Monday, February 21, 2011

ভাষা দিবসিও কথোপকথন


স্থান: 17 তলার একটি ফ্ল্যাট, দক্ষিণ কোলকাতা
কাল: ২১ ফেব্রুয়ারী
পাত্র-দ্বয়: পিতা, বয়স ৩৯, চাকুরে / পুত্র, বয়স ৭, ছাত্র
কাল্পনিক?: আদৌ নয়। পিতা'টির অনুরোধে নাম গুলি চেপে যাওয়া হলো।


পুত্র: হোয়াট ইস দিস ল্যাংগুয়েজ-ডে ড্যাড? এনি আইডিয়া?
পিতা: গেট আইডিয়া মাই সন!
পুত্র: হোয়াট?
পিতা: ইয়ে, ল্যাংগুয়েজ ডে মিন্স ভাষা দিবস, আই মিন দ্য ডে টু সেলিব্রেট ইওর ল্যাংগুয়েজ ডিয়ার সনি।

পুত্র :ও, মানে ইউ মিন, ফদার্স ডে-মাদার্স ডে লাইক ডে, তাই না ড্যাড?
পিতা: প্রিসাইসলি।
পুত্র: তো, ফাদার্স ডে'তে যদি তোমাকে কার্ড দি, হুম সুড আই প্রেজেন্ট আ কার্ড অন দিস ডে?
পিতা: ওয়েল সন, ইট্স আ নো-কার্ড ডে।ইট্স আ লেকচার কাম কালচারাল অনুষ্ঠান ডে।
পুত্র: ড্যাড, ইউ নো, সামটাইমস আই ডোন্ট গেট ইউ। এনিওয়েস, সো হোয়াই ডু উই সেলিব্রেট ল্যাংগুয়েজ ডে?
পিতা: বিকজ..বিকজ..ইউ সি, ওয়ান্স আপঅন এ টাইম, অন দিস ডে, উই ফট এ ব্যাটেল টু সেভ আওয়ার ল্যাংগুয়েজ।
পুত্র :ইউ ফট?
পিতা: মি? যা: শ্লা, নো নট মি বাট মাই পূর্ব-পুরুষেস ফট, আই মিন আওয়ার ফোরফাদার্স ফট ফর আওয়ার ল্যাংগুয়েজ। ভয়ানক ফাইট কিয়া, ফট টিল দে ডাইড, এ ফাটা-ফাটি যুদ্ধ ইট ওয়াজ!আই মিন
এ ভ্যালিয়াণ্ট ব্যাটেল ইট ওয়াজ!
পুত্র: ওয়াও, সাউণ্ড্স কুল ড্যাড, সো হোয়াট ল্যাংগুয়েজ ডিড উ ফাইট ফর?
পিতা: বাংলা, বাঙাল টু বি পৃসাইস! আহ আমাগো গরব আমাগো ভাষা, উফ্!
পুত্র: হোয়াট আর ইউ মাম্ব্লিংগ ড্যাড?
পিতা: হুম? , না, ওয়াস সেয়িং যে দে ফট ফর আওয়ার মাদার টাং, বেঙ্গলি!
পুত্র: ওয়াও, নাইস। বাট টেল মি ড্যাড, দে ডিড নট ফাইট টু ওয়েল, ডিড দে?
পিতা: সে কি রে ব্যাটা, হোয়াই ডু ইউ আস্ক দ্যাট?
পুত্র: কজ মাই মাদার টাং ইস বেঙ্গলি বাট আমি ভালো বেঙ্গলি বলতে পারেস না। ইন স্কুল মাই ফার্স্ট ল্যাংগুয়েজ ইস ইংলিশ এন্ড সেকণ্ড ল্যাংগুয়েজ ইস হিন্দী।
পিতা: ডোন্ট বদার সন, আই উইল টিচ ইউ গুড বাংলা, ডান?
পুত্র: ডান, বাট ড্যাড..ইউ রিয়ালি থিঙ্ক দ্যাট বেঙ্গলি ইস মাই মাদার টাং? কজ ইউ সি, মম কান্ট রিড বেঙ্গলি এণ্ড হার্ডলি এভার স্পিক্স ইন বেঙ্গলি। সি ওনলি স্পিক্স ইন বেঙ্গলি হোয়েন সি ইস এবিউসিং
ইউ, তাই না ড্যাড?
পিতা: গেস বেঙ্গলি ইস ইউর ফাদার টাং দেন।
পুত্র: নট ব্যাড, বাট হোয়াট কুড বি মই মাদার টাং দেন?
পিতা :খিস্তি! দ্যাট ইস ইউর মাদার টাং সন!
পুত্র: হোয়াট? হোয়াট ডিড ইউ জাষ্ট সে ড্যাড? হোয়াট স্তি?
পিতা: খি.. আহ ওয়েল, নেভার মাইন্ড, ইউ উইল নো হোয়েন ইউ ম্যারি। কাল থেকে আমি তোমায় বাংলা শেখাব।

Saturday, February 5, 2011

বাঙ্গালের বিশ্ব-বুদ্ধি

আমার জ্ঞান-স্ফেয়ারে, মিশর হাজার তিনেক বছর’এর তফাতে, পিরামিড’এর পর মুবারক-সাহেবের হাত ধরে প্রবেশ করল। মাঝে কিছু খুচরো এন্ট্রি ছিল বটে; এই যেমন নন এলাইনমেন্ট-পন্থী নাসের, টিনটিন’এর ফারওয়ের চুরুট খোঁজা অথবা প্রোফেসর শঙ্কুর মিশর-ভ্রমণ ইউ-এফ-ও’এর খোঁজে। ভাবলে অবাক হতে হয়, যে গ্লোবালাইজ্ড অর্থনীতি এবং টেকনোলজির যুগে, যখন গোটা পৃথিবীটা পকেটে চিরকুটের মত পড়ে থাক উচিত, আমি যে ইণ্টেলেকচুয়াল ডোবায় বাস করছি, তার রেডিয়াস’টাই সামান্য পাল্টেছে মাত্র। মিশরের মানুষ যে ওদিকে পিরামিডিও এক মানবিক যুদ্ধে নেমেছেন, তার খবরটা অন্তত আমার কাছে তখন পৌছল যখন বিস্ফোরণ ঘটে গ্যাছে, বাঁধ ভাঙ্গার কাজ শুরু হয়ে গ্যাছে।


এই সময়ই মনে হল, এই ‘গোটা পৃথিবী’ই এক’ গোছের কথা আদতে স্রেফ ফালতু-বাত। মুখ’এর সামনে এটলাস খুলে বসলে ঘাবড়ে যেতে হয় যে এই ইউনিভার্সাল ব্রাদারহুডের যুগেও আমরা আসলে আমাদের ব্রাদার-দিগকে আদৌ তেমন চিনে উঠতে পারিনি। অন্ততো যে কয়েকটি গুটিকয় দেশ সম্বন্ধে সামান্য যোগ অনুভুব করি, সেগুলো বিশ্লেষণ করলে মনে হয় ঝাঁপ দি। কোন কোন দেশ কে কি কি সূত্রে এবং কতটুকু জানি?বলি শুনুন:

১। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র: নমস্য। ‘মোদের গরব মোদের আশা-আমেরিকা দেশটি খাসা’। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আমাগো প্র্যাসিডেণ্ট। ডেমক্রেসির বাপ- হোয়াইট হাউস। সিনেমার ঠাকুরদা- হলিউড। সমস্ত ‘ভালো-ছেলে’দের স্পষ্ট গন্তব্য। আর মানে..ইয়ে..ফ্রি সেক্স-টেক্স চলে বোধ হয় ওখানে।

২। পাকিস্তান: ক্রিকেট। মাঝে মাঝে রাম-প্যাদানী’র ভয়; উগ্রবাদ। উচ্ছন্নে যাক, বয়ে গ্যাছে।

৩। চিন: চাউমিন। মাও সে তুং।অলিম্পিক মেডাল। আর ওরা বোধ হয় টিকটিকি খায়!

৪। বাংলাদেশ: ধুর, দেশ কি। ও তো ক্যানিং’এর ওপার। ইলিশ’এর সাপ্লাই চালিয়ে যাক, ব্যাস!

৫। নেপাল: মণিষা কইরলা। যত কান্ড কাঠমাণ্ডু’তে। আম আদমির বিদেশ ভ্রমনের শখ মিটিয়ে থাকে।

৬। শ্রীলঙ্কা: ক্রিকেট। ব্যাস। চুপ।

৭। সিংগাপুর, হংকং: ব্যাপক কিছু হবে, ঝাঁ-চকচকে শহর টহর বোধ হয়।

৮। ইন্দোনেশিয়া,জাভা, বার্মা, ভিয়েতনাম, উত্তর/দক্ষিণ কোরিয়া: হে: হে:, আরে দাদা 8B বাস স্টপ’টাই সেদিন গুলিয়ে গেছিল, আর বার্মা। তবে ভিয়েতনামে কোনও এক কালে কোনও যুদ্ধ-টুদ্ধ হয়েছিল, কমুনিষ্ট গোছের কিছু। আর কোনও এক কোরিয়ার কাছে বোমা আছে, বুড়িমা-ছাপ নয়; পরমাণু!

৯। অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যাণ্ড : ক্রিকেট, নিয়মিত ভারতীয় ছাত্র-চাবকানো।

১০। জাপান: ইলেক্ট্রনিক্স: সোনি, এরাও টিকটিকি খায় না? ও হ্যাঁ, হিরোশিমা-নাগসাকি; দুম-দুমা-দুম!

১১। আরব: যাহা ওমান, তাহাই সৌদি; ওসব ফারাক বুঝি না। তেল-মরুভূমি-খেজুর-শেখ-বেলি ড্যান্স; তুখোড়!

১২। দক্ষিণ আফ্রিকা: ম্যান্ডেলা, ক্রিকেট, সাফারি; দেশটা আফ্রিকা’তে না থেকে ইউরোপে থাক উচিত ছিল।

১৩। আফ্রিকার অন্য সব দেশ: কালো, অন্ধকার, জঙ্গল, গরীব, যুদ্ধ; এককেবারে যা-তা। মিশর আফ্রিকায় নাকি? হ্যাঁ?

১৪। ইংল্যান্ড: চার্ণকের দেশ।লণ্ডন। ধোপ-দুরুস্ত সাহেবরা শুধু এখানেই থাকেন; এবং হেথায় রানি’র বাস (থেবড়ি বুড়ী আবার কি না রানি..)। কিন্তু ইংল্যান্ড, গ্রেট ব্রিটেন আর ইউনাইটেড কিংডম’এর কনফিউশন এ জন্মে আরে ক্লিয়ার হল না। ও হ্যাঁ; ই পি এল’এর লাইভ টেলিকাস্ট।

১৫। জার্মানি: হিটলার, বিশ্ব-যুদ্ধ, আর হিটলার। এবং ফুটবল।

১৬। ফ্রান্স: আইফেল টাওয়ার। আর ফ্যাশন টিভি।

১৭। রাশিয়া: কম্যুনিস্ট, লেনিন।

১৮। ব্রাজিল: পেলে, আর্জেন্টিনা: মারাদোনা।

১৯। সুইজারল্যান্ড: বরফ, চকলেট। পকেটভারী’রা এখানে ঘুরতে যান, পকেটখালি’রা এর ছবি ড্রইং-রুমে সাজিয়ে থাকেন।

২০। গ্রীস, ইতালি: ইতিহাস। আলেকজান্ডার।সীজার।

২১। ফুটবল: স্পেন, পর্তুগাল, কলম্বিয়া, চিলি, ইত্যাদি ইত্যাদি; সব নাম মনে থাকে না; ওয়ার্ল্ড কাপ শুরু হলে গড়গড় করে মনে চলে আসে।

এই হল আমার বিশ্ব-মানচিত্রের কনসেপ্ট। ভাবছেন বিশ্ব না চিনি, দেশ’টাকে অন্তত জানি। ধ্যুর মশাই!

পাঞ্জাব মানেই আমার কাছে ভাঙ্গরা আর পাতিয়ালা পেগ।
সিন্ধু এখন আউট অফ কন্টেক্সট।
গুজরাত মানে মোদী আর ন্যানো।
মারাঠা বলতে চিনলাম শিবাজী, তেণ্ডুলকর আর বাল ঠাকরেকে।
দ্রাবিড় মাত্রই মাদ্রাজী; ওসব তামিল, কেরল, কর্ণাটক বুঝি না; দক্ষিণ মাত্রই ডোসা-ইডলি-রজনীকান্ত!
উত্‍কল: পুরী এবং উড়ে ঠাকুর
বঙ্গ: দেশটা না চিনি, রাজ্য চিনি ভাবছেন? বিষ্ণুপুরের পোড়া-মাটি মন্দির, বোলপুরে শান্তিনিকেতন, বর্ধমানের মুড়ি,মালদার আম, চন্দননগরের জগধাত্রী পুজো, তিন বছরে এক বার দার্জিলিং; এই হল গিয়ে আমার মানসে বঙ্গ-মূর্তি।

ভাবছেন কোলকাতা’টা ভাল করে চিনি অন্তত? শেয়ালদা টু হাওড়া এবং শ্যামবাজার থেকে ময়দান; এর বাইরে যদি আমি কখনো-সখোনো ছিটকে পড়ি, তখন কলকাতা’কে আমি ততোটাই চিনি যতটা চিনি নাগপুর’কে (না, এর আগে আমি নাগপুরে কখনো যাইনি)।ট্র্যাজেডিটা আরও হৃদয় বিদারগ হয়ে ওঠে অন্য জায়গায়। বিকেলে বউ চা দিতে দেরি করায় মেজাজ চড়িয়ে ঢুকলাম রান্নাঘরে; নিজের চা নিজেই বানিয়ে দেখিয়ে দেব পুরুষ কি না পারে! রান্না ঘরে ঢুকতেই যাকে বলে এলাবোরেট কেলো; কোথায় দেশলাই, কোথায় চা, কোথায় কাপ, কোথায় চিনি! মাথায় উঠল চা বানানো; ঘৃণ্য আত্ম-সমর্পণ ছাড়া কোনও উপায়’ই রইল না।বিশ্ব তো কোন ছার, এতদিনে নিজের ঘর’টাকেও ভাল করে চিনতে পারলাম না!

Saturday, January 1, 2011

আনন্দবাজারি বঙ্গ দশক


আর এক বছর হাওয়া। “Morning shows the day” মার্কা একটা ফালতু হাইপোথেসিস ফলিয়ে যদি একটা বছরের মতি-গতি ট্রেস করতে হয়?

বাঙালির টেম্পারামেন্ট মাঁপতে হলে আনন্দবাজার পত্রিকার চেয়ে কোনও বেশি সলিড বেস আর নেই। গত ১০ বছরের আনন্দবাজারের প্রথম পাতা ইন্টারনেটে ঘেঁটে দেখলাম। প্রতিটি বছরের শুরুতে বাঙালির মজ্জায় কি কি (বা কারা কারা) ট্রেন্ডকরেছে সেটার আঁচ কিন্তু বেশ স্পষ্ট।
২০০১, ১ জানুয়ারী



বঙ্গ-
Trending: বুদ্ধদেব, উন্নয়ন, সৌরভ গাঙ্গুলী, মমতা

২০০২, ১ জানুয়ারী
বঙ্গ-Trending: শিল্প/উন্নয়ন, রবীন্দ্রনাথ (কপিরাইট-মুক্তি কারণে), আতঙ্কবাদ/আফ্গানিস্তান, মেদিনীপুর (জেলা ভাগ), সৌরভ গাঙ্গুলী, মমতা, বুদ্ধদেব
২০০৩, ১ জানুয়ারী
বঙ্গ-Trending: ক্রিকেট বিশ্বকাপ, সৌরভ গাঙ্গুলী, ক্রিকেট বিশ্বকাপ, অটল বিহারী বাজপায়ী, জঙ্গল বাঁচাও-নকশাল, বুদ্ধদেব, বাপী সেন
২০০৪, ১ জানুয়ারী
বঙ্গ-Trending: মুসারফ/পাকিস্তান, সৌরভ গাঙ্গুলী, বুদ্ধ-মমতা
২০০৫, ১ জানুয়ারী
বঙ্গ-Trending: সুনামি, মনমোহন সিং, বুদ্ধদেব, সৌরভ গাঙ্গুলী
২০০৬, ১ জানুয়ারী
বঙ্গ-Trending: মাও-বাদী, মমতা-প্রণব, ধোনী, শিল্পের জন্যে জমি
২০০৭, ১ জানুয়ারী
বঙ্গ-Trending: মাওবাদ, আতঙ্ক-বাদ, ইরাক/সাদ্দাম/বুশ, শিল্পায়ন
২০০৮, ১ জানুয়ারী
বঙ্গ-Trending: মাওবাদ, মমতা, রিজবাণুর, নন্দীগ্রাম,পরিবর্তন, ন্যানো, সৌরভ গাঙ্গুলী
২০০৯, ১ জানুয়ারী
বঙ্গ-Trending: মাওবাদ, মমতা, ন্যানো, সিঙ্গুর, আতঙ্কবাদ, শেখ হাসিনা, পরিবর্তন, কল্পনা চাওলা, ধোনী
২০১০, ১ জানুয়ারী
বঙ্গ-Trending: মমতা, পরিবর্তন, মাওবাদী, জঙ্গলমহল, ছত্রধর, বুদ্ধিজীবী, সচিন তেণ্ডুলকার
২০১১, ১ জানুয়ারী
বঙ্গ-Trending: মমতা, বিধানসভা ভোট, মাও-বাদ, সচিন তেণ্ডুলকার, বুদ্ধিজীবী (বিনায়ক কথা), বুদ্ধ

Monday, December 13, 2010

বড়া পাও বনাম আলুর চপ

আলোচনায়: ভেঙ্কট গুরু/সাম্য দত্ত

লেখক পরিচিতি:

ভেঙ্কট গুরু :
আপামর মুম্বাইকার এক তামিল বাংলা বিলাসীও বটে আদ্যোপান্ত ভারতীয় চাকুরে, ব্লগীয়ে ভালবাসেন রাস্কিন বন্ড, বিকেল বেলা ও আড্ডা

সাম্য দত্ত:
রাঁচী'র প্রবাসী বাঙালি কর্ম সূত্রে বর্তমানে চেন্নাইতে খাদ্য রসিক গাইয়ে, ব্লগীয়ে ভালবাসেন কথা বলতে এবং বন্ধুদের

অনুবাদ: বংপেন

(প্রথম পর্ব :ভেঙ্কট গুরু)

ভূমিকা


এমন এক শহরের মফস্বলি প্রান্তে বড় হয়েছি, যে শহর এক সময় 'বম্বে' ডাকে ঘুরে তাকাতো এই জন-মায়াবী বাস্তবতা খুব অল্প বয়স থেকেই আমায় সহজ ভাবে দুনিয়াদারি শিখিয়েছিলো রোজকার লোকাল ট্রেন সফরে কর্ম-ব্যস্ততা যখন যৌবনে ঠ্যালা দিল, তখন থেকেই এই শহর'এর ধমনী চিনতে শিখেছিলাম এই লোকাল ট্রেন সফর গুলো'তে, লক্ষ্য মানুষ'এর সন্নিধ্যে; যাদের সঙ্গে দিন শুরু হত এবং যাদের সাথে গৃহ-মুখি দৌড় দৌড়ে দিন শেষ করতাম ঠিক এই সময়ই এই শহরের নাগরিক হিসেবে নিজেকে আত্মস্থ করেছিলাম আপামর নাগরিক-খাদ্য বড়া-পাও'এর সাথে বড়া-পাও; যা কিনা এক সমগ্র শহুরে জাতির দৈনিক কর্ম-ব্যস্ততার মাঝে কখনো সকাল'এর জলখাবার, কখনো দুপুর রাত্রির গ্রাস, কখনো বা সন্ধ্যের ক্ষুধা তৃপ্তির সাজে; স্নেহ হয়ে নেমে আসে

এক পুরনো বন্ধুর সঙ্গে আলোচনার সূত্র ধরে মনে পড়ে যায় এম বি এ করবার সময় দিল্লীর চিত্তরঞ্জন পার্কে দুর্গা পুজোর সময় কিছু বাঙালি বন্ধুর সাথে ঘুরে বেড়ানোর এক সন্ধ্যে যাবতীয় বাঙালি খানার দোকানপাট'এর ভীড়ে একটা দোকানে যেন মনে হল বড়া-পাও বিক্রি হচ্ছে আর্কিমিডিও উত্তেজনা ইউরেকা বলতে যাব এমন সময় সহস্য নির্মমতায় আমার বাঙালি বন্ধুটি আমার ভুল ভাঙ্গীয়ে দিলো যে বস্তু'টি কে দেখে বড়া-পাও'এর বড়া ভেবে ভুল করেছিলাম তার কাছে গিয়ে নজর শ্যেণ করতেই বুঝতে পারলাম যে ব্যাপারটায় বাইরের কিছু মিল থাকলেও, সেটি আলাদা কতটা আলাদা বুঝতে এক টুকরো তুলে কামড় লাগালাম সেই হলো গিয়ে আমার এক-রাত্রিক আলু চপ'এর অভিজ্ঞতা আলু চপ, যা নাকি বঙ্গ জিহ্বা রস'এর অঙ্গ, কোলকাতার যে কোনও চৌমাথা থেকে বাংলার গ্রাম-গঞ্জ'এর যে কোনও বাজারে তেল-ভরা কড়াইয়ে যার গতায়াত সর্বত্র

মুন্নী-শীলার পেলবতায় তর্ক সুখ আটকে রেখে দেশ এবং মানবতার কি বিন্দু মাত্রও শ্রীবৃদ্ধি সম্ভব? আসুন সহ-নাগরিকেরা, জীবনের আরও নিবিড় স্পর্শ ও টানাপোড়েন গুলো নিয়ে আমরা মনসংযোগ করি, তর্ক জুড়ি জীবন'এর অতি-বাস্তবতাদের নিয়েআসুন, আমরা হিসেব কষে জেনে নিই,মানব জিহ্বাকে কে বেশি তড়িত্‍ স্পর্শ করেছে
এক নিরীহ ও একান্তই এক মধ্যবিত্ত্ব তুলনামূলক আলোচনায় ডুব দেওয়া যাক এইবারে, তুলনার পাত্ররা কারা? বড়া-পাও এবং আলুর চপদুই'ই বাহ্যিক রূপে প্রায় কাছাকাছি, দুটোই মেদ-মেদূর আলু দিয়ে তৈরি, ডুবো তেলে ডুব দিয়ে দুই'এরই আত্ম-প্রকাশ কিন্তু মননে এবং সত্ত্বায় এই দুটি খাদ্য ভিন্য মেরু'তে বিচরন করে মুম্বাইকর সূত্র ধরে বড়া-পাও'এর হয়ে পটভূমি রচনা করলাম আমি, নিরপেক্ষতার স্বার্থে আলুর চপ নিয়ে বিশ্লেষণে বসবেন আমার প্রিয় বন্ধু সাম্য দত্ত, যিনি নিজে প্রবাসী হয়েও, রসনার দিক থেকে এক প্রবল-বাঙালি


বড়া-পাও বনাম আলুর চপ

অথ বড়া-পাও কথা

বড়া-পাও মুম্বাইয়ের অলিতে-গলিতে-রাজপথের সবচেয়ে সহজলভ্য আম-জনতার খাদ্য গরম গরম পরিবেশিত হয়ে, দৈনিক ব্যস্ততার মাঝে, যা লক্ষ্য-কোটি পাকস্থলীদের শান্ত করে আসছে সেই কবে থেকে পকেটে কম তোলপাড় তুলে পেট'কে সুস্বাদু টোটকায় ভরিয়ে তোলে এই বড়া-পাও...এক নম্বর প্লাটফর্ম থেকে চার নম্বরের দিকে দৌড়ের মাঝে; হয়ত অফিস, হয়ত টিউশনি, হয়তো বা ক্রিকেট প্র্যাক্টিসের জন্যে...
বড়া পাও চিরে দেখুন:
সেদ্ধ আলু কাঁচা লঙ্কা-ধনে-হিং-হলুদ-শুকনো লঙ্কা গুড়ো সহ চটকে, নিটোল গোল্লা পাকিয়ে, বেসনে চুবিয়ে ডুব তেলে ভাজা এই ভাবে আত্ম-প্রকাশ বড়া' বড়া ব্যাপারটা নিজ গুণে খাওয়া যেতেই পারে, তবে এর পূর্ণ স্বাদ-সত্ত্বা এক মাত্র পাও'এর সাথেই প্রকাশ পায়পাও হল পাউ-রুটির পশ্চিমা অবতার, যার মধ্য ভাগ চেরা যাতে তার মধ্যে বড়া আশ্রয় নিতে পারেপাও কে মাখিয়ে নিন মিঠে চাটনি, ঝাল চাটনী এবং রসুনের শুকনো চাটনিতে এর পর এই রমণীয় চাটনি-রসাল পাও'এর মাঝে বড়া এসেই অমৃত-সৃষ্টি হুড়মুর ছুটতে-ছুটতে খান, বা ভীড়'এর মাঝে শ্বাস গুছিয়ে নিতে নিতে কড়া 'কাটিং' চা হাতে এর স্বাদে বুঁদ হয়ে যান আর এর সাথে যদি জুটে যায় বম্বের বৃষ্টি, তবে নিশ্চিত একটা আলপটকা রোমান্স আপনার বুক ছুয়ে পাকস্থলীতে মিশে যাবে
মুম্বাইয়ের সব চেয়ে নামী বড়া-পাও-স্থলগুলির মধ্যে অন্যতমগুলির ঠিকানা হলো ভিল্যে পারলে, ঠিক নারসী মঞ্জি আর মিথি ভাই কলেজের সামনে নারসী মঞ্জি'তে যে কয় বছর কাটিয়েছি, সেই কয় বছরে আর কাছে এসে পড়েছি এই বড়া-পাও'এর এখানকার বড়া-পাও'এর দোকানগুলির একটা অভিনবত্ব ছিল; এরা পাও'এর সাথে অন্যান্য চাটনিগুলোর সঙ্গে এক টুকরো আমূল মাখন ছড়িয়ে দিত এবং ফলত পাও ব্যাপারটা হয়ে উঠতো মাখন স্পর্শে অতি রমণীয় ভাবে সিক্ত চাটনি আর মাখনের আদর মাখা সেই বড়া-পাও যখন ধোঁয়া সহ মুখে যেত; আহ, জিহ্বে যেন রমন-বিস্ফোরণ ঘটে যেতো
মুম্বাইয়ের ব্যাবসা বাজারে বড়া-পাও'ও ব্র্যান্ড অর্জন করেছে এবং সেইসব ব্র্যান্ড সফলভাবে নিজেদের বানিজ্যিকরণ ঘটিয়েছে; "জাম্বো কিং", "গোলি বড়া পাও", "শিব বড়া-পাও"; কত অবতারেই বড়া-পাও আজ বম্বে আলো করে আছে
বড়া-পাও'এর নিবিড় সৌন্দর্য কোথায় জানেন? আশায়! এ শহরের শিরা-উপশিরায় কত মানুষ হিংস্র প্রতিকুলতা মাথায় নিয়ে প্রতিনিয়ত মাথা উঁচু করে টিকে আছে; শত অভাবেও একটা বড়া-পাও'এর দোকান দিয়ে কত মানুষ রোজ নিজেদের এলুমিনিয়ামের থালা ভরে নেন রুটি-তরকারী-আচারে বড়া পাও, যে সবার বড় প্রয়োজনের;যে কোনও প্রান্তে, যে কোনও জটলায়; এর বিক্রি তো হবেই, তাই না? আমি ব্যক্তিগত ভাবে চিনি এমন এক বন্ধুকে যিনি এক সময় ছোট্ট এক বড়া-পাও'এর দোকান শুরু করে আজ একটি পাঁচ-তারা হোটেলের শেফ
স্নেহের বড়া-পাও কে এই মুম্বাইকারের সেলাম
(দ্বিতীয় পর্ব: সাম্য দত্ত)

আলু চপ চরিত

এই তুলনাটা অনেকটা ডিস্কভারী চ্যানেলের ওই অনুষ্ঠান গুলোকে মনে করিয়ে দেয়, ওই যে যেখানে বিবিধ জানোয়ারদের গতি-প্রকৃতি নিয়ে চুল চেরা গবেষণা চালিয়ে যান বিশেষজ্ঞরা যাক, আলুর চপ নিয়ে আমায় বলতে হবে, এর চেয়ে ভালোবাসার আর কি হতে পারে আগেই যেমন আমার বন্ধু বলেছেন যে বড়া-পাও'এর বড়া আর আলুর চপের মধ্যে বাহ্যিক মিল আছে বটে, তবে সেটুকু নিতান্ত বাহ্যিকই বটে; ঠিক যেমন ধরুন অঞ্জন দত্ত ও নচিকেতা; দাঁড়ি-গীটারে-জীবনমুখিতে মিল আছে বটেই; তবে সেই মিলটুকু নিতান্তই আবরনের, আত্মার নয়
ভিতরের পুরের স্বাদে বড়া-পাও এবং আলুর চপ আদ্যোপান্ত আলাদা; সেদ্ধ আলু-পেঁয়াজ-নুন-লঙ্কা এবং আর কিছু ঘরোয়া মসলা মিলে মেখে, সাঁতলে এর পুর তৈরি হয়; মাখার গুনেই হোক বা বড়া'র তুলনায় কড়া ভাজার গুনেই হোক, এ দুয়ের স্বাদ বেশ আলাদা তাছাড়া কামড় দিলে বেশ টের পাবেন যে আলুর চপটি একটু বেশি মুচ-মুচে, গায়ের রংটিও সামান্য বেশি কড়া অনেক সময় আলুর চপ'এর দোকানে সিঙ্গারাও পাওয়া যায় কারণ আলুর চপের সঙ্গে পুরের রসদের কিছু মিল আছে, তবে আলুর চপের জনন্যে আলু কে একটু বেশি মাখতে হয়; আলুর চপ ভারী স্নেহময় কিনা বড়া যেমন পাও'এ পূর্ণ হয়, আলুর
চপের তেমনি কোনও বাঁধন নেই নিশ্চিন্তে একলা আলুর চপ'এর রসাস্বদন করতে পারা যায় তবে হ্যাঁ, অনন্য হরেক খাওয়ারের সঙ্গে মিলে অনাবিল হয়ে উঠতে পারে আলুর চপ সব চেয়ে বিস্ফোরক জুটি অবশ্যই আলুর চপ-মুড়ি (মুড়ি যদি সামান্য সর্ষের তেলে মাখা হয় তাহলে তো কথাই নেই) তবে কোনও সঙ্গত ছাড়াও, ভাজা-পড়ার জগতে আলুর-চপ'এর দৃপ্ত-আবেদন সর্বজনবিদিত এবং আস্বাদিত
আলুর চপ কিছুতেই হুড়মুরিয়ে গেলার বস্তু নয়আলুর চপের সাথে বাঙালির বহু যুগের আড্ডা-বিলাস, বহু সন্ধ্যের আলসেমো, বহু গল্প মাখা বৃষ্টি বিকেল আছে বাংলার গরিমসি আমেজের সাথে নির্মেঘ মিশে আছে আলুর চপ, আর কোনও খাদ্যই হয়তো বাঙালির এতটা স্বভাব-আয়ত্ব নয় সেই জন্যেই হয়তো আজ কলকাতায় এলেই প্রথম ঝাঁপ রোল-ফুচকায় নয়; আলুর চপেই দিয়ে থাকি

আলুর চপ যদি পূর্বের প্রতিনিধি হয়ে তবে বড়া-পাও একান্তই পশ্চিমা বড়া-পাও যদি ছুট-ছুট ব্যস্ততা হয়ে তবে আলুর চপ হয়তো গা-এলানো ভালোবাসা