Saturday, September 28, 2013

কোলকাতা ও কোলকাতাইয়া


গ্রাম থেকে শহরে এসেছেন কমলেশ। ওর গ্রাম বিহারের সুপল জেলার এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে। গ্রামের নামটি ভারি সুন্দর; নির্মলি। বছর পাঁচেক আগে এক ভয়ানক বন্যায় কোশী নদী ভাসিয়ে নিয়ে যায় তার ভিটে মাটি ও একটি বাছুর কে। স্ত্রী ও দুই শিশু কে নিয়ে তারপর সোজা কলকাতায় চলে আসেন কম্‌লেশ। বন্যার আগে কমলেশ শহর বলতে দেখেছে দ্বারভাঙ্গা ,মুজঃফরপুর ও পাটনা। তবে ভিটেমাটি হারিয়ে কমলেশয়ের মনে প্রথমেই আসে কলকাতার কথা। সে শুনেছিল যে সেখানে গতর খাটিয়ে দু পয়সা কামানোর সুযোগ প্রচুর।   

কলকাতায় এসে বেশ বিপর্যস্ত হয়ে কিছুদিন কাটাতে হয়েছিল কমলেশ ও তার পরিবারকে। হাওড়ার বাজারে কুলি-গিরি করে প্রথম কিছুদিন গুজরান হয় তার; শহরে তার প্রথম গৃহস্থালি ফুটপাথে। তারপর হাওড়া অঞ্চলেই এক বস্তিতে একটা ঘর আর একটা কারখানায় ঠিকে কাজ পায় কমলেশ। সেই বস্তিতে তার আলাপ হয় বিহারের মধুবনি জেলা থেকে আশা রাজীবের সাথে। রাজীব ট্যাক্সি চালান। সেই রাজীবের কাছে ট্যাক্সি চালানো সেখে কমলেশ। কমলেশকে এক ট্যাক্সি ধরিয়েও দেন রাজীব। ড্রাইভিং লাইসেন্সয়ের ব্যবস্থাও হয়।  গত দু বছর ধরে ট্যাক্সি চালাচ্ছে কমলেশ।  

আমি কমলেশের ট্যাক্সিতে উঠি গতকাল। ঢাকুরিয়া থেকে রাজারহাট যাওয়ার জন্যে। সন্ধ্যের বাইপাসে ভীষণ ভিড়। সেই ফাঁকেই আলাপ জমেছিল কমলেশের সাথে। কমলেশের কাছে জানতে চাইলাম তার কোলকাতা কেমন লাগে। কমলেশ বললে;

শ্বাস বন্ধ্‌ হয়ে যেত সাহাব শুরু শুরু মে। এয়সা লাগতো কি কলকত্তা আমাকে খেয়ে যাবে। কিন্তু তারপর ধীরেধীরে দো পয়সা আসা শুরু হল। দেখলাম থোরা কষ্ট্‌ করলে, কলকত্তা রোটি দিতে কসুর করবে না। আস্তে আস্তে বাংলা ভি শিখলাম। এস্মার্ট হলাম। আমার গাঁওতে আমার জমিন ছিল কিন্তু উধর ভি গরিবি বহুত থা সাহাব। ওখানেও দু বেলা বিবি-বাচ্চা কে ঠিকঠাক খানা খিলাতে পারতাম না  তবে সচ্‌ বলবে তো কলকত্তা আমার পরিবারকে একদিন ভি ভুখা রাখেনি। এখানে কাজ করলে খানা আছে সাহাব। হামি এখন কলকত্তার আদমি আছি সাহাব। ইয়ে সোচ কে আচ্ছা লগতা হ্যায়। লেকিন মুঝে পতা হ্যায় কি আসলিয়ত মে আমি কভি কলকাত্তা কা আদমি হব না। ই ভেবে আমার কভি কভি খুব দুখ ভি হয়

কেন কমলেশ ? তোমার এমন মনে হয় কেন ?”

আমি বুঝি সাহাব, সব বুঝি। বাঙ্গালিদের কাছে আমরা বিহারিরা গঁওয়ার আদমি আছি। আমরা ভদ্দরলোকের মাফিক গান শুনি না। সিগারেট না পিয়ে খৈনী খাই। আমরা কালচার বুঝে না। আমরা শুধু খাটতে পারি সাহাব। কালচার নাহি থাকলে,  খামোখা খাটনি করে কলকাত্তাইয়া কৈসে বনবে সাহাব ?”  

Sunday, September 22, 2013

দুর্গা পুজো ইজ হিয়ার


দুর্গা পুজো ইজ হিয়ার।
ক্যালকাটা ইজ অন ফায়ার।

পুজোবার্ষিকী সমস্ত জমা হয়ে গেছে। ফ্রম শুকতারা টু আনন্দমেলা টু দেশ।

পিতৃপক্ষ শুরু হওয়ার পর থেকেই পেট কন্ট্রোল তথা কন্ডিশনিং শুরু। মিনিমাম মটন, নিয়মিত এন্ট্যাসিড। যাতে পুজো এলে জয় মাবলে খাসি-মুর্গির বন্যায় নিজের গা ভাসিয়ে দেওয়া যায়।

গড়িয়াহাট থেকে একটা পাঞ্জাবি আর একটা ফতুয়া, নিউ মার্কেট থেকে হাফ শার্ট কেনা হয়ে গেছে। খাদিম থেকে এক জোড়া জব্বর চটি কেনা হয়েছে যা পায়ে দিয়ে খিচুড়ি ভোগ বিতরণও করা যাবে আবার অনায়াসে পার্ক স্ট্রীটে গিয়ে কেতাবি হন্টনও চালানো যাবে।  

সিদ্ধি খেয়ে বেহেড নেচে নিজেকে বেইজ্জত করব না, এ প্রতিজ্ঞা অন্যবারগুলোর মত এবারেও করেছি। ফিঙ্গারস্‌ ক্রস্‌ড।

অফিসে ক্যাসুয়াল লিভ এপ্লাই করে বসকে বেদম তোষামোদ শুরু করে দিয়েছি। একাদশী টু লক্ষ্মী পুজো ট্রিপ টু পুরীজগন্নাথ এক্সপ্রেসের বার্থ অবিশ্যি দেড় মাস আগেই বুক করে রাখা হয়েছে।

আমেরিকা থেকে মাকু আসছে, ব্যাঙ্গালোর থেকে হুলো। অতএব সপ্তমী টু বিজয়া দুপুর-বিকেল আড্ডার টাইম টেবিল ফিক্সড।

প্ল্যান কষতে বেশ মশগুল। এই রবিবারের দুপুরেও ভাত-ঘুমের ফাঁকে নবমীর জলখাবারের মেনুটা গুছিয়ে ভেবে নিচ্ছিলাম। এমন সময় স্বপ্নে দেবীর আবির্ভাব। এক্কেবারে গতবারের কলেজ স্কোয়ারের প্রতিমার মত আদল। আমি নমস্কার করায় দেবী কিছুটা ভেবেরে গেছিলেন বটে; দশ হাতে প্রতি-নমস্কার তো আর চাট্টি-খানি ব্যাপার নয়। আমিও স্মার্টলি বললাম প্লিজ ব্যস্ত হবেন না দেবী, বলুন কি করতে পারি আমি ?”

দেখলাম দেবীর মুখে গভীর চিন্তা।

বললেন হ্যাঁ রে বাবা, আমি চাট্টি দিনের জন্যে আসি। আর আমার বাহানায় তুই গান বাজনা, আড্ডা, খাওয়া দাওয়া, থিম পুজো...শুধু এই সব প্ল্যান চালিয়ে যাস ? গতবার দেখলাম তুই বেমালুম লুচি আলুর দম গিলে অঞ্জলি দিলি ? এটা কি তুই ঠিক করছিস বাবা ?”

দেবীর চিন্তার দিকটা বুঝলাম। তাঁকে বুঝিয়ে বললাম প্লিজ ডোন্ট টেক ইট আদার ওয়াইজ দেবী। আপনি চান আনন্দ ধারা বইয়ে দিতে ভুবনে। আলোর বেণু প্লে করতে। উই আর রাইট ইন সিন্‌ক উইথ দ্যাট স্পিরিট। এত ধর্ম দেশে মা, আর এত ঠাকুর অবতার; ভক্তি-টক্তি না ডিসপ্লে করে উপায় কি ? এক মাত্র তুমি আর তোমার পুজোর চারটে দিনই আছে মা; যখন পাবলিক একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। এই কটা দিনই কেবল অফিসের বস আমাদের মাথা চিবায় না বরং আমরা দু চার পিস মুর্গীর ঠ্যাং চিবিয়ে প্রাণ জুড়োই। এক মাত্র আপনিই আছেন যিনি পাবলিককে ধর্মীয় হুকুম-বাজিতে চাবকান না। আপনার পুজোই হল আদত সেকুলার পুজো দেবী, মনের পুজো, আনন্দের পুজো, একটু জিরিয়ে নেওয়ার পুজো। তাই তো আমরা আপনাকে এত ভালোবাসি। দেবী, আপনি শুধু লুচি-গেলা অঞ্জলিই দেখলেন ? আপনি দেখেন নি গত বছর বিজয়ার দিন, আপনার চলে যাওয়ার দুঃখে আমি সিদ্ধি খেয়ে কেমন হাউ হাউ করে কেঁদে আকুল হলাম ? দেখেন নি দেবী ?

আমার কথা শেষ হতে না হতেই দেখলাম দেবীর মুখে স্মিত হাসি আর তার দশ খানা হাত আমার মাথার ওপর। তিনি বললেন ব্রাভো মাই বয়। গর্বিত আমি তোকে নিয়ে। আসলে তোকে একটু বাজিয়ে দেখছিলাম তুই কোন নেকু উত্তর দিস কি না। তুই জব্বর উত্তর দিয়েছিস। নে খোকা, বর প্রার্থনা কর

দেবীর পা ছুঁয়ে বললাম দেবী, ধন দৌলত, ফ্ল্যাটবাড়ি বা প্রমোশনের মত ছিঁচকে স্বার্থপর বর চেয়ে তোমায় ছোট করব না। নবমীর সন্ধ্যেয় ভারি ইচ্ছে ছিল পিটার ক্যাটে ডিনার সারার। তুমি বর দাও যাতে আমায় পাঁচ মিনিটের বেশি লাইনে না দাঁড়াতে হয়। নয়ত যা ভিড় হয় মা, সে তোমায় আর নতুন করে কি বলব

দেবী ভ্যানিস হওয়ার আগে বলে গেলেন তাই হবে”  


Sunday, September 15, 2013

কারণ

দাড়ি না থাকলেও রবীন্দ্রনাথ কবিগুরু হতেন। তবে গুরুদেব না থাকলে কি সফেদ ঝুলন্ত দাড়ি বাঙালি মানসে অমন দাপটে জায়গা পেত ? পেত না। কজ্‌ অ্যান্ড এফেক্ট; সঠিক ফ্রেমে না ফেললেই মুস্কিল।

এগজ্যাম্পেলটা বেশি সাদামাঠা হয়ে গেল। জীবনের বহু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে এই ফ্রেমটাই ঠিকঠাক সাজিয়ে ওঠা মুস্কিল। এই যেমন সিঙ্গারা; তার টান কি নিমকি সুলভ চামড়ায় না মখমলে আলুর পুর থেকে ? কম্বিনেশনে ? ছোটমামা বলেন  এগুলোর কোনটাতেই নয়, সিঙ্গারার টেস্ট রয়েছে তার তন্বী খাপছাড়া-পিরামিডিও আকারে। সিঙ্গারা বর্তুলাকার হলে একটা আদত বেয়াদব খানা হত বলে মেজ-পিসেমশায়ের বিশ্বাস।

অথবা যেমন পল্টুদার চায়ের দোকানে কাঁচের বয়াম থেকে বেরা করা লেড়ো বিস্কুট। স্বাদ কি আদতে বিস্কুটে ? ধুর। আদৌ নয়। ওই বিস্কুট বাড়িতে এনে সোফায় বসে আয়েস করে খেয়ে দেখলাম; বেশ ম্যাড়মেড়ে স্বাদ। সেই লেড়োই পল্টুদার দোকানের বেঞ্চিতে বসে কামড়ে মনে হয় অমৃত। স্বাদ কি ওই পল্টুদার দোকানের চা-বেঞ্চি- কাঁচের গেলাস মাখা গন্ধে ?  

প্রেমে পড়লে বুক চিনচিন না বুক চিনচিন জাগে বলেই প্রেমিকা খুঁজে নিয়ে অঙ্কের খাতার শেষ পাতা ছিঁড়ে আমি-তুমি-আকাশ গোছের গাম্‌বুট কবিতা ?

এই সব ভাবতে ভাবতে  বেশ চমৎকার আধ ঘণ্টা কেটে গেল অনিকেতের। আজও ইন্টার্ভিউটা ঠিক হিসেব মত গেল না। অতএব বাস স্ট্যান্ডে বসে নির্বিকারে একের পর এক যাদবপুর যাওয়ার বাস দেখতে পেয়েও পাত্তা দেওয়ার প্রয়োজন দেখছিল না সে। অবশ্য বাড়ি ফেরার তেমন তাড়াও নেই। বাড়িতে কেউই তো আর অপেক্ষা করে বসে নেই। ভাগ্যিস মা গত মাসেই চলে গেলেন। নয়তো বেকার ছেলের খপ্পরে পরে আরও ভুগতে হত।

সবে এক মাস হল তো, মা’র কথা মনে এলে চোখ ছলছল করবেই। এমনটাই স্বাভাবিক – এটা জানে অনিকেত। চাকরি নেই বলে কতটা চোখ ছলছল আর মা নেই বলে কতটা কান্না ? অনিকেত বুঝলে এখানেও ফ্রেমটা সাজানো গোলমেলে। হয়ত এক খাবলা চমৎকার নিষ্পাপ কান্না তার বুক থেকে টেনে আনতেই মা চলে গেলেন আর আজকের চাকরিটা গচ্চা গেল; দুজনে মিলে যুক্তি করে। হয়ত। হয়ত। হয়ত।     

Wednesday, September 4, 2013

শিক্ষক


মাঝরাত-গুলোর রোয়াবই আলাদা। যারা শহুরে রাত জাগায় অভ্যস্ত; তারা জানেন যে রাত্রের আকাশও ঠিক নিকষ কালো হয় না। রাতের আকাশের রঙ আছে, আবছা আলোছায়া আছে।

কৈশোরে, সেই আলোছায়াতেই প্রথম আবিষ্কার করেছিলাম যে এই সুমন ভদ্রলোকটির গান গুলো বেসুরো নয়; বরং বেশ অবলীলায় পাঁজরে হাত বুলিয়ে যায় সে সব সুর। রাতের অন্ধকারেই প্রথম; কোন স্কুল-প্রেমিকার প্রতি আনুগত্য স্বীকার করে নেওয়ার টেলিফোনিক সাহস জোগাড় করা। মাঝ রাত্তিরেই আবিষ্কার করে ওঠা যে রবীন্দ্রনাথ তালেবর নন, বরং বেশ বন্ধুবাৎসল্যে ভরা ভদ্রলোক। 
  
রাত্তিরগুলো মোটামুটি আমাদের সবাইকে চাবুক মেরে শিখিয়ে দেয় যে দুঃখ ব্যাপারটা নেহাত ফেলনা নয়; কালটিভেট করলে আখেরে টু পাইস হৃদয় ঘটিত প্রফিট ঘটলেও ঘটতে পারে। রেডিও এবং গুলাম আলির দরদ এই রাত্তিরগুলোতেই উথলে ওঠে।

কলেজে ক্লাস প্রায় করতাম না বললেই চলে। কারণ কলেজ স্ট্রিটের পুরনো মেস বাড়িতে তখন বেধড়ক রাত জাগবার ধুম। রাত ভর গোগ্রাসে জেনে নেওয়া বন্ধুত্ব, শক্তি চট্টোপাধ্যায় এবং গোল্ডফ্লেকের গুণাবলী।

দিনভর পৃথিবী জুড়ে পাবলিক একে অপরকে শিখিয়ে চলেছেন। পরিবারের গুরুজনেরা শেখাচ্ছেন, বন্ধুরা জ্ঞান ভাঁজছে, প্রোফেসররা গালভরা বুকনি ছুঁড়ছেন, বস চাবকে বোঝাচ্ছেন, বউ কপচে চলেছে, ট্র্যাফিক পুলিশ নিয়ম হাঁকরে চলেছেন; অর্থাৎ আমায় সবাই শিখিয়ে চলেছেন। একটানা, গোটা দিন জুড়ে ; জবরদস্তি কত কিছু শিখে নেওয়া। 
  
শুধু রাত নেমে এলে, যখন শহর থেবড়ে বসে পরে; তখন কত কিছু শেখা আপনা হতেই বুকে ও মগজে ঢুকে যায়। সেই রাত্রি ঘটিত শেখা-গুলি পাঁচন গেলা শেখা নয়; রবিশঙ্করের সেতারের মত রিনিঝিনি মেজাজের শিক্ষা সে সব।

কম ঘুমনো বা না ঘুমনো রাত্রি গুলো যে কি স্নেহ মিশ্রিত সুরে কত কি শিখিয়ে গেলে। তাই প্রিয় রাত্তিরগুলোকে বলি ; হ্যাপি টিচার্স ডে-থ্যাঙ্ক ইউ।    

Tuesday, August 27, 2013

ফিলিপ কোটলার ও মানব জীবন

এটা ভাঁওতার যুগ। মার্কেটিঙের যুগ। নেকু বাঙালি সেজে থাকলে কিস্যু হওয়ার নয়। এর কাঁঠাল অন্যের মাথায় ভেঙ্গে দিন গুজরান ; এই হল মন্ত্র। দুনিয়ার সামনে নিজেকে একটা প্রডাক্ট হিসেবে জাহির না করতে পারলেই চিত্তির। ফিলিপ কোটলার সাহেব পই পই করে বলে দিয়েছেন যে কোনও পণ্য কেতার সঙ্গে বেচতে হলে প্রয়োজন সঠিক বিপণন মিশেল অর্থাৎ চারটে P, যথা Product, Price, Place এবং Promotion।

এই চারটে P’কে নিজের জীবনেও যদি যুতসই ভাবে ব্যাবহার না করা যায় তবে বিষম কেস।

প্রথম পি ; প্রডাক্ট বা পণ্য আপনি নিজে স্যার – বউ’য়ের কাছে আপনি মাকাল ফল, ছেলেমেয়ের কাছে দুধেল গাই, বসের কাছে গাধা। অকাট্য।

দ্বিতীয় পি ; প্রাইস বা পণ্য-মূল্য। অর্থাৎ আপনি যে সক্কলকে নিজের রক্ত জল করে পরিষেবা দিচ্ছেন তাতে আপনার টু পাইস ইনকাম আছে কি না। শুনে রাখুন; আপনি সবার মন জুগিয়ে চলতে পারলে আপনার স্ত্রী আপনাকে বাপান্ত করবেন না, ছেলেমেয়েরা ছিঁচে কান্না জুড়বে না আর আপনার বস খিস্তি মেরে আপনার গুষ্টির তুষ্টি করবেন না – এবসেন্স অফ নেগেটিভ ইজ দ্য অনলি পজিটিভ স্যার। এই বাপান্ত, ছিঁচে কান্না আর খিস্তি থেকে রেহাই পাওয়াই আপনার খাটুনির একমাত্র মূল্য।

তৃতীয় পি ; প্লেস। অর্থাৎ সর্ষে কে পেষাই কোথায় করা হবে। ভেবে হয়রান হবেন না স্যার; সর্ষে আপনিই। আপনার পেষাই চলবে বাড়িতে, অফিসে, মিনিবাসে; সর্বত্র। আপনাকে রগড়ে যে ফোঁটা ঝাঁঝালো তেল বেরোবে; তা দিয়ে আপনারই কলজে ডিপ-ফ্রাই হবে।

চতুর্থ এবং সবচেয়ে মারাত্মক পি ;  প্রোমোশন। অর্থাৎ নিজেকে একটু ফেস্টুনের মত টাঙিয়ে ধরুন আপনার খদ্দেরদের কাছে।   বউকে বলুন “ আই লাভ ইউ সোনা”; তাকে বুঝিয়ে বলুন এই মাগ্যির বাজারে ‘সোনা’ ডাকটিও কি অমূল্য। ছেলেমেয়েদের সামনে নিজেকে একটা চলমান মানিব্যাগ বলে তুলে ধরুন, নয়ত ইজ্জতের আশা করবেন না। আর নিজের বসের সামনে নিজেকে পেশ করুন পনের শতকের মধ্য-ইউরোপের বাজারে বিক্রি হওয়া আফ্রিকান দাস’দের রেপ্লিকা বলে- তবেই সময়মত উন্নতি ঘটবে। প্রোমোশনে একটু কোথাও ঝুলিয়েছেন কি “ বেআক্কেলে, ন্যাকা ভুত, অকর্মণ্য” এমন যাবতীয় পোষ্ট-মডার্ন বাক্য-ক্যালানি সহ্য করতে হবে।  

 শুধু “ মা, মা গো” বলে আরাম মাখা দীর্ঘশ্বাস ভাসিয়ে দিতে কোনও কোটলারের হিসেব-কিতেব মাথায় রাখার দরকার নেই।

Monday, August 26, 2013

মাধুকরী


ঘুগনি। পাঁঠার কিমা ছড়ানো আবেদনময় ঘুগনি। এলুমিনিয়ামের ডেকচিতে টগবগ করে ফোটা পিকাসো মেজাজের ঘুগনি।

মোড়ের মাথার মাধবদা’র ঠেলা।  থরে থরে ষ্টীলের প্লেটে ঘেরা ঠেলার চারপাশ। কেরোসিনের পাম্প দেওয়া স্টোভের গনগনে আঁচ। তার ওপরে মোহময় সেই ডেকচি। যার ভেতরে ফুলে ফেঁপে উথলে উঠছে ঘুগনিয় ঈশ্বর। পাশে প্লাস্টিকের মাঝারি মাপের সবুজ গামলার তিন ভাগ জুড়ে কুচোনো পেঁয়াজের ঢিপি আর বাকিটা জুড়ে লংকা কুচি। ঠেলার অন্য প্রান্তে রয়েছে ষ্টীলের একটা বেয়াড়া সাইজের বাটি – ওতে আছে তেঁতুল গোলা জল। সঙ্গে এক এলুমিনিয়াম গামলা সেদ্ধ খোসা না ছাড়ানো ডিম এবং এক বড় থলি ভরা মোহন বেকারির লম্বা পাউরুটি।

মাধবদা ঠিক সন্ধ্যে ছটায় ঠেলা নিয়ে মোড়ের মাথায় আসেন। ঘুগনি গরম করে নিতে তার লাগে মিনিট কুড়ি। তারপর তার ঠেলা ঘিরে খরিদ্দার জমতে থাকে। তিন ধরনের খরিদ্দার;
এক দল যারা শুধু ঘুগনি খান।
একদল যারা এক প্লেট ঘুগনি খেয়ে একটা বা দুটো ডিম সেদ্ধ খান।
আর আর এক দল যারা ঘুগনিতে ভিজিয়ে পাউরুটি খান।
মাধব’দার ঘুগনি পরিবেশন দেখাবার মত ব্যাপার ছিল। খদ্দের নতুন হলে জিজ্ঞেস করে নিতেন নুন-ঝাল-টক কেমন পড়বে ? মাধবদা বলতেন;
“শুধু ঘুগনি কাঁচা মাটির মত ব্যাপার, তাতে তুমি কেমন ভাবে পেয়াজ-লংকা কুচি তেঁতুল জল, বিট নুন ছড়িয়ে চাস-আবাদ করবে সেটা তোমার ব্যাপার। কাজেই খদ্দেরের থেকে আগে জেনে নিতে হয় যে সে কেমন স্বাদ চাইছে।  নয়ত দেখব সে চাইলে ধান; আমি ফলিয়ে দিলাম ফুলকপি। বুঝলে ?”      

মাধবদা অতি যত্নে প্লেট চামচ ধুতেন। ঝকঝকে প্লেটে গরম ধোঁয়া ওঠা পাঁঠার ঘুগনি; তার ওপর পেঁয়াজ কুচি-লংকা ছড়ানো, তেঁতুল জল মিশিয়ে নেওয়া। আহা:, ভাবলেই জিভে-চোখে জল চলে আসে।

ঠিক সন্ধ্যে সাড়ে সাতটার মধ্যে মাধবদা’র ভাঁড়ার সম্পূর্ণ ভাবে খতম হয়ে যেত; গোটা বছর, প্রত্যেক দিন। দিনে এই সোয়া ঘণ্টার ব্যবসা চলত মাধবদার। সেই সোয়া ঘণ্টা পাশের অন্য ঘুগনির দোকানগুলো মাছি মারত, মাধবদা ঠেলা সরিয়ে চলে গেলে তবে তাঁদের ঘুগনি বিক্রি খোলতাই ভাবে শুরু হত। এমন ছিল মাধবদার ঘুগনির সুনাম।

একদিন মাধবদাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে সে আরও বেশি করে ঘুগনি-ডিম সেদ্ধ নিয়ে আসে না কেন। তাহলে সে আরও বেচতে পারতে; আরও মুনাফার সুযোগ থাকত। এক গাল হেসে মাধবদা বলেছিলেন;

“ আরে ধুর, এতেই যা দু পয়সা আসে তাতে আমার দিব্য চলে যায়। আরে বাবা, আমি কি ব্যবসা করি না কি গো ? আমি করি মাধুকরী। দরকারের বেশি পয়সাকড়ি নাড়াচাড়া করে তারপর চিন্তায় চিন্তায় গোল্লায় যাই আর কি। আমাকে বোকা ঠাউরেছ ?”      

Friday, August 23, 2013

মামা ভাগ্নে সংবাদ এবং পুজো পরিকল্পনা


ছোটমামা – “ কি বললি ? এবার পুজোয় তুই পাড়ায় থাকবি না?”

আমি-“ কতবার বলব ? নো। না। নেভার। হাওড়া টু কালকা টিকিট কেটে ফেলেছি। 
পুজোর পাঁচটা দিন শিমলা এবং মানালিতে কমপ্লিট রিল্যাক্সেশন”

ছোটমামা – “ টিকিট কাটার সময় আমার পারমিশন নিয়েছিলি ?”

আমি- “ বাবা’র পারমিশন নিয়েছি”

ছোটমামা – “ ভারি এক্কেবারে পিতৃভক্তি উথলে উঠেছে। টিকিট ক্যান্সেল কর। তোর যাওয়ার কোন প্রয়োজন আমি দেখছি না। এক কাড়ি টাকা নষ্ট। কলকাতার অক্টোবরে গায়ে কম্বল চাপা দিস, শিমলে গেলে বেঁচে ফিরবি ভেবেছিস ?”

আমি- “ সে আমি বুঝবো”

ছোটমামা – “ আমরা গুরুজনেরা থাকতে তুই কি বুঝবি রে আহাম্মক ? তুই চলে গেলে নবমীর থিয়েটারে শিশুপাল হবে কে ? আমি গলা কাটবো কার ?”

আমি – “ বাঃ রে, আমি শিশুপাল হতে যাব কোন দুঃখে ? প্রত্যেকবার যত ফালতু রোলে আমায় কাস্ট করা, আই ওন্ট টলারেট”

ছোটমামা – “ ফালতু কথা। তুই জানিস শিশুপালের ডায়লগ ডেলিভারি কি মর্মান্তিক ? বিশু শিশুপালের রোল পাওয়ার জন্যে আমায় ভজহরির ডিনার অফার করেছে সে খবর রাখিস ?”

আমি – “ ওসব ছাড়ো। বারোয়ারী মণ্ডপে লেবারের মত খাটাবে। ভোগ বিতরণে হাত লাগা রে, ধুনুচি প্রস্তুত কর রে, বৃষ্টি নামলে চেয়ার সরা রে, এটা আন রে, সেটা কেন রে, ভিড় সামলা রে, হ্যান কর রে, ত্যান কর রে। উফ পাঁচটা দিন জুড়ে; সকাল টু রাত ভলেন্টিয়ারগিরির নামে বেগার খাটুনি।  ওই থ্যাঙ্কলেস্‌ হয়রানির মধ্যে এ বান্দা নেই। তাছাড়া হিমাচল আমায় ডাকছে মামা, রিফিউজ করতে পারব না”

ছোটমামা – “ ন্যাকা! হিমাচল ডাকছে! তুই জানিস পুজোর সময় যে বাঙালি পাড়ার পুজো বাদ দিয়ে ব্যাংকক বা ঊটি গিয়ে নেত্য করে তাঁদের দশা কেমন ?
বিরিয়ানি বাদে আরসালানের মতন। ভুঁড়ি বাদে গণেশের মত। ময়দান বাদ কলকাতার মত। টুপি বাদে হিমেশ রেশমিয়ার মত। আপেল বাদে নিউটনের মত। লংকা কুচি বাদে এগ রোলের মত। কচুরি বাদে রবিবারের সকালের মত...”

আমি- “থামো থামো। মাথা চিনচিন করছে”

ছোটমামা – “ ঠিক হ্যায়। মর গিয়ে তুই শিমলায়। শুধু ইয়ে, এ বারে থিয়েটারে দোলন দ্রৌপদির পার্ট করছে। কাল থেকে রিহার্সাল শুরু। টানা দেড় মাস চলবে; সন্ধ্যে সাতটা থেকে রাত নটা পর্যন্ত। ভাবছিলাম তোকে বলব যে তোর বাড়ির কাছাকাছি থাকে যখন, তখন দোলন কে রোজ রিহার্সালের শেষে বাড়ি পর্যন্ত সঙ্গে নিয়ে যেতে। এখন ভাবছি তুই যখন শিমলা কাটছিস, তখন বিশুকেই শিশুপালের পার্টটা অফার করি”

আমি – মামা ইয়ে, আমি বলছিলাম কি...

ছোটমামা – কি ?

আমি – ভেবে দেখলাম তুমি মন্দ বলনি। টনসিলটা এমনিতেই এত ট্রাবল দিচ্ছে। অক্টোবরের শিমলার টেম্পারেচারে আবার কোল্যাপ্স না করে যাই। ভাবছি টিকিটটা ক্যান্সেল করে দি বল ? তাছাড়া শিশুপালের ক্যারেক্টারে একটা বেশ ইয়ে আছে...তাই না ?

ছোটমামা – “ ভারি ইয়ে হয়েছিস, মামা’র সামনেও অমন ইয়ে ভাবে ইয়ে রিভিল করতে আছে ? হা হা হা হা হা হা......”