কিন্ত একটিতেও তার আজ পর্যন্ত পদার্পণ ঘটেনি।  
এ কেমন মদ্য-প্রীতি যুক্ত কলকাতার ভদ্র-বাবু, যিনি শহরের  এমন পান-তীর্থগুলিই ভ্রমণ করেন নি ? শিউরে উঠলেন জনৈকা।

বিবেকানন্দ-সুলভ আশ্বাস নিয়ে নিজের প্রিয় মদিরালয়ের আখ্যান মেলে ধরলেন জনৈক। নিজের অপত্য-মদ্য স্নেহ কে কেউ আড় চোখে দেখে চুকচুক করবে, এমনটা তো মেনে নেয়া যায় না। জনৈক মেলে ধরলেন মদ্য-অভিজ্ঞতা ডালি :
উত্তর কলকাতার সাবেকী বাড়ির চিলেকোঠায় মাঘের শীতে-রাত্রে; মাটির ভাঁড়ে রাম-চুমুক।
ছাতের ওপরের জলের ট্যাংকে মই বেয়ে বন্ধু সহ উঠে বিয়ার-অজ্ঞানতা-বরণ।
ফুটপাথিও-ল্যাম্পপোস্টের নিচে ইঁট পেতে বসে, কলকাতার মধ্য-রাত্রি ও এক অপরিচিত মুখ কে ভদকার প্লাস্টিক গেলাস হাতে চিনে নেওয়া; রাত জুড়ে।
 জনৈকা অপ্রতিভ হয়ে জানান দিলেন যে এই পান-অভিজ্ঞতা-সুখগুলি থেকে তিনিও বঞ্চিত।

জনৈক ও জনৈকা তখন অনলাইন যুক্তি-গুছোতে ব্যস্ত; কী ভাবে একে অপরের মদ্য-পরিবেশজনিত  অভিজ্ঞতার অভাবগুলি যৌথ-কার্যক্রমের মধ্যমে মিটিয়ে নেওয়া যায়। ঠিক হলো যে তার দুজনে সুনীল-শক্তি সুড়সুড়ি সম্বলিত খালাসীটোলায় দেখা করবেন এবং একে অপরের অভিজ্ঞতা বিকাশের স্বার্থে যথাযত প্ল্যান হাঁকবেন।

ওদিকে
ব্রহ্মা দেখিলেন ইহা এক মহাফাঁপর। দুই মাতাল যৌথ ভাবে জ্ঞান-অন্বেষণে বাহির হইলে মর্ত্তলোক নিশ্চিত ধ্বংস পাইবেদুই মাতালের মিলিত ও সুব্যবহারে শাণিত জ্ঞান-শক্তি;  নারায়ণ ও মহাদেবের যৌথ শক্তি হইতেও তীব্র- এমন সত্যটি ব্রহ্মা বিলক্ষণ জানিতেন কিন্তু এই মর্মান্তিক সত্যটি তিনি বেদ বা অন্য কোনও শ্লোক মাধ্যমে উহার উল্লেখ করেন নাই; পাছে মাতালরা তাহা জানিয়া প্রতি নিয়ত উত্‍পাত করিয়া বেড়ায়। যখনই কোনও দুইটি মাতাল জ্ঞান-অন্বেষণের স্বার্থে জোট বাঁধিতেন, ব্রহ্মা আগ বাড়াইয়া কোনওভাবে তাহাদের জোটে ব্যাঘাত ঘটাইতেন।

জনৈক-জনৈকার জ্ঞান-বিনিময় অভিসারে বিঘ্ন ঘটাইতে তথা মর্ত্তলোককে এ যাত্রা বাঁচাইয়া দিতে ব্রহ্মা ব্রহ্মাস্ত্র নিক্ষেপ করিয়া খালাসীতোলার বাংলা মদের আসরটি জ্বালাইয়া খাক করিয়া দিলেন। কিছু মানুষে ভাবিলো আপদ চুকিলো কেউ বা এই ভাবিয়া অস্থির হইলো যে; দ্যাখো সরকারের তরফ হইতে যথেষ্ট দেখভালের অভাবে এমন পবিত্র পিঠস্থানটি শর্ট-সার্কিটের আগুনে বিনষ্ট হইলো ; তাহারা মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করিয়া রাজ্য মাথায় করিলো 

খালাসি-বিযোগে জনৈক ও জনৈকা এমন ভাঙ্গিয়া পড়িলেন যে তাহারা প্রতিজ্ঞা করিলেন যে কখনোই আর একে অপরের সহিত দেখা করিবেন না

ব্রহ্মা হাঁপ ছাড়িয়া, ঘাম মুছিয়া;  মিচকি হাসিলেন।