Monday, April 29, 2013

বিনু মারান্ডির গ্রামে

বিনু মারান্ডিরবাড়িতে সন্ধ্যেটা মন্দ কাটলে না। ছোট্ট কুঁড়ে, তার উঠোনে খড়ের ওপরে পাতা মাদুর ; এই হলো বিছানা। খান-কুড়ি আদিবাসীদের গেরস্থালি মিলে এই গ্রাম। আদিবাসীদের উচ্চারনে ঠিক মালুম হয় না; তবে গ্রামের নাম বোধ হয় বিধ্মা। বিটকেল। বিধ্মা’র কাছেই রয়েছে ঝাড়খণ্ডের জঙ্গল। সব চেয়ে কাছের বসতি রয়েছে রামগড়ে; অন্তত আড়াইশো মাইল দূরে। যাচ্ছিলাম রামগড়েই। ঠিক সন্ধ্যের মুখে গাড়িটা গড়বড় করলে এই খানে এসে। নিজের বিদ্যেয় অনেক চেষ্টা করলাম কিন্তু গাড়ি গুমরে রইলেপুরনো ফিয়াট গাড়িটা এবার বিদায় করতে হবে; এত দুরের ড্রাইভে এমন নড়বড়ে গাড়ি নিয়ে বেরোনোটাই ঝুঁকি। আশেপাশে মেকানিকের টিকিও নেই। রামগড়ে এক সহকর্মী থাকে; মোবাইলে অগত্যা তাকেই ধরতে হলো। সহকর্মীটি জানালে সে গাড়ি এবং মেকানিক দুইই পাঠাচ্ছে তবে তা ভোরের আগে পৌছবে না।

অগত্যা কাছের এই আদিবাসি বসতি দেখে এখানেই ঢুঁ মেরে দেখলাম রাতে মাথা গোঁজার একটা ব্যাবস্থা করতে পারি কি নাবিনু মারান্ডির এই কুঁড়েতে আশ্রয় জুটে গেল; বিনুই এ গ্রামে এক মাত্র স্মার্ট ব্যাক্তি; মোড়ল গোছের কিছু বোধ হয়, ভাঙ্গাচোরা হিন্দিতে চমৎকার কাজ চালিয়ে নিতে পারে। আশ্রয় দিতে রাজি হওয়ায় একটা একশো টাকার নোট অফার করেছিলাম; তখনই টের পেলাম যে বিনু সভ্য কায়দায় জিভ কাটতেও দিব্যি শিখে গেছে।
 
বিনুর বউ’য়ের হাতের রান্না শহুরে জিভে রুচবেনা, সেটাই স্বাভাবিক। হরলিক্স  বিস্কুট আর বিসলারির একটা জলের বোতল সঙ্গে থাকায় রাতের খাওয়ার চাপ কমে গেছিলো। অগস্ট মাসের রাত; ভ্যাঁপসা গরমটা নেই; মন্দ লাগছিলো না উঠোনে গা এলিয়ে শুয়ে থাকতে।

লক্ষ্য করলাম বিনুর কুঁড়েতে বেশ কিছু প্রতিবেশী এসে জড়ো হয়েছে। সবার হাতেই ছোট ছোট মাটির হাঁড়ি ; আর সেই মাটির হাঁড়িতে যে তুলসি ভেজানো জল নেই তা স্পষ্ট। বাতাস ভারি করা গন্ধটা নাকে জমা হতেই নিশ্চিন্ত হলাম; আসলি হাঁড়িয়ার সুবাস তাহলে একেই বলে।  অস্বস্তির ব্যাপার হল সবাই দাওয়ায় বসে আমায় হাঁ করে দেখে চলেছে; বুঝলাম শহুরে পাবলিক এ সব দিকে বড় একটা ঘেঁষে না। নিজেকে ইয়েতি মনে হচ্ছিলো আশেপাশের এমন বাড়াবাড়ি কৌতূহলে।
হাত ঘড়িতে দেখলাম রাত আট’টা। ভোর চারটের আগে মেকানিক বা গাড়ি এসে পৌঁছোবার কোনও সুযোগ নেই। একটু চোখ বুজে ঘুমের চেষ্টা করবার তাল করছি এমন সময় বিনু মারান্ডি কাছে এসে বসলে। বুঝলাম এবার সামান্য আলাপ না করলে ভালো দেখায় না।

হিন্দিতে জিজ্ঞেস করলাম “বিনু, তোমরা কর কি ? পেট চলে কিভাবে ?”

বিনু বললে – “ জঙ্গল ভুখ মিটায় বাবু”

জানতে চাইলাম চাষবাস জানা আছে কি না ব্যাটাদের ; সে ঘাড় নেড়ে না বললে।

জিজ্ঞেস করলাম “ জন্তু জানোয়ার পোষা হয় না ?”

কিছুক্ষন ড্যাবড্যাব করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলে বিনু মারান্ডী। তারপর তার ভাঙ্গা হিন্দিতে বললে –
“ এক কালে হাঁস-মুরগি পোষা হতো গ্রামে, কিন্তু হাঁড়িয়ার সাথে ‘চাট’ ভারি দরকারি; সেই চাটের জোগান দিতে গিয়ে তারা সম্পূর্ণ নিকেশ হয়ে যায়। এদিকে মেয়েমানুষ ছাড়া জিন্দেগী চলতে পারে, কিন্তু চাট ছাড়া হাঁড়িয়া কি ভাবে রুচবে ? এ গ্রামে এক ধরনের বুনো খটাশ পাওয়া যেত; এরপর সবাই সেই খটাশ পাকড়াও  করতে লাগলো চাট বানাতে; ধীরে ধীরে খটাশ খতম হয়ে গেল। বুনো শেয়াল মাঝে মাঝে এ গ্রামে আসতো, তারপর তাদের ধরে কতল করা হতো হাঁড়িয়ার চাটের লোভে। তারাও নির্বংশ হলে এ গ্রামের মানুষ বট-অসত্থে ঝুলে থাকা বাদুড় ধরে খেতে শুরু করে; বাদুড় পোড়া আর হাঁড়িয়া চলে বেশ কিছুদিন। কিন্তু অল্প সময়েই বাদুড়ের গুষ্ঠিও হাপিশ হয়ে যায়। তারপর কিছুদিন চললে ব্যাঙ মেরে খাওয়ার রেওয়াজ ; কিন্তু তারা আর কতদিন টিকবে বাবু ?”

আমি থ মেরে গেলাম। জিজ্ঞেস করতেই হলো, “ তবে এখন তোমাদের হাঁড়িয়ার সাথে চাটের ব্যবস্থা কি করে হয় হে বিনু ?”

বিনু বিমর্ষ ভাবে বললে “ আজকাল মানুষ কমে আসছে বাবু, মানুষ কমে আসছে”, বলতে বলতে বিনু কোমরের কাটারিটা খুলে হাতে নিয়ে আমার গা ঘেঁষে এসে বসলে।     

( এটি আদ্যপান্ত গ্যাঁজা নয়, আদত ব্যাপারটা রয়েছে শ্রী অনিমিখ পাত্র’র এই ফেসবুক আপডেটে )


Thursday, April 25, 2013

চিট-ফান্ড

বস বলছে ছয় মাসের কাজ ছয় দিনে সারতে। 

বউ বলছে পুজোয় দীঘা-টিঘা চলবে না, ম্যালেইসিয়ার টিকিট কাটতে হবে। 

মন্ত্রীরা ভাবছেন এক কোপেই হাজার কোটি হাপিস মারতে, ইনস্টলমেন্টে ঝাড়ার  গড়িমসি অসহ্য।

প্রেমিকার মনের চিড়ে সওদাগরী আপিসের চাকরির জলে আর ভিজছেনি, দরকার "ফরেন পোস্টিং"।

ভিক্টোরিয়া প্রেম প্রেমিকের মনে যথেষ্ট সুধা-সঞ্চার করতে পারছে না আজকাল, কথায়  কথায় শুধু বকখালি-উইকেন্ডের বাই। 

বাংলা সিনেমা-দেখিয়ে পাবলিক এখন আর বাইক-চড়া রোম্যান্সে গলে পড়ছেন না, "বেড-সিন" চাই'ই চাই।

ভগবানও মাগনায় ক্রিকেট ছাড়তে চাননা, চল্লিশে চালসে ভগবান মানবেন কেন ? 

জগত্টাই এখন চিট-ফান্ড, তামাম পাবলিক চাইছেন কানা কড়ি ছড়িয়ে গ্যালন গ্যালন সর্ষের তেল গায়ে মাখবেন। লে রগড়। 
খামোখা সুদীপ্ত সেন'য়ের পেছনে হুমড়ি খেয়ে গড়াগড়ি যাওয়ার কি দরকার ?  

Friday, April 12, 2013

চৈত্র সেল কেলো

চৈত্র সেল হলো বাঙালি হুজুগের ভাঁটিখানা। অমুক ডিস্কাউন্ট তমুক ফ্রি’র চক্করে যে একটা তামাম জাতী কি বীভৎস ভাবে কাছাখোলা হয়ে পড়তে পারে তা মালুম করতে হলে এ সময়ে সন্ধ্যেবেলা গড়িয়াহাঁট ঢুঁ মারলেই চলবে।

ফুটপাত উপচে লোকের ঢল রাস্তায়, পুলিস বারোয়ারি পুজার ভলেন্টীয়ারের মত নাচনকোঁদন করে হিমশিম খেয়ে চলেছে। পুরো এলাকাটা গরম কড়াইয়ের মত টগবগ করছে আর আমি পাঁঠার মত ক্রমশ সেদ্ধ হয়ে চলেছি। পাশে ঝাঁ-চকচকে জিন্স যুক্ত বউ ডীস্কাউণ্ট সমেত বাঁকুড়া’র গামছা খুঁজে পাওয়ায় আহ্লাদে আট-খানা।

অক্সিজেন কমে আসছে। এপ্রিল গরমে প্যাচপ্যাচে জামা গায়ের সাথে লেপ্টে। পায়ের ওপর দিয়ে কত শত হিল-ময়ি চটি ও বিরাশি সিক্কার জুতো বয়ে যায় তার ইয়ত্তা নেই। তবু শালা সারা বছরের যত ঝরতি-পড়তি মাল,  চৈত্র-সেলের আছিলায় পাবলিক তা গিলেই ছাড়বে। ফেড আপ।

গামছার দোকানে দাঁড়িয়ে যখন অসহায় হয়ে ভাবছি যে ওই এক পিস গামছা সিলিং ফ্যানে ঝুলিয়ে নিজকে টাঙ্গিয়ে দেওয়া যায় কিনা এমন সময় আমার পাশে লেপ্টে থাকা, ঘামে লটপট টাক সমেত এক মাঝ বয়েসি ভদ্রলোক আমার দিকে ফিরে বললেন “ দাদা এই মানিব্যাগ টা কি আপনার ?”

লে হালুয়া। ভদ্রলোকের হাতে আমারই মানি-ব্যাগ। মানি-ব্যাগ নিয়ে থ্যাঙ্ক ইউ বলতেই ভদ্রলোক গলা উঁচু করে বললেন “ কি ক্যালামিটি বলুন মশায়, এমন জাপটাজাপটি করে দাঁড়িয়ে রয়েছি, নিজের পকেটে হাত ঢোকাতে গিয়ে আপনার পকেটে হাত চালান করে দিয়েছিলাম। কি ভাগ্যি আপনি সেই ব্রাহ্ম-মুহূর্তে টের পাননি, নয়তো পকেটমার ভেবে আমার কেলিয়ে ছাড়তেন”।

ভদ্রলোক পকেট থেকে রুমাল বার করে কপালের ঘাম মুছলেন।
জিজ্ঞেস করলাম, “ ইয়ে, রুমাল টা নিজের পকেট থেকেই বের করেছেন তো ?”  

Friday, March 15, 2013

হুজুগ-দেবী ও বাহানা-সম্রাট

ঘুরতে যাওয়ার জন্যে কত শত মজবুত হুজুগ মজুত রয়েছে। ছোট ঘুরতে যাওয়া, মেজ ঘুরতে যাওয়া বড় ঘুরতে যাওয়া। আহাঃ।  

কতদিন ঘুরতে যাওয়া হয় না, চলো ঘুরে আসি। পাহাড় ডাকছে গো, চলো তবে। জগন্নাথের মানত ওভার ডিউ, এবার না গেলেই নয়। মাইনে বেড়েছে গত মাসে, ঘুরে আসি। বোনাস আ গয়া, টিকিট কেটে ফেলা যাক। শরীর মন ভালো নেই, একটু বেড়িয়ে আসলে কেমন হয়? প্রবল স্ফূর্তি; দল বেঁধে বেড়িয়ে আসা যাক। মন কেমন বিকেলবেলা, চলো গঙ্গার ঘাটে। সময় কাটাবার  পার্কে হাঁটাহাঁটি। পায়ের তলায় আর ইলিশ ভাপায়; সর্ষে ম্যাজিকের জুড়ি নেই। ঘুরে বেড়াবার যুক্তি জোগাড় করে একদল মানুষ হিল্লে মনে ঘুরে বেড়ান; যেমন আমার সঙ্গিনীটি।

অন্যদিকে। যারা মুভ-টি-নট হয়ে ঘরের কোনে ক্যানিয়াকুম্যারি টু ক্যাস্মের এস্পার-ওস্পারে করে থাকেন, তাঁদেরও বাহানা-বাহিনী নিতান্ত নড়বড়ে নয়।
পাড়ার মণ্ডপে না বসলে পুজো গ্যাঁজলা মেরে যায়, এ সময় ঘুরতে বেরোবার মানে হয় না। উইকেণ্ড রেস্ত করে রেস্ট নেওয়ার সময়; বেফালতু বোলপুর গিয়ে হেজিয়ে মরার কি দরকার ? সমুদ্র বাদ কারন কুষ্ঠীতে আছে জলে ফাঁড়া বিটউইন আঠারো টু তেপান্ন। Acrophobia আর সর্দির ধাত, অতএব পাহাড় বাদ। কলকাতার ঘেমো ভিড়ে চটকে নিউমার্কেট ঘুরবার জন্যে রবিবারের সিয়েস্টা ত্যাগ করতে হবে, শেষটায় এমন দিন এলো ?  ঘরে বসে ল্যাদ খাওয়ার টাল-বাহানা মুলক যুক্তির লিস্টি অনেকে পকেটে রেখে চলা-ফেরা করেন। যেমন আমি।

দেবীর ভ্রমন-পিপাসায় ও নিজের গৃহ-আলস্যের যুদ্ধে দুজনেই অনবরত জিতে চলি।  তাই সিমলা বেড়াতে , হোটেলের বারান্দায় ফেলে আসা কলকাতার ব্যালকনির মেজাজ খুঁজে পেয়ে আমি বিভূতিভূষণ ও কফি-কাপে দিন উড়িয়ে দিই। আবার দেবী বাড়ির ছাদে উঠে বিকেলের পাতলা আলোয় পড়েন ভ্রমন কাহিনীর রগরগে সমস্ত প্রকৃতি প্রেম। এইটুকুতেই সংসারে থাকা।  

Thursday, March 7, 2013

শাহবাগের প্রতি



আমি মনে মনে শাহবাগ প্র্যাকটিস করি। সক্কাল সক্কাল বাথরুমে ঢুকে শাওয়ারের তালে চিৎকার করে উঠি “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি”। এরপর গায়ে ডিও স্প্রে করতে করতে আলতো গলা কাঁপুনিতে ফ্ল্যাট বাড়ির বাতাস হয়ে ওঠে বিপ্লব-ময় : “ আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী, আমি কি ভুলতে পারি ?” ।

তারপর মুখে সামান্য লুচি-আলুর দম মুখে পুরে ঝুঁকে পরি আনন্দবাজারে; এক দিকে শাহবাগ; অন্য দিকে শহবাগ। ওপারের নির্ভীক প্রতিবাদের খবরে গর্বে ফেঁপে উঠি, বাংলা বলে ঢেঁকুর তুলি,গর্জে উঠি ; “আর একটা লুচি প্লিজ”।

হুন্ডাই গাড়ির স্টীয়ারিং’য়ে দ্রুত অফিসের দিকে ভেসে যেতে যেতে অবাক হয়ে ভাবি ; “ আমরা কি ভাবে পাল্টে দিচ্ছি বাংলার জং ধরা যত খোল নলচে; কি ভাবে ঘুরিয়ে দিচ্ছি বাঙ্গালির ভাগ্য-পথ”। তিন বার জয় বাংলা বলে চালিয়ে দিই গাড়ির মিউজিক সিস্টেম-   “ যে তোমায় ছাড়ে ছাড়ুক আমি তোমায় ছাড়বো না মা...” । আহা; গায়ে কাঁটা আর মৌলবাদের মুখে ঝ্যাঁটা।

অফিসে ইংরেজিতে বার-ফাট্টাই চলে বটে কিন্তু মনে মনে বিপ্লবি বাঙালি হল্লা করে চলে “ জয় শাহবাগ, জয় বাংলা, স্ক্রিউ রাজাকার”। তবে অফিস তো, মন কে একটু মিউট করে চলতেই হয়।

ঘর ফেরতা টিভি’তে শাহবাগ, টুইটারে শাহবাগ, ফেসবুকে শাহবাগ - রক্ত গরম হয়ে যায় মাইরি; এত জোর বিপ্লব পায় যে কি বলবো। নিজেকে সামলাতে পারি না; সামান্য হুইস্কি আর এম-পি-থ্রি’তে প্রতুল মুখুজ্জের হাতে নিজেকে সঁপে দিয়ে গুনগুন করে চলিঃ “ আমি যা কিছু মহান বরন করেছি বিনম্র শ্রদ্ধায়, মেশে তেরো নদি সাত সাগরের জল গঙ্গায় পদ্মায় / বাংলা আমার তৃষ্ণার জল তৃপ্ত শেষ চুমুক / আমি একবার দেখি বার বার দেখি দেখি বাংলার মুখ”। 

Wednesday, February 20, 2013

বনধ থাকুক

বনধ কে যারা গা-জোয়ারি গাল পাড়েন, ইতিহাস তাঁদের চাবকাবেন; এমনটাই আশা। অফিসে বসে সলিট্যায়ার খেলার চেয়ে দুপুরের ভাত ঘুম ঢের ভালো।  মুখে আপনি যাই বাতেলা ঝাড়ুন, নিজের হৃদয় হাতড়ালে টের পাবেন যে বনধ আসলে হিসেবি-ব্লাউজের-সুন্দরী-পরনারী বই আর কিছু নয়।  
  
সব চেয়ে দুঃখের বিষয় যে বনধ-শিল্প বাঙালি আজও সঠিক সুরে বাঁধবার চেষ্টা করলো না। বনধ যেন লিটল ম্যাগাজিনের কবিতা; আঁতলামো করে খিস্তি মেরেই খালাস। বনধ নাকি ইকনমি, জি-ডি-পি, শিক্ষা-স্বাস্থ সমস্ত ইস্যুতে ব্লেড চালায়। আরে ধুর; দেশের পর দেশ সেনাবাহিনী পুষে ফতুর হয়ে যাচ্ছে আর যত গলা-শুকনো কান্না শুধু বনধ’য়ের বেলায়। বনধ হলও হাফ-শহীদ-চাকুরি’বাজেদের বুকের ভেতরের ব্যালকনির হাওয়া; খল-নলচে জুড়ে না হয় খেলুক একটু।  

বনধ-সংস্কৃতি বরং একটু সুসংহত করে তোলবার সময় এসেছে। অমুক-চেতনা সপ্তাহ, তমুক-জাগরন পক্ষ গোছের বেফালতু নেত্য না করে; জাতীয় বনধ সপ্তাহ পালন করা হোক। পালা করে দেশের তাবড় রাজনৈতিক দলগুলো বনধ ডাকবেন। পার্টির বনধ ভলেন্টিয়াররা রাজ্যময় ছড়িয়ে পড়বেন বনধ সম্বন্ধে পাবলিককে আরও সচেতন করে তুলতে। মোরে মোরে ওয়ার্ক-শপ করে লোককে শেখানো হোক কি ভাবে বনধের দিন রাস্তা জুড়ে ক্রিকেট ফুটবল খেলতে হবে, অফিস-কারখানার গেটের সামনে জমায়েত করে কি ভাবে থিয়েটার করতে হবে, কি ভাবেই বা বিভিন্ন পার্টির বনধ-মাস্তানি-কমিটি’তে নাম লেখানো যাবে।

রাজ্যের বনধ-মন্ত্রি রাস্তায় কোনও মিনিবাসে আগুন জ্বেলে বনধ-সপ্তাহের উদ্বোধন করতে পারেন; পেছনে রি-মেড রবিন্দ্রসঙ্গীতের কোরাস – “ বাস জ্বেলে দাও, বাস জ্বেলে দাও, বাস জ্বেলে দাও, দাওওওওওওও...”। এর পর সমস্ত রাজনৈতিক দল গুলো এক এক করে আয়োজন করবেন এক দিনের বন্ধ। রাজ্য জুড়ে উদযাপিত হবে বিভিন্ন উৎসব ও আনন্দ-খেলা; যেমন বনধ ক্রিকেট টুর্নামেন্ট, ছোটদের জন্যে বসে-টায়ার-পোড়াও প্রতিযোগিতা, থিম ভিত্তিক সড়ক-অবরোধ ইত্যাদি। খুব ভালো হয় যদি প্রত্যেক বনধ বা বনধ-বিষয়ক উৎসবগুলোর জন্যে আলাদা আলাদা স্পনসর পাওয়া যায়। বেশ একটা আই-পি-এল হাওয়া লাগবে; কার্বন-কামাল-গাড়ি ভাংচুর বা সিটি-মোমেন্ট অফ রেল-অবরোধ। আহাঃ।

সপ্তাহ শেষে, যখন সমস্ত দলের বনধ শেষ, তখন শুরু হবে সেরা বনধ-ডাকিয়ে রাজনৈতিক দল নির্বাচনের পালা। এটা ডেমোক্রেসির যুগ, ভোটাভুটি ব্যাপারটা মানুষ বেশ খায়। অতএব “সেরা কে”,  এই ব্যাপারটা ঠিক করা যেতে পারে এস-এম-এস ভোটের মাধ্যমে। আপনার প্রিয় বনধ-ডাকিয়ে রাজনৈতিক দল কে জেতাতে হলে আপনাকে এসএমএস করতে হবে <পার্টির নাম>স্পেস<সেরা-বন্ধবাজ> আর তা পাঠিয়ে দিতে হবে অমুক নম্বরে। পার্টি নেতারা নিজে এসে এস-এম-এস এপিল করবেন; তাতে খেল জমবে। সেরা বনধ-ডাকিয়ে রাজনৈতিক দল পাবেন বছরে আরও দুটি এক দিনের বনধ ডাকার সুবর্ণ সুযোগ। রাজ্য-জুড়ে ছড়িয়ে পড়বে বনধ-প্রিয় জনতার জন্যে বনধ গুডীজ; যেমন আই-লাভ-বনধ লেখা টি-শার্ট, টুপি, বিবেকানন্দের বানী লেখা শুনশান বনধ-রাস্তার পোস্টার; ইত্যাদি।

এ সব কিছু হলে দেখবেন; টি-আর-পি,স্পন্সর,এন্সিলারি আউটপুট ইত্যাদি সব মাল-কড়ি মিলে বনধ-ইন্ডাস্ট্রি আপনাদের ইকনমিতেও টু পাইস ঢালবে। ল্যাদখোর পাবলিকও বছরে কদিন ভাত ঘুম দিয়ে হাঁপ ছাড়বে।
      

Monday, February 4, 2013

বসাসুর

-          আগরওয়ালের এপ্রুভালটা করিয়ে এনেছো ?
-          কালকে করবো স্যার।
-          এম কে আর ওয়ার্কস’য়ের ফাইল টা ক্লিয়ার করা হয়েছে ?
-          ভাবছি সেটা আর এ মাসে ধরে লাভ নেই স্যার।
-          মান্থলি রিপোর্ট ?
-          এই যাঃ, ভুলে গেছি।
-          তুমি অফিস আসো কি করতে ? বাড়ি থাকলেই পারো, মাস মাইনেটা আমি না হয় মানিঅর্ডার করে দেবো।
-          ব্যাঙ্ক ট্রান্সফার থাকতে অমন মহাভারতের আমলের কথা বলবেন না তো! মানি অর্ডার শুনলে লোকে হাসবে।
-          মুখে মুখে তর্ক ?
-          গলার আওয়াজ তুলছেন কেন ? পাঁচ ফুটের মধ্যেই তো দুজনায় আছি।
-          বেয়াদপ!
-          খিস্তি মারলে কিন্ত বস-টস বলে তোয়াক্কা করবো না স্যার।
-          থ্রেট করছো ?
-          হুমকি, চমকানি; যা বলবেন।
-          আমি তোমার প্রমোশন আটকে দেবো।
-          আপনার প্রমোশনে আমি ইয়ে করি মাইরি।
বেহেড বেআক্কেলে লোক মশায় আপনি। রইলো আপনার চাকরি। এই আমার রেসিগনেশনের চিঠি। আর আগরওয়ালের থেকে যে আপনি নিয়মিত কমিশন খান; সে কথাও বড় কত্তা দের জানিয়ে যাব।
-          আহা ভাই মুকুজ্যে, তোমার এই দোষ- ইয়ং ম্যান কি না- অল্পেতেই মাথা গরম। অমন রেসিগনেশন রেসিগনেশন বাই তুলোনা তো! তুমিই তো ফিউচার আমাদের। একটু ঠাণ্ডা হয়ে নাও তো দেখি। একটা কাপুচিনো আনাই ? আর মান্থলি রিপোর্ট নিয়ে তোমায় আর বেশি ভাবতে হবে না। আমার হাতে বেশ কিছুটা খালি সময় থাকে। আই উইল মেক ইট। ইউ রিল্যাক্স। রিল্যাক্স। আর ছুটি-টুটির দরকার থাকলে আমায় বলতে প্লিজ হেসিটেট করো না, তোমরা আজকালকার ইয়ং ম্যানরা এত লাজুক যে কেন। 
স্বপ্ন-ভাবনাটা দারুন গাঢ় হয়ে এসেছিলো; এমন সময় পিওন বিশে ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিলে; “বড় সাহেব ডেকেছেন। বলেছেন আগরওয়ালের ফাইলটা নিয়ে যেতে”

মুখ তেতো হয়ে গেল। কলজে ঠাণ্ডা মেরে গেল।
নিজেকে হেঁচড়ে নিয়ে ঢুকলাম বসের ঘরে।
-          আগরওয়ালের এপ্রুভালটা করিয়ে এনেছো ?
-          কালকের মধ্যে হয়ে যাবে স্যার।
-          টুয়েন্টি ফোর আওয়ারস ? ইডিয়ট! এম কে আর ওয়ার্কস’য়ের ফাইল টা ক্লিয়ার করা হয়েছে ?
-          আজ সন্ধ্যের মধ্যেই...।
-          উফ! যত নিষ্কর্মার পাল্লায় পড়েছি।  মান্থলি রিপোর্ট ?
-          কাল ভুলে গেছিলাম স্যার ... এই ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই...
-          দেখি আগামি পাঁচ বছরের মধ্যে তুমি প্রমোশন কি করে পাও, নন-সেন্স কোথাকার! কোনও কাজ ঠিক সময়ে হয় না। অফিসে বসে কি নেত্য করা হয় ?
-          সরি স্যার
-          শাট আপ! আচ্ছা বেআক্কেলে পিস তুমি। তোমায় কি করে টাইট করতে হবে আমি বেশ জানি। বর-কত্তা কে বলে তোমায় এমন কানাগলিতে ট্রান্সফার করাবো...
-          প্লিজ স্যার, মায়ের অসুখ, ছেলের স্কুল, ট্রান্সফার হলে জলে পড়ে যাবো। আসলে দিবাকরদা অসুস্থ হওয়ায় ওর কাজটাও করতে হচ্ছে...তাই এ কাজ গুলো একটু...
-          হোয়াট ? হামকো অজুহাত দেতা হ্যায় ?
-          নো অজুহাত স্যার। ফ্যাক্ট।
-          মুখে মুখে তক্কও করা হচ্ছে আজকাল ?
-          সরি স্যার, এমন আর কোনও দিন হবে না।
-          ব্লাফ।
-          মা কালির দিব্বি। সমস্ত পেন্ডীং ব্যাপারগুলো আজই ম্যানেজ করে নেব স্যার।
-          আজকের মধ্যে না হলে আমি তোমার খাল খিঁচে নেবো। নাউ গেট আউট।