Thursday, October 24, 2013

ইভনিং শাওয়ার

বাথরুমে এত রকমের সাবান সাজানো থাকে যে নির্মল রোজই খেই হারিয়ে ফেলেন। নতুন কোম্পানি থেকে সাজানো ফ্ল্যাট দেবে তা বেশ জানা ছিল কিন্তু তার বাথরুমের চেকনাইও যে এমন হবে, সেটা আগে ভাবা যায়নি। বউ-ছেলেকে তাড়াতাড়ি অন্ডালের বাড়ি থেকে এখানে নিয়ে আসতে হবে। এখন কত তাড়াতাড়ি দীপা ও বুম্বা এখানকার সোসাইটির আদব কায়দা রপ্ত করতে পারে সেইটেই দেখবার।

বাথরুমের ক্যাবিনেট খুলে মনে ভরে প্রসাধন সম্ভার দেখতে থাকেন নির্মল। হাত ধোয়ার সাবান এক, মুখ ধোয়ার সাবান অন্য।  বাকি শরীরের ধোয়ার জন্যে অন্তত চার রকমের সাবান – লিকুইড আর বার মিলে। লেবেল পড়ে নির্মল বুঝতে পারেন একেক সাবানের মর্ম একেক রকম; একেক রকম স্কিনের জন্যে একেক চিজ্‌, নিজের চামড়ার রকমটা এতদিনেও জানা হয়ে ওঠেনি নির্মলের। স্ক্রাব বলে কিছু একটা ব্যাপার রয়েছে যা দিয়ে বোধ নিজেকে বেশ রগড়ে পরিষ্কার করা যায়।

চুলের জন্যেও হরেক আয়োজন; শ্যাম্পু, কন্ডিশনার, মাস্ক, সিরাম। আর তাছাড়া যে কতশত রকমের শিশি রয়েছে গুনে বা পড়ে শেষ করা যায় না।  শাওয়ারের ঠাণ্ডা জলের সাথে নির্মলের শিরদাঁড়ার ঘাম মিশে যায়।

ফেনায় ভেসে যেতে যেতে নির্মল গাঙ্গুলি তার এই অচানক বিশ্বজয়ের তড়িৎ সিঁড়িগুলো মনে করতে থাকেন। থ্রিল। নতুন সেক্রেটারির ব্লাউজের ঝিলিক খেলে যায় মনে। থ্রিল। বস যে শ্যাম্পেন খাওয়ালে তার এক গেলাসের দাম নাকি থ্রি অ্যান্ড হাফ্‌ থাউজ্যান্ড রুপিজ। থ্রিল।

মৃদু অস্বস্তিটা যায় না, সেটাও বেশ টের পান নির্মল। গোটা শরীরময় জল সাবানের ঝাঁপাটা সত্যেও একটা চ্যাটচ্যাটে ভাব। ছেলেবেলায় বাবা মার্গো সাবান আনতেন। সবজে সাবান, নিম তিতকুটে গন্ধ। তবু নির্মলের ভারি প্রিয় ছিল।

বাথরুমের দরজা খুলে গলা বাড়িয়ে নির্মল হাঁক দিলেন।

-      রাজু ? রাজু ?
-      জি সাহাব। আউর এক তাউলিয়া চাহিয়ে কেয়া সাহাব ?
-      না।  মার্গো সাবান এখনও বাজারে চলে ? জানিস তুই ?
-      জি নহি পতা হুজুর।
-      এক কাজ কর। চট করে নিচের মুদির দোকানে গিয়ে খোঁজ করে আয় দেখি। মার্গো সাবান। মনে থাকবে ? যা দেখে আয়।
-      শর্মার দুকানমে সাহাব ?
-      হ্যাঁ, হ্যাঁ, ওই ছোট মুদীর দোকানটায়।
-      উ দুকানমে আপকা লায়েক সামান নহি মিলেগা সাহাব।
-      আরে যা বলছি তাই কর গিয়ে। এটা থাকলে ওর দোকানেই থাকবে। চট করে যা। ভেজা গায়ে আমি দাঁড়িয়ে আছি। মার্গো সাবান থাকলে এক জোড়া নিয়ে আসিস। টেবিলের ওপর খুচরো টাকা রাখা আছে। জলদি, যা। 

Tuesday, October 15, 2013

ইভনিং পার্টি

সান্যাল – আই হোপ তুমি আজকের ইভনিং পার্টির ইম্পরট্যান্স বুঝতে পারছ গাঙ্গুলি।

গাঙ্গুলি  - অ্যাব্‌সলিউটলি স্যার। কন্ট্র্যাক্ট পাওয়ায় জন্যে ঢান্ডানিয়া কে যে আমরা স্পেশাল ফেভার অফার করতে পিছপা হব না, সেইটা কনভে করবার এর চেয়ে বেটার প্ল্যাটফর্ম আর পাওয়া যাবে না।

সান্যাল – প্রিসাইসলি। ইন ফ্যাক্ট,আগাম হাতে গুঁজে দেওয়ার জন্যে কিছু ক্যাশ আমি সঙ্গে রাখছি। দ্য সুনার উই টাই হিম ডাউন দ্য বেটার।

গাঙ্গুলি – কিন্তু ঢান্ডানিয়াকে হাতে রাখাই কি মূল শর্ত এই কন্ট্র্যাক্ট হাতে পাওয়ার ? ওর ওপরওয়ালা রয়েছে।

সান্যাল – যথেষ্ট খবর রয়েছে আমার কাছে। ওর ওপরওয়ালারা সবাই শুধু রাবার ষ্ট্যাম্প। তাছাড়া, এই ঢান্ডানিয়া ইজ আ ভেরি ধুরন্ধর মাল। দেবিকাপ্রসাদ বলে যে ওর অ্যানুয়াল ইনকাম’য়ের সেভেন্টি পারসেন্ট হল ব্ল্যাক। বুঝতেই পারছ।

গাঙ্গুলি – আই সি। আচ্ছা পার্টিতে তো ডেভিডসন অ্যান্ড কোম্পানির দাশগুপ্তও থাকবে। তাই না। ঢান্ডানিয়াকে এপ্রোচ করবার সময় ওকে দূরে রাখতে হবে।

সান্যাল – সেই কাজটা আমি করব।

গাঙ্গুলি – স্যার, আপনি মানে ? আপনি যদি দাশগুপ্তর সঙ্গে  নিজেকে ব্যস্ত রাখেন তাহলে ঢান্ডানিয়া কে টোপ গেলাবে কে ?

সান্যাল – তুমি। আই ওয়ান্ট ইউ টু ডু ইট।

গাঙ্গুলি  - মাফ করবেন স্যার। আপনি তো জানেন এই ধরনের শেডি ট্র্যান্স্যাকশনগুলো আমি হ্যান্ডল করতে পারি না। মানে, আজ পর্যন্ত কখনও...

সান্যাল – লুক হিয়ার গাঙ্গুলি। এই বিজনেসে থেকে তুমি তুলসী পাতার প্রিটেন্স নিয়ে জীবন কাটিয়ে দেবে সেটা তো হতে পারে না।

গাঙ্গুলি – দেখুন স্যার। আমার এই ব্যাপারটা আপনার কাছে অজানা নয়। কিছু ব্যাপারে আমি কম্প্রোমাইজ করতে পারব না।

সান্যাল – ইউ উইল হ্যাভ টু গাঙ্গুলি। এই সব ডার্টি প্ল্যান ফাঁদায় তোমার এক্সপ্লিসিট মদত থাকবে। মুনাফা কামাবে। বেন্‌জ চড়বে। আর এদিকে হাতে ছুঁচোর গন্ধ বরদাস্ত করবে না। সেইটে তো বেশি দিন হতে পারে না। ইউ উইল হ্যাভ টু। অর আই উইল মেক শিওর দ্যাট ইউ আর নট আ পার্ট অফ দিস ডিল।

গাঙ্গুলি – ইজ ইট আ থ্রেট ?

সান্যাল – এক্সপ্লিসিটলি সো।

গাঙ্গুলি – আমি ভাবতে পারছি না স্যার। আপনার গলার স্বর এই মুহূর্তে সম্পূর্ণ ভাবে অন্য।

সান্যাল – ন্যাকামোর সময় নেই গাঙ্গুলি। ইউ আর ডুয়িং ইট। আর এখন থেকে মনে রেখ, তেল মাখতে হলে তোমায় কড়িটি ফেলতে হবে।

গাঙ্গুলি – বাড়ির ফোন। এক্সকিউজ মি।

পিতা – হ্যালো। গুবলু ? শোন, সন্ধ্যে বেলা আমার একটা ইম্পরট্যান্ট মিট অ্যাটেন্ড করতে হবে । ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড বাবা।

আই নো। আই নো। প্রেপারেশন ভালো আছে তো ? গুড বয়।

হ্যাঁ তোমার সান্যাল কাকু সঙ্গেই আছে আমার। হি উইশেস ইউ অল দ্য বেস্ট ফর টুমরোজ ক্লাস টেস্ট।  

কাল কোন সাবজেক্টে টেস্ট যেন গুবলু সোনা ? মরাল সায়েন্স ? দ্যাট শুড বি আ ওয়াক ইন দ্য পার্ক ফর ইউ। টূ ইজি সাবজেক্ট, তাই না ?


Thursday, October 3, 2013

চিন্তার ব্যাপার


লাঞ্চ হয়ে গেছে দেড়টার মধ্যেই। এই সময়টা দেবুবাবু একটু জিরিয়ে নেন। অফিসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে একটা জর্দা-পান, একটু আনন্দবাজার, অ্যাকাউন্টস’য়ের সামন্তের সঙ্গে চাট্টি কথা, একটা গোল্ডফ্লেক। অতঃপর ফের টেবিলে ফিরে এসে  ফাইল মন্থন।

বারান্দাটা চওড়া। কিন্তু ভারি স্যাঁতস্যাঁতে। ব্রিটিশ আমলের বাড়ি কি না। সতের  বছর আগে জয়েন করেছেন দেবুবাবু; কিন্তু এর মাঝে অফিসে একবারও চুনকাম হয়েছে বলে মনে পড়ে না। পাঁচতলার এই বারান্দা থেকে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউর ব্যস্ততা দেখতে দেখতে দিব্যি সময় কেটে যায়। আনন্দবাজারের খেলার পাতায় পৌঁছে , পান চিবোনো শেষ করে এবং গোল্ড ফ্লেক ধরিয়ে; দেবুবাবু টের পেলেন যে সামন্ত ছোকরা এখনও আসেনি। আজ সামন্ত কামাই করেনি, কারণ গুপ্তা অ্যান্ড কোম্পানির ফাইলটা নিজের হাতে পৌঁছে দিয়েছিল সকাল বেলা।

হরিদেব সামন্ত বয়েসে দেবুবাবুর চেয়ে বছর দশেকের ছোট। বছর খানেক আগে জয়েন করে, আলাপ হয় অফিস ক্যান্টিনে। সেই থেকে দুজনের মধ্যে গুরুশিষ্য গোছের সম্পর্ক। অফিস পলিটিক্স থেকে বস ম্যানেজ করার উপায়; সমস্ত ব্যাপারেই সামন্তকে গাইড করে থাকেন দেবুবাবু। তাছাড়া প্রতিদিন দেড়টা থেকে দুটো; অফিসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দুজনের আড্ডাটা একটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

পৌনে দুটোতেও যখন সামন্ত এলে না; তখন দেবুবাবুর খটকা লাগলো। সিগারেট বারান্দার কোনায় ছুঁড়ে ফেলে এগোলেন অ্যাকাউন্টসয়ের দিকে। সামন্তর টেবিল নজরে আসতেই দেখলেন যে সামন্ত মুখ গুঁজে ডায়েরিতে কিছু লিখে চলেছে।

চিন্তায় পড়লেন দেবুবাবু। ছোকরা কি অসময়ে কাজ করা আরম্ভ করলে নাকি ? ম্যানেজমেন্ট লাই পেয়ে যাবে যে। পই পই করে দেবুবাবু ছোকরাকে বুঝিয়ে চলেন যে অফিসে আসার পরে আধ ঘণ্টা , লাঞ্চের পর আধ ঘণ্টা আর ছুটির আগের আধ ঘণ্টা; কাজ করতে নেই, কাজ করতে নেই, কাজ করতে নেই – করলে  কেরানী জাতের অমঙ্গল। বেশ কথা শুনে চলা ছেলেই তো মনে হত। সেই ব্যাটা এই অসময়ে মন দিয়ে কলম পিষছে দেখে গা পিত্তি জ্বলে গেল দেবুবাবুর।
দুড়দাড় করে এগিয়ে গেলেন সামন্তের টেবিলের দিকে।

-      কই হে সামন্ত, ভারি কাজ করছ দেখছি। বড়বাবু সুড়সুড়ি দিয়েছেন নাকি ?
-      না দেবুদা, অফিসের কাজ নয়।

-      আহ: , বেশ। নিশ্চিন্ত হলাম। তা এত মন দিয়ে কি লেখাপড়া হচ্ছে ভায়া ? সোশ্যালিস্ট পোয়েট্রি-টোয়েট্রি নাকি?

-      ইয়ে না, তা নয়।

-      তবে? দুপুরের আড্ডা ছেড়ে টেবিলে বসে কলম চালাচ্ছ, জরুরি কিছু তো বটেই। পরকীয়া প্রেম পত্র নাকি ?

-      না দেবুদা। আসলে বউ দু মাস পর বাপের বাড়ি থেকে ফিরছে আগামীকাল। বলে রেখেছে মাসকাবারি বাজার করে না রাখলে আমার কপালে দুঃখ আছে। তা, এর আগে বাজার যতবার করেছি বউই ফর্দ করে দিয়েছে। সে চলে যাওয়ার পর হারধনের মেসেই খাওয়া দাওয়া চালিয়েছি এ দুমাস। সেই সকাল থেকে বসে রয়েছি ডায়রি খুলে দেবুদা। চাল, মুগ ডাল আর বাতাসা ছাড়া কিস্যু মাথায় আসছে না। এদিকে ফি মাসে বউ ইয়া লম্বা লিস্ট ধরিয়ে দেয়। কি উপায় দেবুদা? যদি মাসকাবারি ম্যানেজ না করতে পারি তাহলে দু মাসের জন্যে এবার আমায় গা ঢাকা দিতে হবে।

-      হুম, মিনিবাসের ভিড় আর মাসকাবারি; এই করেই যৌবনের বাপের নাম খগেন হয়ে যায় হে। তাই তো বলি; আরথ্রাইটিস গেড়ে বসার আগে হিমালয়ে চলে যাও ভায়া। আজকের বাজারে; মাসকাবারির চেয়ে মাধুকরী ইজ আ ঢের বেটার অপশন।  

Saturday, September 28, 2013

কোলকাতা ও কোলকাতাইয়া


গ্রাম থেকে শহরে এসেছেন কমলেশ। ওর গ্রাম বিহারের সুপল জেলার এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে। গ্রামের নামটি ভারি সুন্দর; নির্মলি। বছর পাঁচেক আগে এক ভয়ানক বন্যায় কোশী নদী ভাসিয়ে নিয়ে যায় তার ভিটে মাটি ও একটি বাছুর কে। স্ত্রী ও দুই শিশু কে নিয়ে তারপর সোজা কলকাতায় চলে আসেন কম্‌লেশ। বন্যার আগে কমলেশ শহর বলতে দেখেছে দ্বারভাঙ্গা ,মুজঃফরপুর ও পাটনা। তবে ভিটেমাটি হারিয়ে কমলেশয়ের মনে প্রথমেই আসে কলকাতার কথা। সে শুনেছিল যে সেখানে গতর খাটিয়ে দু পয়সা কামানোর সুযোগ প্রচুর।   

কলকাতায় এসে বেশ বিপর্যস্ত হয়ে কিছুদিন কাটাতে হয়েছিল কমলেশ ও তার পরিবারকে। হাওড়ার বাজারে কুলি-গিরি করে প্রথম কিছুদিন গুজরান হয় তার; শহরে তার প্রথম গৃহস্থালি ফুটপাথে। তারপর হাওড়া অঞ্চলেই এক বস্তিতে একটা ঘর আর একটা কারখানায় ঠিকে কাজ পায় কমলেশ। সেই বস্তিতে তার আলাপ হয় বিহারের মধুবনি জেলা থেকে আশা রাজীবের সাথে। রাজীব ট্যাক্সি চালান। সেই রাজীবের কাছে ট্যাক্সি চালানো সেখে কমলেশ। কমলেশকে এক ট্যাক্সি ধরিয়েও দেন রাজীব। ড্রাইভিং লাইসেন্সয়ের ব্যবস্থাও হয়।  গত দু বছর ধরে ট্যাক্সি চালাচ্ছে কমলেশ।  

আমি কমলেশের ট্যাক্সিতে উঠি গতকাল। ঢাকুরিয়া থেকে রাজারহাট যাওয়ার জন্যে। সন্ধ্যের বাইপাসে ভীষণ ভিড়। সেই ফাঁকেই আলাপ জমেছিল কমলেশের সাথে। কমলেশের কাছে জানতে চাইলাম তার কোলকাতা কেমন লাগে। কমলেশ বললে;

শ্বাস বন্ধ্‌ হয়ে যেত সাহাব শুরু শুরু মে। এয়সা লাগতো কি কলকত্তা আমাকে খেয়ে যাবে। কিন্তু তারপর ধীরেধীরে দো পয়সা আসা শুরু হল। দেখলাম থোরা কষ্ট্‌ করলে, কলকত্তা রোটি দিতে কসুর করবে না। আস্তে আস্তে বাংলা ভি শিখলাম। এস্মার্ট হলাম। আমার গাঁওতে আমার জমিন ছিল কিন্তু উধর ভি গরিবি বহুত থা সাহাব। ওখানেও দু বেলা বিবি-বাচ্চা কে ঠিকঠাক খানা খিলাতে পারতাম না  তবে সচ্‌ বলবে তো কলকত্তা আমার পরিবারকে একদিন ভি ভুখা রাখেনি। এখানে কাজ করলে খানা আছে সাহাব। হামি এখন কলকত্তার আদমি আছি সাহাব। ইয়ে সোচ কে আচ্ছা লগতা হ্যায়। লেকিন মুঝে পতা হ্যায় কি আসলিয়ত মে আমি কভি কলকাত্তা কা আদমি হব না। ই ভেবে আমার কভি কভি খুব দুখ ভি হয়

কেন কমলেশ ? তোমার এমন মনে হয় কেন ?”

আমি বুঝি সাহাব, সব বুঝি। বাঙ্গালিদের কাছে আমরা বিহারিরা গঁওয়ার আদমি আছি। আমরা ভদ্দরলোকের মাফিক গান শুনি না। সিগারেট না পিয়ে খৈনী খাই। আমরা কালচার বুঝে না। আমরা শুধু খাটতে পারি সাহাব। কালচার নাহি থাকলে,  খামোখা খাটনি করে কলকাত্তাইয়া কৈসে বনবে সাহাব ?”  

Sunday, September 22, 2013

দুর্গা পুজো ইজ হিয়ার


দুর্গা পুজো ইজ হিয়ার।
ক্যালকাটা ইজ অন ফায়ার।

পুজোবার্ষিকী সমস্ত জমা হয়ে গেছে। ফ্রম শুকতারা টু আনন্দমেলা টু দেশ।

পিতৃপক্ষ শুরু হওয়ার পর থেকেই পেট কন্ট্রোল তথা কন্ডিশনিং শুরু। মিনিমাম মটন, নিয়মিত এন্ট্যাসিড। যাতে পুজো এলে জয় মাবলে খাসি-মুর্গির বন্যায় নিজের গা ভাসিয়ে দেওয়া যায়।

গড়িয়াহাট থেকে একটা পাঞ্জাবি আর একটা ফতুয়া, নিউ মার্কেট থেকে হাফ শার্ট কেনা হয়ে গেছে। খাদিম থেকে এক জোড়া জব্বর চটি কেনা হয়েছে যা পায়ে দিয়ে খিচুড়ি ভোগ বিতরণও করা যাবে আবার অনায়াসে পার্ক স্ট্রীটে গিয়ে কেতাবি হন্টনও চালানো যাবে।  

সিদ্ধি খেয়ে বেহেড নেচে নিজেকে বেইজ্জত করব না, এ প্রতিজ্ঞা অন্যবারগুলোর মত এবারেও করেছি। ফিঙ্গারস্‌ ক্রস্‌ড।

অফিসে ক্যাসুয়াল লিভ এপ্লাই করে বসকে বেদম তোষামোদ শুরু করে দিয়েছি। একাদশী টু লক্ষ্মী পুজো ট্রিপ টু পুরীজগন্নাথ এক্সপ্রেসের বার্থ অবিশ্যি দেড় মাস আগেই বুক করে রাখা হয়েছে।

আমেরিকা থেকে মাকু আসছে, ব্যাঙ্গালোর থেকে হুলো। অতএব সপ্তমী টু বিজয়া দুপুর-বিকেল আড্ডার টাইম টেবিল ফিক্সড।

প্ল্যান কষতে বেশ মশগুল। এই রবিবারের দুপুরেও ভাত-ঘুমের ফাঁকে নবমীর জলখাবারের মেনুটা গুছিয়ে ভেবে নিচ্ছিলাম। এমন সময় স্বপ্নে দেবীর আবির্ভাব। এক্কেবারে গতবারের কলেজ স্কোয়ারের প্রতিমার মত আদল। আমি নমস্কার করায় দেবী কিছুটা ভেবেরে গেছিলেন বটে; দশ হাতে প্রতি-নমস্কার তো আর চাট্টি-খানি ব্যাপার নয়। আমিও স্মার্টলি বললাম প্লিজ ব্যস্ত হবেন না দেবী, বলুন কি করতে পারি আমি ?”

দেখলাম দেবীর মুখে গভীর চিন্তা।

বললেন হ্যাঁ রে বাবা, আমি চাট্টি দিনের জন্যে আসি। আর আমার বাহানায় তুই গান বাজনা, আড্ডা, খাওয়া দাওয়া, থিম পুজো...শুধু এই সব প্ল্যান চালিয়ে যাস ? গতবার দেখলাম তুই বেমালুম লুচি আলুর দম গিলে অঞ্জলি দিলি ? এটা কি তুই ঠিক করছিস বাবা ?”

দেবীর চিন্তার দিকটা বুঝলাম। তাঁকে বুঝিয়ে বললাম প্লিজ ডোন্ট টেক ইট আদার ওয়াইজ দেবী। আপনি চান আনন্দ ধারা বইয়ে দিতে ভুবনে। আলোর বেণু প্লে করতে। উই আর রাইট ইন সিন্‌ক উইথ দ্যাট স্পিরিট। এত ধর্ম দেশে মা, আর এত ঠাকুর অবতার; ভক্তি-টক্তি না ডিসপ্লে করে উপায় কি ? এক মাত্র তুমি আর তোমার পুজোর চারটে দিনই আছে মা; যখন পাবলিক একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। এই কটা দিনই কেবল অফিসের বস আমাদের মাথা চিবায় না বরং আমরা দু চার পিস মুর্গীর ঠ্যাং চিবিয়ে প্রাণ জুড়োই। এক মাত্র আপনিই আছেন যিনি পাবলিককে ধর্মীয় হুকুম-বাজিতে চাবকান না। আপনার পুজোই হল আদত সেকুলার পুজো দেবী, মনের পুজো, আনন্দের পুজো, একটু জিরিয়ে নেওয়ার পুজো। তাই তো আমরা আপনাকে এত ভালোবাসি। দেবী, আপনি শুধু লুচি-গেলা অঞ্জলিই দেখলেন ? আপনি দেখেন নি গত বছর বিজয়ার দিন, আপনার চলে যাওয়ার দুঃখে আমি সিদ্ধি খেয়ে কেমন হাউ হাউ করে কেঁদে আকুল হলাম ? দেখেন নি দেবী ?

আমার কথা শেষ হতে না হতেই দেখলাম দেবীর মুখে স্মিত হাসি আর তার দশ খানা হাত আমার মাথার ওপর। তিনি বললেন ব্রাভো মাই বয়। গর্বিত আমি তোকে নিয়ে। আসলে তোকে একটু বাজিয়ে দেখছিলাম তুই কোন নেকু উত্তর দিস কি না। তুই জব্বর উত্তর দিয়েছিস। নে খোকা, বর প্রার্থনা কর

দেবীর পা ছুঁয়ে বললাম দেবী, ধন দৌলত, ফ্ল্যাটবাড়ি বা প্রমোশনের মত ছিঁচকে স্বার্থপর বর চেয়ে তোমায় ছোট করব না। নবমীর সন্ধ্যেয় ভারি ইচ্ছে ছিল পিটার ক্যাটে ডিনার সারার। তুমি বর দাও যাতে আমায় পাঁচ মিনিটের বেশি লাইনে না দাঁড়াতে হয়। নয়ত যা ভিড় হয় মা, সে তোমায় আর নতুন করে কি বলব

দেবী ভ্যানিস হওয়ার আগে বলে গেলেন তাই হবে”  


Sunday, September 15, 2013

কারণ

দাড়ি না থাকলেও রবীন্দ্রনাথ কবিগুরু হতেন। তবে গুরুদেব না থাকলে কি সফেদ ঝুলন্ত দাড়ি বাঙালি মানসে অমন দাপটে জায়গা পেত ? পেত না। কজ্‌ অ্যান্ড এফেক্ট; সঠিক ফ্রেমে না ফেললেই মুস্কিল।

এগজ্যাম্পেলটা বেশি সাদামাঠা হয়ে গেল। জীবনের বহু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে এই ফ্রেমটাই ঠিকঠাক সাজিয়ে ওঠা মুস্কিল। এই যেমন সিঙ্গারা; তার টান কি নিমকি সুলভ চামড়ায় না মখমলে আলুর পুর থেকে ? কম্বিনেশনে ? ছোটমামা বলেন  এগুলোর কোনটাতেই নয়, সিঙ্গারার টেস্ট রয়েছে তার তন্বী খাপছাড়া-পিরামিডিও আকারে। সিঙ্গারা বর্তুলাকার হলে একটা আদত বেয়াদব খানা হত বলে মেজ-পিসেমশায়ের বিশ্বাস।

অথবা যেমন পল্টুদার চায়ের দোকানে কাঁচের বয়াম থেকে বেরা করা লেড়ো বিস্কুট। স্বাদ কি আদতে বিস্কুটে ? ধুর। আদৌ নয়। ওই বিস্কুট বাড়িতে এনে সোফায় বসে আয়েস করে খেয়ে দেখলাম; বেশ ম্যাড়মেড়ে স্বাদ। সেই লেড়োই পল্টুদার দোকানের বেঞ্চিতে বসে কামড়ে মনে হয় অমৃত। স্বাদ কি ওই পল্টুদার দোকানের চা-বেঞ্চি- কাঁচের গেলাস মাখা গন্ধে ?  

প্রেমে পড়লে বুক চিনচিন না বুক চিনচিন জাগে বলেই প্রেমিকা খুঁজে নিয়ে অঙ্কের খাতার শেষ পাতা ছিঁড়ে আমি-তুমি-আকাশ গোছের গাম্‌বুট কবিতা ?

এই সব ভাবতে ভাবতে  বেশ চমৎকার আধ ঘণ্টা কেটে গেল অনিকেতের। আজও ইন্টার্ভিউটা ঠিক হিসেব মত গেল না। অতএব বাস স্ট্যান্ডে বসে নির্বিকারে একের পর এক যাদবপুর যাওয়ার বাস দেখতে পেয়েও পাত্তা দেওয়ার প্রয়োজন দেখছিল না সে। অবশ্য বাড়ি ফেরার তেমন তাড়াও নেই। বাড়িতে কেউই তো আর অপেক্ষা করে বসে নেই। ভাগ্যিস মা গত মাসেই চলে গেলেন। নয়তো বেকার ছেলের খপ্পরে পরে আরও ভুগতে হত।

সবে এক মাস হল তো, মা’র কথা মনে এলে চোখ ছলছল করবেই। এমনটাই স্বাভাবিক – এটা জানে অনিকেত। চাকরি নেই বলে কতটা চোখ ছলছল আর মা নেই বলে কতটা কান্না ? অনিকেত বুঝলে এখানেও ফ্রেমটা সাজানো গোলমেলে। হয়ত এক খাবলা চমৎকার নিষ্পাপ কান্না তার বুক থেকে টেনে আনতেই মা চলে গেলেন আর আজকের চাকরিটা গচ্চা গেল; দুজনে মিলে যুক্তি করে। হয়ত। হয়ত। হয়ত।     

Wednesday, September 4, 2013

শিক্ষক


মাঝরাত-গুলোর রোয়াবই আলাদা। যারা শহুরে রাত জাগায় অভ্যস্ত; তারা জানেন যে রাত্রের আকাশও ঠিক নিকষ কালো হয় না। রাতের আকাশের রঙ আছে, আবছা আলোছায়া আছে।

কৈশোরে, সেই আলোছায়াতেই প্রথম আবিষ্কার করেছিলাম যে এই সুমন ভদ্রলোকটির গান গুলো বেসুরো নয়; বরং বেশ অবলীলায় পাঁজরে হাত বুলিয়ে যায় সে সব সুর। রাতের অন্ধকারেই প্রথম; কোন স্কুল-প্রেমিকার প্রতি আনুগত্য স্বীকার করে নেওয়ার টেলিফোনিক সাহস জোগাড় করা। মাঝ রাত্তিরেই আবিষ্কার করে ওঠা যে রবীন্দ্রনাথ তালেবর নন, বরং বেশ বন্ধুবাৎসল্যে ভরা ভদ্রলোক। 
  
রাত্তিরগুলো মোটামুটি আমাদের সবাইকে চাবুক মেরে শিখিয়ে দেয় যে দুঃখ ব্যাপারটা নেহাত ফেলনা নয়; কালটিভেট করলে আখেরে টু পাইস হৃদয় ঘটিত প্রফিট ঘটলেও ঘটতে পারে। রেডিও এবং গুলাম আলির দরদ এই রাত্তিরগুলোতেই উথলে ওঠে।

কলেজে ক্লাস প্রায় করতাম না বললেই চলে। কারণ কলেজ স্ট্রিটের পুরনো মেস বাড়িতে তখন বেধড়ক রাত জাগবার ধুম। রাত ভর গোগ্রাসে জেনে নেওয়া বন্ধুত্ব, শক্তি চট্টোপাধ্যায় এবং গোল্ডফ্লেকের গুণাবলী।

দিনভর পৃথিবী জুড়ে পাবলিক একে অপরকে শিখিয়ে চলেছেন। পরিবারের গুরুজনেরা শেখাচ্ছেন, বন্ধুরা জ্ঞান ভাঁজছে, প্রোফেসররা গালভরা বুকনি ছুঁড়ছেন, বস চাবকে বোঝাচ্ছেন, বউ কপচে চলেছে, ট্র্যাফিক পুলিশ নিয়ম হাঁকরে চলেছেন; অর্থাৎ আমায় সবাই শিখিয়ে চলেছেন। একটানা, গোটা দিন জুড়ে ; জবরদস্তি কত কিছু শিখে নেওয়া। 
  
শুধু রাত নেমে এলে, যখন শহর থেবড়ে বসে পরে; তখন কত কিছু শেখা আপনা হতেই বুকে ও মগজে ঢুকে যায়। সেই রাত্রি ঘটিত শেখা-গুলি পাঁচন গেলা শেখা নয়; রবিশঙ্করের সেতারের মত রিনিঝিনি মেজাজের শিক্ষা সে সব।

কম ঘুমনো বা না ঘুমনো রাত্রি গুলো যে কি স্নেহ মিশ্রিত সুরে কত কি শিখিয়ে গেলে। তাই প্রিয় রাত্তিরগুলোকে বলি ; হ্যাপি টিচার্স ডে-থ্যাঙ্ক ইউ।