Thursday, July 18, 2013

সরলীকরণ

রাজনীতির সরলীকরণ হতেই পারে। এবং এই সরলীকরণের ভারি প্রয়োজন রয়েছে। তাতে আখেরে আমাদের প্রচুর লাভ। আহঃ, এই আখের শব্দটিতে কি সুফিয়ানা মেজাজ রয়েছে; আখের রসের মত মিষ্টি বাহার রয়েছে। তবে আখেরের কথা অন্যদিন।

আজ কথা রাজনৈতিক সরলীকরণের। বর্তমানের হিসেব-কিতেব ভারি জটিল। এবং কুটিল।  ভোট দিয়ে নেতা ঠিক করা। তারপর সেই নেতাদের হাতে নিজেদের সঁপে দেওয়া। নিজেদের ভবিষ্যতকে তাদের দায়িত্বশীল হাতে অর্পণ করা। নিজেদের ছোট ছেলেমেয়েগুলোকে রাজনৈতিক মাঞ্জায় ধারালো করে নেওয়া। সরকার-বাহাদুর আমাদের আখের গুছিয়ে দেবেন এমন সব মেজাজি অঙ্কে সামিল হওয়া।  কি অব্যর্থ রোমান্টিসিজ্‌ম। অথচ কি জটিল।

তবে দেশের আম –জনতার পক্ষ থেকে আমি কবুল করে নিচ্ছি যে আমাদের রাজনৈতিক পিতাদের প্রতি আমাদের দাবিগুলি নেহাতই অনৈতিক এবং ক্ষেত্র বিশেষে বর্বরচিত। তাঁদের প্রতি আমরা বিন্দু মাত্র সাহায্যের হাত কখনও বাড়িয়ে দিই না অথচ ওনাদের থেকে আমাদের চাওয়ায় ফিরিস্তি অশেষ। অন্তত রাজনৈতিক ক্রিয়াকর্মের সরলীকরণে সাহায্য করে আমরা তাঁদের প্রতি স্নেহজ্ঞাপন করতেই পারতাম।

আমাদের দেশের রাজনীতি সামান্য ২৩টি শিশুর আহুতি চাইলে। আহুতি বিনে এত বড় দেশ চলবে কি করে ? এই আসুরিক সমাজ-ব্যাবস্থা দাঁড়িয়ে থাকবে কোন বলে যদি এখন-তখন খান কুড়ি কচি প্রানের বিনিময় মুল্যটুকুও সমাজ দিতে অস্বীকার করে ?

কিন্তু না।  এ দেশের মানুষজন এমনই আক্কেলহীন যে সন্তানকে দু মুঠো খেতে দিতে না পারলেও স্কুলে পাঠাবার শখ আছে। আহাম্মকের দল। সরকার বাহাদুরের চরনে ২৩টা লাশ ফেলে দেওয়া কি এতই কঠিন ছিল  ? বাপ-মা’দের এত ভনিতার কি প্রয়োজন ? তেইশটা কচি গলা টিপে দেওয়া কি এতই কঠিন ? তা না করে; তাঁদের সরকারি স্কুলে পাঠিয়ে, বিসাক্ত মিড-ডে মিল গিলিয়ে, সংবাদ-মাধ্যমে হল্লা-বাজি করে সন্তান আহুতি দিয়ে; সরকারকে উদ্ভ্রান্ত করে; কি লাভ হল ? বেওকুফ যত। 

Wednesday, July 17, 2013

রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনা



রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনা কাকে বলে ?

ব্যাসন মাখা পাতলা-লম্বাটে বেগুনের টুকরোকে; টগবগে গরম তেলে ছেঁকে, কড়াই থেকে তুলে নেওয়ায় যে প্রস্তুতি।তাকে।

চীনেবাদামের ঠোঙা থেকে শেষ বাদাম টুকরোটি তুলে; শূন্যে ছুঁড়ে দিয়ে নিজের জিভের ডগা দিয়ে লুফে নেওয়ার যে দেড় সেকন্ড। তাকে।

আতপের ধোঁয়া ওঠা সেদ্ধ ভাতে ঘি'য়ের ফোঁটা মিশে যাওয়ার যে সুবাস। তাকে।

দাস কেবিনের রঙ চটা টেবিলের এক কোনে বসে, প্লাস্টিকের নুন-দানি নিয়ে খেলতে খেলতে ফিশ-কবিরাজির জন্য যে অপেক্ষা। তাকে।

বেদম গরমের রোদ মাখা জুন-দুপুরে- রাস্তার মোরের লেবু-জলের প্রথম চুমুকের গলা বেয়ে নেমে আসা। তাকে।

তেল-লঙ্কা দিয়ে মাখা মুড়িতে ভরাট মুখের মধ্যে ফুলুরির আগমনের যে তপস্যা। তাকে।

এক মুঠো সরু চালের ভাতের মধ্যে গবগবিয়ে গরম মুসুরির ডাল ঢেলে দেওয়ার যে স্পর্ধা। তাকে।

বছরের প্রথম হিমসাগরে যে আদুরে কামড় নেমে আসে। তাকে।

প্লেটের ওপরে রসগোল্লার রসধারা বয়ে গিয়ে সিঙ্গারাকে ছুঁয়ে ফেলার যে রোম্যান্স। তাকে।

"ভাত বেড়েছি, খেতে আয়"- মা'র এমন ডাক। আদত রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনা তাকেই বলে।







Wednesday, July 10, 2013

এক রেল অন্য রেল


রেলগাড়ি শব্দটার মধ্যে কি গড়িমসি স্নেহ কাঠের হাতলের দুলুনি, বাদাম-ওয়ালার হাঁক, ঘটরঘটর ছন্দএকটু চেপে বসবেন দাদা জুলুম-হীন আবদার ভাঁড়ে চা শীতের দুপুরের রোদ; অসময়ে বৃষ্টির ছাঁট; ট্রেন জানলায় কলেজ-ফেরতা পথে রেলগাড়ির ফাঁকা সীটগুলোকে অবজ্ঞা করে দরজায় দাঁড়ানো; সদ্য আবিষ্কৃত প্রেমিকার আঙুলের ডগায় গোপন নিষ্পাপ ছোঁয়া   ভিড় মেখে বন্ধুদের সাথে অক্লান্ত সব গল্পগুলো  কাঠের সীটের কোনায় কোনক্রমে বসে আনন্দবাজারি শব্দছক্নিয়ে নাড়াচাড়া

ট্রেন শব্দটার মধ্যে বড় কঠোর ভাবে একটা কারখানা রয়েছে
যেন ঘাম, অফিস টাইম, জনৈক টিফিন-বাক্সের গুঁতো, দম বন্ধ ভিড় আচমকা ঝগড়া, ডেলি-প্যাসেঞ্জারি উগ্র-হুল্লোড় ঘড়ি দেখে আঁতকে ওঠাআজকেও এত লেট

ট্রেন যদি সওদাগরি আপিসের খ্যাঁকখ্যাঁকে ওপরওয়ালা হয় তবে রেলগাড়ি হলে স্কুল-প্রেমিকা     

Friday, July 5, 2013

তস্য তস্য ঈশ্বর

তেমন কিছু নয়। একটি পোকা। কালচে, পুচকে, বিশ্রী; যেমন তারা হয়। আঙুলের ডগায় কেতরে পরে আছে। চলৎশক্তি-হীন বলেই বোধ হয়। অকিঞ্চিৎকর হুল’টির ইতিউতি নড়াচড়ায় বোঝা যায় যে বেঁচে রয়েছে। আয়তনে একটি বাঁশকাঠি চালের দানার চেয়ে দেড়গুনের বেশি  বড় নয়। মুদির দোকান থেকে বয়ে আনা ডালের প্যাকেট থেকে বের হওয়া প্রাণী। দোকানিকে যে রগড়ানি দিতে হবে তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু এই পোকাটাকে টুসকি মেরে উড়িয়ে দিতে মন চাইলো না। অতি চমৎকার দেবতা দেবতা ভাব মনে। চটকে দিতে পারি, ক্যারমের স্ট্রাইকার চালানোর ভঙ্গিতে উড়িয়ে দিতে পারি, আলতো চাপে ভবলীলা সাঙ্গ  করে ঝাড় দিয়ে সটকে দিতে পারি। আমি এই পোকাটির ঈশ্বর; আমি রাখলে থাকবে-আমি মারলে মরবে। আমার মুখের সামনে এই মুহূর্তে কেউ আয়না ধরলে  নিজের স্মিত হাসিটুকু দেখতে পারতাম।

------------------------


আমি যে ঘরে বসে, সেই ঘরটা যে পাড়ায়, সেই পাড়াটা যে রাজ্যে, সে রাজ্যটা যে দেশে, সে দেশটা যে গ্রহে, সে গ্রহটা যে মহাবিশ্বে; সে মহাবিশ্বটা আসলে একটি দানার মধ্যে রয়েছে।

দানাটি রয়েছে একটি প্রকান্ড পোকার পেটের ভিতর একটি ক্ষুদ্রকায় জীবাণু হয়ে। সেই পোকাটি অন্য এক দানবের আঙ্গুলে অসহায় হয়ে লেটকে পড়ে আছে। দানবটি মুদি গোছের দোকান থেকে ডাল গোছের কিছু খাদ্য জাতীয় বস্তু নিয়ে এসেছিলো যার মধ্যে থেকে এই পোকাটি বেরিয়েছে। দানবটি বুঝতে পারছে যে সে এখন এই পোকাটির ঈশ্বর; সে চাইলে পোকাটি মরবে; সে রাখলে বাঁচবে।   

-------------------------

ভাবনাটা এই ভিডিও থেকে টুকে নেওয়া - 


Thursday, May 30, 2013

তাঁরা


-আরে বাবা কেউ দরজাটা খোল, কখন থেকে কড়া নেড়ে চলেছি...বিশ্রি মানুষ তোরা...

-কে এসেছেন ?

-যাক এতক্ষনে অন্তত কেউ ডাক শুনেছে , বলছি দরজাটা খোল তাড়াতাড়ি।

-দরজা খোলার ভার যার ওপর সে কিছুক্ষনের জন্যে নেই। আপনি একটু অপেক্ষা করুন।

-তুই একটু প্লিজ খুলে দে না , এই এলাম। ঘেমে-নেয়ে একাকার। ভিতরে ঢুকে আগে একটু জিরিয়ে নিই।

-দরজা খোলার অধিকার যে আমার নেই ভাই। একটু দাঁড়াও, তাঁর আসার সময় হল বলে। তোমার কণ্ঠস্বর শুনে মনে হয় বয়স অল্প-তুমি করে ডাকছি। 

-অবশ্যই। তুই করে বল না। আমি কিন্তু পাইকারি হারে তুই চালিয়ে থাকি। 

-অসুবিধে নেই।

-তোর কন্ঠস্বর চেনা ঠেকছে। 

-বটে। 

-হ্যাঁ ? তুই কি ...? তুই কি...?

-হ্যাঁ, আমিই। তোমার গলাও আমি বেশ চিনেছি। এ বয়েসে এ অঞ্চলে ঢুঁ মারবে ভাবিনি। মনে হয় দারোয়ান-বাবুর সহজে পাত্তা মিলবে না। একটু না হয় তোমার  জন্যে নিয়ম ভাঙলাম। দাঁড়াও, দরজা খুলে দিই।

-বাঁচালি, এখানেও দেখছি কলকাতার মত ভ্যাপসা গরম। 

সত্যজিৎ দরজা খুলে ঋতুপর্ণ’কে ভেতরে নিয়ে গেলেন। 

Tuesday, May 21, 2013

হরির কল

হরির কাজে মন নেই। গোটা দিন কল-কব্জার ঘ্যাঁচ-ঘোচ। প্রোডাকশন প্রোডাকশন করে দিনভর ধানাই-পানাই। জান বিলকুল কয়লা। দুনিয়াটাই ফালতু। ধুর।

শিপমেন্ট আসে, শিপমেন্ট যায়; বেওসা বেওসা করে হরির হাড়ে দূর্বা গজায়। তাও ম্যানুফ্যাকচারিং হলে হরির মনে হত যে কিছু একটা জব্বর কাজে আছে। তা নয়, স্রেফ প্রসেসিং। যে কাঁচা মাল ফ্যাক্টরি তে ঢুকল, তাকেই এক যন্ত্রে জীবাণু-মুক্ত করে নেওয়া, তারপর অন্য যন্ত্রে ঘষে-মেজে নেওয়া, অতঃপর সেই মান্ধাতা আমলের প্রসেসরে সেই কাঁচা মাল গুঁজে দিয়ে রি-ফরম্যাট করে নিষ্পাপ করে নেওয়া। অতি মামুলি কেস।।
এরপর সেই কাঁচা মালকে নতুন ছাঁচে ফেলে তার একটা হিল্লে করে দেওয়া; স্বর্গীয় ব্র্যান্ডিং যাকে বলে। এবং সব শেষে নতুন নতুন লটে ফিনিশড মাল ফিরতি চালান করে দেওয়া। যেখানে চালান দেওয়া; সেখানেই মালগুলো চটকে-টসকে ফিরে আসে কারখানায় কাঁচা মাল হিসেবে।

এই কারখানাতেই জিন্দেগী বয়ে গেল হরির; দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর।  হরির গেঁজে যাওয়া জীবনের একঘেয়েমি কেউ চিনল না, কেউ বুঝল না। দুনিয়া শুদ্ধু মানুষ হরির মত সাধা-সিধে মাল’কে সেলাম ঠুকেই কাটিয়ে গেলো। কেউ যে ডেকে দু-দণ্ড মনের কথা বলবে, একটু চা-বিড়ি নিয়ে কিছুক্ষণ আড্ডা দেবে; সে বেলায় লবডঙ্কা। অপদার্থের দল সব।

হরি বেশ জানে, এই বেওয়ারিশ মহাকালের কারখানাতেই তার আদি-অন্তহীন থাকা। বেঁচে থাকা কি তা সে আরে কোনোদিন বুঝবে না। শুধু পৃথিবী থেকে পাইকারি হারে আসা মৃতদের আত্মাগুলো কে তাঁর কারখানায় প্রসেস করে যাওয়া আর সেই প্রসেসড আত্মাগুলোকে দুনিয়াতে ফেরত পাঠানো; এই যন্ত্রণাময় কারখানা জীবন থেকে তাঁর মুক্তি নেই। থেকেই থেকেই দুনিয়ার মানুষ-গুলো যখন আদেখলার মত ঈশ্বর-ঈশ্বর বলে ধেই ধেই নাচে ; তখন হরির খুব কাঁচা খিস্তি করতে মন চায়। 

Friday, May 10, 2013

কলকাতার ডাকনাম

কলকাতা একটি অতি ধামড়া, বেয়াক্কেলে, উচ্চমাধ্যমিক-অঙ্কে ব্যাক পাওয়া ছেলে।  ক্লাস সেভেন থেকে কবিতা লিখে আর ক্লাস নাইন থেকে বিড়ি ফুঁকে যে বেমালুম বখে গিয়েছে। বাহানাবাজিতে নোবেল থাকলে সে বিশ্বের কনিষ্ঠতম নোবেল লরিয়েট হতো। ফাঁকিবাজির দুনিয়ায় সে আলেকজ্যান্দার। বাপের গালি , মায়ের মুখ ঝামটা, ভাই-বোনের বিদ্রুপ আর খুচরো প্রেমিকার অবজ্ঞায় বেড়ে ওঠা হেলদোল-বিহীন একটি চরিত্র। একধার দিয়ে পেটুক এবং অন্য ধার দিয়ে পেট পাতলা - এবং সেই কারণেই তার বুকের পাঁজর গোনা যায় আবার অন্যদিকে তলপেটে সে সামান্য নেদু ভুড়িটি যত্নে পুষে রেখেছে । এই কলকাতা ; মদ না খেয়েই  মাতালামি করে  যে পাবলিক-ক্যালানি খায়। 

কিছুই আর করে উঠতে পারেনা
; সেই বেহেড ছেলের মত এই শহরটা। শুধু কিছু স্মৃতি আঁকড়ে সুখ নিংড়ে নেয় সে; যেন সেই বুড়ি-ঠাম্মার কথা মনে করে চোখের জল ফেলা ; যে হেলা-ফেলা করতে না ; যে গপ্প করতে কত আদর করে; যে কত স্নেহ করতে।  শুধু প্রবল ভাবে ভালোবেসে যায় সেই আধুনিকাকে যে তার সামর্থ্যের একান্তই বাইরে।  সবাই এত খিস্তি করে, তবু সেই ছেলেটার ইচ্ছে হয় সবাইকে জড়িয়ে-জাপটে রাখতে ; কলকাতার মত; পরিচিত স্নেহের মত। 

সহজেই কলকাতার ডাকনাম বাপন বা বিল্টু হতে পারতো।