Wednesday, December 8, 2010

কলেজ স্ট্রিট'য়ের খাওয়া-দাওয়া




কলেজ স্ট্রিট ঘেঁষে যে চার বছর'এর মেস-phase কেটেছে, সেই সময়কর ফুড-হ্যাবিট নিয়ে কিছু কথা ব্লগ রেকর্ডে ঢুকিয়ে রাখা উচিত। ফর ফিউচার রেফারেন্স। বিশেষ করে মমতা যদি সত্যিই কলকাতা'কে লন্ডনে কনভার্ট করতে পারেন (দিদি'র একটা প্রোগ্রেস থিম আছে না? কলকাতা কে লণ্ডন, দার্জিলিং কে সুইজারল্যান্ড এবং দীঘা কে গোয়া?), তাহলে এসব খাওয়ার-দাওয়ার'গুলো ফসিল-স্মৃতি হয়ে যাওয়ার হেভী চান্স আছে। তখন আমি গ্র্যাজুয়েসন করছি ক্যালকাটা উনিভার্সিটি থেকে। থাকছি আমহার্স্ট স্ট্রীট পোস্ট অফিসের উল্টো দিকের এক ছোট্ট গলি সীতারাম ঘোষ স্ট্রীট'এর এক মেস বাড়িতে। সেই সময় খাওয়া-দাওয়ার প্যাটার্ণ ছিল বেশ সোজা সাপটা। রাত তিন'টের আগে ঘুমতাম না, তাই বেলা এগারো'টার আগে ঘুম ভাঙ্গতো না, তাই জলখাবারের কোনও পাট কখনোই ছিল না। কখনো কখনো মেস'এর নিচের অমিত'এর চা'এর দোকান থেকে ডিম-পাউরুটি অবশ্য খাওয়া হত, তবে সাধারণত ব্রেকফাস্ট ব্যাপারটা উহ্যই থাকত। দুপুর'এর খাওয়া এবং রাত'এর খাওয়াটা মেস'য়েই হত।
অতএব কলেজ স্ট্রীট'এর ফুড-হাণ্ট চলতো শুধু সন্ধ্যে বেলার খাওয়াটুকুর জন্য। (সন্ধ্যে বেলার খাওয়া কে কি বলে? নাস্তা?টিফিন?জলখাবার?)। তখন অবশ্য পকেট মেপে চলতে হত, কাজেই বিকেলের টিফিন'এ জমিদারী করার স্কোপ থাকত না। তবে তার মধ্যেই উত্তর কলকাতার এই অঞ্চলে কম ভ্যারাইটি চেখে দেখিনি। সেইসময়কার প্রিয় দশ'টা সান্ধ্য-খাদ্য'এর লিষ্টি নীচে করলাম।


তবে নিচের কোনটাই প্রায় কলকাতা'র লিজেন্ড ঘেঁটে নেওয়া নয়, ব্যক্তিগত রুচি (এবং পকেট)'এর ওপর নির্ভর করে বানানো, একান্ত ব্যক্তিগত পছন্দের টিফিন লিস্ট এটা:
১। চিকেন কবিরাজি, দেলখোশ রেষ্টুরেন্ট, কলেজ স্ট্রিট মোর:
পুরনো কলকাতা'র কাঠামো এখনো জ্যান্ত আছে দেলখুশায়, টেবিল-চেয়ার যাবতীয় আসবাব, পর্দা থেকে ওয়েটার পর্যন্ত; সব কিছুতেই পুরনো গন্ধ। ভীষণ ইচ্ছে ছিল এদের সবুজ পর্দাটানা কেবিন ঘরে প্রেমিকা সহ এন্ট্রি নেওয়া, এমনি কপাল যে টাইমলি একটা প্রেমিকাও জটাতে পারলাম না। কবিরাজি ছাড়াও এদের যে কোনও চপ-কাটলেট নিশ্চিন্তে গেলা যেতে পারে।
২। মটন/চিকেন আফঘানি কাটলেট, ইন্ডিয়ান কফি হাউস, কলেজ স্ট্রীট মোর'এর কাছে:
কফি হাউস একটু ক্যালকুলেট করে ঢুকতাম, ওখানে বেশি ঘুর-ঘুরও করলে লোক'এ ইন্টেলেকচুয়াল বলে প্যাক দিতে পারে ভেবে। দোতলায় যেতাম না দুটো কারণে; দাম বেশি ছিল ওপরে আর প্রেম করতে পারিনি বলে; হামেশা নীচেই বসতাম। এখানের মোগলাইই'টাও মন্দ নয়, তব অদ্ভুত ব্যাপার; কফি হাউস'এর কফি; জানি না কেন আমার তেমন ভাল লাগতো না। আর হ্যাঁ, এখানের কোল্ড কফি বড্ড বাজে!
৩। পাউরুটি-চিকেন স্ট্যিউ, কলেজ স্কোয়ার ক্যান্টিন, কলেজ স্কোয়ার :
না স্যার, এতো রেষ্টুরেন্ট নয় তাই বসবার জায়গার সওয়াল নেই, ক্যান্টিনের ছোট্ট জানলা দিয়ে আপনার দিকে প্লেট বাড়িয়ে দেওয়া হবে, প্লেট হাতে কলেজ স্কোয়ার'এর বেঞ্চিতে বসে খাওয়া।গোল মরিচ ছড়ানো ফ্যাট-ফ্যাটে সাদা মুরগির স্ট্যিউ যাতে থাকত ছোট্ট এক পিস মুরগির অল্প মাংস মাখা হাড় প্লাস কিছু সব্জী এবং লম্বাটে পাউরুটি দু পিস। তখন ভীষণ ভাল লাগতো খেতে সেটা। দাম, যদ্দুর মনে পড়ে বারো টাকা। এখানে এই আইটেম বাদে কোনও কিছুই ট্রাই করিনি কখনো।
৪। মোগলাই পরোটা, কমলা রেষ্টুরেন্ট, সূর্য সেন স্ট্রীট'এর কাছে :
রেষ্টুরেন্টটা বিশাল কেতা-দুরুস্ত কিছু নয় কিন্তু এদের মোগলাই'টা ব্রিলিয়াণ্ট, ঝাল এবং ভারী : এত পুরু মোগলাইই পরটা খুব কম খেয়েছি, এ ছাড়া এদের সঙ্গে যে আলু'র তরকারীটা দিত সেটার মধ্যে কোনও মোগলাই কোয়ালিটি তেমন না থাকলেও; সুপার ফাইন বাঙালি-আলু চচ্চড়ি হত উইথ সুপার-ঝাল। আমার খাওয়া অন্যতম সেরা মোগলাইই পরোটা।
৫। মটন টিক্কা আর রুমালি রুটি, অন্নপূর্ণা রেষ্টুরেন্ট, টুওয়ার্ডস শেয়ালদা : মটন কিমা আর ছাতুর কম্বিনেশন যে এত সাংঘাতিক সুস্বাদু হতে পারে এদের মটন টিকিয়া না খেলে বোঝা যাবে না। এক পা এগিয়ে বলি, এদের মটন টিকিয়া এককেবারে কলকাতা বেস্ট। আর সঙ্গে সুপার ফাইন রুমালি রুটি। আজ ভাবতে গেলে জ্বিভে জল আসে। চার'টে রুমালি রুটি আর একটা মটন টিকিয়া তখন সতেরো টাকায় হয়ে যেত। এটা আমার ইসস্পেশাল টিফিন'এর লেভেলে পরতো।
৬। কচুরী-ছোলার ডাল, পুঁটিরাম, সূর্য সেন স্ট্রীট :
এমনিতেই এটা একটা ল্যান্ডমার্ক দোকান যাকে বলে, এদের ছোলার ডাল টা যাকে বলে তুরীয়, হাফ ডজন কচুরী কোথায় যে ভ্যানিস হয়ে যেত..
৭। রাধাবল্লভী-আলুর দম/ঢাকাই পরোটা, সুরভি মিষ্টান্ন ভান্ডার, আমহার্স্ট স্ট্রিট-হ্যারিসন রোড ক্রশিং'এর কাছে :
রাধাবল্লভী টা সত্যিই ক্লাস বানাতো, মিষ্টি-ঝাল আলুর দম'টাও চেখে দেখবার মত। ঢাকাই পরোটা'টা ছিল নোনতা খাজা আর কচুরীর মিক্সচার, সাইজে বিশাল, একটাতেই পেট ভরে যেত; ওপরে ছোলার ডাল ছড়িয়ে সার্ভ করা হত; বেশ টেষ্টি!
৮। এগ-চাউমিন প্লাস চিকেন পকোড়া, খোকন'দার চাউমীনের দোকান, সীতারাম ঘোষ স্ট্রীট :
একান্তই ব্যক্তিগত অভিরুচি এবং ভীষণ ভালোবাসা মেশানো খাওয়ার জায়গা ছিল এই খোকনদার চাউমীনের দোকান। আমাদের মেসের ঠিক নীচেই ছিল এই দোকান'টা। দোকান বলতে গলি'র ধারে ছোট্ট একটা আস্তানা, সামনের বেঞ্চিতে বসে খাওয়া। এখানের সেরা কম্বো একটাই; হাফ প্লেট এগ চাউমিন (সরু থ্রেডের চাউ, ওপরে ফ্রি চিলি চিকেনের গ্রেভী ছড়িয়ে নেওয়ার সুযোগ সহ) এবং এক পিস চিকেন পকোড়া। ভীষণ টেষ্টি অথচ অতি-মসলায় দুষ্ট নয়; ভরপেট মাত্র দশ টাকায় ছিল এ সব কিছু তখন। দারুন না?
৯। রোজ সিরাপ সরবত, প্যারামাউন্ট, কলেজ স্ট্রীট'এর কাছে :
এটা আর একটা ইতিহাস মার্কা 'বড়' দোকান। বহু রকমের সরবত রাখতো এরা, গরম কালে তো এদের সরবতের কোনও তুলনাই ছিল না । তবে এদের ম্যাঙ্গো, ব্যানানা যাবতীয় হিজিবিজি ফ্লেভার গুলোর মধ্যে সব চেয়ে বেশি প্রিয় ছিল আমার এই রোজ সিরাপ সরবতই; এটাই মনে হয়ে তখন সব চেয়ে সস্তাও ছিল; পাওয়া যেত দশ টাকায়।
১০। হাড়ি-গরম মিক্সচার, কলেজ স্কোয়ার :
বিকেলের ফুরফুরে হাওয়ায় এবং পেট'এর চনমনে খিদে'র সময় যদি টাকা কম থাকত, তখন সেরা সাপোর্ট সিস্টেম ছিল কলেজ স্কোয়ারের এই হাড়ি-গরম ফিরিওয়ালারা। হাড়ি'র আগুনে গরম করা চানাচুর'এর মধ্যে পেয়াজ, নূন, লংকার সলিড মিশেল, অপূর্ব সে স্বাদ। তবে আজব ব্যাপার সেই হাড়ি-গরম চানাচুর কলেজ স্কোয়ারে বসে খেলে যতটা জ্বিভে জল আনতো, তার সিকী ভাগ স্বাদও অন্য কোথাও হাড়ি-গরম খেলে পাই না।
সংযোজন:
কালিকার চপের দোকান, সূর্য সেন স্ট্রীট

ফুড স্টেশন, কলেজ স্ট্রীট (একটু পকেট-হেভী ব্যাপার, তুলনামূলক ভাবে)
বসন্ত কেবিন, কলেজ স্ট্রীট
(পুনশ্চ: কলেজ স্ট্রীট'এর যাবতীয় খাদ্য স্মৃতি ঘেঁটে দেখলাম, যে বহু খাওয়া-দাওয়ার হিসেব এখনো বাকি রয়ে গেল, এই পোস্ট ভবিষ্যতে সেই বাদ থাকা গুলো জুড়ে নিয়ে আরও পুষ্ট করে তুলতে হবে।

Sunday, December 5, 2010

গুগল ঠাট্টা



ইন্টারনেটে একটা মস্করা বহু প্রচলিত আছে।

প্রশ্ন: -"How do you spell God?"

উত্তর: "G-O-O-G-L-E"


রজনীকান্ত ("তুমি নির্মল কর" খ্যাত নয়, "শিবাজী" খ্যাত) নয়, মারাদোনা'র হাতও নয়, যুগ'এ ঈশ্বরত্ব যদি কাউকে গছানো যায় তবে সে হচ্ছে গুগল। কারণ স্পষ্ট।

আমার এক বন্ধু, গুগল'য়ে কর্মরত হয়েও এই ধারণা'টা শুনলেই উসখুস করে উঠতো। মাঝেই মাঝেইবলতো "টেকনোলজি কখনো ভগবান হতে পারে না ব্রাদার, মানুষের চ্যালেঞ্জ ফেস করার ক্ষমতাটেকনোলজির নেই"।

সেই বন্ধুর নাম সুহেল, সুহেল বারুজ্জ্যে। এই সেদিন সুহেল একটা ছোট্ট একটা মেল পাঠালো:



"তন্ময়,

বলেছিলাম না, মানুষ টেকনোলজির মাতব্বরি কে চিরকাল চ্যালেঞ্জ করবেই?

যে ই-মেল আই-ডি থেকে মেল টা পাঠাচ্ছি, সেটা খেয়াল করিস।

সুহেল"


লক্ষ্য করে দেখলাম সুহেল মেল'টা এই আই-ডি থেকে পাঠিয়েছে :

gmail@suhelbanerjee.com


গুগল'এর এত বড় একটা প্রোডাক্ট, জি-মেল, যেটা নাকি ই-মেল বাজির কসেপ্টই পাল্টে দিয়েছে,সেইটাকে এত বড় মনস্তত্বিক ঠাট্টার মুখে ফেলে দেওয়..ভাব যায়?

প্রযুক্তি কখনোই মানুষ কে পিছনে ফেলতে পারবে না; তার বোধ হয় একটাই কারণ: প্রযুক্তির 'সেন্সঅফ হিউমার' নেই।


(পুনশ্চ : gmail@suhelbanerjee.com ই-মেল আই-ডি টা সম্পূর্ণ খাঁটি, মেল করে দেখতে পারেন!)

Saturday, November 20, 2010

দ্য গ্রেট কালচারাল দাদাগিরি

লিওপোল্ডএর লালচে আলো মাখা সন্ধ্যের আঁচ, আধ ঘন্টার মধ্যে যেকোনো মগজে ঝিম নামিয়ে দিতে পারে, মাতাল সহকর্মীগুলোর সঙ্গে মুম্বাইএর এই পান-তীর্থে এসে বুঝলাম যে কলকাতার দিবাকর সান্যালের জাজমেন্টটা নেহাত ফালতু নয়। টেবিলে সহকর্মীদের এক ঘেয়ে এলকহোলিক আড্ডাবাজি থেকে উঠে এসে, বার ঘেঁষে একটা আরাম-টুলে বসলুমগেলাসে মন দেব, এমন সময় কাটোয়া লোকাল ছাপ চাহিদা ভেসে এলো; “দাদা দেশলাই আছে?”

পকেট থেকে দেশলাই বের করে দিতে গিয়ে দেখলাম রঙ চঙে বুশ শার্ট পর এক মধ্য বয়স্ক ভদ্রলোক

-“বুঝলেন কি করে যে আমি বাঙালি?”, জানতে চাইলাম।
-“জনি ওয়াকারে যে ভাবে হাড়-হাভাতের মত চুমুক লাগলেন তাতেই সন্দেহ হয়েছিল, আর এই মাত্র যে রজনীকান্ত গুনগুণ করছিলেন সেটা ট্র্যাক করে ফেলেছি”, ভদ্রলোক দেশলাই ফেরত দিতে গিয়ে জানালেন, “কানটা আমার বেশ শার্প বুঝলেন”
-“শার্প শুধু না, সুপার শার্প”
-“তবে এই যে আপনার গুনগুণ টা শুনতে পেলাম সেটা কিন্তু শুধু কানএর জন্যে নয়, শুনতে পাওয়ার মূল কারণটা হলো আমাদের ইটারনাল সেন্স অফ দাদাগিরি”
-“দাদাগিরি? এক্সকিউজ মি?”
-“ বুঝলেন না তো! লেট মি এক্সপ্লেইন। এই ধরুন বন্ধু-বন্ধবের সঙ্গে আপনি বারে এসেছেন বিলিতি মাল খেতে, ফুর্তি করতে! বেশ করছিলেন সেই সবঅথচ একটু আগে দেখলাম আপনি ওখান থেকে উঠে এসে এই বারএর পাশে এসে একা বসে গুণগুণ করছেন তুমি নির্মল কর, মঙ্গল করহোয়াই? মাল খান, ফুর্তি করুন,কিন্তু লিওপোল্ডে রজনীকান্ত গুণগুণাবার কি হয়েছে? আপনি গুণগুণ করে উঠেছেন কারণ তখন আপনার মধ্যে বাঙালির ইণ্টেলেকচুয়াল দাদাগিরি চুইয়ে বেরোতে শুরু করেছে। ছোট-বাথরুম বড়-বাথরুমের মত এটাও বাঙালির একটা প্রাকৃতিক আর্জ, বুঝলেনযেকোনো জাগায় নিজের কালচার পুশ করা। এটা একটা খতরনাক সেন্স অফ দাদাগিরি, দি গ্রেট বাঙালি কালচারাল দাদাগিরি। আর এই যে আমি, এত ভিড়, হই-চই ফিল্টার আউট করে আপনার গুণ গুণ করা বাংলা গান ট্রেস করে ফেললাম, এটাও সেই আঁতেল দাদাগিরির রেজাল্ট। বাঙালি নর্থ পোলে গেলেও ক্যালেন্ডার দেখে বসন্ত উত্‍সব করবে মশাইআরে, সৌরভের সেঞ্চুরির থেকেও ঢাক বাজাতে পারা আমাদের কাছে বেশি স্পেশাল, বুদ্ধর নন্দন ভিজিট আর মমতার হিজিবিজি স্কেচ আমাদের কাছে বেশি মাইন্ড স্পেস পায়, ওদের পলিসি-টলিসি নিয়ে আমাদের কোনও মাথা ব্যথা নেই। সংস্কৃতি নিয়ে আমাদের এত মাতব্বরি, যে এই করে করেই জাতিটা বখে গেলরবীন্দ্রনাথ আর সত্যজিতের লিমিটেশন আর বাঙালি জন্মে ওভারকাম করতে পারবে নাশুধু এই কালচারাল দাদাগিরি ফলিয়ে বাঙালি খতম হয়ে গেল”
হাঁ করে গিলে গেলাম ভদ্রলোকের কথা গুলো। হুইস্কির জন্যে নাকি ভদ্রলোকের লেকচারের জন্যে জানি না, মাথাটা বেশ ঝিম ঝিম করতে শুরু করেছিলএমন সময় আমার সহকর্মীনী অনিতা আমায় ডাকতে এলোবাঙালি ভদ্রলোকের থেকে বিদায় নিয়ে নিজের টেবিলে এসে বসলাম। আর ঘন্টা খানেক গল্প আড্ডার পর আমরা টেবিল ছেড়ে উঠলাম। বেরোতে যাব এমন সময় দেখলাম যে সেই বাঙালি ভদ্রলোক তখনও বসে আছেন। ওনার দিকে হেঁটে গেলাম। পাশে দাঁড়িয়ে গুড নাইট বলে হাত বাড়িয়ে দিলাম। হ্যান্ড শেক করে ভদ্রলোক বললেন, “টেক কেয়ার”
উত্তরে বললাম “আপনি তাইলে বাঙাল?”
-“বরিশাল”, ভদ্রলোক অবাক হয়ে বললেন।
-“যশোর হিয়ার”, আমি জনালুম।
-“আপনি বুঝলেন কি করে যে আমি বাঙাল?” ভদ্রলোক এবার একটু ভেবড়ে গেছেন।
_ “ওই যে কালচারাল দাদাগিরি, ওই দাদাগিরি বেস করেই বুঝেছি”, হেসে বললাম।
-“মানে?” ভদ্রলোক উত্‍সুক এবার।
- “মানে ওই যে আমার সহকর্মীনী তখন আমাকে ডাকতে এসেছিলেন, তাকে দেখে যে আপনি অস্ফুটে বলে উঠলেন হালা, মাগী খান কি ডবকা’, সেটা আমি পাঁচ ফুট দূর থেকেও, এত হইচই, লাউড মিউজিক সত্ত্বেও ট্রেস করে ফেলেছি, এই হলো গিয়ে বাঙালদের প্রবলেম বুঝলেন, কালচারাল দাদাগিরি; বম্বে কি লণ্ডন, বাঙাল শুনলে বা ইলিশ শুঁকলে, সব ছেড়ে ছুড়ে ট্রেস করে নেবে। গুড নাইট, টেক কেয়ার”!

Monday, November 15, 2010

রোগ-সুন্দর



ভাইরাল, জ্বর-গলা ব্যথা-চোখ লাল-জ্বিভ বিস্বাদ! তবে এসব যন্ত্রণা সহ্য করেও যখন দেখি সোমবার দুপুরে; অফিসের থবড়ানি ভোগ না করে, মেডিকাল লিভের দৌলতে ঘরে বসে মন দিয়ে ভি সি ডিতে আইস এজ দেখছি, তখন দিল সুপার খুশ হয়ে যায়। সাবাস ভাইরাল, উইকেন্ডটাকে পাস কাটিয়ে ঠিক রবিবার রাত থেকে গায়ে টেম্পরেচার। কি টাইমিং মাইরি। নাহ, শুধু সেলস টার্গেটি নয়, জীবনে ভগবানও আছেন। বিকেলে বউ সলিড ঝাল ফুচকা নিয়ে আসবে, তাতে নাকি জ্বিভের টেস্ট-বাডরা জেগে উঠবে। এই বডি টেম্পরেচার আর দু দিন টানতে পারলেই হল, বিষ্যুদ-শুক্কুর অফিসে টুকি মেরেই ফের উইকেণ্ড, ক্লাস সিচুয়েশন!
অতএব কনক্লুশান?, রোগ-ভোগ মানে যে হামেশাই টেনশন-দুশ্চিন্তা-কষ্ট তা নয়। প্রাসঙ্গিক দুটি কেস:


1জনডিস
ক্লাস ইলেভেনে তখনমাস খানেক ক্লাস করার পরেই জনডিস ধরা পড়ল। কিলো কিলো রোল, ফুচকা, চপ-বেগুনীর ফসল। বিলিরুবিন সাড়ে আটসর্বক্ষণ গা-বমি ভাব, ভীষণ উইকনেস; সাপটা ডাক্তারী আদেশ: ১ মাস বেড রেস্ট। শুয়ে থাকার তিন দিনের মাথায় দুপুর বেলা ফোনে এল;
-“এই যে হলুদ পাখি, কি খবর? কদ্দিনের ছুটি?”
-“১ মাস, কে বলছিস?”, বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম।
-“মিকি
-“কে মিকি?”, প্রথমটায় মনে করতে পারিনি এই মিকিটা কে। তারপর মনে পড়ল যে এই মিকি আমাদের স্কুলে নতুন এসেছে। পাশের শহর থেকে প্রতিদিন আসে আমাদের স্কুলে।
চিনতে পেরেছি বলাতে বিজ্ঞের মত বলে গেল – “ এক মাস স্কুল মিস বেশ লম্বা বুঝলি, বাম্পার ছুটি এনজয় করবি বটে, তবে চাপ টা হল এই যে ক্লাসের ব্যাপারে আপডেট না থাকলে চলবেনা। তুই এক কাজ কর আজ থেকে একটা জনডিস ডায়েরী মেনটেন কররোজ দুপুরে আমি তোকে রোজকার স্কুলের আপডেট দেব ফোনে করেচিন্তা নেই, শুধু ক্লাসের পড়াশোনার কথা নয়, বিসাইড দ্য সিলেবাস আমি তোকে স্কুলের বাকি খবর-টবরও স্ট্রাক্চার্ড ওয়েতে সাপলাই করে যাব, হুইচ ইনক্লুডস ইন্টার হাউস ফুটবলএর হাল হকিকত এবং সায়নির সমস্ত খবর, কি ভাই, নামটা ঠিক বলেছি তো
প্রায় জোর করেই আমায় জনডিস জার্নাল মেনটেন করিয়েছিল মিকি। রোজ স্কুল থেকে ফিরে আমায় ফোনে করে স্কুলের ফিরিস্তি শোনাতো মিকি। ক্লাসে কি পড়ানো হচ্ছে, কে টেস্টে ফেল করেছে, কে প্যাদানি খেয়েছে বা দিয়েছে থেকে সায়নির দিকে কে তাকিয়েছে, বুলেট পয়ণ্টে সাজিয়ে বলে যেত রোজ। শুধু আমার জনডিস-ছুটির শেষ দুই দিন মিকির কোনও কল আসেনি। আমার আর ফিরতি কলও করা হয়নি
স্কুলে ফিরে গিয়ে মিকির খবর নিতেই জানলাম মিকি মাস খানেক স্কুলে আসতে পারবে না। জনডিস! বিলিরুবিন নয়ে গিয়ে ঠেকেছে। কি ভালোই যে লেগেছিল খবরটা পেয়ে।
স্কুল থেকে ফিরে গিয়েই ফোনে লাগলাম মিকিকে; - “ এই যে হলুদ পাখি, জনডিস ডায়েরী শুরু করে ফেল, এবার রেগুলার আপডেট দেব আমিপড়াশোনা থেকে ফুটবল, বুলেট বাই বুলেট”!
“আর শর্মিষ্ঠার খবর কে দেবে? প্রিন্সিপাল?”, গম্ভীর গলায় বলেছিল মিকি
দৈনিক খবর গুলো রোজ সাজিয়ে দিতাম মিকিকেসেই দ্বিপাক্ষিক জনডিস-বাজির জেরে এক পেল্লায় দোস্তি গজীয়েছিল। মিকির ভাষায় “এ হৃদয়ের যোগ নয় পচা, লিভার কনেকসন”!
২। চিকেন পক্স
সেই স্কুল থেকে আমি, পাপাই আর চিন্টু এক জান-এক প্রাণ। স্কুলকামাই থেকে মেয়েদের দিকে এংগুলার দৃষ্টি নিক্ষেপ, সমস্তই এক সাথে, গলায় গলায় জেনেছি-শিখেছি-করেছি। বেনিমাধব শীল যাই বলুক, আমাদের দিনগত ফল পৃথক কিছুতেই হতে পারে না, এটা একটা সোজাসাপটা হাইপোথেসিস। হাইপোথেসিসটাকে এক দিন বেমক্কা চ্যালেঞ্জ করে বসল পাপাই।
গরমের ছুটিতে আমি আর চিন্টু প্রবল ভাবে প্ল্যান করে চলেছি কি ভাবে টিউশনীর টাকা শটকে বিকেলগুলোকে চাউমিন-রোল-মোগলাইই সহযোগে আরও মনোরঞ্জক করে তোলা যায়, এমন সময় পাপাই এসে মেজাজের সঙ্গে জানালে যে এই গরমে সে মেজমামার সাথে উটি ঘুরতে যাবে।
টু দি ল্যান্ড অফ ব্লু মাউন্টেনস- আমি চললুম বন্ধুরা”, পাপাইএর কথা শুনে গা জ্বলে গেছিল।
চিন্টু সাবধান করেছিল পাপাইকে, “ওরে ট্রেটর, ওরে ইতর, বাবার পকেট কেটে তোকে চাউমিন গিলিয়েছি নিমাইদার দোকানে, সে কি আজ এই দিন দেখবো বলে? গরমের ছুটিতে আমরা বাড়িতে পচবো আর তুমি ল্যাল ল্যাল করে মেজমামার পিছণ ধরে উটি দেখবে?তুই জাহান্নামে যা, শুয়ার”
আমিও পাপাইকে একটু নিরস্ত করতে চাইলাম, “পাপাই, উটি তে কি এমন হাতি ঘোড়া আছে রে ভাই, তার এর চেয়ে চ শ্রীরামপুরে পিসির বাড়ি থেকে দু দিন কাটিয়ে আসি, পিসেমশাইদের ওখানে হিমসাগরের বাগান আছে, এক একটা মিষ্টি বম্ব এক্কেবারে”!
“গ্রেপ্স আর সাওয়ার মেট, গ্রেপ্স আর সাওয়ার”, এই বলে নিষ্ঠুর পাপাই কেটে পড়েছিল। সেদিন বিকেলেই পাপাই রওনা দিয়েছিল মেজমামার সাথে ২ সপ্তাহের জনন্যে উটি।
পইতে ছুয়ে চিন্টু বলেছিল “ভস্ম হয়ে যাক ব্যাটাচ্ছেলে পাপাই”!
পাপাই ভস্ম হয়নি।
এর ঠিক দুদিনের মাথায় ভোর পাঁচটায় চিন্টুর ফোন, “ পচা, ট্যাক্সি নিয়ে ১০ মিনিটে তোর বাড়ি আসছি, স্টেশন যেতে হবে”
-“কেন?” আমি ঘাবরে গেছি।
-“পাপাই ফিরে আসছে, উটি যাওয়ার পথেই ওর চিকেন পক্স বেরিয়ে গ্যাছে। মেজমামা ওকে পার্সেল করে ফেরত নিয়ে আসছেনওয়েলকাম ব্যাক সেরিমনিটা স্টেশন থেকেই আরম্ভ করতে হবে বুঝলি”
আহহ, এত তৃপ্তির খবর ক্যালকুলাসে পাস করেও পাইনি।